নির্বাচন এলেই চারদিক থেকে শোনা যায় ‘সৎ ও যোগ্য প্রার্থী’ নিয়ে আলোচনা। নাগরিক সমাজের কেউ কেউ মিনমিন করে অর্থ, ক্ষমতা ও পেশিশক্তির রাজনীতির বাইরে সৎ ও যোগ্য প্রার্থীকে ভোট দিয়ে নির্বাচিত করার কথা বলেন। কিন্তু আমাদের এখানে নাগরিকের সঙ্গে রাজনৈতিক দলের নেতাদের প্যাট্রন-ক্লায়েন্ট (আশ্রয়দাতা ও আশ্রিত) সম্পর্কের যে বন্দোবস্ত, সেখানে ‘সৎ ও যোগ্য প্রার্থী’ বলতে বাস্তবে কোনো কিছুর অস্তিত্ব খুঁজে পাওয়া আর খড়ের গাদায় সুচ খোঁজা সমার্থক।
ফেসবুক স্ক্রল করতে গিয়ে হঠাৎ চোখে পড়ল একটি অনলাইন নিউজ পোর্টালের ফটোকার্ড—প্রার্থিতা বাতিল, স্ত্রী-সন্তান নিয়ে দেশত্যাগের ঘোষণা স্বতন্ত্র প্রার্থীর। জাতীয় সংসদ নির্বাচনে এবার প্রার্থী হতে ৩০০ সংসদীয় আসনে দলীয় ও স্বতন্ত্র মিলিয়ে প্রায় ২ হাজার ৫৮২টি মনোনয়নপত্র জমা পড়েছে। প্রতিটি আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন গড়ে ৮ জন। তাঁদের মধ্যে প্রকৃত স্বতন্ত্র প্রার্থী আসলে কতজন, তা নিয়ে বড় প্রশ্ন থেকে যায়।
বেশির ভাগই রাজনৈতিক দলের, বিশেষ করে বিএনপির বিদ্রোহী প্রার্থী। জোটের জন্য ছেড়ে দেওয়া আসনগুলোতে তো বটেই, বেশির ভাগ আসনে বিএনপির এক বা একাধিক বিদ্রোহী প্রার্থী আছেন। বিদ্রোহী প্রার্থী আইনিভাবে স্বতন্ত্র হলেও শেষ পর্যন্ত তাঁরা দলীয় প্রার্থীই। কেননা, রাজনৈতিক পরিচয়েই কর্মী-সমর্থকদের মধ্যে তাঁদের ভিত্তি গড়ে উঠেছে। আবার দল করতে গিয়েই তাঁদের কর্মী-সমর্থক গড়ে উঠেছে। বিদ্রোহী হওয়ায় বহিষ্কার করলেও নির্বাচনে জিততে পারলে দল তাঁদের কাছে টেনে নেয়।
এই মুহূর্তে দেশের মানুষের অন্যতম আলোচনার বিষয় প্রার্থীদের হলফনামা। মানুষ বিস্ময় নিয়ে দেখছেন, তাঁদের ভবিষ্যৎ নীতিনির্ধারকেরা আসলে কতটা গরিব, আর সেই তুলনায় স্ত্রীরা কতটা ধনী। প্রার্থীদের দেওয়া সম্পদের হিসাব থেকে জনগণ এটাও মনে করছেন যে আমরা হয়তো টাইম মেশিনে করে কয়েক দিনের জন্য শায়েস্তা খানের আমলে ফিরে গেছি। না হলে ২৫-২৬ লাখ টাকায় ডুপ্লেক্স বাড়ি কীভাবে মিলবে। কিংবা ৮-১০ হাজার টাকায় এক ভরি স্বর্ণ!
