পুতিনের পাকিস্তান-ধাঁধা

রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনছবি: রয়টার্স

গত সপ্তাহে সেন্ট পিটার্সবার্গে রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন বিভিন্ন ভূরাজনৈতিক ইস্যু নিয়ে কথা বলেন, যা চীন, ভারত ও পাকিস্তান সম্পর্কে মস্কোর দৃষ্টিভঙ্গিও স্পষ্ট করে। তাঁর সবচেয়ে আকর্ষণীয় মন্তব্য ছিল, তিনি মনে করেন না যে পাকিস্তান চীনের নিয়ন্ত্রণাধীন। তাঁর ভাষায়, পাকিস্তান একটি বড় দেশ, যার বিভিন্ন রাষ্ট্রের সঙ্গে বহুমাত্রিক সম্পর্ক রয়েছে।

সম্ভবত তিনি মস্কোর সাম্প্রতিক প্রতিরক্ষা-সংক্রান্ত আলোচনাগুলোকে ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করছিলেন, যেগুলোকে তালেবান সরকারের প্রতিরক্ষামন্ত্রী মোল্লা ইয়াকুব আফগানিস্তানের অভ্যন্তরে পাকিস্তানের বিমান হামলার পাল্টা প্রতিক্রিয়া হিসেবে ব্যবহার করেছিলেন।

পুতিনের বক্তব্যের অন্তর্নিহিত বার্তা ছিল, পাকিস্তান যেমন চীন, যুক্তরাষ্ট্র এমনকি রাশিয়ার সঙ্গেও বহুমুখী সম্পর্ক বজায় রাখে, মস্কোও বিভিন্ন দেশের সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে তোলার ক্ষেত্রে একই ধরনের পন্থা অনুসরণ করে। সর্বোপরি রাশিয়াই বিশ্বের একমাত্র দেশ, যা তালেবান সরকারকে আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকৃতি দিয়েছে।

এ নিয়ে খুব কমই সন্দেহ রয়েছে যে পাকিস্তান বহুমুখী কূটনৈতিক কৌশল অনুসরণ করেই নিজের ভূরাজনৈতিক শক্তি অর্জন করেছে এবং যুক্তরাষ্ট্র বা অন্য কোনো শক্তির সঙ্গে সম্পর্কের ক্ষেত্রে নিজেকে কখনোই নিছক অনুগত অংশীদার হিসেবে উপস্থাপন করে না। তবে প্রতিটি নীতিরই দুটি দিক রয়েছে এবং কোনো কিছুই বিনা মূল্যে আসে না। কৌশলগত ভারসাম্য বজায় রাখতে হলে ভিন্নমুখী অংশীদারদের সঙ্গে একটি নির্দিষ্ট মাত্রায় আস্থা অর্জন ও ধরে রাখা জরুরি।

উদাহরণ হিসেবে পুতিন যে চীন-পাকিস্তান সম্পর্কের কথা উল্লেখ করেছেন, তা এখন নতুন এক পর্যায়ে প্রবেশ করেছে। দুই দেশের কূটনৈতিক সম্পর্কের ৭৫তম বার্ষিকী উপলক্ষে পাকিস্তানের বেসামরিক ও সামরিক নেতৃত্ব বেইজিং সফর করে এবং একাধিক সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) সই করে। এ ঘটনা স্পষ্টভাবে ইঙ্গিত দেয় যে চীন-পাকিস্তান সম্পর্ক এখন একটি গুরুত্বপূর্ণ নতুন কৌশলগত পর্যায়ে প্রবেশ করেছে এবং এ সম্পর্ক আরও গভীর হচ্ছে।

পাকিস্তান যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের কাছে গুরুত্বপূর্ণ থাকবে এবং একই সঙ্গে পশ্চিম এশিয়ার সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক বজায় রাখবে। চীন এসব সম্পর্ককে সন্দেহের চোখে দেখলেও শেষ পর্যন্ত তাদের কৌশলগত ও ভূরাজনৈতিক অংশীদারত্ব অটুট থাকবে।

চীন ক্রমেই পাকিস্তানকে তার প্রভাববলয়ের মধ্যে দৃঢ়ভাবে ধরে রাখতে চাইছে এবং শুধু সিপিইসি-নির্ভর অর্থনৈতিক সহযোগিতা থেকে সরে এসে প্রতিরক্ষা ও নিরাপত্তা সহযোগিতার দিকে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে। একসময় দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের কেন্দ্রবিন্দুতে থাকা সিপিইসি এখন তুলনামূলকভাবে কম অগ্রাধিকার পাচ্ছে, এমনকি সন্ত্রাসবিরোধী সহযোগিতার ক্ষেত্রেও।

