সরকারের পক্ষ থেকে খাদ্য উৎপাদন বাড়িয়ে আমদানিনির্ভরতা কমানোর কথা বলা হচ্ছে। অথচ যে খাতের বিকাশ হলে আমদানিনির্ভরতা হ্রাস করে মূল্যবান বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয় করা যেত, সেই রাষ্ট্রায়ত্ত শিল্পকে নিদারুণ অবহেলার মধ্যে ফেলে রাখা হয়েছে। যথাযথ গুরুত্ব দেওয়া হলে রাষ্ট্রায়ত্ত কলগুলো চাহিদার উল্লেখযোগ্য অংশ সরবরাহ করতে পারত, সেই সঙ্গে হাজারো আখচাষি ও শ্রমিকের কর্মসংস্থানে ভূমিকা রাখতে পারত।

রাষ্ট্রীয় চিনিকলগুলোর সংকটের একটা বড় কারণ হলো উৎপাদন খরচ আমদানিকৃত চিনির বাজারদরের তুলনায় অনেক বেশি। আর কলগুলোর বাড়তি উৎপাদন খরচের কারণ হলো—এক. কলগুলো মাড়াই করার মতো পর্যাপ্ত আখ পায় না, এতে বছরের একটা বড় সময়জুড়ে সেগুলো বন্ধ থাকে, যদিও বেতন-ভাতাসহ বিভিন্ন খরচ সারা বছরই বহন করতে হয়। দুই. যে আখ পাওয়া যায়, তা থেকে চিনি আহরণের পরিমাণ তুলনামূলক অনেক কম—৬–৭ শতাংশ। ভারতে বা ব্রাজিলে এই হার ১২–১৪ শতাংশ। ফলে ১০০ কেজি আখ থেকে ভারত বা ব্রাজিল যে পরিমাণ চিনি আহরণ করে, বাংলাদেশ করে তার প্রায় অর্ধেক। চিনি উৎপাদনের মোট খরচের প্রায় ৪০ শতাংশই হয় কাঁচামাল বাবদ। চিনি আহরণের এই অতি নিম্ন হারের কারণে বাংলাদেশে কলগুলোর কাঁচামাল বাবদ খরচ ভারতীয় কলগুলোর তুলনায় দ্বিগুণ, যা শেষ পর্যন্ত প্রতি কেজি চিনি উৎপাদনে বাড়তি খরচ হিসেবে যোগ হচ্ছে।

মাড়াইয়ের জন্য পর্যাপ্ত আখ যায় না কেন? কারণ, খরচের তুলনায় আখের দাম পাওয়া যায় না, চিনিকলে সময়মতো বিক্রি করা যায় না এবং সময়মতো অর্থও পাওয়া যায় না। ফলে কৃষকেরা আখের বদলে ধান বা সবজি চাষ করছেন, আর যাঁরা আখ চাষ করছেন, তাঁরা চিনিকলের বদলে গুড় উৎপাদকের কাছে বিক্রয় করছেন। আরেকটি কারণ হলো, চাষাবাদ ব্যবস্থার বিভিন্ন সংকটের কারণে একরপ্রতি আখের ফলন ১৮ থেকে ১৯ টন, যা অন্যান্য আখ উৎপাদনকারী দেশের তুলনায় খুবই কম। যেমন সারা ভারতের গড় উৎপাদন ২৮ টন।

সরকারের কোনো নীতির কারণে যদি কতগুলো বেসরকারি চিনিকল বন্ধ হয়ে যেত আর রাষ্ট্রায়ত্ত কারখানার সামনে চিনির ট্রাকের দীর্ঘ লাইন হতো, তাহলে বন্ধ হয়ে যাওয়া বেসরকারি কারখানা নিয়ে চারদিকে যে ধরনের মাতম উঠত, রাষ্ট্রায়ত্ত চিনিকলগুলোকে বন্ধ করে রাখার ক্ষেত্রে তেমনটি নেই কোথাও!

চিনিকলগুলোয় চিনি আহরণের হার এত কম হওয়ার কারণ কী? সেটি নির্ভর করে আখে কী পরিমাণ চিনি রয়েছে এবং আখে থাকা চিনির কতটুকু কারখানায় যান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় আহরণ করা সম্ভব হচ্ছে, তার ওপর। চিনিকল কর্তৃপক্ষের বক্তব্য হচ্ছে, কৃষকদের কাছ থেকে কেনা আখের চিনি ধারণক্ষমতা ৮ থেকে ৯ শতাংশ; ২.৩৫ থেকে ২.৪০ শতাংশ কারখানা লস যুক্ত করেই।

