তথ্যের সুরক্ষা নিশ্চিতের লক্ষ্যে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের আওতায় সরকারি ২৯টি প্রতিষ্ঠানকে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পরিকাঠামো ঘোষণা করা হয়েছে। ২১ সেপ্টেম্বর প্রজ্ঞাপন আকারে জারি করে ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি (আইসিটি) বিভাগ। ২৯ প্রতিষ্ঠানের মধ্যে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নাম রয়েছে ৩ নম্বরে। এতে বলা হয়, গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পরিকাঠামোতে বেআইনিভাবে প্রবেশ করলে সাত বছরের কারাদণ্ড বা সর্বোচ্চ ২৫ লাখ টাকা অর্থদণ্ড অথবা উভয় দণ্ড দেওয়া যাবে। বেআইনিভাবে প্রবেশ করে ক্ষতিসাধন বা ক্ষতির চেষ্টা করলে ১৪ বছর কারাদণ্ড বা সর্বোচ্চ ১ কোটি টাকা অর্থদণ্ড অথবা উভয় দণ্ডই দেওয়া যাবে। এই প্রজ্ঞাপনের বলেই কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কর্মকর্তাদের সাত বছরের জেলের ভয় দেখানো হলো।

প্রজ্ঞাপন জারির পর সম্পাদক পরিষদসহ বিভিন্ন গণমাধ্যমকর্মীরা প্রতিবাদ করলে এক বিজ্ঞপ্তিতে তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি বিভাগ জানিয়েছে, উক্ত প্রতিষ্ঠানগুলো সরকার এবং জনগণের গুরুত্বপূর্ণ ও আর্থিক তথ্যাবলি সংরক্ষিত থাকায় তাদের সাইবার নিরাপত্তা নিশ্চিত করা অপরিহার্য। গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পরিকাঠামোগুলোর আইটি অডিট সম্পন্ন, যথাযথ অবকাঠামো নির্মাণ, সঠিক মানসম্পন্ন নেটওয়ার্ক রক্ষণাবেক্ষণ, যথাযথ স্ট্যান্ডার্ড অনুযায়ী হার্ডওয়্যার ও সফটওয়্যার ব্যবহার, দক্ষ ও যোগ্যতাসম্পন্ন মানবসম্পদ নিয়োগ ইত্যাদি কার্যক্রমের দ্বারা পরিকাঠামোগুলোর নিরাপত্তা নিশ্চিত করার মাধ্যমে জনসাধারণকে নিরাপদ ও নিরবচ্ছিন্নভাবে সেবা পৌঁছে দেওয়াই এই ঘোষণার প্রধান উদ্দেশ্য। গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পরিকাঠামো ঘোষণা করা হলেও জনগণের তথ্য প্রাপ্তিতে ব্যাঘাত ঘটবে না।

জনগণ শুধু বিশ্বাস করে ব্যাংকে টাকা জমা রাখে। কোনো ব্যাংকের মালিক ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক কে, তা-ও দেখেন না। বিশ্বাস করে বাংলাদেশ ব্যাংক আছে এসব দেখার জন্য। তাই কষ্টের টাকা নিরাপদ আছে। টাকা ফেরত পেতে কোনো ভোগান্তি পোহাতে হবে না। আর জনগণের বিশ্বাসে যাতে চির না ধরে এ জন্য ব্যাংক খাতের সত্য তথ্য-উপাত্ত নিয়ে আলোচনা জারি থাকা প্রয়োজন। কারণ, কোনো খারাপ ব্যাংকের দায় কেন কোনো ভালো ব্যাংক নেবে।

ফলে কোন ধারায় কর্মকর্তাদের জেল খাটানোর ভয় দেখাচ্ছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক, তা বোধগম্য হচ্ছে না। কারণ, কেন্দ্রীয় ব্যাংকে গণমাধ্যমকর্মীরা প্রবেশ করে যথাযথ অনুমোদন নিয়ে। কেউ অবৈধ বা বেআইনিভাবে প্রবেশ করে না। প্রবেশ করতে নির্দিষ্ট বইয়ে স্বাক্ষর করতে হয়। কর্মক্ষেত্রের পরিচয়, আইডি ও মুঠোফোন নম্বর লিখতে হয়। কখন প্রবেশ করেছে, তা-ও উল্লেখ করতে হয়। এ ক্ষেত্রে যদি আইনের ভুল ব্যাখ্যা দিয়ে কর্মকর্তাদের মধ্যে ভীতি ছড়ানো হয়, তা তো রীতিমতো অপরাধ।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের শীর্ষ কর্মকর্তাদের এমন ভীতি ছড়ানোর উদ্যোগ খুব বেশি দিনের নয়। এটা শুরু হয়েছে গত জুলাইয়ে নতুন গভর্নর যোগদানের পর। এর ফলে যা হয়েছে, তা এখন সবার জানা। দেশের অনেক মানুষ ব্যাংকে জমা রাখা টাকা নিয়ে চিন্তিত।

