তেলের দাম একলাফে ২০ টাকা বাড়ানোর বিকল্প যেখানে ছিল

জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানোর পর মোটরসাইকেল চালকদের আয় কমেছেছবি : সাজিদ হোসেন

দেশে জ্বালানি তেলের দাম রেকর্ড পরিমাণ বেড়েছিল ২০২২ সালের আগস্ট মাসের ৬ তারিখে। রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের বাস্তবতায় বিশ্ববাজারে তেলের দাম বেড়েছিল। সেই প্রেক্ষাপটে মধ্যরাতে একলাফে লিটারপ্রতি বেড়েছিল ৩৪-৪৬ টাকা পর্যন্ত। এর অভিঘাত লেগেছিল পরিবহন, যাতায়াত, সেবা, কৃষি ও শিল্প উৎপাদনে।

নিত্যপণ্য থেকে থেকে শুরু করে সবকিছুর দাম বাড়তে শুরু করেছিল। মাস শেষে মূল্যস্ফীতি ৭ থেকে ৯ শতাংশে গিয়ে ঠেকেছিল। আওয়ামী লীগ আমলের অবাধ দুর্নীতি, টাকা পাচার, ব্যাংক খাতে লুটপাট ও আর্থিক খাতের অব্যবস্থাপনার সঙ্গে জ্বালানি তেলের দাম একলাফে বাড়ানোর সিদ্ধান্তে যে মূল্যস্ফীতির সুনামি সৃষ্টি হয়েছিল গত চার বছরেও অর্থনীতিকে সেখান থেকে বের করে আনা যায়নি।

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর সর্বশেষ তথ্য বলছে, আগস্ট মাসে দেশে মূল্যস্ফীতি ছিল ৮ দশমিক ২৮ শতাংশ। যদিও অর্থনীতিবিদদের অনেকেই বিবিসির এই তথ্যে সংশয় প্রকাশ করেন। আর সাধারণ মানুষ যাঁরা বাজারে যান, তাঁরা যখন পকেটের হিসাব কষতে গিয়ে রুইয়ের বদলে পাঙাশ, পাবদার বদলে তেলাপিয়া কিনে ফিরতে বাধ্য হন, তাঁরা হাড়ে হাড়ে বোঝেন মূল্যস্ফীতির আঁচ কতটা।

মূল্যস্ফীতি অর্থনীতির ভাষায় নীরব ঘাতক। সাধারণত ৫-এর নিচে মূল্যস্ফীতিকে স্বাভাবিক বলে ধরে নেওয়া হয়। মজুরি, বেতন বাড়ানোর যে স্বাভাবিক প্রক্রিয়া, সেখানে মূল্যস্ফীতির হিসাবটাকে ৫ ধরেই করা হয়। বর্তমান ৮-এর ঘরের মূল্যস্ফীতি এমনিতেই উচ্চ। গত চার বছরে মূল্যস্ফীতি কখনোই ৮–এর নিচে নামেনি। সর্বোচ্চ উঠেছে ১৩। ফলে দেশের বেশির ভাগ মানুষের প্রকৃত আয় চার বছর আগের চেয়েও কমেছে। ফলে মানুষ বাধ্য হয়েই ছেলেমেয়েদের লেখাপড়া, নিজেদের চিকিৎসা, বেড়াতে যাওয়া, বাজার খরচ কাটছাঁট করে, যাকে বলে কায়দা করে টিকে থাকছেন।

মূল্যস্ফীতি শুধু সরকারি চাকরিজীবীদের সংকট নয়, মূল্যস্ফীতি সাধারণ মানুষের জন্য জীবনধারণের সংকট হিসেবে দেখা দেয়। জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানোয় বছর শেষে সরকারের বাঁচবে ১০ হাজার কোটি টাকা। ফলে প্রশ্ন উঠেছে জ্বালানি তেল, বিদ্যুৎ-গ্যাসের দাম বাড়ানো, নতুন করের বোঝা নাগরিকদের ঘাড়ে চাপবে কি না।

