হাসপাতালগুলোর জন্য শেষ সতর্কঘণ্টা কি আমরা শুনতে পাচ্ছি

ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে অগ্নি দুর্ঘটনায় ফুলবাড়িয়া উপজেলার রাঙ্গামাটিয়া ইউনিয়নের বিষ্ণুরামপুর গ্রামের শাহাজাহান মনিরের মৃত্যুতে আহাজারি করছেন তাঁর মা হাওয়া খাতুন।ছবি : প্রথম আলো

হাসপাতাল এমন একটি স্থান, যেখানে মানুষ জীবন বাঁচানোর আশায় প্রবেশ করে। অথচ হাসপাতালই যদি আগুন, ধোঁয়া ও অপরিকল্পিত রোগী স্থানান্তরের কারণে মৃত্যুফাঁদে পরিণত হয়, তবে তাকে নিছক দুর্ঘটনা বলে পাশ কাটানোর সুযোগ নেই। এটি স্বাস্থ্যব্যবস্থা, ভবন নিয়ন্ত্রণ, অগ্নিনিরাপত্তা ও প্রাতিষ্ঠানিক দায়িত্ববোধের সম্মিলিত ব্যর্থতা।

১৪ সেপ্টেম্বর সন্ধ্যায় ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের নতুন আটতলা ভবনে অগ্নিকাণ্ড আবার সেই অস্বস্তিকর সত্য সামনে এনেছে। প্রাথমিক তথ্যে বলা হয়েছে, লিফট বা এর নিয়ন্ত্রণকক্ষ-সংশ্লিষ্ট স্থানে আগুনের সূত্রপাত। কোথাও শর্টসার্কিট, কোথাও অতিরিক্ত উত্তাপ, আবার কোথাও সিগারেটের আগুনের সম্ভাবনার কথা এসেছে। লিফট-শ্যাফট দিয়ে ধোঁয়া ও আগুন ওপরের তলায় ছড়িয়ে পড়লে রোগী, স্বজন, চিকিৎসক ও নার্সদের মধ্যে আতঙ্ক সৃষ্টি হয়। ফায়ার সার্ভিসের একাধিক ইউনিট পরে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনে।

হতাহতের সংখ্যা নিয়েও পরস্পরবিরোধী তথ্য প্রকাশিত হয়েছে। প্রকৃত সংখ্যা নিরপেক্ষ তদন্তে নিশ্চিত করা জরুরি। তবে সংখ্যা যা-ই হোক, আগুনের শিখার চেয়ে ধোঁয়া, আতঙ্ক, বিশৃঙ্খলা ও প্রস্তুতির ঘাটতি যে বড় বিপদ তৈরি করেছিল, তা স্পষ্ট।

প্রশ্ন হলো, এটি কি শুধু ময়মনসিংহ মেডিকেলের বিচ্ছিন্ন ঘটনা, নাকি দেশের সব সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতালের জন্য চূড়ান্ত সতর্কসংকেত?

ময়মনসিংহের আগুন আমাদের দরজায় কড়া নাড়েনি; দরজা ভেঙে সতর্ক করেছে। এবারও সরকার, হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ ও জনগণ না জাগলে পরবর্তী অগ্নিকাণ্ডকে আর ‘দুর্ঘটনা’ বলা যাবে না। সেটি হবে জানা ঝুঁকি উপেক্ষার পরিণতি—আমাদের সম্মিলিত, প্রাতিষ্ঠানিক ও নৈতিক ব্যর্থতা।

‘শর্টসার্কিট’-দায় এড়ানোর জাতীয় শব্দ

বাংলাদেশে অধিকাংশ অগ্নিকাণ্ডের পর প্রথম শোনা যায় ‘শর্টসার্কিট’। শব্দটি উচ্চারণ করেই যেন তদন্ত, দায় ও কর্তৃপক্ষের দায়িত্ব শেষ হয়ে যায়। অথচ শর্টসার্কিট পূর্ণাঙ্গ তদন্তের ফল নয়; এটি বৈদ্যুতিক ব্যবস্থার গভীর কোনো ত্রুটির দৃশ্যমান পরিণতি।

কেন শর্টসার্কিট হলো? কেবল কি অতিরিক্ত লোড বহন করছিল? সার্কিট ব্রেকারের রেটিং সঠিক ছিল? আর্থিং কার্যকর এবং ইনসুলেশন রেজিস্ট্যান্স পরীক্ষা করা হয়েছিল? লিফটের কন্ট্রোল প্যানেল, মোটর, কেব্‌ল ও সেফটি ডিভাইস নিয়মিত পরীক্ষা হয়েছিল? অতিরিক্ত উত্তাপ শনাক্ত করতে থার্মাল স্ক্যানিং করা হয়েছিল? শ্যাফটে দাহ্য আবর্জনা ছিল কি? ফায়ার-স্টপিং ও ধোঁয়া প্রতিরোধের ব্যবস্থা কোথায় ছিল?

