গত কয়েক দিনে দেশের নামকরা তিনটি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় দেশের গণমাধ্যমের শিরোনাম হয়েছে। প্রথম ঘটনাটি ঘটেছে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে। সেখানে এক নারী শিক্ষার্থীকে যৌন হয়রানি করা হয়েছে। তাঁকে বিবস্ত্র করে ভিডিও ধারণ করা হয়েছে। এ কাজ করেছেন সেই বিশ্ববিদ্যালয় ও বাইরের একটি কলেজের কয়েক ছাত্র। এ ঘটনার পর ভুক্তভোগী শিক্ষার্থী বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের কাছে অভিযোগ করেছেন। এ ঘটনার বিচার চেয়েছেন। দিন দুয়েক আগে দেশের একটি টেলিভিশন চ্যানেলে এসে বিশ্ববিদ্যালয়টির এক শিক্ষক (যিনি একটি দায়িত্বশীল পদেও আছেন) বলেছেন, ‘সব জায়গায় তো আর নিরাপত্তা দেওয়া সম্ভব নয়।’ চিন্তা করা যায়! একজন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক বলেছেন, ক্যাম্পাসের ভেতর তাঁরা শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা দিতে পারবেন না!

দ্বিতীয় ঘটনাটি ঘটেছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে। একটি আবাসিক হলের ছাত্র অভিযোগ করে বলেছেন, হলের ভেতর একটি ‘পলিটিক্যাল রুম’-এ নিয়ে তাঁর ওপর শারীরিক নির্যাতন করা হয়েছে। এ ঘটনার পর বিশ্ববিদ্যালয়ের কর্তাব্যক্তিদের কথা শুনে মনে হচ্ছে, এ আর এমন কী! আবাসিক হল তো শিক্ষার্থীদের থাকার জায়গা। সেখানে ‘পলিটিক্যাল রুম’ কেন থাকবে? এসব জিজ্ঞাসা করলে অবশ্য কর্তাব্যক্তিরা দিব্যি অস্বীকার করে বলেন, কোথাও এমন কোনো রুম নেই। অথচ আমরা সবাই বুয়েটের শিক্ষার্থী আবরার ফাহাদকে পিটিয়ে হত্যার ঘটনাটি জানি। এরপরও কোথাও কোনো পরিবর্তন হয়েছে বলে তো মনে হচ্ছে না।

তৃতীয় ঘটনাটি ঘটেছে সিলেটের শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে। বহিরাগত তিন ছিনতাইকারী ক্যাম্পাসের ভেতরে বিশ্ববিদ্যালয়ের এক শিক্ষার্থীকে ছুরিকাঘাতে হত্যা করেছে। মোবাইল ও ম্যানিব্যাগ ছিনিয়ে নেওয়ার সময় বাঁধা দিলে ছিনতাইকারীরা ছুরি দিয়ে আঘাত করে। এখন প্রশ্ন হচ্ছে, শাহজালাল বিশ্ববিদ্যালয় তো কোনো খোলা জায়গা নয়। এর তো একটা আলাদা ক্যাম্পাস আছে। সেখানে কীভাবে ছিনতাইকারীরা ঢুকে একজন শিক্ষার্থীকে হত্যা করে পালিয়ে যেতে পেরেছে? তাহলে শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা কোথায়?

আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোয় কোথাও কোনো দায়বদ্ধতা নেই। দায় কাঁধে নিয়ে পদত্যাগ করার সংস্কৃতি নেই। কর্তাব্যক্তিদের কাজ হচ্ছে স্রেফ ‘তদন্ত’ করে বেড়ানো। এদিকে শিক্ষার্থীদের যদি নিজেদের নিরাপত্তার জন্য আন্দোলন করতে হয়, তাহলে শিক্ষা ও গবেষণার কাজ কীভাবে চলবে?

দেশের তিনটি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে এই তিন ঘটনা পরপর ঘটেছে। কোথাও শিক্ষার্থীকে যৌন হয়রানি করা হয়েছে। সেখানে তাঁরা নিজেদের নিরাপত্তার জন্য আন্দোলন করেছেন। কোথাও আবাসিক হলের ছাত্রকে একটা রুমে নিয়ে গিয়ে পেটানো হয়েছে। সেই ছাত্রও নিরাপত্তা চেয়ে আবেদন করেছেন। আবার ক্যাম্পাসের ভেতরেই এক ছাত্রকে ছুরি মেরে হত্যা করা হয়েছে। সেখানেও শিক্ষার্থীরা আন্দোলন করেছেন নিরাপত্তা চেয়ে।

এদিকে আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর কর্তাব্যক্তিরা খুঁজে বেড়ানোর চেষ্টা করছেন, কেন বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয় কোনো র‍্যাঙ্কিংয়ে খুঁজে পাওয়া যায় না! এত ঘটনার পরও কোথাও কোনো শিক্ষককে কিংবা কর্তাব্যক্তিদের দেখা যায়নি দায় কাঁধে নিয়ে পদত্যাগ করতে। সবাই এসে বলছেন, ঘটনার তদন্ত করা হবে। তাহলে ঘটনা যে ঘটে গিয়েছে, এর দায় কে নেবে? এরপর যদি এর চেয়েও ভয়াবহ ঘটনা ঘটে, তখনো নিশ্চয় তাঁরা এসে বলবেন, আমরা সঠিক তদন্ত করে ব্যবস্থা নেব!

আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোয় কোথাও কোনো দায়বদ্ধতা নেই। দায় কাঁধে নিয়ে পদত্যাগ করার সংস্কৃতি নেই। কর্তাব্যক্তিদের কাজ হচ্ছে স্রেফ ‘তদন্ত’ করে বেড়ানো। এদিকে শিক্ষার্থীদের যদি নিজেদের নিরাপত্তার জন্য আন্দোলন করতে হয়, তাহলে শিক্ষা ও গবেষণার কাজ কীভাবে চলবে?

ছোটবেলায় পড়েছিলাম ‘শিক্ষা জাতির মেরুদণ্ড’। সেই মেরুদণ্ডকে ভেঙে পুরো জাতিকে পঙ্গু করে দেওয়ার যে সংস্কৃতি আমরা এর মধ্যেই চালু করে ফেলেছি, এর মাশুল আমাদের কীভাবে দিতে হয়, এখন কেবল সেটিই দেখার অপেক্ষা।

  • ড. আমিনুল ইসলাম সিনিয়র লেকচারার এস্তনিয়ান এন্ট্রাপ্রেনিউরশিপ ইউনিভার্সিটি। ই-মেইল: [email protected]

কলাম থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন