অভিমত–বিশ্লেষণ
বিশ্ববিদ্যালয়কে আবার বিশ্ববিদ্যালয় করতে হবে
বাংলাদেশের এখন প্রয়োজন কিছু বিশ্বস্ত গবেষণা বিশ্ববিদ্যালয়, বহু উৎকৃষ্ট শিক্ষাকেন্দ্রিক বিশ্ববিদ্যালয়, শক্তিশালী ফলিত ও কারিগরি প্রতিষ্ঠান এবং সম্মানজনক মানের কলেজব্যবস্থা। লিখেছেন এম. নিয়াজ আসাদুল্লাহ
সম্প্রতি ঢাকা কেন্দ্রীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক মো. নুরুল ইসলাম উচ্চশিক্ষার মান নিয়ে একটি অস্বস্তিকর, কিন্তু জরুরি প্রশ্ন তুলেছেন। বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন আয়োজিত এক নীতি সংলাপে তিনি বলেছেন, শুধু বাজেট বাড়িয়ে মানসম্পন্ন বিশ্ববিদ্যালয় গড়ে তোলা যায় না। বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে পড়ানোর উপযুক্ত মানসিকতা ও দক্ষতাসম্পন্ন শিক্ষক, গবেষণার সক্ষমতা এবং নতুন জ্ঞান সৃষ্টির পরিবেশ—তিনটিই নিশ্চিত করতে হবে।
কিন্তু সাত কলেজে কর্মরত বিসিএস সাধারণ শিক্ষা ক্যাডারের শিক্ষকদের বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ের পাঠদান, গবেষণা ও জ্ঞান সৃষ্টির সক্ষমতা বিবেচনায় নেওয়ার কথা বলায় তিনি ব্যাপক সমালোচনার মুখে পড়েন। পরে ঢাকা কেন্দ্রীয় বিশ্ববিদ্যালয় জানায়, তাঁর বক্তব্যের একটি খণ্ডিত অংশ প্রচারিত হয়েছে; কারও অনুভূতিতে আঘাত লেগে থাকলে তিনি দুঃখিত।
শিক্ষা ক্যাডারের সদস্যদের ক্ষুব্ধ হওয়ার কারণ বোধগম্য। দীর্ঘদিন ধরে প্রয়োজনীয় গবেষণা অবকাঠামো, সময়, প্রশিক্ষণ বা প্রণোদনা না দিয়ে এখন তাঁদের গবেষণা-সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন তোলা অন্যায্য মনে হতে পারে। কিন্তু বক্তব্যের ভাষা বা ব্যক্তিবিশেষের যোগ্যতা নিয়ে বিতর্কের আড়ালে বড় প্রশ্নটি হারিয়ে গেলে সেটিও হবে দুর্ভাগ্যজনক: বাংলাদেশে ‘বিশ্ববিদ্যালয়’ বলতে আমরা আসলে কী বুঝি?
এই প্রশ্ন এখন বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, বাংলাদেশকে একই সময়ে উচ্চশিক্ষার দুটি রূপান্তর সম্পন্ন করতে হবে। একদিকে বিপুলসংখ্যক তরুণকে মানসম্পন্ন উচ্চশিক্ষা ও শ্রমবাজারের উপযোগী দক্ষতা দিতে হবে; অন্যদিকে শিক্ষাকেন্দ্রিক প্রতিষ্ঠান থেকে অন্তত একগুচ্ছ বিশ্ববিদ্যালয়কে গবেষণা, উদ্ভাবন ও নতুন জ্ঞান সৃষ্টির কেন্দ্রে রূপান্তর করতে হবে। এ কাজের জন্য আমাদের হাতে অনন্ত সময় নেই।
জনসংখ্যার বয়স-কাঠামো বদলাচ্ছে; জনমিতিক–সুবিধার জানালা ধীরে ধীরে সংকুচিত হচ্ছে। আজ বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রবেশ করা তরুণদের শিক্ষার মানই নির্ধারণ করবে বাংলাদেশ তার তরুণ জনগোষ্ঠীকে উৎপাদনশীল সম্পদে রূপ দিতে পারবে, নাকি বার্ধক্যে প্রবেশের আগেই অপূর্ণ সম্ভাবনার ভার বহন করবে।
কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের পার্থক্য কোথায়
চলতি মাসের শুরুতে বেসরকারি গবেষণাপ্রতিষ্ঠান শিক্ষাসংস্কার উদ্যোগ এডুকেশন রিফর্ম ইনিশিয়েটিভের উদ্বোধনী গণবক্তৃতায় আমি বাংলাদেশের শিক্ষা ও অর্থনীতির বিচ্ছিন্ন সম্পর্ক (ব্রোকেন লিংকেজ) নিয়ে আলোচনা করেছিলাম। সেখানে পরিকল্পনা উপদেষ্টা অধ্যাপক রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর আরও সরাসরি অভিযোগ করেন, দেশের অনেক বিশ্ববিদ্যালয় আজ কার্যত কলেজে পরিণত হয়েছে। শিক্ষামন্ত্রী এবং সরকারি-বেসরকারি কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ও সহ-উপাচার্যের উপস্থিতিতেই তিনি কথাটি বলেন।
প্রথমে মন্তব্যটি অতিরঞ্জিত মনে হতে পারে। কিন্তু অধ্যাপক তিতুমীর তাঁর বক্তব্যের ব্যাখ্যাও দিয়েছিলেন। কলেজ প্রধানত প্রচলিত জ্ঞান শিক্ষার্থীদের কাছে পৌঁছে দেয়। বিশ্ববিদ্যালয়ও তা করে, কিন্তু তার দায়িত্ব সেখানে শেষ হয় না। বিশ্ববিদ্যালয়কে বিদ্যমান জ্ঞান যাচাই করতে হয়, নতুন প্রশ্ন তুলতে হয়, নতুন জ্ঞান সৃষ্টি করতে হয় এবং পরবর্তী প্রজন্মের গবেষক ও চিন্তক তৈরি করতে হয়। গবেষণা ও বিদ্যাচর্চা অনুপস্থিত হলে শুধু স্নাতক ও স্নাতকোত্তর সনদ দেওয়ার কারণে একটি প্রতিষ্ঠান বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বতন্ত্র মর্যাদা দাবি করতে পারে কি না, এই প্রশ্ন এড়িয়ে যাওয়া কঠিন।
বাংলাদেশে এই পার্থক্য ক্রমেই অস্পষ্ট হয়েছে। একদিকে কলেজগুলোতে অনার্স ও মাস্টার্স কোর্সের বিস্তার ঘটেছে। অন্যদিকে বহু বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষাদানের চাপ, দুর্বল গবেষণা পরিবেশ, অপ্রতুল গবেষণাগার, মানসম্পন্ন পিএইচডি তত্ত্বাবধানের অভাব এবং গবেষণার মানের বদলে প্রকাশনার সংখ্যা বাড়ানোর প্রবণতা তৈরি হয়েছে। ফলে কলেজ বিশ্ববিদ্যালয়ের সনদ দিতে চাইছে, আর অনেক বিশ্ববিদ্যালয় কলেজের মতো কেবল পাঠদান ও পরীক্ষা পরিচালনা করছে।