বিএনপি সরকার গঠনের মাত্র দুই সপ্তাহের মধ্যে অভাবনীয় এক বৈশ্বিক পরিস্থিতির মধ্যে পড়ে। ২৮ ফেব্রুয়ারি হঠাৎ করেই যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল ইরানে হামলা চালিয়ে দেশটির সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনিসহ শীর্ষ নেতাদের হত্যা করে। শুরু হয় যুদ্ধ। এই যুদ্ধের অভিঘাত মধ্যপ্রাচ্যে ছাড়িয়ে গোটা বিশ্বেই ছড়িয়ে পড়ে। বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেল ও এলএনজির দাম হু হু করে বাড়তে থাকে। হরমুজ প্রণালি কার্যত বন্ধ থাকায় পরিবহন খরচও বেড়ে যায়।

বাংলাদেশ জ্বালানির ক্ষেত্রে আমদানিনির্ভর হওয়ায় খুব স্বাভাবিকভাবে বাংলাদেশের সংকটটা আরও প্রকট। পেট্রলপাম্পগুলোতে জ্বালানির জন্য গাড়িগুলোর দীর্ঘ লাইন, ঘন ঘন লোডশেডিং, শিল্পকারখানার উৎপাদন থেকে শুরু করে বাসাবাড়ির রান্না—জ্বালানির সংকট সবখানেই ভোগান্তি তৈরি করছে। বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান, ব্যবসা-বাণিজ্য, কৃষি উৎপাদনসহ গেটা অর্থনীতিতেই এর অভিঘাত পড়ছে।

দামবৃদ্দির ঘোষণার পরই বাস ভাড়া বেড়েছে
ছবি: প্রথম আলো

যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর প্রথম দেড় মাস জ্বালানি তেলের দাম না বাড়ালেও এপ্রিল মাসে এক দফা দাম বাড়ায় সরকার। এর মধ্যে গ্যাস ও বিদ্যুতের দামও বাড়ানো হয়। এরপর মঙ্গলবার মধ্যরাত থেকে সব ধরনের জ্বালানি তেলের দাম একলাফে ২০ টাকা বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নেয় সরকার। দুই দফা মিলিয়ে ডিজেল, পেট্রল ও অকটেনের দাম বেড়েছে ৩৫-৪৫ টাকা।

সরকার তেলের দাম বাড়ানোর পেছনে দুটি যুক্তি তুলে ধরেছে। বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দাম অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যাওয়ায় ও পরিবহন খরচ বেড়ে যাওয়ায় বিপিসির ভর্তুকি কয়েক গুণ বেড়েছে। পার্শ্ববর্তী দেশগুলোর জ্বালানি তেলের দামের একটি চিত্র দিয়ে বলা হয়েছে, বাংলাদেশে তেলের দাম কম হওয়ায় পাচারের শঙ্কা থেকে দাম সমন্বয় করা হয়েছে।

এটা সত্যি যে ইরান যু্দ্ধের কারণে বিশ্ববাজারে যে অভাবনীয় পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে তাতে সরকার অনেক বেশি চাপে পড়েছে। কিন্তু একলাফে ২০ টাকা বাড়ানোর বিকল্প কি ছিল না, তা নিয়ে বিতর্ক তৈরি হয়েছে। বিশ্ববাজারে তেলের দাম যদি এ রকম বেশিই থাকে তাহলে সব ধরনের জ্বালানির দাম ২০ টাকা বাড়ানোয় বছর শেষে বিপিসির লোকসান কমবে ১০ হাজার কোটি টাকা।

এ জায়গায় সরকারি ভাষ্যে দুটি ক্ষেত্রে অস্পষ্টতা রয়েছে। অতীতে জ্বালানি তেল বিক্রি করে বিপিসি বিপুল অঙ্কের টাকা মুনাফা করেছে। বিপিসি প্রকাশিত নিরীক্ষা প্রতিবেদনের বরাতে গত ৭ আগস্ট প্রথম আলোর প্রতিবেদন জানাচ্ছে, ২০১৪-১৫ অর্থবছর থেকে ২০২৪-২৫ অর্থবছর পর্যন্ত ১০ বছরে সংস্থাটি প্রায় ৫৫ হাজার ৮৩৭ কোটি টাকার নিট মুনাফা অর্জন করেছে। প্রশ্ন হচ্ছে, ১০ বছর ধরে বিপুল অঙ্কের মুনাফা করার পর ইরান যুদ্ধের পাঁচ মাসে লোকসানের প্রশ্নটি কেন সামনে আনা হচ্ছে।

