এতিম শব্দের অর্থ একা, নিঃস্ব ও নিঃসঙ্গ। পিতা–মাতাহীন বালক-বালিকাকে এতিম বলা হয়। ইসলামি শরিয়তের পরিভাষায় যে শিশুর পিতা ইন্তেকাল করেছেন, তাকে নাবালেগ অবস্থায় এতিম বলা হয়। এতিম শিশু যখন বালেগ হয়ে যায়, তখন তাকে আর এতিম বলা হয় না। এতিম সম্পর্কে ইসলাম যেমন নৈতিক নির্দেশনা দিয়েছে, তেমনি এতিমের বিষয়ে প্রশাসনিক ও আইনগত অধিকারও নিশ্চিত করেছে।
আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘তারা তোমাকে এতিম সম্পর্কে জিজ্ঞেস করে। বলে দাও, তাদের ইসলাহ তথা সুব্যবস্থা করা উত্তম।’ (সুরা-২ বাকারা, আয়াত: ২২০)
যারা এতিমের প্রতি অবিচার করে, আল্লাহ তাআলা তাদের ভর্ৎসনা করে বলেন, ‘অসম্ভব! কখনোই নয়; বরং তোমরা এতিমের সম্মান রক্ষা করো না।’ (সুরা-৮৯ ফজর, আয়াত: ১৭)
আল্লাহ আরও বলেন, ‘তুমি এতিমের প্রতি কঠোর হয়ো না।’ (সুরা-৯৩ দুহা, আয়াত: ৯)
এতিম প্রতিপালন বিষয়ে পবিত্র কোরআনের ঘোষণা: ‘পূর্ব ও পশ্চিম দিকে মুখ ফেরানোতেই তোমাদের কোনো পুণ্য নেই; বরং পুণ্য আছে তারই জন্য, যে আল্লাহ, পরকাল, ফেরেশতাগণ, কিতাবসমূহ এবং নবীদের প্রতি ইমান আনে; আল্লাহর মুহাব্বতে আত্মীয়স্বজন, এতিম, অভাবগ্রস্ত, মুসাফির ও সাহায্যপ্রার্থীদের এবং দাস-দাসী মুক্তির জন্য অর্থ দান করে; সালাত কায়েম করে ও জাকাত প্রদান করে আর অঙ্গীকার করলে তা পূর্ণ করে, দুঃখ-ক্লেশে ও সংগ্রাম-সংকটে ধৈর্য ধারণ করে। বস্তুত তারাই সত্যপরায়ণ এবং তারাই আল্লাহভীরু।’ (সুরা-২ বাকারা, আয়াত: ১৭৭)
আল্লাহ আরও বলেন, ‘বলো, তোমরা ধনসম্পদ থেকে যা ব্যয় করবে, তা পিতা-মাতা, আত্মীয়স্বজন, এতিম, মিসকিন ও পথিকদের জন্য।’ (সুরা-২ বাকারা, আয়াত: ২১৫)
‘যে ব্যক্তি কোনো এতিম সন্তানকে তার স্বাবলম্বী হওয়া পর্যন্ত নিজের সঙ্গে পানাহারে যুক্ত করে নেয়, তার জন্য অবশ্যই জান্নাত অবধারিত হয়ে যায়।’
‘কখনোই নয়; বরং তোমরা এতিমকে সম্মান করো না এবং অভাবগ্রস্তকে খাদ্যদানে পরস্পরকে উৎসাহিত করো না—যা করা উচিত।’ (সুরা-৮৯ ফজর, আয়াত: ১৭-১৮)
‘তোমরা আল্লাহর ইবাদত করো এবং তাঁর সঙ্গে কোনো কিছুকে শরিক কোরো না; আর পিতা–মাতা, আত্মীয়স্বজন, এতিম, অভাবগ্রস্ত, নিকট প্রতিবেশী, দূর প্রতিবেশী, সঙ্গী-সাথি, মুসাফির ও তোমাদের অধিকারভুক্ত দাস-দাসীদের প্রতি সদাচরণ করো। নিশ্চয়ই আল্লাহ দাম্ভিক ও অহংকারীকে পছন্দ করেন না।’ (সুরা-৪ নিসা, আয়াত: ৩৬)
