জ্বালানিসংকটের টেকসই সমাধান কী

বাংলাদেশ কার্যত একটি দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানিসংকটের মধ্য দিয়ে চলেছে। সেই সংকটের টেকসই সমাধান কী হতে পারে, তা নিয়ে লিখেছেন অরুণ কর্মকার

প্রতীকী ছবি

চলমান জ্বালানিসংকটে দেশবাসী উদ্বিগ্ন। কিন্তু এই সংকটের রাতারাতি কোনো সমাধান যে নেই, এ কথা বুঝতে সক্ষম ও অক্ষম—দুই ধরনের মানুষই সরকারের ওপর অসন্তুষ্ট। কারণ, জ্বালানির অভাবে তাঁদের জীবন-জীবিকা সংকটে। একের পর এক শিল্পকারখানা বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। কর্মসংস্থান নেই, বরং কর্মজীবী বহু মানুষ চাকরি হারাচ্ছেন। অর্থনীতি স্থবির। জ্বালানিসংকটের কারণে বিদ্যুতের অবস্থাও বেহাল।

সরকারের তরফ থেকে বিভিন্ন সময় সংকট সমাধানের উপায় এবং সময়সীমা নিয়ে অনেক রকম কথা বলা হয়েছে এবং হচ্ছে। এর মধ্যে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীর একটি কথা যৌক্তিকতা বিবেচনায় বাস্তবতার কাছাকাছি। তিনি বলেন, বর্তমান জ্বালানিসংকট সমাধানে দুই বছর সময় লাগবে। অবশ্য দুই বছরের মধ্যে কীভাবে, কোন পথে সমাধান হবে, তার কোনো বিস্তারিত উল্লেখ তিনি করেননি। সরকারিভাবে এমন কোনো পথনকশাও প্রকাশ করা হয়নি।

আরও পড়ুন

সম্ভাব্য বিকল্প

আমরা জানি যে জ্বালানিসংকট সমাধানের একমাত্র পথ জ্বালানি, বিশেষ করে প্রাকৃতিক গ্যাস এবং কয়লার সরবরাহ বাড়ানো। সেটা দুই উপায়ে হতে পারে। এক. দেশের ক্ষেত্রগুলো থেকে উত্তোলন বৃদ্ধি করে। দুই. আমদানি বাড়িয়ে। দেশে এখন চাহিদার তুলনায় প্রাকৃতিক গ্যাসের সরবরাহ ঘাটতি দৈনিক প্রায় ১৫০ কোটি ঘনফুট। দেশের ক্ষেত্রগুলো থেকে গ্যাসের উত্তোলন ও সরবরাহ বাড়ানোর যে কার্যক্রম গ্রহণ করা হয়েছে এবং চলমান আছে, তাতে আগামী দুই বছরে ২০ থেকে ৩০ কোটি ঘনফুট সরবরাহ বাড়াতে পারলেই তা বাহবা পাওয়ার যোগ্য বলে বিবেচিত হবে।

দ্বিতীয় উপায় আমদানি বাড়ানো। আমদানি বাড়াতে হলে নতুন অবকাঠামো তৈরি করতে হবে। সে ক্ষেত্রে সরকারের সক্রিয় বিবেচনায় রয়েছে একাধিক এফএসআরইউ (ফ্লোটিং স্টোরেজ অ্যান্ড রি-গ্যাসিফিকেশন ইউনিট), সহজ ভাষায় ভাসমান টার্মিনাল স্থাপন। কিন্তু এ বিষয়ে এখন পর্যন্ত সরকার সিদ্ধান্ত নিয়ে স্থাপনের প্রক্রিয়া শুরু করেনি। সুতরাং আগামী দুই বা তিন বছরে নতুন কোনো এফএসআরইউ চালু হবে, এমন আশা করা যায় না। কারণ, দরপত্র প্রক্রিয়া শেষ করে কার্যাদেশ দেওয়ার পর একেকটি এফএসআরইউ স্থাপনে ঠিকাদারকে সময় দিতে হয় ২৪ থেকে ৩২ মাস। দরপত্র প্রক্রিয়ার বাইরে গিয়ে সরাসরি ক্রয় পদ্ধতিতে (ডিপিএম) কার্যাদেশ দিতেও কিছু সময় লাগবে।

