যখন হৃদয় বসন্তের সঙ্গে জেগে ওঠে

বসন্ত বাতাসে ঝরে পড়েছে পলাশ ফুলফাইল ছবি

বসন্ত মানেই মনকে স্পন্দিত করা এবং সুন্দরের পানে এক অনিবার্য আহ্বান। এই ঋতুতে প্রকৃতি ও মানবিক আবেগের অপূর্ব মিলন ঘটে। বসন্ত কেবল ঋতু পরিবর্তনের নাম নয়, বরং হৃদয়ের জাগরণ, সুরের মূর্ছনা ও জীবনের পুনর্নবীকরণের প্রতীক।

শীতের রুক্ষতা ও স্থবিরতার অবসান ঘটিয়ে বসন্ত প্রকৃতিকে ফিরিয়ে দেয় তার সজীবতা ও প্রাণপূর্ণতা। পাতাঝরা বৃক্ষ নবপল্লবে সেজে ওঠে, পুষ্পমঞ্জরির সমারোহে চারদিক রঙিন হয়ে ওঠে, ফুলের সুবাসে বাতাস ভরে যায়। দখিনা হাওয়ার মৃদু পরশে প্রকৃতি যেন নতুন যৌবনের উন্মাদনায় উচ্ছ্বসিত হয়ে ওঠে।

ফাগুনের এই রূপান্তর কেবল দৃশ্যমান নয়, অনুভবযোগ্যও বটে। আম্রকুঞ্জে মুকুলের গন্ধে মৌমাছিরা ব্যাকুল হয়ে ওঠে, কোকিলের কুহু ডাক ঋতুর আগমনী বার্তা ছড়িয়ে দেয়। শীতের অবসন্নতা কাটিয়ে মানুষও যেন হঠাৎ এক অদ্ভুত প্রাণশক্তিতে ভরে ওঠে। দিন দীর্ঘ হয়, আলো বাড়ে, আকাশ স্বচ্ছ হয় আর প্রকৃতির এই পরিবর্তন মানুষের অন্তর্জগতেও ঢেউ তোলে।

যুগ যুগ ধরে বসন্ত কবি ও সাহিত্যিকদের প্রেরণার উৎস। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বসন্তকে দেখেছেন কেবল একটি ঋতু হিসেবে নয়, বরং যৌবন, সৃষ্টি ও উৎসবের রূপকার হিসেবে। তাঁর গানে বসন্ত এসেছে শ্যামল শোভন রথে, এসেছে পিয়াল ফুলের রেণু মেখে, এসেছে প্রাণের উচ্ছ্বাসে। তিনি বসন্তকে ঋতুরাজের মর্যাদায় অধিষ্ঠিত করেছেন। তাঁর ‘বসন্ত’ গীতিনাট্যটি তিনি উৎসর্গ করেছিলেন কাজী নজরুল ইসলামকে, যা বসন্তের তারুণ্য ও বিদ্রোহী প্রাণশক্তির এক অনন্য দৃষ্টান্ত। নজরুলের কবিতায় বসন্তমুখর দক্ষিণ সমীরণে, বনে বনে বিহ্বল বাণী ওঠে বাজি। তাঁর কাছে বসন্ত মানে আবেগের জাগরণ, প্রেমের আহ্বান, জীবনের স্পন্দন।

অন্যদিকে জীবনানন্দ দাশ বসন্তকে দেখেছেন আরও অন্তর্মুখী দৃষ্টিতে। তাঁর কাছে বসন্ত কেবল ফুল ফোটার উল্লাস নয়, বরং ফাল্গুনের অন্ধকারে পুরোনো স্মৃতির রোমন্থন, নশ্বরতার ভেতর নতুন জীবনের উপলব্ধি। এই বহুমাত্রিকতা বসন্তকে আমাদের সাহিত্যে এক গভীর নান্দনিক ও দার্শনিক মাত্রা দিয়েছে।

বসন্তকে কেবল নান্দনিকতার ঋতু বলে দেখলে তার পূর্ণতা ধরা পড়ে না। এটি আমাদের দেহঘড়ির পুনঃসমন্বয়, হরমোনের পুনরুজ্জীবন এবং মনের পুনর্জাগরণের সময়। সাহিত্যে, গানে ও কবিতায় যে বসন্তের প্রতিধ্বনি আমরা শুনি, তার ভেতরে রয়েছে প্রকৃতি ও জীববিজ্ঞানের সূক্ষ্ম সুরেলা সমন্বয়। বসন্ত আমাদের শেখায় পরিবর্তন অনিবার্য আর সেই পরিবর্তনের মধ্যেই লুকিয়ে থাকে নবজীবনের সম্ভাবনা।

তবে বসন্তের আবেগময়তা কেবল কাব্যের অলংকার নয়। এর পেছনে রয়েছে সুস্পষ্ট জৈবিক ও স্নায়ুবৈজ্ঞানিক ভিত্তি। শীত থেকে বসন্তে উত্তরণের সঙ্গে সঙ্গে দিনের আলো বৃদ্ধি পায়। এই আলো আমাদের দেহের অভ্যন্তরীণ জৈবিক ঘড়ি বা সার্কাডিয়ান ছন্দকে প্রভাবিত করে। মস্তিষ্কের হাইপোথ্যালামাসে অবস্থিত সুপ্রাকায়াজম্যাটিক নিউক্লিয়াস আলোর সংকেত গ্রহণ করে ঘুম জাগরণ চক্র, হরমোন নিঃসরণ ও শরীরের তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ করে। বসন্তে সকালের আলো বাড়ার ফলে মেলাটোনিনের উৎপাদন কমে, ফলে ঘুমের সময়কাল হ্রাস পায় এবং সতর্কতা বৃদ্ধি পায়।

