জননিরাপত্তা ও জনসম্পদ রক্ষায় পুলিশ অপরিহার্য বাহিনী। বর্তমানে পুলিশবিহীন রাষ্ট্র কল্পনা করা যায় না। এমনকি ক্ষুদ্র রাষ্ট্র, যেমন ভাটিকান সিটি, অ্যান্ডোরা, স্যান মেরিনো ও মোনাক্কো নিজস্ব পুলিশ কাঠামো সীমিত হলেও প্রতিবেশী দেশের পুলিশিং ও কারাগারব্যবস্থা ব্যবহার করে। তাই পুলিশবিহীন রাষ্ট্র যেমন অকল্পনীয়, তেমনি দেশকে পুলিশি রাষ্ট্র বা নৈতিকতার পুলিশি তদারকির রাষ্ট্রেও পরিণত করা যায় না।
জনবান্ধব পুলিশিং ছাড়া গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র নির্বিকার হয়ে পড়ে। ১৯৮০–এর দশকের শেষ দিকে একের পর এক কমিউনিস্ট শাসনের পতনের পর গণতান্ত্রিক উত্তরণের পথে বিভিন্ন দেশে গণতান্ত্রিক পুলিশিং ব্যবস্থার প্রয়োজনীয়তা অনুভূত হয়। কারণ, গণতান্ত্রিক জবাবদিহি, জনপরিসরে পর্যালোচনাযোগ্য ও জনসমর্থননির্ভর পুলিশিং কার্যক্রম, আইনের শাসন এবং জনসেবায় ন্যায়ভিত্তিক আচরণ গণতান্ত্রিক পুলিশিংয়ের প্রধান শর্ত।
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট সরকারের পতনের পর অন্তর্বর্তী সময় অতিক্রম করে গত ১২ ফেব্রুয়ারি জাতীয় নির্বাচনের মাধ্যমে বাংলাদেশ নতুন গণতান্ত্রিক পরিক্রমায় প্রবেশ করেছে। সুতরাং পুলিশিং ব্যবস্থার সংস্কার করে গণতান্ত্রিক পুলিশিং নির্মাণ ছাড়া গণতান্ত্রিক পরিকাঠামো সুদৃঢ় করা সম্ভব নয়। কীভাবে তা সম্ভব, সে আলোচনার আগে বাংলাদেশ পুলিশের বর্তমান অবস্থার দিকে তাকানো প্রয়োজন।
আস্থাসহ বহুমাত্রিক সংকটে পুলিশ। জনপরিসরে পুলিশ সম্পর্কে নেতিবাচক ধারণা প্রবল। অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘পুলিশিং’ শীর্ষক জার্নালে প্রকাশিত এক গবেষণায় বলা হয়েছে, বাংলাদেশের পুলিশের প্রতি শহুরে নাগরিকদের আস্থা খুব কম।
জনবল ও প্রযুক্তিগত সীমাবদ্ধতার পাশাপাশি পুলিশ সদস্যরা মানসিক চাপে ভোগেন। চলতি বছরের এক গবেষণায় দেখা গেছে, পেশাগত উচ্চমাত্রার চাপ ২৯ দশমিক ৬ শতাংশ, উদ্বেগ ৪৮ দশমিক ৭ শতাংশ এবং বিষণ্নতা ১৮ দশমিক ৪ শতাংশ সদস্যের মধ্যে বিদ্যমান। জুলাই আন্দোলন ও পরবর্তী ঘটনাবলি পুলিশের মনোবলকে আরও দুর্বল করেছে। পুলিশ সদস্যরা যেমন নিহত হয়েছেন, তেমনি মবোক্রেসির শিকারও হয়েছেন।
পুলিশ একদিকে মনোবলহীন, অন্যদিকে অভিযোগের ভারে জর্জরিত। দমন–পীড়ন, মামলা–বাণিজ্য, ওয়ারেন্ট ছাড়া গ্রেপ্তার, ক্রসফায়ার, রিমান্ড, হেফাজতে মৃত্যু, গুম, অসদাচরণ, ঘুষ ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ দীর্ঘদিনের। গত ২৩ ফেব্রুয়ারি রাতে রাজধানীর সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে মাদকবিরোধী অভিযানে এক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ও এক সাংবাদিককে মারধরের ঘটনা সে ধারাবাহিকতারই অংশ। এ বাস্তবতা থেকে উত্তরণ জরুরি। প্রশ্ন হলো, তা কি সম্ভব? অবশ্যই সম্ভব। যোগাযোগের শক্তি প্রয়োগে তা সম্ভব।