অন্যদিকে ইক্ষু গবেষণা সংস্থার বক্তব্য হলো আখে চিনির পরিমাণ ১২ শতাংশের কম থাকে না। মূলত কারখানাগুলোতে চিনি লস বা অপচয় বেশি হওয়ার কারণেই আহরণের হার কম হয়। এই অপচয় অনুমোদিত মাত্রার মধ্যে দেখানোর জন্য পেছন থেকে হিসাব করে আখের চিনির হার কম করে দেখানো হয় বলেও অভিযোগ আছে। আসলে চিনি কম পাওয়ার পেছনে আখে চিনির হার, খেত থেকে আখ পরিবহনের সমস্যা এবং কারখানায় অপেক্ষাকৃত কম পরিমাণ আহৃত হওয়া—এসব সমস্যাই কমবেশি দায়ী। আবার অঞ্চলভেদে মাটির বৈশিষ্ট্য, জমির উচ্চতা, আবহাওয়া ইত্যাদি বিবেচনায় রেখে উপযুক্ত জাতের আখ চাষ না হওয়াও আখে চিনির হার কম হওয়ার বড় একটি কারণ।

অন্যদিকে আখে চিনি থাকলেও কম আহরণ হওয়ার কারণ হলো, আখ মাড়াই করে রস বের করার যন্ত্র (রোলার) ঠিকঠাক কাজ না করা, নষ্ট ও পুরোনো যন্ত্রপাতির ব্যবহার, রস প্রক্রিয়াজাত করার সময় রসের তাপমাত্রা ও অম্লত্ব নির্ধারিত মাত্রার চেয়ে কম বা বেশি হওয়া ইত্যাদি। এ ছাড়া প্রতি টন আখ মাড়াইয়ে বিদ্যুতের ব্যবহার, রক্ষণাবেক্ষণ খরচ, আখ মাড়াইকালে সময়ের অপচয় ইত্যাদিও অনেক বেশি হওয়ায় উৎপাদন খরচ বেড়ে যাচ্ছে।

তা ছাড়া প্রতিবছর ঋণের সুদ বাবদ বিপুল অর্থ খরচ হওয়ার কারণেও চিনির উৎপাদন খরচ বেড়ে যায়। চিনির উৎপাদন খরচের ৩০ থেকে ৪০ শতাংশই হলো ঋণের সুদ!

চিনিকলগুলোর লোকসানের আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ হলো আমদানিকৃত চিনির চেয়ে স্বাস্থ্যসম্মত ও ভালো দেশীয় চিনির বাড়তি চাহিদা থাকা সত্ত্বেও বেসরকারি কোম্পানির সঙ্গে প্রতিযোগিতামূলকভাবে সরবরাহ, বিতরণ ও বিপণনব্যবস্থায় প্রয়োজনীয় পরিবর্তন না আনার কারণে ডিলার থেকে পাইকারি বিক্রেতা এবং পাইকারি থেকে খুচরা বিক্রেতার কাছে চিনি পর্যাপ্ত পরিমাণে পৌঁছায় না। ফলে একদিকে আগ্রহী ক্রেতা বাজারে দেশি চিনি খুঁজে পায় না, অন্যদিকে চিনিকলগুলোর গুদামে অবিক্রীত চিনি নষ্ট হতে থাকে।

রাষ্ট্রায়ত্ত চিনিশিল্প ও আখ চাষের এসব সমস্যা নতুন নয় এবং এগুলোর সমাধানের উপায়ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বহুদিন ধরেই জানা। এরপরও সমাধানের সুনির্দিষ্ট পদক্ষেপ না নিয়ে চিনিকলগুলো বন্ধ করে ও অবহেলা করে চিনিশিল্পের এ সংকট আরও ঘনীভূত করা হচ্ছে।

সরকারের কোনো নীতির কারণে যদি কতগুলো বেসরকারি চিনিকল বন্ধ হয়ে যেত আর রাষ্ট্রায়ত্ত কারখানার সামনে চিনির ট্রাকের দীর্ঘ লাইন হতো, তাহলে বন্ধ হয়ে যাওয়া বেসরকারি কারখানা নিয়ে চারদিকে যে ধরনের মাতম উঠত, রাষ্ট্রায়ত্ত চিনিকলগুলোকে বন্ধ করে রাখার ক্ষেত্রে তেমনটি নেই কোথাও!

আমরা আশা করব সাম্প্রতিক ডলার–সংকটের প্রেক্ষাপটে দেশীয় উৎপাদনের গুরুত্ব যেভাবে স্পষ্ট হয়ে উঠেছে, তার ফলে সরকারে পক্ষ থেকে রাষ্ট্রায়ত্ত চিনিশিল্প পুনর্জ্জীবনে যথাযথ উদ্যোগ নেওয়া হবে।

  • কল্লোল মোস্তফা প্রকৌশলী এবং সর্বজনকথা সাময়িকীর নির্বাহী সম্পাদক