দ্বিতীয় প্রশ্নটি হচ্ছে, এক লিটার জ্বালানি তেলে সরকার শুল্ক ও কর আরোপ করে রেখেছে প্রায় ৩১ শতাংশ। এখানে শুল্ক ও কর কমালে সরকারকে একলাফে তেলের দাম ২০ টাকা বাড়াতে হতো না। এ ছাড়া জ্বালানি খাতের অদক্ষতা, সিস্টেম লসের নামে যে সিস্টেমেটিক চুরি, দুর্নীতি ও অপচয় সেটা বন্ধে আগের সরকারগুলোর মতো এই আমলেও কোনো পদক্ষেপ নিতে দেখা যায়নি।

জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানোর ক্ষেত্রে সরকারের অন্যতম যুক্তি হলো, পার্শ্ববর্তী দেশের তুলনায় বাংলাদেশে দাম কম হওয়ায় পাচার হওয়ার শঙ্কা রয়েছে। জাতীয় অর্থনীতি পত্রিকায় প্রকাশিত এক প্রতিবেদন থেকে দেখা যাচ্ছে, ২০ টাকা দাম বাড়ানোর পর এখন ভারতের দিল্লি, কলকাতা, মুম্বাইয়ের তুলনায় বাংলাদেশে ডিজেলের দাম বেশি। গত পরশু ভারতের রাজধানী নয়াদিল্লিতে ডিজেলের দাম ছিল ৯৫ দশমিক ৪৪ রুপি। বাংলাদেশি টাকায় ১২২ টাকা ২৪ পয়সা। মুম্বাইতে ডিজেলের দাম ছিল ৯৭ দশমিক ৮৩ রুপি বা ১২৫ টাকা ৩০ পয়সা ও কলকাতায় ৯৯ দশমিক ৮২ রুপি বা ১২৭ টাকা ৮৫ পয়সা।

সরকারি চাকরিজীবীদের বেতন-ভাতা একলাফে ১০০-১৪২ শতাংশ বাড়ানোর প্রজ্ঞাপন জারির কয়েক দিনের মধ্যে জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানোয় নানা প্রশ্ন জন্ম হয়েছে। অর্থনীতির এই সংকটকালে বেতন-ভাতা এতটা বাড়ানো কতটা যৌক্তিক ও বিচক্ষণ সিদ্ধান্ত হয়েছে, তা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। নতুন পে স্কেল বাস্তবায়ন করতে হলে সরকারের এ বছর বাড়তি প্রায় ৩৭ হাজার ৮৭৫ কোটি টাকা প্রয়োজন। প্রশ্ন উঠেছে, এই অর্থের জোগানটা কোথা থেকে আসবে? সরকারের দিক থেকে স্পষ্ট কোনো রূপরেখা আসেনি।

এ ছাড়া বর্তমানে ভুটানে ডিজেলের দাম প্রতি লিটার বাংলাদেশি টাকায় ১৩৩ টাকা ৭৬ পয়সা। মালদ্বীপে ১৩৯ টাকা ২৯ পয়সা, নেপালে ১৫৬ টাকা ২৫ পয়সা এবং শ্রীলঙ্কায় ১৭৭ টাকা ৫৯ পয়সা। পাকিস্তানে ১৮৭ টাকা ৯৩ পয়সা।

দাম বাড়ানোর ক্ষেত্রে পার্শ্ববর্তী দেশগুলোর জ্বালানির দাম একমাত্র বিবেচ্য হতে পারে না। মূল্যস্ফীতি ও ন্যূনতম আয়ের বিষয়টাও সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ। লেখক ও গবেষক কল্লোল মোস্তফা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে এক পোস্টে জানিয়েছেন, ভারতের দিল্লিতে বর্তমানে মূল্যস্ফীতি ৪ দশমিক ৮২ শতাংশ। আর ন্যূনতম মজুরি ২৩ হাজার ৬২৩ টাকা।

উল্লেখ্য যে, দক্ষিণ এশিয়ার অন্য দেশগুলোর মধ্যে বর্তমানে একমাত্র পাকিস্তানের মূল্যস্ফীতি বাংলাদেশের চেয়ে বেশি।

বাংলাদেশে সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা যখন চার বছর ধরে ধারাবাহিকভাবে কমছে, বেসরকারি খাতে বিনিয়োগে যখন ভাটা চলছে, তখন সব ধরনের জ্বালানি তেলের মূল্য লিটারে একলাফে ২০ টাকা বৃদ্ধির সিদ্ধান্তের যৌক্তিকতা নিয়ে বড় প্রশ্ন ওঠাটাই স্বাভাবিক।