পুলিশ ও জনগণের যোগাযোগ অবিরাম প্রক্রিয়া। এই ধারাবাহিক প্রয়োগ পুলিশকে আস্থাশীল করে তুলতে পারে। তবে আধুনিক ও পেশাদার বাহিনী গড়ে তুলতে হলে প্রয়োজন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাসহ সমসাময়িক প্রযুক্তির প্রাপ্যতা ও দক্ষ ব্যবহার নিশ্চিত করা।
যোগাযোগপ্রক্রিয়ায় উদ্দীপনা ও প্রেরণার মাধ্যমে আচরণগত পরিবর্তন আনা যায়। গবেষণা বলছে, মানুষের আচরণ পরিবর্তনে যোগাযোগ অত্যন্ত কার্যকর শক্তি। মানবীয় যোগাযোগের বিশেষায়িত শাখা উন্নয়ন যোগাযোগ এই রূপান্তর প্রক্রিয়ায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। যোগাযোগদক্ষতা কাজে লাগিয়ে বলপ্রয়োগ ছাড়াই আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়ন সম্ভব।
কানাডার পুলিশ কর্মকর্তারা আইন প্রয়োগের চেয়ে শান্তির দূত হিসেবে উপস্থিত হতে বেশি গুরুত্ব দেন। যোগাযোগের মাধ্যমে তাঁরা সাধারণ দ্বন্দ্ব ও মতভেদও মীমাংসা করেন। কানাডাপ্রবাসী লেখক অ্যালভিন দিলীপ বাগচীর সঙ্গে আলাপে জানা যায়, কানাডার পুলিশ ব্যক্তিগত ও পারিবারিক ছোট সমস্যাতেও বন্ধুর মতো পাশে দাঁড়ায়। বাংলাদেশে বিপদে মানুষ বন্ধুকে ডাকে, আর কানাডায় পুলিশকে ডাকে। কেউ খাদ্যসংকটে পড়লে পুলিশ আশ্রয় ও ফুডব্যাংকের সহায়তার ব্যবস্থা করে। এভাবেই আস্থাশীল সম্পর্ক গড়ে ওঠে।
বাংলাদেশে পুলিশিং সংস্কার নিয়ে বহু প্রস্তাব এসেছে। কিন্তু পোশাক বদল ছাড়া দৃষ্টিভঙ্গি ও আচরণগত পরিবর্তন দৃশ্যমান হয়নি। আচরণগত পরিবর্তনের জন্য রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে উন্নয়ন যোগাযোগভিত্তিক কর্মসূচি প্রয়োজন। একই সঙ্গে বলপ্রয়োগের পরিবর্তে যোগাযোগ কৌশল ব্যবহারের সক্ষমতা নিশ্চিত করতে হবে।
জেল ও জরিমানার উদ্দেশ্য সংশোধন। তাই দাগি আসামি, খুনি কিংবা মাদকাসক্ত ব্যক্তির সঙ্গেও যোগাযোগ অপরিহার্য। যথাযথ যোগাযোগ শীর্ষ সন্ত্রাসীকেও স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে আনতে পারে।