এই অবস্থাই একটি কঠিন রাজনৈতিক অর্থনীতির জন্ম দিয়েছে। যখন হাজার হাজার শিক্ষার্থী কলেজ থেকে অনার্স ও মাস্টার ডিগ্রি অর্জন করেন, তখন তাঁদের প্রতিষ্ঠানকে বিশ্ববিদ্যালয় করার দাবি অযৌক্তিক বলে উড়িয়ে দেওয়া কঠিন হয়। কারণ, সরকার নিজেই ‘ডিগ্রি দেওয়া’ এবং ‘বিশ্ববিদ্যালয় হওয়া’—এই দুটির মধ্যকার পার্থক্য স্পষ্ট রাখেনি। কিন্তু নাম পরিবর্তন করে কলেজকে বিশ্ববিদ্যালয় বানানো যায়; গবেষণার সংস্কৃতি, বিজ্ঞানী তৈরির সক্ষমতা বা জ্ঞান সৃষ্টির প্রতিষ্ঠান রাতারাতি বানানো যায় না।
সম্প্রসারণ হয়েছে, গবেষণাব্যবস্থা গড়ে ওঠেনি
বাংলাদেশে উচ্চশিক্ষার দ্রুত সম্প্রসারণকে পুরোপুরি নেতিবাচকভাবে দেখা উচিত নয়। এর ফলে জেলা ও প্রান্তিক এলাকার বহু তরুণ-তরুণী উচ্চশিক্ষার সুযোগ পেয়েছেন। বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোও সরকারি ব্যবস্থার সীমিত আসনের বাইরে বিপুল চাহিদা সামাল দিয়েছে। এই সম্প্রসারণ সামাজিক গতিশীলতা ও নারীর উচ্চশিক্ষায় অংশগ্রহণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।
সমস্যা সম্প্রসারণে নয়; সমস্যা হলো, সম্প্রসারণের সঙ্গে প্রয়োজনীয় প্রাতিষ্ঠানিক বিভাজন, মাননিয়ন্ত্রণ এবং শিক্ষক তৈরির ব্যবস্থা গড়ে ওঠেনি। আমরা প্রায় সব প্রতিষ্ঠানের কাছে প্রায় একই ধরনের দাবি করছি এবং একই ‘বিশ্ববিদ্যালয়’ পরিচয় দিচ্ছি, অথচ তাদের শিক্ষকসংখ্যা, গবেষণা অবকাঠামো, পিএইচডি প্রশিক্ষণ, গবেষণা অর্থায়ন ও শিক্ষার্থীর প্রস্তুতিতে বিশাল পার্থক্য রয়েছে।
এর বিপজ্জনক পরিণতি সাম্প্রতিক গবেষণা প্রত্যাহারের ঘটনায় দৃশ্যমান। প্রথম আলোর অনুসন্ধানে ২০১৯ থেকে ২০২৬ সালের জুন পর্যন্ত বাংলাদেশের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান-সংশ্লিষ্ট অন্তত ৩২৫টি গবেষণাপত্র প্রত্যাহারের তথ্য পাওয়া গেছে। এর মধ্যে ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ৪৪টি এবং নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ৪২টি গবেষণাপত্র রয়েছে। তবে প্রত্যাহার মানেই প্রতিটি ক্ষেত্রে একই ধরনের অপরাধ নয়; কারণ জালিয়াতি ছাড়াও ত্রুটি, লেখকত্বের বিরোধ বা পর্যালোচনা-প্রক্রিয়ার সমস্যায় গবেষণাপত্র প্রত্যাহৃত হতে পারে। তাই প্রতিষ্ঠান বা সব গবেষককে একসঙ্গে অভিযুক্ত না করে প্রতিটি ঘটনা স্বচ্ছভাবে তদন্ত করা দরকার।