বরাবরের মতো এবারও জ্বালানির দাম বাড়ার প্রথম ধাক্কাটি লেগেছে পরিবহন খাতে। সরকার দূরপাল্লা ও রাজধানীসহ শহরের বাসে কিলোমিটার প্রতি ভাড়া ১৭ পয়সা বৃদ্ধির সিদ্ধান্ত নিয়েছে। তবে বাস্তবতা হলো, বিভিন্ন রুটে বাসমালিকেরা এরইমধ্যে নিজেদের ইচ্ছেমতো ভাড়া বাড়িয়েছেন। পণ্য পরিবহনের ভাড়াও বেড়েঝ বাড়ানো হয়েছে। মোটরসাইকেলে রাইড শেয়ারিং করে জীবিকা নির্বাহ করা ও চলাচলের ক্ষেত্রে এই সেবার ওপর নির্ভরশীল ব্যক্তিরাও মুশকিলে পড়েছেন। তেলের দাম ও ভাড়া দুই–ই বেড়ে যাওয়ায় তাঁদের মধ্যে অসন্তোষ তৈরি হয়েছে।

মূল্যস্ফীতি শুধু সরকারি চাকরিজীবীদের সংকট নয়, মূল্যস্ফীতি সাধারণ মানুষের জন্য জীবনধারণের সংকট হিসেবে দেখা দেয়।
ফাইল ছবি

সরকারি চাকরিজীবীদের বেতন-ভাতা একলাফে ১০০-১৪২ শতাংশ বাড়ানোর প্রজ্ঞাপন জারির কয়েক দিনের মধ্যে জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানোয় নানা প্রশ্ন জন্ম হয়েছে। অর্থনীতির এই সংকটকালে বেতন-ভাতা এতটা বাড়ানো কতটা যৌক্তিক ও বিচক্ষণ সিদ্ধান্ত হয়েছে, তা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। নতুন পে স্কেল বাস্তবায়ন করতে হলে সরকারের এ বছর বাড়তি প্রায় ৩৭ হাজার ৮৭৫ কোটি টাকা প্রয়োজন। প্রশ্ন উঠেছে, এই অর্থের জোগানটা কোথা থেকে আসবে? সরকারের দিক থেকে স্পষ্ট কোনো রূপরেখা আসেনি।

অন্যদিকে জ্বালানি সংকট, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি এই সব মিলিয়ে বেসরকারি খাতে বিনিয়োগ বৃদ্ধি ও রাজস্ব আয় বাড়ার সম্ভাবনা সীমিত। সরকারি খাতের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে বেসরকারি খাতে বেতন-ভাতা-মজুরি যৌক্তিকভাবে বাড়ানোর বাস্তবতা কতটা আছে সেটা অনেক বড় প্রশ্ন। ফলে এই প্রশ্ন ওঠাটা স্বাভাবিক যে ১৪-১৫ লাখ সরকারি চাকরিজীবীর জন্য বাকি ১৭ কোটি মানুষের জীবনকে নতুন সংকটের মুখে ফেলা দেওয়া হচ্ছে কি না।

মূল্যস্ফীতি শুধু সরকারি চাকরিজীবীদের সংকট নয়, মূল্যস্ফীতি সাধারণ মানুষের জন্য জীবনধারণের সংকট হিসেবে দেখা দেয়। জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানোয় বছর শেষে সরকারের বাঁচবে ১০ হাজার কোটি টাকা। ফলে প্রশ্ন উঠেছে জ্বালানি তেল, বিদ্যুৎ-গ্যাসের দাম বাড়ানো, নতুন করের বোঝা নাগরিকদের ঘাড়ে চাপবে কি না।

এক সপ্তাহের মধ্যে সরকারের দুই সিদ্ধান্ত অর্থনীতির প্রবৃদ্ধি কমে যাওয়া থেকে সমাজে নতুন করে বৈষম্য তৈরি, মূল্যস্ফীতির নতুন ধাক্কা, মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কমে যাওয়া, সামাজিক অসন্তোষ তৈরির শঙ্কা তৈরি করছে। সরকারের সামনে বিকল্প ও ভারসাম্যপূর্ণ পদ্ধতি থাকলেও সেটা নেওয়া হয়নি।

মনোজ দে প্রথম আলোর সম্পাদকীয় সহকারী

[email protected]

মতামত লেখকের নিজস্ব