২০১৬ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত সুন্দরবনের পাঁচ শতাধিক জলদস্যু অস্ত্রসহ আত্মসমর্পণ করে স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসেন। উদ্বুদ্ধকরণমূলক যোগাযোগ এতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। জলদস্যুনেতা মোস্তফা শেখ ২০১৭ সালের ১১ সেপ্টেম্বর বিবিসি বাংলাকে বলেন, সরকার, র্যাব ও গণমাধ্যমের আস্থাভিত্তিক যোগাযোগই তাঁদের ফিরে আসতে সহায়তা করেছে। অথচ ১৯৮০ থেকে ২০১৫ সাল পর্যন্ত শতাধিক জলদস্যু বন্দুকযুদ্ধে নিহত হয়েছিলেন।
উনিশ শতকের গোড়ায় যুক্তরাজ্যের সাবেক প্রধানমন্ত্রী স্যার রবার্ট পিল পুলিশের জন্য নয়টি নীতি প্রণয়ন করেন, যা পিলিয়ান নীতি নামে পরিচিত। সেখানে প্রভাবিতকরণ, পরামর্শ ও সতর্কীকরণ ব্যর্থ হলে তবেই বলপ্রয়োগের কথা বলা হয়েছে। অর্থাৎ যোগাযোগই মূল ভিত্তি। জনগণের সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রাখা এবং ন্যায়পরায়ণতা, সহমর্মিতা, দায়িত্ববোধ ও শ্রদ্ধাবোধ অর্জনেও যোগাযোগ দক্ষতা অপরিহার্য।
পুলিশিং হতে হবে প্রতিরোধমূলক ও জন–অংশগ্রহণমূলক। অপরাধ দমনে বলপ্রয়োগের পাশাপাশি অপরাধ প্রতিরোধে জনগণের সঙ্গে নিয়মিত তথ্য আদান–প্রদান জরুরি। কমিউনিটি পুলিশিং উদ্যোগ একসময় আশাব্যঞ্জক ছিল, কিন্তু এখন তা নিষ্ক্রিয়। এটিকে পুনরুজ্জীবিত করতে হবে জনসম্পৃক্ততার ভিত্তিতে।
৮৪৯ থেকে ৮৯৯ খ্রিষ্টাব্দে ওয়েসেক্সের রাজা (বর্তমান যুক্তরাজ্যের দক্ষিণ–পশ্চিম অংশে এই রাজ্যটি ছিল) আলফ্রেড দ্য গ্রেটের শাসনামলে স্থানীয় শান্তিরক্ষায় দশ পরিবার নিয়ে গঠিত দলকে নির্দিষ্ট এলাকার দায়িত্ব দেওয়া হতো, যা টাইটিং পদ্ধতি নামে পরিচিত। স্থানীয়ভাবে সমষ্টিগত দায়বদ্ধতার এ ধারণা আধুনিক প্রেক্ষাপটে পুনর্বিবেচনা করা যেতে পারে।
পুলিশ যেন জনগণের কাছে কেবল বিশেষ পোশাকধারী বাহিনী না হয়ে নিজস্ব সমাজের অংশ হয়ে ওঠে, সে জন্য নিবিড় যোগাযোগ অপরিহার্য। উন্নত দেশগুলো পুলিশ সদস্যদের যোগাযোগদক্ষতা বৃদ্ধিতে প্রশিক্ষণকে গুরুত্ব দেয়। মনোযোগ দিয়ে শোনা, সহানুভূতি প্রকাশ, তাৎক্ষণিক সাড়া দেওয়া ও কার্যকর প্রতিক্রিয়া প্রদান পুলিশের অপরিহার্য দক্ষতা। চাকরির শুরু থেকেই এ ধরনের প্রশিক্ষণ বাধ্যতামূলক হওয়া উচিত।
পুলিশ ও জনগণের যোগাযোগ অবিরাম প্রক্রিয়া। এই ধারাবাহিক প্রয়োগ পুলিশকে আস্থাশীল করে তুলতে পারে। তবে আধুনিক ও পেশাদার বাহিনী গড়ে তুলতে হলে প্রয়োজন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাসহ সমসাময়িক প্রযুক্তির প্রাপ্যতা ও দক্ষ ব্যবহার নিশ্চিত করা।
মাহমুদুল হক সহকারী অধ্যাপক, গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ, বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়, রংপুর।
ই–মেইল: [email protected]
(মতামত লেখকের নিজস্ব)