আরও পড়ুন

সংকটের আশু সমাধানের জন্য সরকার আরও যে উদ্যোগ নিয়েছিল, তার মধ্যে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য জরুরি ভিত্তিতে মালয়েশিয়া থেকে এলএনজি আনার চেষ্টা। আমাদের সংকটের আশু সমাধানের জন্য মালয়েশিয়া বিশেষায়িত কনটেইনারে (আইএসও কনটেইনার) জাহাজযোগে এলএনজি সরবরাহ করতে পারে। প্রতিদিন একটি করে জাহাজে সর্বোচ্চ ৬০০টি করে কনটেইনার তারা পাঠাতে পারে। বন্দরে আসার পর জাহাজ থেকে কনটেইনার খালাস করে সড়ক অথবা রেলপথে নিয়ে যেতে হবে বিভিন্ন লোড সেন্টারে (যেসব স্থানে জ্বালানি সরবরাহ জরুরি, যেমন মেঘনাঘাট, আশুগঞ্জ, ভেড়ামারা প্রভৃতি)। ওই সব জায়গায় আবার ক্ষুদ্রাকার রি-গ্যাসিফিকেশন ইউনিট স্থাপন করে কনটেইনারের এলএনজি সরবরাহ করতে হবে। পেট্রোবাংলা দেখেছে, এই প্রক্রিয়ায় প্রতিদিন যে পরিমাণ গ্যাস পাওয়া যাবে, আর সে জন্য যে ব্যয় হবে, তাতে গ্যাসের দাম হবে খুবই চড়া, যা আর্থিকভাবে পোষানো সম্ভব নয়।

বাংলাদেশ কার্যত একটি দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানিসংকটের মধ্য দিয়ে চলেছে। ২০১৩-১৪ সালে দেশের ক্ষেত্রগুলো থেকে গ্যাস উত্তোলনের পরিমাণ দৈনিক প্রায় ২৮০ কোটি ঘনফুটে উঠলেও তা কমতে কমতে এখন ১৬০ কোটি ঘনফুটের কাছাকাছি চলে এসেছে। এর সঙ্গে দুটি এফএসআরইউ থেকে আমদানি করা গ্যাস (এলএনজি) পূর্ণ ক্ষমতায় চালু রাখতে পারলেও পাওয়া যায় ১১০ কোটি ঘনফুট। অর্থাৎ সব মিলে ২৭০ কোটি ঘনফুট হতে পারে সর্বোচ্চ সরবরাহ। কিন্তু পেট্রোবাংলার হিসাবেই চাহিদা ৪২০ কোটি ঘনফুট।

সরকারের বিবেচনার মধ্যে একটি বিষয়কে অনেক বেশি নির্ভরযোগ্য বলা যায়। সেটি হচ্ছে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র। আগামী বছর থেকে যদি প্রত্যাশামতো এই কেন্দ্র থেকে ১ হাজার ২০০ মেগাওয়াট এবং পরের বছর আরও ৩০০ থেকে ৪০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ পাওয়া যায়, তাহলে বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য গ্যাসের ওপর চাপ কিছুটা কমবে। তখন সেই গ্যাস অন্যত্র সরবরাহ করার একটা সুযোগ হবে। তবে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রেও নিরবচ্ছিন্নভাবে কিছু গ্যাস সরবরাহ করা দরকার হবে।

সরকারের বিবেচনার জন্য সর্বশেষ যে বিকল্পটির কথা জানা যায়, সেটি হচ্ছে জিবিএস, মানে গ্র্যাভিটি বেইজড স্ট্রাকচার। আমাদের দেশে নামটি নতুন মনে হলেও সমুদ্রবক্ষে বৃহৎ আকারের গ্যাসাধার তৈরি করে সরবরাহের এই পদ্ধতি অনেক পুরোনো। এটি মূলত সমুদ্রবক্ষে একটি গ্যাসের ‘হাব’, যেখানে প্রচুর পরিমাণ এলএনজি মজুত রাখা যায়।

জিবিএসের উপযোগিতা

জিবিএসে আমদানি করা এলএনজি রি-গ্যাসিফিকেশন করার ব্যবস্থার পাশাপাশি বিপুল পরিমাণ এলএনজি মজুত রাখা, সেই মজুত থেকে বিশেষায়িত নৌযানে এলএনজি নিয়ে বিভিন্ন লোড সেন্টারে সরবরাহ করারও ব্যবস্থা থাকে। মহেশখালীতে স্থাপিত একেকটি এফএসআরইউতে যেখানে পাঁচ দিন সরবরাহ করার মতো গ্যাস মজুত রাখা যায়, সেখানে একটি জিবিএসে রাখা যায় এক মাসের গ্যাস। ভাসমান নয় বলে জিবিএস থেকে দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়ার সময়ও নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস সরবরাহ অব্যাহত রাখা যায়। যুক্তরাষ্ট্রের জ্বালানি বিভাগের অধীন ন্যাশনাল রি–নিউঅ্যাবল এনার্জি ল্যাবরেটরির এক সমীক্ষা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশের মহেশখালী এলাকাটি ঘূর্ণিঝড়প্রবণ এলাকার মধ্যে পড়েছে। ঝড়ের মৌসুমে সেখানে প্রায়ই সমুদ্র তরঙ্গের উচ্চতা সাড়ে তিন মিটারের বেশি হয়। কিন্তু দুই মিটারের বেশি উঁচু তরঙ্গ হলে এফএসআরইউ থেকে গ্যাস সরবরাহ চালু রাখা যায় না।

