বহু বছর ধরে ইয়েমেনের যুদ্ধ এমন এক সংঘাতে রূপ নিয়েছে, যা আসলে কোনো বিজয়ীর খোঁজ করছে না। এটি এখন এক ক্ষয়িষ্ণু লড়াইয়ে পরিণত হয়েছে, যেখানে প্রতিটি পক্ষই চায় তার প্রতিদ্বন্দ্বীকে দুর্বল করতে—তবে এমন কোনো জয় নয়, যা পুরো অঞ্চল সামলে উঠতে পারবে না।
বিষয়টি ১৯৯৯ সালে মার্কিন কৌশলবিদ এডওয়ার্ড লুটওয়াকের ‘গিভ ওয়ার আ চান্স’ শীর্ষক নিবন্ধে তোলা সেই তত্ত্বের কথা মনে করিয়ে দেয়, যা ২০১৩ সালে সিরিয়া সংকটের সময় প্রয়োগ করা হয়েছিল—সব যুদ্ধের সমাপ্তি মানেই শান্তি নয়, আবার সব বিজয়েও কাঙ্ক্ষিত ফল আসে না।
কখনো কখনো কৌশলগত স্বার্থ লুকিয়ে থাকে কাউকে জিততে না দেওয়ার মধ্যে, যাতে একটি ভারসাম্য বজায় থাকে এবং কেউ প্রতিপক্ষকে একেবারে চূর্ণ করতে না পারে। সিরিয়া প্রসঙ্গে লুটওয়াক যুক্তি দিয়েছিলেন, সরকারি বাহিনীর জয় মানে ইরানের শক্তিশালী হওয়া, আর তার পতন মানে ‘নিয়ন্ত্রণহীন জিহাদিদের’ উত্থান। মার্কিন ও ইসরায়েলি দৃষ্টিকোণ থেকে সে সময় তাই সংঘাতকে অনির্দিষ্টকালের জন্য অচল অবস্থায় রাখাই ছিল সবচেয়ে অনুকূল পথ।
এক দশকের বেশি সময় পর ইয়েমেন যেন সেই তত্ত্বেরই এক বাস্তব মহড়া দিচ্ছে; যদিও তা আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকার করা হয় না। ইয়েমেনের সংঘাত প্রথাগত যুদ্ধ হিসেবে থমকে গেলেও জমিনে এর মীমাংসা হয়নি।
২০১৫ সালের মার্চে হুতিরা সানা দখল করার পর সৌদি নেতৃত্বাধীন জোটের হস্তক্ষেপের মূল লক্ষ্য ছিল আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সরকারকে পুনর্বাসিত করা। কিন্তু এই যুদ্ধ ইয়েমেনকে না ফিরিয়ে নিতে পেরেছে আগের জায়গায়, না পৌঁছাতে পেরেছে কোনো চূড়ান্ত উপসংহারে।
হুতিরা কখনোই পুরো দেশ দখল করতে পারেনি, আবার জোট বাহিনীও তাদের সানা থেকে সরাতে পারেনি।
২০২২ সালের মধ্যে যুদ্ধের ফ্রন্টলাইনগুলো স্থবির হয়ে পড়ে এবং একটি যুদ্ধবিরতি শুরু হয়। তবে দেশের উত্তর-পশ্চিমের বড় অংশ এখনো হুতিদের নিয়ন্ত্রণে। এটি কিন্তু শান্তি নয়, এটি আসলে সংঘাতকে কেবল থামিয়ে রাখা।
শূন্যতা পূরণের সমীকরণ
হুতিদের পূর্ণাঙ্গ বিজয়ের অর্থ হলো সৌদি আরবের এক হাজার কিলোমিটারের বেশি দীর্ঘ সীমান্তে ইরানঘেঁষা এক সশস্ত্র শক্তির স্থায়ী অবস্থান।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের জন্য এর অর্থ বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক পথ বাব আল-মানদেবের ওপর চরম ঝুঁকি। তা ছাড়া হুতি-নিয়ন্ত্রিত ইয়েমেন হতে পারে অঞ্চলের মধ্যে ইরানের এক শক্তিশালী সামরিক ঘাঁটি।
অন্যদিকে হুতিদের একেবারে নির্মূল করাও বেশ কঠিন। তারা কেবল ইরানের প্রক্সি বা ছায়া শক্তি নয়। ইয়েমেনের সামাজিক, রাজনৈতিক ও উপজাতীয় কাঠামোর সঙ্গে তারা গভীরভাবে যুক্ত।