একই সঙ্গে সূর্যালোক সেরোটোনিন নিঃসরণকে উদ্দীপিত করে, যা আমাদের মেজাজ নিয়ন্ত্রণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। সেরোটোনিনের মাত্রা বৃদ্ধি পেলে মন প্রফুল্ল হয়, উদ্বেগ কমে, শক্তি বাড়ে। ডোপামিনের সক্রিয়তাও বৃদ্ধি পায়, যা প্রেরণা ও আনন্দের অনুভূতির সঙ্গে জড়িত। এই জৈব রাসায়নিক পরিবর্তনের ফলেই অনেকের মধ্যে দেখা দেয় তথাকথিত বসন্ত জ্বর, যা উন্নত মেজাজ, সৃজনশীলতা এবং কখনো কখনো অস্থিরতার রূপে প্রকাশ পায়।

সূর্যালোক ভিটামিন ডির উৎপাদন বাড়ায়, যা রোগ প্রতিরোধক্ষমতা ও মানসিক সুস্থতার সঙ্গে সম্পর্কিত। গবেষণায় দেখা গেছে, প্রকৃতির সংস্পর্শে থাকা, প্রস্ফুটিত ফুল দেখা কিংবা ফুলের সুবাস নেওয়া কর্টিসল নামক স্ট্রেস হরমোনের মাত্রা কমাতে সাহায্য করে। এর ফলে রক্তচাপ হ্রাস পায়, উদ্বেগ কমে এবং ইতিবাচক আবেগ জোরদার হয়। শীতের ধূসরতা থেকে রঙিন বসন্তে উত্তরণ তাই আমাদের স্নায়ুতন্ত্রেও এক নবজাগরণের বার্তা বহন করে।

আলোর পরিবর্তন প্রজনন হরমোনের ওপরও প্রভাব ফেলে। গবেষণা ইঙ্গিত দেয় যে বসন্তকালে টেস্টোস্টেরন, ইস্ট্রোজেন ও অন্যান্য প্রজননসংশ্লিষ্ট হরমোনের কার্যকারিতা বৃদ্ধি পেতে পারে। এর সঙ্গে যুক্ত হয় অক্সিটোসিনের ভূমিকা, যা বিশ্বাস ও সামাজিক সংযোগ জোরদার করে। ফলে বসন্তে রোমান্টিক অনুভূতি ও সামাজিক মেলবন্ধন স্বাভাবিকভাবেই বৃদ্ধি পায়। প্রেমের কবিতায় যে উচ্ছ্বাস আমরা দেখি, তার পেছনে রয়েছে এই জটিল হরমোনীয় সমন্বয়।

বসন্তের প্রভাব কেবল মানুষের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। প্রাণিজগতে এটি প্রজনন ও সক্রিয়তার মৌসুম। শীতের সুপ্তাবস্থা কাটিয়ে অনেক প্রাণী খাদ্য সংগ্রহ, মিলন ও বংশবৃদ্ধিতে সক্রিয় হয়। পাখিদের কলতান, বিশেষত পুরুষ পাখির গান, সঙ্গী আকর্ষণ ও এলাকা রক্ষার কৌশল। উষ্ণতা ও খাদ্যের প্রাপ্যতা প্রজননের অনুকূল পরিবেশ সৃষ্টি করে, যা বংশধরদের বেঁচে থাকার সম্ভাবনা বাড়ায়। বসন্ত তাই বিবর্তনের দৃষ্টিতেও এক কৌশলগত ঋতু।

সব মিলিয়ে বসন্ত এক বহুমাত্রিক অভিজ্ঞতা। এটি যেমন রং ও গন্ধের উৎসব, তেমনি স্নায়ু ও হরমোনের সমন্বয়ে সৃষ্ট এক গভীর জৈবিক প্রতিক্রিয়া। শীতের অবসন্নতা পেরিয়ে যখন আমরা আলোয় ভেসে উঠি, তখন আমাদের মস্তিষ্কও যেন নতুন করে সংযোগ স্থাপন করে, নতুন সম্ভাবনার দিকে হাত বাড়ায়। প্রেম, সৃজনশীলতা, সামাজিকতা ও আশাবাদ এ সময় স্বাভাবিকভাবেই বৃদ্ধি পায়।

অতএব বসন্তকে কেবল নান্দনিকতার ঋতু বলে দেখলে তার পূর্ণতা ধরা পড়ে না। এটি আমাদের দেহঘড়ির পুনঃসমন্বয়, হরমোনের পুনরুজ্জীবন এবং মনের পুনর্জাগরণের সময়। সাহিত্যে, গানে ও কবিতায় যে বসন্তের প্রতিধ্বনি আমরা শুনি, তার ভেতরে রয়েছে প্রকৃতি ও জীববিজ্ঞানের সূক্ষ্ম সুরেলা সমন্বয়। বসন্ত আমাদের শেখায় পরিবর্তন অনিবার্য আর সেই পরিবর্তনের মধ্যেই লুকিয়ে থাকে নবজীবনের সম্ভাবনা।

  • ড. রাশিদুল হক সাবেক সহ-উপাচার্য, বরেন্দ্র বিশ্ববিদ্যালয়, রাজশাহী এবং সাবেক অধ্যাপক, এমোরি বিশ্ববিদ্যালয়, আটলান্টা, যুক্তরাষ্ট্র, ও প্রাণিবিদ্যা বিভাগ, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়, বাংলাদেশ