শেষ পর্যন্ত চীন পাকিস্তানের জন্য শক্তিশালী নিরাপত্তা সুরক্ষা প্রদানের প্রতিশ্রুতি পুনর্ব্যক্ত করলেও দেশের অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ও প্রশাসনিক সংস্কারের দায়িত্ব পাকিস্তানকেই নিতে হবে। চীন পাকিস্তানের জাতীয় সার্বভৌমত্বের জন্য গুরুত্বপূর্ণ নিশ্চয়তা দিলেও পশ্চিমা শক্তি, বিশেষত যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্কের ভারসাম্য রক্ষার ক্ষেত্রে এই রূপান্তর পাকিস্তানের জন্য একটি জটিল দ্বিধার সৃষ্টি করছে।

রাশিয়ার তুলনায় চীন আরও কৌশলীভাবে নিজেকে একটি প্রধান বৈশ্বিক শক্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে চায় এবং ‘গ্লোবাল সাউথ’-এর দেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে তুলতে বিভিন্ন উদ্যোগ গ্রহণ করছে। এর মধ্যে রয়েছে গ্লোবাল ডেভেলপমেন্ট ইনিশিয়েটিভ, গ্লোবাল সিকিউরিটি ইনিশিয়েটিভ, গ্লোবাল সিভিলাইজেশন ইনিশিয়েটিভ এবং গ্লোবাল গভর্ন্যান্স ইনিশিয়েটিভ।

এসব উদ্যোগে দেশগুলোকে সম্পৃক্ত করার পাশাপাশি চীন দ্বিপক্ষীয় সহযোগিতার এমন কাঠামো তৈরি করছে, যা দেশগুলোকে তার বৃহত্তর রাজনৈতিক অংশীদারত্বের সঙ্গে যুক্ত করে। এতে স্বাভাবিকভাবে কোনো সমস্যা নেই, কিন্তু এসব উদ্যোগের মাধ্যমে চীন সরাসরি সংঘাত সৃষ্টি না করেই বিদ্যমান পশ্চিমা রাজনৈতিক ও নিরাপত্তাব্যবস্থাকে চ্যালেঞ্জ জানাচ্ছে।

পাকিস্তান সম্প্রতি এসব উদ্যোগের আওতায় সব কটি এমওইউতে সই করেছে, যা বেইজিং এমনভাবে উপস্থাপন করছে, যেন পাকিস্তান তার প্রভাববলয়ের মধ্যে থাকার বিষয়ে সম্মত হয়েছে। এখানেই জটিলতা। যে দেশ বহুমুখী সম্পর্ক বজায় রাখে, সে সাধারণত এমন আদর্শভিত্তিক রাজনৈতিক উদ্যোগ অনুসরণ করে না।

রাশিয়াও বহুমাত্রিক সম্পর্ক বজায় রাখে এবং চীন, ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে ভারসাম্য রক্ষার চেষ্টা করে। তবে চীন ও রাশিয়ার মধ্যে একটি অভিন্ন বিষয় হলো, যুক্তরাষ্ট্র তাদের জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ। যত দিন যুক্তরাষ্ট্র পশ্চিম এশিয়ায় ব্যস্ত থাকবে, তত দিন চীন ও রাশিয়া লাভবান হবে।

কারণ, এতে তাদের অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক শক্তি বৃদ্ধি পাবে এবং যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থ দুর্বল হবে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের মনোযোগ হয়তো আফগানিস্তানের দিকে, বিশেষ করে বাগরাম ঘাঁটির দিকে, যে ঘাঁটির প্রতি তাঁর দীর্ঘদিনের আগ্রহ রয়েছে। এই প্রেক্ষাপটে পাকিস্তানকে যুক্তরাষ্ট্রের অংশীদার হিসেবে দেখা হলেও বেইজিংয়ের কিছু উদ্বেগ রয়েছে।

যদি রাশিয়া-তালেবান সহযোগিতা আরও গভীর হয়, তবে যুক্তরাষ্ট্রকে আফগানিস্তান সম্পর্কে তার অবস্থান নতুন করে ভাবতে হতে পারে। এর মধ্যে তালেবান-সম্পর্কিত সম্পদের ওপর নিষেধাজ্ঞা এবং সন্ত্রাসবিরোধী কৌশলও অন্তর্ভুক্ত। তবে একটি মত হলো, ওয়াশিংটনের এখন আফগানিস্তানে প্রভাব খাটানোর সুযোগ সীমিত এবং আফগান ইস্যুতে প্রভাব বিস্তারের প্রধান মাধ্যম হিসেবে পাকিস্তানের সঙ্গে সুসম্পর্ক বজায় রাখাই তার সবচেয়ে কার্যকর পথ।