আসল জটিল প্রশ্ন হলো, হুতিদের পতন হলে সেই রাজনৈতিক ও সামরিক শূন্যতা পূরণ করবে কে? ইয়েমেন কখনোই একক রাজনৈতিক সত্তা ছিল না। এখানে স্বীকৃত সরকার, নানা উপজাতীয় গোষ্ঠী এবং সংযুক্ত আরব আমিরাত–সমর্থিত দক্ষিণাঞ্চলীয় বিচ্ছিন্নতাবাদীরা সক্রিয়।
ফলে ওয়াশিংটন চায় না হুতিরা একচ্ছত্র ক্ষমতার অধিকারী হোক, আবার তাদের প্রতিপক্ষদেরও অলআউট যুদ্ধে যেতে দিতে চায় না। এতে বহিরাগত শক্তিগুলোর হস্তক্ষেপের খরচ কমে যায়, যদিও ইয়েমেনের সার্বভৌমত্ব কেবল নামেই টিকে থাকে।
এই অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব ২০২৫ সালের শেষের দিকে ও ২০২৬ সালের শুরুতে প্রকাশ্য রূপ নেয়, যখন এডেন ও পূর্বাঞ্চলীয় প্রদেশে প্রসারিত হতে যাওয়া দক্ষিণ অন্তর্বর্তীকালীন পরিষদের (এসটিসি) বিরুদ্ধে সৌদি আরব সামরিক পদক্ষেপ নেয় এবং এর পেছনে আমিরাতের ভূমিকা নিয়ে অসন্তোষ জানায়। পাশাপাশি মুসলিম ব্রাদারহুড-ঘেঁষা ‘ইসলাহ’ পার্টিকে দমন করার বিষয়ে রিয়াদ ও আবুধাবির মূল্যায়নেও স্পষ্ট পার্থক্য রয়েছে।
এখানে প্রতিটি পক্ষের হিসাব আলাদা। হুতি ও ইরান; ইয়েমেন সরকার, সৌদি আরব ও স্থানীয় জোট; আরব আমিরাত; যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল—এমনকি আল-কায়েদা, সবার কাছেই ইয়েমেনের ভবিষ্যৎ ও বন্ধু-শত্রুর সংজ্ঞা ভিন্ন।
২০১৫ সাল থেকে মার্কিন নীতিতে যে দোলাচল দেখা গেছে, তা এই ফ্রেমওয়ার্ক দিয়েই ব্যাখ্যা করা যায়। ওয়াশিংটন কখনো সৌদি আরবকে অস্ত্র দিয়েছে, আবার কখনো সমর্থন গুটিয়ে নিয়েছে; কখনো আবার ইরানের সঙ্গে সম্পর্কের বরফ গলাতে চেয়েছে। এতে ওয়াশিংটনের প্রতি রিয়াদের আস্থা নড়ে যায়, এমনকি তাদের গ্রিস থেকেও প্যাট্রিয়ট ক্ষেপণাস্ত্র ধার করতে হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের এই নীতি সৌদি বিজয় নিশ্চিত করার চেয়ে ক্ষমতার ভারসাম্য নিয়ন্ত্রণের চেষ্টাকেই স্পষ্ট করে।
২০২৫ সালের মার্চ থেকে মে মাসের মধ্যে লোহিত সাগরে জাহাজে হামলার জবাবে যুক্তরাষ্ট্র হুতিদের ওপর হামলা জোরদার করে, আবার ওমানের মধ্যস্থতায় হুতিরা মার্কিন জাহাজে হামলা বন্ধের প্রতিশ্রুতি দিলে তারাও সেই আক্রমণ থামিয়ে দেয়। এখানে লক্ষ্য হুতি শাসন বা যুদ্ধের অবসান ঘটানো ছিল না; কেবল সংঘাতের একটি নির্দিষ্ট আচরণকে নিয়ন্ত্রণ করাই ছিল মূল উদ্দেশ্য।
নিয়ন্ত্রিত বিভাজন
২০২৩ সালের অক্টোবরের পর গাজা যুদ্ধের জেরে হুতিদের সম্পৃক্ততা তাদের এক আঞ্চলিক শক্তিতে পরিণত করেছে। তারা পুরো ইয়েমেন না জিতলেও বিশ্ববাণিজ্যে বড় ধরনের প্রভাব ফেলতে পারছে; অন্যদিকে সরকার পুরোপুরি পরাজিত না হলেও রাষ্ট্র পরিচালনায় ব্যর্থ।