জিবিএসের স্থাপনা ব্যয় (ক্যাপিটাল কস্ট) এফএসআরইউর চেয়ে বেশি। এফএসআরইউর ক্যাপিটাল কস্ট যেখানে ৫০০ মিলিয়ন ডলার, সেখানে জিবিএসের ব্যয় ৯৫০ মিলিয়ন। কিন্তু প্রতি টন এলএনজির ক্ষেত্রে ক্যাপিটাল কস্ট এফএসআরইউতে ১৩৬ ডলার ও জিবিএসে ১০০ ডলার। কারণ, জিবিএসে গ্যাস মজুত এবং সরবরাহের ক্ষমতা অনেক বেশি। একটি জিবিএসের ধারণক্ষমতা ৮৫ লাখ মেট্রিক টন, যা চাহিদা অনুযায়ী বাড়ানো বা কমানো যায়। আর এফএসআরইউর ধারণক্ষমতা ৩৮ লাখ মেট্রিক টন নির্দিষ্ট করা। একটি জিবিএসের আয়ুষ্কাল ৬০ থেকে ৮০ বছর, একটি এফএসআরইউর ১৫ বছর।

একটি জিবিএসে প্রতিদিনের পরিচালন ব্যয় আকারভেদে ২০ থেকে ৪০ হাজার মার্কিন ডলার। আর এফএসআরইউর ব্যয় ৫৭ হাজার ডলার। জিবিএসের ক্ষেত্রে প্রতি টন এলএনজির অপারেটিং কস্ট সর্বোচ্চ দুই ডলার। এফএসআরইউর ক্ষেত্রে ৫ দশমিক ২ ডলার। দক্ষতা ও নির্ভরযোগ্যতা বিবেচনায় জিবিএস ৯৮ শতাংশ এবং এফএসআরইউ সর্বোচ্চ ৮০ শতাংশ। সরকারের সংশ্লিষ্ট বিভাগ ও প্রতিষ্ঠানগুলো এফএসআরইউ এবং জিবিএসের মধ্যেকার এই তুলনামূলক বৈশিষ্ট্যগুলো পর্যালোচনা করে দেখছে।

দেশি সম্পদ আহরণ

বাংলাদেশ কার্যত একটি দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানিসংকটের মধ্য দিয়ে চলেছে। ২০১৩-১৪ সালে দেশের ক্ষেত্রগুলো থেকে গ্যাস উত্তোলনের পরিমাণ দৈনিক প্রায় ২৮০ কোটি ঘনফুটে উঠলেও তা কমতে কমতে এখন ১৬০ কোটি ঘনফুটের কাছাকাছি চলে এসেছে। এর সঙ্গে দুটি এফএসআরইউ থেকে আমদানি করা গ্যাস (এলএনজি) পূর্ণ ক্ষমতায় চালু রাখতে পারলেও পাওয়া যায় ১১০ কোটি ঘনফুট। অর্থাৎ সব মিলে ২৭০ কোটি ঘনফুট হতে পারে সর্বোচ্চ সরবরাহ। কিন্তু পেট্রোবাংলার হিসাবেই চাহিদা ৪২০ কোটি ঘনফুট।

চাহিদা ও সরবরাহের মধ্যে এই যে ১৫০ কোটি ঘনফুটের ব্যবধান, এখন পর্যন্ত কিন্তু তা কমার প্রবণতা নেই। কারণ, দেশের গ্যাসক্ষেত্রগুলোর প্রাকৃতিক চাপ (রিজার্ভার প্রেশার) কমে আসছে। ফলে গ্যাস উত্তোলন যতটুকু কমছে, ততটুকু বা তার চেয়ে বেশি নতুন গ্যাস উত্তোলনের মতো কার্যক্রম নেই। প্রায় এক যুগ ধরে এই অবস্থা চলে এসেছে। এর মধ্যে ২০১৮ সাল থেকে এলএনজি আমদানি শুরু করা হয়। এরপর দ্বিতীয় এফএসআরইউ স্থাপন করে এলএনজি আমদানি বাড়ানো হয়। কিন্তু দেশের গ্যাস উত্তোলন কমতে থাকায় পরিস্থিতি চলে গেছে নিয়ন্ত্রণের বাইরে। এর ওপর ‘মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা’-এর মতো প্রথমে রাশিয়া-ইউক্রেন তারপর ইরান যুদ্ধ আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারকে ভয়াবহ রকম অস্থিতিশীল করে তোলে।