ট্রাম্প নিশ্চয়ই বাগরাম ঘাঁটি নিয়ে নতুন করে আলোড়ন সৃষ্টি করবেন। এদিকে রাশিয়া তালেবানের সঙ্গে প্রতিরক্ষা চুক্তি নিয়ে আলোচনা করছে, যদিও প্রাথমিকভাবে তা ২০২৬ সালের ২৭ মে স্বাক্ষরিত ‘সামরিক-প্রযুক্তিগত সহযোগিতা’ চুক্তির আওতায় পুরোনো সামরিক সরঞ্জাম মেরামতের মধ্যেই সীমাবদ্ধ।

কিন্তু তালেবানের সঙ্গে যেকোনো প্রতিরক্ষা সহযোগিতাকেই সন্দেহের চোখে দেখা হবে। কারণ, শক্তিশালী তালেবান পাকিস্তানে সন্ত্রাসবাদের ঝুঁকি বাড়াতে পারে। যদিও আফগানিস্তানে সক্রিয় সন্ত্রাসী নেটওয়ার্ক নিয়ে রাশিয়ারও উদ্বেগ রয়েছে, তবু বৃহত্তর কৌশলগত সুবিধার কথা বিবেচনায় নিয়ে মস্কো ভিন্ন সিদ্ধান্ত নিতে পারে।

বিরোধ–আভাসপূর্ণ হলেও আরেকটি কারণে পাকিস্তান ধীরে ধীরে মস্কোর কাছে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে—ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে চলমান মধ্যস্থতা প্রক্রিয়ায় তার সক্রিয় ভূমিকার কারণে। পুতিন পাকিস্তানকে এমন একটি জানালা হিসেবে দেখছেন, যার মাধ্যমে তিনি ওয়াশিংটনের সঙ্গে যোগাযোগ ও বার্তা আদান-প্রদান করতে পারেন।

ভারতের সঙ্গে তার মূল সম্পর্ককে ঝুঁকির মধ্যে না ফেলেই রাশিয়া পাকিস্তানের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নত করেছে। তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে মস্কো সতর্কতার সঙ্গে ইসলামাবাদের দিকে ঝুঁকেছে। পাকিস্তান দীর্ঘমেয়াদি ভূরাজনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে রাশিয়াকে মূল্যায়ন করে এবং জানে যে যত দিন না রাশিয়া-ভারত কৌশলগত ও প্রতিরক্ষা অংশীদারত্ব যথেষ্ট দুর্বল হয়, অথবা ভারত-যুক্তরাষ্ট্র প্রতিরক্ষা জোট এমন পর্যায়ে পৌঁছে যে মস্কোকে তার ভারতনীতি পুনর্বিবেচনা করতে বাধ্য করে, তত দিন পাকিস্তান অপেক্ষা করে দেখতে পারে যে এই ভারসাম্য কীভাবে বজায় থাকে।

এই ধারণা যথার্থ যে পাকিস্তান পুরোপুরি চীনের নিয়ন্ত্রণে নয়, যদিও বেইজিং তাকে নিজের প্রভাববলয়ের মধ্যে রাখতে চায়। তবে তাদের কৌশলগত অংশীদারত্ব অর্থনৈতিক সহযোগিতার চেয়েও দীর্ঘস্থায়ী হবে, যদিও উভয় পক্ষই বিভিন্ন ক্ষেত্রে ভিন্নমুখী নীতি অনুসরণ করবে।

পাকিস্তান যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের কাছে গুরুত্বপূর্ণ থাকবে এবং একই সঙ্গে পশ্চিম এশিয়ার সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক বজায় রাখবে। চীন এসব সম্পর্ককে সন্দেহের চোখে দেখলেও শেষ পর্যন্ত তাদের কৌশলগত ও ভূরাজনৈতিক অংশীদারত্ব অটুট থাকবে। ভারতের ক্ষেত্রে রাশিয়া এমন সুবিধা ভোগ করে না।

মুহাম্মদ আমির রানা একজন নিরাপত্তা বিশ্লেষক। তিনি পাকিস্তানের ইসলামাবাদভিত্তিক পাকিস্তান ইনস্টিটিউট ফর পিস স্টাডিজের (পিআইপিএস) পরিচালক।