এর পাশাপাশি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোও সময়ে–সময়ে চৌর্যবৃত্তি ও গবেষণা-নৈতিকতা নিয়ে বিতর্কের মুখে পড়েছে। অথচ একই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়েই ভূতত্ত্ববিদ অধ্যাপক কাজী মতিন উদ্দিন আহমেদের মতো আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত গবেষক রয়েছেন, যাঁর ভূগর্ভস্থ পানি ও আর্সেনিক বিষয়ে কাজ দেশে-বিদেশে সমাদৃত; অর্থাৎ বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়ে গবেষণা-সক্ষমতা একেবারে নেই, এ দাবি ভুল।
সংকট হলো, ব্যক্তিগতভাবে সফল গবেষক থাকার পরও তাঁদের ঘিরে একটি টেকসই জাতীয় গবেষণাব্যবস্থা, উত্তরসূরি তৈরির প্রক্রিয়া এবং প্রতিষ্ঠানব্যাপী নৈতিক সংস্কৃতি গড়ে ওঠেনি।
অর্থের অভাব অবশ্যই বড় সমস্যা; কিন্তু অর্থই একমাত্র সমস্যা নয়। গবেষণা অনুদান যদি যথাযথ প্রতিযোগিতা, সহকর্মী পর্যালোচনা, ফলাফল যাচাই এবং জবাবদিহি ছাড়া বণ্টিত হয়, তাহলে অর্থ বাড়লেও মান বাড়বে না। পদোন্নতিতে গবেষণার গুণমানের বদলে প্রকাশনার সংখ্যা, জার্নালের নামের বদলে অস্পষ্ট ‘ইমপ্যাক্ট ফ্যাক্টর’ অথবা অর্থের বিনিময়ে দ্রুত প্রকাশনাকে পুরস্কৃত করলে নকল ও নিম্নমানের গবেষণার বাজার তৈরি হবেই।
সব বিশ্ববিদ্যালয় গবেষণা বিশ্ববিদ্যালয় হবে না
এখানে একটি অস্বস্তিকর বাস্তবতা স্বীকার করতে হবে: ৫ থেকে ১০ বছরের মধ্যে বাংলাদেশের সব বিশ্ববিদ্যালয়কে গবেষণা বিশ্ববিদ্যালয়ে রূপান্তর করা সম্ভব নয়। তা চাওয়ারও প্রয়োজন নেই।
যুক্তরাষ্ট্রের কার্নেগি শ্রেণিবিন্যাসসহ প্রতিষ্ঠিত উচ্চশিক্ষাব্যবস্থাগুলো বিশ্ববিদ্যালয়কে তাদের প্রধান দায়িত্ব, ডিগ্রির ধরন ও গবেষণা তৎপরতার ভিত্তিতে বিভিন্ন শ্রেণিতে ভাগ করে। কোথাও গবেষণানির্ভর বিশ্ববিদ্যালয়, কোথাও প্রধানত স্নাতক শিক্ষা, কোথাও ফলিতবিজ্ঞান ও পেশাভিত্তিক প্রশিক্ষণকে প্রাধান্য দেওয়া হয়। একটি ভালো শিক্ষাকেন্দ্রিক বিশ্ববিদ্যালয় ব্যর্থ গবেষণা বিশ্ববিদ্যালয়ের চেয়ে সমাজের জন্য বেশি মূল্যবান হতে পারে।
আমাদেরও অন্তত চার ধরনের প্রতিষ্ঠান আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকৃতি দেওয়া দরকার: গবেষণা বিশ্ববিদ্যালয়, শিক্ষাকেন্দ্রিক বিশ্ববিদ্যালয়, ফলিতবিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় এবং ডিগ্রি কলেজ। প্রতিটির নিয়োগনীতি, শিক্ষকতার চাপ, গবেষণার বাধ্যবাধকতা, অর্থায়ন ও মূল্যায়নের মানদণ্ড আলাদা হওয়া উচিত। শিক্ষাকেন্দ্রিক প্রতিষ্ঠানের শিক্ষককে গবেষণা না করার জন্য হেয় করা যেমন ঠিক নয়, তেমনি গবেষণার প্রমাণ ছাড়াই কোনো প্রতিষ্ঠানকে গবেষণা বিশ্ববিদ্যালয়ের মর্যাদা দেওয়াও উচিত নয়।