এই পরিস্থিতি থেকে পরিত্রাণ পাওয়ার সব উপায় সরকারের হাতে নেই, তবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টি সব সময়ই সরকারের হাতে ছিল এবং আছে। তা হলো নিজস্ব জ্বালানি সম্পদের অনুসন্ধান ও আহরণ বৃদ্ধি করা। এ বিষয়ে বিভিন্ন সময় বাপেক্সের মাধ্যমে ১০০টি, কখনো ৫০টি কূপ খননের কর্মসূচি ঘোষণা করা হয়েছে, যা তেমন কোনো কাজে আসেনি। কারণ, সেই কর্মসূচিগুলো ছিল নিজেদের আর্থিক ও কারিগরি সক্ষমতার বিচারে সম্পূর্ণ বাস্তবতা বর্জিত। এখনো তেমন একটি কর্মসূচি চলমান, তবে বিগত অন্তর্বর্তী সরকার ও তার ধারাবাহিকতায় বর্তমান সরকার কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ কাজ শুরু করেছে। এর অন্যতম হচ্ছে তিতাস, বাখরাবাদ, মোবারকপুর ও সুনেত্র গ্যাসক্ষেত্রে গভীর কূপ খননের উদ্যোগ। চীনা একটি কোম্পানি তিতাসের কূপ খনন প্রায় শেষ করে এনেছে। এরপর বাখরাবাদে খনন শুরু হবে। গভীর কূপগুলো খনন শেষ হলে ওই ক্ষেত্রগুলোতে গ্যাস মজুতের একটি নতুন চিত্র পাওয়া যাবে। গ্যাস উত্তোলনও বাড়বে।

আরও কিছু ক্ষেত্র দেশে আছে, যেখানে খনন করা হলে বিপুল পরিমাণে গ্যাস পাওয়ার প্রবল সম্ভাবনা রয়েছে। এর মধ্যে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য ছাতকের দুটি ক্ষেত্র। এর একটিতে কানাডীয় কোম্পানি নাইকো পরপর দুবার বিস্ফোরণ ঘটিয়েছে। সেখানকার সমস্যা হচ্ছে মাটির কম গভীরতায় বিপুল পরিমাণ গ্যাসের মজুত এবং রিজার্ভার প্রেশার খুব বেশি। ফলে সেখানে বিশেষজ্ঞ কোনো কোম্পানিকে সঙ্গে নিয়ে খনন না করলে ভালো ফল পাওয়া কঠিন হবে। সিলেট গ্যাসক্ষেত্র থেকে এই মুহূর্তেই উত্তোলন বাড়ানোর সুযোগ আছে। সরকারের উচিত সেটা সক্রিয়ভাবে খতিয়ে দেখা। আমেরিকান কোম্পানি শেভরন আরও দুটি নতুন ক্ষেত্রে কাজ করতে আগ্রহ দেখাচ্ছে দীর্ঘদিন ধরে।

এ কথা সত্য যে শুধু দেশের সম্পদ দিয়ে আমাদের ভবিষ্যৎ জ্বালানি চাহিদার শতভাগ পূরণ করা সম্ভব হবে না। কিন্তু চেষ্টা করতে হবে জ্বালানি খাতের মেরুদণ্ড হিসেবে যেন দেশের সম্পদ ব্যবহার করা যায়। এমনিতে আমাদের জ্বালানি তেল আমদানি করতেই হবে। কয়লাও আমদানি করছি। এরপর ইউরেনিয়াম আমদানি করতে হবে। গ্যাস নিয়েও আমরা যেন আমদানিনির্ভর হয়ে না পাড়ি, সেই লক্ষ্যে পরিস্থিতি বিবেচনা করে কাজ অব্যাহত রাখতে হবে।