গণমাধ্যমকর্মীরা কোনো সংবাদ প্রকাশের আগে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের থেকে বিষয়টি নিয়ে পরিষ্কার ধারণা নিতেন। কোন তথ্য দেশের জন্য ভালো হবে, কর্মকর্তারাও সেই পরামর্শ দিতেন। যেসব ব্যাংকে অনিয়ম-দুর্নীতি হচ্ছে, তাদের বিষয়ে বিস্তারিত খোঁজ নিয়ে শুধু সত্যটাই তুলে ধরতেন। যাতে ক্ষতি হতো দুর্নীতিবাজ, ব্যাংক দখলবাজ ও অর্থ পাচারকারীদের। এখন তাঁদের চাপে কেন্দ্রীয় ব্যাংক কড়াকড়ি আরোপ করেছে। ফলে পুরোটা জেনে ও বুঝে তথ্য প্রকাশের সুযোগ সীমিত হয়ে এসেছে।

কিন্তু গণমাধ্যমকর্মীদের তথ্য পাওয়ায় যে প্রবাহ তা বন্ধ হয়নি। কারণ, কেন্দ্রীয় ব্যাংক কোনো বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিলে তা সরকারি বিভিন্ন দপ্তরে পাঠায়। আবার সংশ্লিষ্ট ব্যাংকের সঙ্গে দফায় দফায় চিঠি চালাচালি হয়। কড়াকড়ি আরোপের ফলে যেটা হয়েছে, তা হলো গণমাধ্যমে ব্যাংক খাতের বিভিন্ন বিষয় নিয়ে অপব্যাখ্যা প্রকাশিত হচ্ছে। আবার বাস্তব অবস্থা বিবেচনা না করে শুধু কোন নথির ভিত্তিতে প্রতিবেদন প্রকাশিত হচ্ছে, যাতে ব্যাংক খাতে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ছে। আবার বিভিন্ন মহল উসকানি দেওয়ার সুযোগ নিচ্ছে। যাতে আতঙ্কিত হয়ে পড়ছেন ব্যাংকের আমানতকারীরা।

এখন ব্যাংক খাতের তথ্য লুকিয়ে রাখতে চাইলে কেন্দ্রীয় ব্যাংকসহ সব ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান, এমনকি মন্ত্রণালয়ও কড়াকড়ি কঠোর নির্দেশনা দিতে পারে। এ জন্য সব কর্মকর্তাদের মুঠোফোন বা যেকোনো ডিভাইস নিয়ে প্রবেশ বন্ধ করতে পারে। ইন্টারনেট লাইন বন্ধ করে দিতে পারে। আরেকটি হতে পারে রাতারাতি ভালো হয়ে যেতে পারে সব ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান। এতে আর সত্য তথ্য প্রকাশে কোনো ভয় থাকবে না। আবার সব অনিয়ম ধরা বন্ধ করে হাত গুটিয়ে বসে থাকতে পারে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।

এমন হাত গুটিয়ে থাকার কারণেই দেশে খেলাপি ঋণ এখন প্রায় ১ লাখ ৩৪ হাজার কোটি টাকা। আর ব্যাংক থেকে ঋণের নামে নেওয়া অর্থ পাচার হচ্ছে দেদার। এ জন্য গভর্নরকে যোগ দিয়েই দুর্বল ১০ ব্যাংককে বিশেষ তদারকের আওতার আনার উদ্যোগ নিতে হয়েছে।

তবে এডওয়ার্ড স্নোডেনের মতো কর্মকর্তা যে দেশে নেই, তা বলা যাবে না। স্নোডেন একসময় মার্কিন কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সংস্থা (সিআইএ) ও এনএসএর সঙ্গে ঠিকাদার হিসেবে কাজ করতেন। তথ্যপ্রযুক্তির ক্ষেত্রে দক্ষতার অধিকারী এই তরুণ এনএসএর গোয়েন্দা নজরদারি কর্মসূচির বেআইনি কার্যকলাপ ধরে ফেলেন। নিজের কম্পিউটারে গোপনে কপি করে নেন এনএসএর বিপুল পরিমাণ তথ্য। এ জন্য ‘স্নোডেন’ সিনেমাটি দেখে নিতে পারেন ব্যাংক কর্মকর্তারা।

জনগণ শুধু বিশ্বাস করে ব্যাংকে টাকা জমা রাখে। কোনো ব্যাংকের মালিক ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক কে, তা-ও দেখেন না। বিশ্বাস করে বাংলাদেশ ব্যাংক আছে এসব দেখার জন্য। তাই কষ্টের টাকা নিরাপদ আছে। টাকা ফেরত পেতে কোনো ভোগান্তি পোহাতে হবে না। আর জনগণের বিশ্বাসে যাতে চির না ধরে এ জন্য ব্যাংক খাতের সত্য তথ্য-উপাত্ত নিয়ে আলোচনা জারি থাকা প্রয়োজন। কারণ, কোনো খারাপ ব্যাংকের দায় কেন কোনো ভালো ব্যাংক নেবে।

দেশ-বিদেশে দুর্ভিক্ষ বা মন্দা এখন আলোচিত শব্দ। নোবেল বিজয়ী অর্থনীতিবিদ অমর্ত্য সেন দুর্ভিক্ষ সম্পর্কে বলেছেন, যে দেশে গণমাধ্যম স্বাধীন, সে দেশে দুর্ভিক্ষ হয় না। তাঁর এই বক্তব্য বর্তমান অর্থনৈতিক সংকটেরও সমভাবে প্রযোজ্য। মানুষ সঠিক তথ্য পেলে এই সংকট মোকাবিলা সহজ হবে।

  • সানাউল্লাহ সাকিব প্রথম আলোর জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক
    [email protected]