গবেষণা বিশ্ববিদ্যালয়ের মর্যাদা স্থায়ী উপাধি না হয়ে প্রতিযোগিতামূলক ও নির্দিষ্ট সময়ের জন্য হওয়া উচিত। গবেষণা অর্থায়ন, মানসম্পন্ন পিএইচডি উৎপাদন, গবেষণার প্রভাব, নৈতিকতা, আন্তর্জাতিক সহযোগিতা এবং জাতীয় সমস্যার সমাধানে অবদানের ভিত্তিতে প্রথম পর্যায়ে অল্পসংখ্যক সরকারি ও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় এই মর্যাদা পেতে পারে।
পাঁচ বছর পর স্বাধীন মূল্যায়নের মাধ্যমে মর্যাদা নবায়ন, উন্নীত বা বাতিল করা যেতে পারে। ঢাকা কেন্দ্রীয় বিশ্ববিদ্যালয়সহ নতুন কোনো প্রতিষ্ঠানকে কেবল একটি সময়সীমার মধ্যে বেঁধে গবেষণা বিশ্ববিদ্যালয় হওয়ার নির্দেশ দেওয়ার বদলে প্রতিযোগিতার মাধ্যমে সেই যোগ্যতা অর্জনের পথ দিতে হবে।
ফিনল্যান্ড ও যুক্তরাজ্যের শিক্ষা
আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতাও দেখায়, বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যা বাড়ানোই একমাত্র পথ নয়। ফিনল্যান্ড ২০০৯ সালের বিশ্ববিদ্যালয় আইন সংস্কারের সঙ্গে উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোকে একীভূত করে। ২০১০ সালে তিনটি নতুন একীভূত বিশ্ববিদ্যালয় গঠিত হয়; পুরোনো ১৮টি বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যা কমে ১৪–তে আসে।
যুক্তরাজ্য বিপরীতমুখী অভিজ্ঞতাও দিয়েছে। ১৯৯২ সালে পলিটেকনিকগুলোকে বিশ্ববিদ্যালয়ের মর্যাদা দেওয়ার ফলে উচ্চশিক্ষায় প্রবেশাধিকার ব্যাপকভাবে বেড়েছিল। এই প্রতিষ্ঠানগুলো গণ–উচ্চশিক্ষা ও কর্মমুখী শিক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছে। কিন্তু নামের অভিন্নতা প্রতিষ্ঠানগুলোর ঐতিহাসিক দায়িত্ব ও গবেষণাগত পার্থক্য মুছে দেয়নি।
বাংলাদেশের জন্য শিক্ষা হলো—প্রাতিষ্ঠানিক একীভূতকরণ ব্যর্থতার স্বীকারোক্তি নয়; কখনো তা মান, সক্ষমতা ও সম্পদের যৌক্তিক ব্যবহারের কৌশল। প্রতিটি জেলা বা প্রতিটি বড় কলেজকে আলাদা বিশ্ববিদ্যালয় বানানোর চেয়ে কয়েকটি কলেজকে একটি শক্তিশালী ফেডারেল কাঠামোর অধীনে রেখে যৌথ গবেষণাগার, গ্রন্থাগার, ডিজিটাল অবকাঠামো ও প্রশিক্ষিত শিক্ষক ব্যবহার করা অধিক কার্যকর হতে পারে।
গবেষক শিক্ষক আসবেন কোথা থেকে
সবচেয়ে কঠিন প্রশ্নটি জনবল নিয়ে। কয়েক দশক ধরে প্রধানত পাঠদাননির্ভর প্রতিষ্ঠানে কাজ করা শিক্ষকদের হঠাৎ গবেষণামুখী শিক্ষক হয়ে উঠতে বলা বাস্তবসম্মত নয়। গবেষণা একটি স্বতন্ত্র পেশাগত দক্ষতা। এর জন্য পদ্ধতিগত প্রশিক্ষণ, নিবিড় তত্ত্বাবধান, সহকর্মী পর্যালোচনা, সময়, তথ্য-উপাত্ত ও ধারাবাহিক অর্থায়ন প্রয়োজন।
