যদিও যুক্তরাষ্ট্র প্রায়ই বলে থাকে, স্বাধীনভাবে নৌযান চলাচলে চীন যে বাধা সৃষ্টি করে, তা যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় নিরাপত্তা স্বার্থের জন্য হুমকি। ১৬ জুলাই দক্ষিণ চীন সাগরে যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধজাহাজ চলাচলে চ্যালেঞ্জ জানায় চীন। বেইজিংয়ের পক্ষ থেকে বলা হয়, তাদের সমুদ্রসীমায় যুদ্ধজাহাজ চলাচল করতে হলে আগে থেকে অনুমতি নিতে হবে। যুক্তরাষ্ট্রের নৌবাহিনী এ ঘটনাকে ‘আইনবিরোধী এবং মুক্তবাণিজ্য ও নির্বিঘ্ন ব্যবসার জন্য হুমকি’ বলে এক বিবৃতিতে দাবি করে। প্রকৃত সত্য হচ্ছে, চীন তাদের সমুদ্রসীমায় বাণিজ্যিক নৌযান চলাচলে কোনো হুমকি সৃষ্টি করেনি। শান্তিকালীন পরিস্থিতিতে এ ধরনের কোনো ঘটনা ঘটানো বেইজিংয়ের কাছে পছন্দনীয় হওয়ার কথা নয়।

যুক্তরাষ্ট্র তাদের যুদ্ধজাহাজ ও যুদ্ধবিমানের স্বাধীন চলাচল এবং গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহ এবং চীনের প্রতিরক্ষার প্রতি হুমকি তৈরি হয়, এমন সব কর্মকাণ্ডকে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলের স্বাধীনতার সঙ্গে গুলিয়ে ফেলেছে। নিজেদের জাতীয় নিরাপত্তায় হুমকি সৃষ্টি করে, এমন কোনো কিছু থেকে চীন যখন নিজেদের রক্ষা করতে যায়, সে সময়ই যুক্তরাষ্ট্র ‘স্বাধীনভাবে নৌযান চলাচলে বাধা দেওয়ার’ মিথ্যা যুক্তিটি সামনে নিয়ে আসে। চীনের সমুদ্রসীমার ১২ নটিক্যাল মাইলের মধ্যে যুদ্ধজাহাজ চলাচলে বাধা সৃষ্টি করার মানে এই নয় যে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলে বাধা দেয় চীন।

সিমসেক মনে করে, যুক্তরাষ্ট্রকে এ প্রস্তাব বাস্তবায়ন করতে হলে ইন্দো-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে অংশীজন ও জোট বাড়াতে হবে। এর অংশ হিসেবে দক্ষিণ চীন সাগরে ক্ষমতায়নের মডেল হিসেবে তাইওয়ানকে সামনে নিয়ে আসতে চায় যুক্তরাষ্ট্র। এ প্রতিবিদ্রোহে তাইওয়ান, অস্ট্রেলিয়া, জাপান ও ভারত হতে পারে যুক্তরাষ্ট্রের প্রধান সঙ্গী।

চীন ‘আইনবিরোধী’ কর্মকাণ্ড করছে—এমন যে দাবি যুক্তরাষ্ট্র করেছে, সেটা উদারনৈতিক সম্পর্কের ভিত্তিতে গড়ে ওঠা বিশ্বব্যবস্থার প্রতি বৃদ্ধাঙ্গুলি প্রদর্শন। তবে যুক্তরাষ্ট্রের মূল উদ্বেগের বিষয় হচ্ছে, চীন তাদের বৈশ্বিক নেতৃত্বের প্রতি চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়েছে। জাতিসংঘ সমুদ্র আইন সনদে (ইউএনসিএলওএস) স্বাক্ষর করেনি যুক্তরাষ্ট্র। এর মধ্য দিয়ে উল্টো আন্তর্জাতিক উদারনৈতিক সম্পর্কের ভিত্তিতে গড়ে ওঠা বিশ্বব্যবস্থার প্রতি অশ্রদ্ধা করেছে তারা। প্রকৃতপক্ষে, জাতিসংঘ সমুদ্র সনদে স্বাক্ষর না করেও মুক্তভাবে নৌযান চালানোর সুবিধা ভোগ করার সুযোগ চাওয়ার যৌক্তিকতা নেই।