এসব প্রশ্নের উত্তর না দিয়ে ‘শর্টসার্কিট’ বলা রোগের কারণ না খুঁজে শুধু জ্বরকে দায়ী করার মতো।

অগ্নিকাণ্ডের সময় ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ৪টি সিঁড়ি তালাবন্ধ ছিল
ছবি : প্রথম আলো

আগুনের প্রথম ৫ থেকে ১০ মিনিট—‘গোল্ডেন মিনিটস’

ফায়ার সার্ভিস রাষ্ট্রের প্রধান পেশাদার অগ্নিনির্বাপণ ও উদ্ধারকারী সংস্থা। তবে যানজট, দূরত্ব ও প্রবেশগত বাধা পেরিয়ে তাদের ঘটনাস্থলে পৌঁছাতে হয়। তাই আগুনের প্রথম ৫ থেকে ১০ মিনিট ‘গোল্ডেন মিনিটস’ সম্পূর্ণভাবে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ ও প্রশিক্ষিত ফায়ার রেসপন্স টিমের হাতে থাকে।

এ সময়ে আগুন শনাক্ত, অ্যালার্ম চালু, বিদ্যুৎ–বিচ্ছিন্ন, দরজা বন্ধ করে ধোঁয়া নিয়ন্ত্রণ, উপযুক্ত অগ্নিনির্বাপণ যন্ত্র প্রয়োগ এবং ঝুঁকিপূর্ণ রোগীদের নিরাপদ কম্পার্টমেন্টে সরাতে পারলে ছোট আগুন বিপর্যয়ে পরিণত হয় না। তাই ফায়ার সার্ভিস কত মিনিটে পৌঁছেছে, শুধু তা নয়; অ্যালার্ম ও নিয়ন্ত্রণকক্ষের সংকেত কাজ করেছিল কি না, ফায়ার টিম কোথায় ছিল এবং অগ্নিনির্বাপণ যন্ত্র, হোস রিল, হাইড্র্যান্ট ও পাম্প ব্যবহার করা হয়েছিল কি না, তা–ও জানতে হবে।

কাগজে ফায়ার টিম কিংবা দেয়ালে অগ্নিনির্বাপণ যন্ত্র থাকাই যথেষ্ট নয়। রিজার্ভ বা ছাদের পানির ট্যাংকের সঙ্গে পাম্প, চাপ, ভাল্‌ভ, পাইপ, বিদ্যুৎ, বিকল্প শক্তি, নিয়মিত পরীক্ষা এবং প্রশিক্ষিত জনবল সচল থাকলেই হাইড্র্যান্ট কার্যকর হবে।

হাসপাতাল খালি করা সাধারণ ভবনের মতো নয়

হাসপাতালের সবাই স্বাভাবিকভাবে হাঁটতে পারেন না। সেখানে অস্ত্রোপচাররত, ভেন্টিলেটরনির্ভর, আইসিইউ-সিসিইউ, নবজাতক, শিশু, গর্ভবতী, ডায়ালাইসিসরত, অক্সিজেননির্ভর ও মানসিকভাবে বিভ্রান্ত রোগী থাকেন। তাঁদের সিঁড়ি দিয়ে দ্রুত নামানো যায় না। একজন রোগীকে সরাতে প্রশিক্ষিত কর্মী, অক্সিজেন, স্ট্রেচার, হুইলচেয়ার, ওষুধ ও নিরবচ্ছিন্ন চিকিৎসা-সহায়তা প্রয়োজন হতে পারে।

আন্তর্জাতিকভাবে পুরো হাসপাতাল নির্বিচার খালি করার পরিবর্তে আগুন নিয়ন্ত্রণ, ধোঁয়ার বিস্তার রোধ এবং ‘হরাইজন্টাল ইভাকুয়েশন’, অর্থাৎ একই তলার নিরাপদ ফায়ার কম্পার্টমেন্টে রোগী সরানো অগ্রাধিকার পায়। প্রয়োজন হলে পরে নিচের তলা বা বাইরে স্থানান্তর করা হয়।

এ জন্য ফায়ার ও স্মোক কম্পার্টমেন্ট, ফায়ার-রেটেড দরজা, সুরক্ষিত করিডর, বিকল্প সিঁড়ি, র‍্যাম্প, ইভাকুয়েশন চেয়ার ও রোগীভিত্তিক অগ্রাধিকার তালিকা প্রয়োজন। ময়মনসিংহ মেডিকেলে বিকল্প বের হওয়ার পথ থাকায় বড় বিপর্যয় সীমিত হয়ে থাকতে পারে। কিন্তু দেশের কতটি হাসপাতালের দুটি স্বাধীন সিঁড়ি দখলমুক্ত এবং কতটিতে আইসিইউ রোগী স্থানান্তরের মহড়া হয়েছে?