এতিমদের প্রতিপালন ও তাদের পুনর্বাসন হতে হবে নিঃস্বার্থ। কোরআনুল করিমে বলা হয়েছে, ‘তারা নিজেরা আহারের প্রয়োজন থাকা সত্ত্বেও আল্লাহর ভালোবাসায় অভাবী, এতিম ও বন্দীকে আহার্য দান করে। আর তারা বলে, আমরা শুধু আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্যই তোমাদের আহার্য দান করি; বিনিময়ে তোমাদের কাছ থেকে কোনো প্রতিদান চাই না।’ (সুরা-৭৬ দাহর, আয়াত: ৮-৯)
প্রিয় নবী হজরত মুহাম্মদ (সা.) আজন্ম এতিম ছিলেন। তিনি বলেন, ‘আমি ও এতিম প্রতিপালনকারী জান্নাতে এভাবে থাকব’—তিনি তর্জনী ও মধ্যমা আঙুল দিয়ে ইঙ্গিত করেন এবং এ দুটির মধ্যে সামান্য ফাঁক করেন। (বুখারি: ৫৩০৪ ও ৬০০৫)
প্রিয় নবী আরও বলেন, ‘বিধবা, এতিম ও গরিবের সাহায্যকারী ব্যক্তি আল্লাহর পথে মুজাহিদের সমতুল্য। তার মর্যাদা ইবাদতে রাত জাগরণকারীর মতো—যে কখনো ক্লান্ত হয় না। তার মর্যাদা সেই রোজাদারের মতো—যে কখনো ইফতার (রোজা ভঙ্গ) করে না।’ (মুসলিম: ৫২৯৫)
নবী করিম (সা.) বলেন, ‘যে ব্যক্তি কোনো এতিমকে আপন মাতা–পিতার সঙ্গে নিজেদের পরিবারের সঙ্গে খাবারের আয়োজনে বসায়, তাকে এই পরিমাণ খাবার দেয় যে সে পরিতৃপ্ত হয়ে আহার করে, তাহলে তার জন্য জান্নাত ওয়াজিব হয়ে যায়।’ (মুসনাদে আহমাদ: ১৮২৫২)।
‘মুসলিমদের ওই বাড়িই সর্বোত্তম, যে বাড়িতে এতিম আছে এবং তার সঙ্গে ভালো ব্যবহার করা হয়। আর সবচেয়ে নিকৃষ্ট ওই বাড়ি, যে বাড়িতে এতিম আছে অথচ তার সঙ্গে খারাপ ব্যবহার করা হয়। অতঃপর তিনি তাঁর অঙ্গুলির মাধ্যমে বলেন, ‘আমি ও এতিম প্রতিপালনকারী জান্নাতে এমনভাবে অবস্থান করব।’ (ইবনে মাজাহ: ৩৬৭৯; বুখারি-আদাবুল মুফরাদ: ১৩৭)
‘যে ব্যক্তি কোনো এতিম সন্তানকে তার স্বাবলম্বী হওয়া পর্যন্ত নিজের সঙ্গে পানাহারে যুক্ত করে নেয়, তার জন্য অবশ্যই জান্নাত অবধারিত হয়ে যায়।’ (মুসনাদে আহমাদ: ১৯০২৫)
অধ্যক্ষ মুফতি মাওলানা শাঈখ মুহাম্মাদ উছমান গনী, সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব, বাংলাদেশ জাতীয় ইমাম সমিতি; সহকারী অধ্যাপক, আহ্ছানিয়া ইনস্টিটিউট অব সুফিজম
ই–মেইল: [email protected]