এই বৈপরীত্য ‘বিজয়’ শব্দটিকে প্রায় অর্থহীন করে তুলেছে। ফলে ওয়াশিংটন চায় না হুতিরা একচ্ছত্র ক্ষমতার অধিকারী হোক, আবার তাদের প্রতিপক্ষদেরও অলআউট যুদ্ধে যেতে দিতে চায় না। এতে বহিরাগত শক্তিগুলোর হস্তক্ষেপের খরচ কমে যায়, যদিও ইয়েমেনের সার্বভৌমত্ব কেবল নামেই টিকে থাকে।
ওয়াশিংটন জেনেশুনে লুটওয়াকের তত্ত্ব প্রয়োগ করেছে কি না, তা বড় কথা নয়; তবে এই ফ্রেমওয়ার্ক সুদান, লিবিয়া, ইরাক ও লেবাননের ঘটনা বুঝতেও সাহায্য করে। সেখানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলি নীতি সংঘাত সমাধানের চেয়ে সমাজগুলোকে বিভক্ত ও দুর্বল করে রাখার কাজই বেশি করেছে।
হুতিদের পূর্ণ বিজয় যেমন রিয়াদ সীমান্ত বিপন্ন করবে, তেমনি তাদের পুরো পতন ঘটাতে প্রয়োজন এক দীর্ঘ ও ব্যয়বহুল যুদ্ধ। আবার দেশভাগ এক সংকট মেটাতে গিয়ে জন্ম দেবে নতুন সংঘাতের।
বর্তমান অচলাবস্থায় প্রতিটি পক্ষই কিছু না কিছু সুবিধা পাচ্ছে—হুতিদের হাতে সানা, সরকারের হাতে আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি, সৌদির জন্য হুতি রাষ্ট্রের প্রতিহত অবস্থা, আর ইরানের হাতে যুদ্ধের নিয়ন্ত্রক কার্ড। তবে এই ভারসাম্য অত্যন্ত ভঙ্গুর।
আঞ্চলিক সমীকরণেও এর প্রভাব দৃশ্যমান। নতুন উদীয়মান তুরস্ক-সৌদি-পাকিস্তান অক্ষ এখনো কোনো যৌথ সামরিক জোট নয়; রিয়াদের হয়ে আঙ্কারা বা ইসলামাবাদ যুদ্ধে নামবে কি না, তা অনিশ্চিত।
মার্কিন নিরাপত্তার ওপর পুরো নির্ভর না করে কম খরচে অস্ত্র পাওয়া এবং ইসরায়েল ও ইরানকে ভারসাম্যে রাখার জন্যই সম্ভবত এই দেশগুলোর দিকে রিয়াদ ঝুঁকছে।
এর মানে কি উপসাগরীয় দেশগুলো মার্কিন নিরাপত্তার প্রতি আস্থা হারাচ্ছে?
অনেকাংশে তা–ই। তবে অঞ্চলটিতে যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাব এখনো অটুট। তাহলে কি এই অক্ষ মার্কিন স্বার্থের বিরুদ্ধে যাচ্ছে? একেবারেই নয়। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল সম্ভবত এটিই চায়, যাতে অন্য শক্তিগুলো অঞ্চলটির আঞ্চলিক সংঘাত ও ঝুঁকি সামলানোর দায়িত্ব নিজের কাঁধে নেয়।
এই জোট ইসরায়েলবিরোধী—এমন কোনো স্পষ্ট প্রমাণ নেই। এটি বরং ইয়েমেনের সেই ঝুলে থাকা যুদ্ধের যুক্তিকেই তুলে ধরে—যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ড্রাইভিং সিটে না বসে আড়ালে থেকেই যুদ্ধের সীমা ঠিক করে দিতে বেশি স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করে, আর অন্যরা বহন করে তার মাশুল।
শাদি ইব্রাহিম ইস্তাম্বুল সাবাহাত্তিন জাইম ইউনিভার্সিটির সেন্টার ফর ইসলাম অ্যান্ড গ্লোবাল অ্যাফেয়ার্সের গবেষণা সহযোগী। মিডল ইস্ট আই থেকে সংক্ষেপে অনূদিত।