অক্সিজেন জীবন বাঁচায়, আগুনও তীব্র করে

হাসপাতালে মেডিকেল অক্সিজেন, দাহ্য রাসায়নিক, জীবাণুনাশক, এলপিজি, জেনারেটরের জ্বালানি, ব্যাটারি ও বৈদ্যুতিক যন্ত্র থাকে। অক্সিজেন নিজে দাহ্য নয়, কিন্তু আগুনকে দ্রুত ও তীব্র করে। ছোট স্ফুলিঙ্গও অক্সিজেনসমৃদ্ধ পরিবেশে ভয়াবহ হতে পারে। তাই মেডিকেল গ্যাস পাইপলাইন, ম্যানিফোল্ড রুম, জোন ভাল্‌ভ, অ্যালার্ম, সিলিন্ডার সংরক্ষণ ও জরুরি বিচ্ছিন্নকরণের ব্যবস্থা নিয়মিত পরীক্ষা করা জরুরি। কোন ওয়ার্ডের অক্সিজেন কোথা থেকে বন্ধ করতে হবে, তা চিকিৎসক, নার্স, প্রকৌশলী ও ফায়ার টিমকে জানতে হবে। আতঙ্কে অক্সিজেন খুলে রোগী টেনে নেওয়া উদ্ধার নয়; সেটি নতুন ঝুঁকি।

তদন্ত কমিটি নয়, কার্যকর ব্যবস্থা চাই

সরকারকে সব সরকারি, স্বায়ত্তশাসিত ও বেসরকারি হাসপাতালে সময়সীমাবদ্ধ জাতীয় ফায়ার সেফটি অডিট চালু করতে হবে। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের নেতৃত্বে ফায়ার সার্ভিস, স্থানীয় সরকার, সিটি করপোরেশন, রাজউকসহ ভবন অনুমোদনকারী সংস্থা, গণপূর্ত অধিদপ্তর, ডাইফি, বিদ্যুৎ বিতরণ সংস্থা ও প্রয়োজন অনুযায়ী গ্যাস কর্তৃপক্ষকে যৌথ পরিদর্শন এবং একই ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে আনতে হবে।

প্রতিটি হাসপাতালের অনুমোদিত নকশা, ব্যবহার অনুমতি, ফায়ার সেফটি প্ল্যান, ফায়ার লাইসেন্স, বৈদ্যুতিক সিঙ্গেল লাইন ডায়াগ্রাম, আর্থিং ও ইনসুলেশন পরীক্ষার ফল, থার্মাল স্ক্যানিং রিপোর্ট, ফায়ার পাম্প পরীক্ষার রেকর্ড এবং মহড়ার তথ্য যাচাই করতে হবে। শুধু যন্ত্রপাতির উপস্থিতি নয়—অ্যালার্ম থেকে পাম্প, পাম্প থেকে হাইড্র্যান্ট এবং সংকেত পাওয়ার পর মানুষের প্রতিক্রিয়া—পুরো ব্যবস্থার সমন্বিত পরীক্ষা প্রয়োজন।

প্রতিটি হাসপাতালে সার্বক্ষণিক প্রশিক্ষিত ফায়ার সেফটি ম্যানেজার ও শিফটভিত্তিক রেসপন্স টিম থাকতে হবে। চিকিৎসক, নার্স, ওয়ার্ডবয়, নিরাপত্তাকর্মী, প্রকৌশলী ও পরিচ্ছন্নতাকর্মীর দায়িত্ব লিখিতভাবে নির্ধারণ করতে হবে। দিন ও রাতের শিফটে বছরে অন্তত দুটি মহড়া এবং আইসিইউ, ওটি, নবজাতক ও ডায়ালাইসিস বিভাগের পৃথক রোগী স্থানান্তর পরিকল্পনা থাকতে হবে।

নির্দেশ অমান্যকারী হাসপাতালকে শুধু সতর্কপত্র নয়; লাইসেন্স স্থগিত এবং দায়ী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নিতে হবে।

আগুনের পর রোগী উদ্ধার করা বীরত্ব; আগুন লাগার আগেই ঝুঁকি দূর করা রাষ্ট্রীয় প্রজ্ঞা। হাসপাতাল মানুষকে বাঁচানোর স্থান; সেখানে নিরাপত্তা কোনো সৌন্দর্যবর্ধক সংযোজন, লাইসেন্সের আনুষ্ঠানিকতা বা মুনাফার পরে বিবেচ্য বিষয় নয়।

ময়মনসিংহের আগুন আমাদের দরজায় কড়া নাড়েনি; দরজা ভেঙে সতর্ক করেছে। এবারও সরকার, হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ ও জনগণ না জাগলে পরবর্তী অগ্নিকাণ্ডকে আর ‘দুর্ঘটনা’ বলা যাবে না। সেটি হবে জানা ঝুঁকি উপেক্ষার পরিণতি—আমাদের সম্মিলিত, প্রাতিষ্ঠানিক ও নৈতিক ব্যর্থতা।

মেজর এ কে এম শাকিল নেওয়াজ (অব.) ফায়ার, ডিজাস্টার অ্যান্ড ক্রাইসিস ম্যানেজমেন্ট বিশেষজ্ঞ; সাবেক পরিচালক, বাংলাদেশ ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স

*মতামত লেখকের নিজস্ব