যাহোক, প্রার্থী হতে গেলে সম্পদ যে কতটা গুরুত্বপূর্ণ, তা বিএনপি ও জামায়াতের প্রার্থীদের হলফনামায় উল্লেখ করা সম্পদের দিকে তাকালেই পরিষ্কার হয়ে যাবে। বিএনপির ২২৩ জন প্রার্থী কোটিপতি, এর মধ্যে শতকোটিপতি ৭ জন। এর অর্থ দলটির ৮৩ শতাংশ প্রার্থীই কোটিপতি। জামায়াতে ইসলামী ঢাকায় ১৭টি আসনে প্রার্থী দিয়েছে। এর মধ্যে ১৩ জনই কোটিপতি। অভ্যুত্থানের নেতৃত্ব দেওয়া ছাত্রদের দল এনসিপিও পিছিয়ে নেই। ঢাকায় তাদের ৮ প্রার্থীর দুজন কোটিপতি।
এক-এগারোর সেনানিয়ন্ত্রিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ (আরপিও) সংশোধনের মাধ্যমে নতুন দলের নিবন্ধন ও দলের বাইরের কাউকে প্রার্থী হওয়ার সুযোগ শূন্যের কাছাকাছি নামিয়ে আনা হয়েছে। শর্ত অনুযায়ী, কোনো আসনে কেউ স্বতন্ত্র হিসেবে প্রার্থী হতে গেলে ওই আসনের ১ শতাংশ ভোটারের সমর্থন জোগাড় করে তাঁকে মনোনয়নপত্র জমা দিতে হবে।
যাহোক, হলফনামা থেকে ফিরে আসা যাক স্বতন্ত্র প্রার্থীবিষয়ক আলাপে। রাজনৈতিক সমীকরণে সব স্বতন্ত্র যে স্বতন্ত্র নয়, সেটি ভোটারদের কাছে পরিষ্কার। যত বড় জনপ্রিয় মুখ হোক না কেন, নির্বাচনী বৈতরণি পার হতে গেলে যে বড় দলের সঙ্গে জোট বাঁধার বিকল্প নেই, সেটিও স্পষ্ট। তফসিল ঘোষণার পর জোট বাঁধার যে নাটকীয়তা ও হুড়োহুড়ি, অনেকের কাছে তা বিনোদন, আবার অনেকের কাছে মোহভঙ্গের কারণও হয়েছে।
তফসিল অনুযায়ী ৪ জানুয়ারি মনোনয়ন বাছাইয়ের শেষ দিন ছিল। প্রথম আলোর খবর জানাচ্ছে, ৩০০ আসনে ৭২৩ জন প্রার্থীর মনোনয়নপত্র বাতিল হয়েছে। এর মধ্যে স্বতন্ত্র (প্রকৃত স্বতন্ত্র ও বিদ্রোহী মিলিয়ে) রয়েছেন ৩৩৮ জন। অবশ্য নির্বাচন কমিশনে আপিল করে অনেকে প্রার্থিতা ফিরে পেয়েছেন। এর মধ্যে জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে নির্বাচনী জোট করার প্রতিবাদে এনসিপি থেকে পদত্যাগ করে ঢাকা-৯ আসনে স্বতন্ত্র প্রার্থী হওয়া তাসনিম জারাও রয়েছেন। ক্রাউড ফান্ডিংয়ের মাধ্যমে নির্বাচনের খরচ জোগাড় করে একটি ভালো দৃষ্টান্ত স্থাপন করেন তরুণ এই রাজনৈতিক মুখ। কিন্তু তাঁরও মনোনয়নপত্র বাতিল হয়েছিল।
সংবিধান সংশোধন ও রাষ্ট্র সংস্কারের দাবি যাঁরা জনপ্রিয় করে তুলেছেন, তাঁদের মধ্যে প্রথম সারির মুখ রাষ্ট্র সংস্কার আন্দোলনের সভাপতি হাসনাত কাইয়ূম। স্বতন্ত্র হিসেবে তিনি কিশোরগঞ্জ-৫ (বাজিতপুর-নিকলী) আসনে মনোনয়নপত্র জমা দেন; কিন্তু তাঁর মনোনয়নপত্র বাতিল হয়ে যায়। সমর্থনকারী ভোটারদের স্বাক্ষরে গরমিল পাওয়ার অভিযোগে সেটি বাতিল করে। নির্বাচন কমিশনে তিনি আপিল করেছেন।
এক-এগারোর সেনানিয়ন্ত্রিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ (আরপিও) সংশোধনের মাধ্যমে নতুন দলের নিবন্ধন ও দলের বাইরের কাউকে প্রার্থী হওয়ার সুযোগ শূন্যের কাছাকাছি নামিয়ে আনা হয়েছে। শর্ত অনুযায়ী, কোনো আসনে কেউ স্বতন্ত্র হিসেবে প্রার্থী হতে গেলে ওই আসনের ১ শতাংশ ভোটারের সমর্থন জোগাড় করে তাঁকে মনোনয়নপত্র জমা দিতে হবে।
প্রশ্ন হচ্ছে, এই আইন গণতান্ত্রিক চেতনার সঙ্গে কতটা সামঞ্জস্যপূর্ণ? এমন আইন যাঁরা তৈরি করেছেন, সম্ভবত তাঁদের মাথায় এই ভাবনা কাজ করেছে—নির্বাচনে যেন প্রার্থীর সংখ্যা অনেক বেশি বেড়ে না যায়। বাস্তবতা হচ্ছে, এর মাধ্যমে দলীয় সমর্থন, টাকা ও পেশি ক্ষমতার বাইরে কাউকে নির্বাচন করার সুযোগটাই কঠিন করে দেওয়া হয়েছে। জাতীয় সংসদ কোটিপতিদের ক্লাব হলে তার পরিণতি যে কতটা দুর্বিষহ হতে পারে, হাসিনার শাসনামল তার সবচেয়ে কাছের উদাহরণ। এটা গণতন্ত্রের নামে শেষ পর্যন্ত একটা গোষ্ঠীতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করে। বড় দল আর কোটিপতি ক্লাবের বাইরে কেউ কি তাহলে এমপি হতে পারবে না?
● মনোজ দে প্রথম আলোর সম্পাদকীয় সহকারী
* মতামত লেখকের নিজস্ব