এ ছাড়া ছোট-বড় যে কাজগুলো চলেছে, তা অব্যাহত রাখতে হবে। নতুন নতুন ক্ষেত্রে অনুসন্ধান চালানো খুবই প্রয়োজনীয়। বিশেষ করে বেঙ্গল বেসিনে (একেবারে বঙ্গোপসাগরের মোহনা থেকে মেঘনা অববাহিকা ধরে সমগ্র ভোলা অঞ্চল, শরীয়তপুর থেকে পাবনার মোবারকপুর পর্যন্ত) নিবিড় অনুসন্ধান দেশের জ্বালানি সম্পদের চিত্র আমূল পাল্টে দিতে পারে। কিন্তু এসব কার্যক্রম সত্ত্বেও দুই-তিন বছরের মধ্যে দেশের গ্যাস উত্তোলন কমার প্রবণতা রোধ করা যাবে, তেমনটা আশা করা একটু বেশিই হবে। কারণ, প্রতিটি কাজই সময়সাপেক্ষ, ব্যয়বহুল এবং কারিগরি দক্ষতার সমন্বিত একটি প্রয়াস। তবে এ কাজ থেকে পিছিয়ে এলে কিংবা ফেলে রাখলে আরও বাজেভাবে পস্তাতে হবে।

দেশের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি সম্পদ হচ্ছে কয়লা। দেশের পাঁচটি আবিষ্কৃত ক্ষেত্রে কয়লা মজুত প্রায় তিন কোটি টন। এই সম্পদ নিয়ে কী করা হবে, সে বিষয়ে সরকারের একটি প্রায়োগিক সিদ্ধান্ত নেওয়া দরকার। আমরা প্রায় আট হাজার মেগাওয়াট ক্ষমতার কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপন করেছি অপেক্ষাকৃত কম দামে বিদ্যুৎ পাওয়ার জন্য। ওই কেন্দ্রগুলোর জন্য আমরা অপেক্ষাকৃত নিম্নমানের কয়লা আমদানি করি। জাতীয় সমৃদ্ধি ও অর্থনৈতিক অগ্রগতির ক্ষেত্রে এর কি কোনো অর্থ হতে পারে?

সব কথার শেষ কথা হলো বর্তমান সংকট থেকে আমাদের আশু পরিত্রাণের উপায় কী। অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেছেন দুই বছর লাগবে। কিন্তু দুই বছরে কোনো পরিত্রাণ বাস্তবসম্মত নয়। আরও সময় লাগবে। আমরা জাতীয় গ্রিডে বর্তমানের চাহিদা ৪২০ কোটি ঘনফুট গ্যাস কত দিনে সরবরাহ নিশ্চিত করতে পারব, তা বলা সম্ভব নয়। তবে দুই থেকে তিন বছরে যে নয়, সেটা নিশ্চিত। তাহলে করণীয় কী?

প্রথম করণীয় হচ্ছে ধৈর্য ধরতে হবে, আঞ্চলিক সহযোগিতা বৃদ্ধি করতে হবে এবং পরিকল্পিত ও ধারাবাহিকভাবে দেশের নিজস্ব জ্বালানি সম্পদের অনুসন্ধান, উত্তোলন বৃদ্ধি ও অগ্রাধিকারভিত্তিক ব্যবহারের কার্যক্রম চালিয়ে যেতে হবে। এরপরের করণীয় হচ্ছে কী পদ্ধতিতে জ্বালানি আমদানিকে টেকসই করা যায়, গভীরভাবে চিন্তা করে সেই পথে যাওয়া। এ ক্ষেত্রে অবশ্যই মনে রাখতে হবে যে আমাদের জ্বালানি আমদানির পরিমাণ ৬০ শতাংশের ওপর চলে গেছে। বিশ্লেষক-গবেষকদের অভিমত, এটা ৮০ শতাংশ ছাড়িয়ে যেতে পারে। তখন আমরা কীভাবে চলব, সেটি একটি বিরাট প্রশ্ন।

এ কথা সত্য যে শুধু দেশের সম্পদ দিয়ে আমাদের ভবিষ্যৎ জ্বালানি চাহিদার শতভাগ পূরণ করা সম্ভব হবে না। কিন্তু চেষ্টা করতে হবে জ্বালানি খাতের মেরুদণ্ড হিসেবে যেন দেশের সম্পদ ব্যবহার করা যায়। এমনিতে আমাদের জ্বালানি তেল আমদানি করতেই হবে। কয়লাও আমদানি করছি। এরপর ইউরেনিয়াম আমদানি করতে হবে। গ্যাস নিয়েও আমরা যেন আমদানিনির্ভর হয়ে না পাড়ি, সেই লক্ষ্যে পরিস্থিতি বিবেচনা করে কাজ অব্যাহত রাখতে হবে।

  • অরুণ কর্মকার ফ্রিল্যান্স সাংবাদিক ও কলাম লেখক

  • মতামত লেখকের নিজস্ব