তাই ৫ থেকে ১০ বছর মেয়াদি একটি জাতীয় ‘গবেষক শিক্ষক প্রস্তুতি কর্মসূচি’ দরকার। নির্বাচিত তরুণ শিক্ষকদের দেশি ও আন্তর্জাতিক যৌথ পিএইচডি, পোস্ট ডক্টরাল প্রশিক্ষণ এবং গবেষণা ফেলোশিপের সুযোগ দিতে হবে। বিদেশে কর্মরত বাংলাদেশি গবেষকদের স্বল্প ও মধ্যমেয়াদি যৌথ নিয়োগে যুক্ত করা যায়। প্রতিষ্ঠিত গবেষকদের অধীনে বহু বিশ্ববিদ্যালয়ের তরুণ শিক্ষকদের নিয়ে বিষয়ভিত্তিক গবেষণা ক্লাস্টার গঠন করা যেতে পারে। একই সঙ্গে গবেষণার জন্য পাঠদানের চাপ কমানো এবং গবেষণা সহকারী ও প্রশাসনিক সহায়তা নিশ্চিত করতে হবে।
বর্তমান শিক্ষকদের জন্যও পথ খোলা রাখতে হবে। তবে তাঁদের সবাইকে একই ছাঁচে-ঢালার চেষ্টা না করে আগ্রহ ও সক্ষমতার ভিত্তিতে তিনটি পেশাগত ধারা রাখা যেতে পারে—শিক্ষাদানে উৎকর্ষ, গবেষণা ও উদ্ভাবন এবং বিশ্ববিদ্যালয়শিল্প বা সমাজসংযোগ। প্রতিটি ধারায় পদোন্নতি ও মর্যাদার সমান সুযোগ থাকলে গবেষণার নামে কৃত্রিম প্রকাশনার চাপ কমবে।
এর সঙ্গে প্রয়োজন জাতীয় গবেষণা সততা দপ্তর, বিশ্ববিদ্যালয়ভিত্তিক কার্যকর নৈতিকতা কমিটি, গবেষণা-অসদাচরণের স্বচ্ছ তদন্ত এবং প্রত্যাহৃত প্রবন্ধের বাধ্যতামূলক প্রাতিষ্ঠানিক পর্যালোচনা। ইউজিসি একই সঙ্গে অর্থদাতা, অনুমোদনকারী ও দুর্বল পর্যবেক্ষক হয়ে থাকলে চলবে না; মান নিরীক্ষা ও গবেষণা-সততার কাজকে প্রয়োজনীয় স্বাধীনতা দিতে হবে।
উপাচার্য নুরুল ইসলামের মন্তব্য নিয়ে বিতর্ক তাই একটি সুযোগও সৃষ্টি করেছে। এই বিতর্ককে কোনো ক্যাডারের সম্মান বনাম বিশ্ববিদ্যালয়ের মর্যাদার সংঘাতে নামিয়ে আনা উচিত নয়। বিসিএস শিক্ষা ক্যাডারভুক্ত শিক্ষকদের সক্ষমতার ঘাটতি থাকলে প্রশ্ন করতে হবে—রাষ্ট্র তাঁদের গবেষক হওয়ার কী সুযোগ দিয়েছে? আবার বিশ্ববিদ্যালয়ের মর্যাদা চাইলে প্রতিষ্ঠানকেও বলতে হবে—নতুন জ্ঞান সৃষ্টি, গবেষণা প্রশিক্ষণ ও নৈতিকতার কী অবকাঠামো তারা গড়ে তুলেছে?
একটি দেশের সব উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানকে একই কাজ করতে হয় না। কিন্তু প্রতিটিকে নিজের ঘোষিত কাজটি মানসম্পন্নভাবে করতে হয়। বাংলাদেশের এখন আরও বেশি নামমাত্র বিশ্ববিদ্যালয় নয়; প্রয়োজন কিছু বিশ্বস্ত গবেষণা বিশ্ববিদ্যালয়, বহু উৎকৃষ্ট শিক্ষাকেন্দ্রিক বিশ্ববিদ্যালয়, শক্তিশালী ফলিত ও কারিগরি প্রতিষ্ঠান এবং সম্মানজনক মানের কলেজব্যবস্থা।
বিশ্ববিদ্যালয়কে আবার বিশ্ববিদ্যালয় করতে হলে প্রথম কাজ ভবনের নামফলক বদলানো নয়, তাদের দায়িত্বের পার্থক্য ফিরিয়ে আনা। জনমিতিক সুযোগের জানালা বন্ধ হওয়ার আগে এই কঠিন সিদ্ধান্ত নিতে না পারলে আমরা ডিগ্রিধারীর সংখ্যা বাড়াব, কিন্তু বিজ্ঞানী, গবেষক ও উদ্ভাবকের প্রয়োজনীয় জাতীয় ভিত্তি গড়ে তুলতে পারব না।
এম. নিয়াজ আসাদুল্লাহ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক এবং যুক্তরাজ্যের ইউনিভার্সিটি অব রিডিংয়ের ভিজিটিং প্রফেসর।
মতামত লেখকের নিজস্ব