দক্ষিণ চীন সাগরে যুক্তরাষ্ট্রের নৌশক্তি বাড়ানোর এ প্রস্তাব সম্পর্কে একটা বদ্ধমূল ধারণা হচ্ছে দক্ষিণ–পূর্ব এশিয়া বা আসিয়ানের দেশগুলো এটিকে স্বাগত জানিয়েছে। কিন্তু দেশগুলো নিজেদের বিরুদ্ধে ব্যবহৃত হতে পারে, এমন ‘গানবোট কূটনীতি’ অনুমোদন দেয়নি। আসিয়ানের উপকূলবর্তী দেশগুলোর আরও একটি ভয়ের কারণ হচ্ছে, তারা মনে করে, এতে দক্ষিণ চীন সাগরে অস্থিতিশীলতা সৃষ্টি হবে। এমনকি আমেরিকার সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ কৌশলগত মিত্র সিঙ্গাপুরও এ প্রস্তাবে সাড়া দেয়নি।

চীনের যুদ্ধজাহাজ ও যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধজাহাজের মধ্যে সংঘর্ষ বাধার উপক্রম হলে সিঙ্গাপুরের প্রতিরক্ষামন্ত্রী এনজি ইং হেন বলেন, ‘দক্ষিণ চীন সাগরে ঘটে যাওয়া কিছু ঘটনার সঙ্গে নীতির বিষয়টি যুক্ত। কিন্তু এ ধরনের কিছু ঘটলে এত উচ্চমূল্য দিতে হবে যে সেই নীতির সপক্ষে নিজেদের অবস্থান দাবি করা বা প্রমাণ করার বিষয়টি হবে সম্পূর্ণ নিরর্থক।’ শুধু সিঙ্গাপুর নয়, অন্যদেরও উদ্বেগের কারণ হচ্ছে, দক্ষিণ চীন সাগরে আরও বেশি সামরিকায়নের ফলে সেখানকার পরিস্থিতি আরও খারাপ হবে।

যুক্তরাষ্ট্রের প্রস্তাবটি যেমন উদ্বেগজনক, আবার রাজনৈতিকভাবে অবিবেচনাপ্রসূত। কিন্তু এর চেয়েও ভয়াবহ শঙ্কার বিষয়টি তুলে ধরেছে সেন্টার ফর ইন্টারন্যাশনাল মেরিটাইম সিকিউরিটি (সিমসেক)। আন্তর্জাতিক থিঙ্কট্যাংকটি জানিয়েছে, চীনের ‘গ্রে জোন’ কর্মকাণ্ডের পাল্টা হিসেবে যুক্তরাষ্ট্র তাদের কোস্টগার্ডের বিশেষায়িত বাহিনী (ডিএসএফ) নিয়োগ দিতে চায়। সিমসেকের যুক্তি হচ্ছে, যুক্তরাষ্ট্র অবশ্যই চীনের কমিউনিস্ট পার্টি এবং দক্ষিণ চীন সাগরের দেশগুলোর মধ্যে একটি সামুদ্রিক প্রতিবিদ্রোহী–ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করবে।

সিমসেক মনে করে, যুক্তরাষ্ট্রকে এ প্রস্তাব বাস্তবায়ন করতে হলে ইন্দো-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে অংশীজন ও জোট বাড়াতে হবে। এর অংশ হিসেবে দক্ষিণ চীন সাগরে ক্ষমতায়নের মডেল হিসেবে তাইওয়ানকে সামনে নিয়ে আসতে চায় যুক্তরাষ্ট্র। এ প্রতিবিদ্রোহে তাইওয়ান, অস্ট্রেলিয়া, জাপান ও ভারত হতে পারে যুক্তরাষ্ট্রের প্রধান সঙ্গী।

এ ধরনের কৌশল বাস্তবায়ন করতে গেলে চীনের প্রতিক্রিয়া হবে ভয়ানক। বিশেষ করে তাইওয়ানের ক্ষেত্রে। সামরিক শক্তি নিয়োগের নির্বোধ এ প্রস্তাব দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার জন্য সতর্কঘণ্টা বাজিয়েছে।

এশিয়া টাইমস থেকে নেওয়া, ইংরেজি থেকে অনূদিত

মার্ক ভ্যালেন্সিয়া আন্তর্জাতিক সমুদ্র আইন বিষয়ে বিশ্লেষক

কলাম থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন