বাংলাদেশের অর্থনীতি আজ একটি অস্বস্তিকর বাস্তবতার মুখোমুখি। আয়ের তুলনায় জীবনযাত্রার ব্যয় বাড়ছে লাগামহীনভাবে। ক্ষুদ্র ও মাঝারি ব্যবসাগুলো টিকে থাকার অন্তহীন সংগ্রামে ব্যস্ত। তরুণদের জন্য নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ নেই বললেই চলে।
অথচ নীতিনির্ধারকদের ভাষ্য এখনো এমন, যেন অর্থনীতি কেবল অভ্যুত্থান-পরবর্তী সময়ের একটি স্বল্পমেয়াদি অনিশ্চয়তার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে—যেন আত্মবিশ্বাস ফিরলেই বা নির্বাচন শেষ হলেই সবকিছু আবার স্বাভাবিক প্রবৃদ্ধির পথে ফিরবে। তারা ভাবছেন, বর্তমান উচ্চ মূল্যস্ফীতির হার নিয়ন্ত্রণে এনে একটি সম্প্রসারণমূলক রাজস্ব ও মুদ্রানীতিতে ফিরে গেলেই প্রবৃদ্ধি, কর্মসংস্থান ও বিনিয়োগ—সবই সচল হবে।
পে কমিশনের প্রস্তাবিত অতিরিক্ত এক লাখ কোটি টাকা সরকারি কর্মচারীদের বেতন ও ভাতা বাড়ানোর সিদ্ধান্ত মূলত এই ধারণার ওপরই দাঁড়িয়ে আছে। এতে ধরে নেওয়া হয়েছে, বাংলাদেশ একটি মৌলিকভাবে শক্তিশালী অর্থনীতির দেশ, যা বিপ্লব-পরবর্তী সাময়িক অস্থিরতায় পড়েছে; এবং রাজনৈতিক ধুলা ঝরে গেলেই বিনিয়োগ, প্রবৃদ্ধি ও রাজস্ব—সবই স্বাভাবিক গতিতে ফিরবে।
বিগত এক দশকে সরকারি কর্মকর্তাদের বেতন কাঠামো অপরিবর্তিত থাকায় বর্তমান উচ্চ মূল্যস্ফীতির বাজারে তাদের জীবনযাত্রার মান বজায় রাখা কঠিন হয়ে পড়েছে। এই প্রেক্ষাপটে বেতন বৃদ্ধির দাবিটি যৌক্তিক হলেও, দেশের বর্তমান অর্থনৈতিক পরিস্থিতি ও আর্থিক মন্দার মুখে ১ লাখ কোটি টাকার এই বিশাল আর্থিক বোঝা বহন করা কতটা সমীচীন, তা নিয়ে বড় ধরনের প্রশ্ন থেকেই যায়।
আমার মতে, নীতিনির্ধারকেরা একটি গভীর কাঠামোগত সংকোচনকে সাময়িক উত্থান-পতন হিসেবে দেখে ভুল করছেন। আমি এই ধারণাকে ‘হাসিনাকোনোমিকস’-এর ফলে সৃষ্ট আর্থিক সংকটের একটি মারাত্মক ‘মিস-ডায়াগনসিস’ বলে মনে করার যথেষ্ট কারণ আছে। এটি নতুন কিছু নয়; বিগত শাসনামলেও তারা একই ভুল করেছেন।
বাস্তবতা হলো, বাংলাদেশের অর্থনীতি এখন আর কেবল একটি চক্রাকার মন্দার ভেতরে নেই; এটি একটি কাঠামোগত সংকোচনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। এই সংকোচন খালি চোখে সব সময় দৃশ্যমান নয়, হঠাৎ ধসের মতোও নয়, কিন্তু এটি ধারাবাহিক, গভীর ও দীর্ঘস্থায়ী। ডেটা চৌর্যবৃত্তির শিকার না হওয়া বিভিন্ন পরিসংখ্যানে এটি স্পষ্ট।
বাংলাদেশের ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান, চাকরির বাজার, আয় ও সঞ্চয় কোভিড-পরবর্তী সময়ে একটি সার্বিক সংকোচনের মধ্য দিয়ে গেছে। অথচ সেই সংকোচনের মধ্যেই ২০২১-২২ সালের প্রায় তিন লাখ কোটি টাকার রাজস্ব এখন প্রায় দ্বিগুণ বাড়িয়ে ৫.৬৪ লাখ কোটি টাকা করা হয়েছে।
এর ফলে জনগণের প্রতিটি পণ্য ও সেবার মূল্য বৃদ্ধি পেয়েছে, যার প্রধান দায় সরকারের বিভিন্ন রকম ডিউটি ও ট্যাক্স, অতিরিক্ত জ্বালানি খরচ, আমলাতন্ত্রের সার্ভিস চার্জ, অদক্ষতা ও দীর্ঘদিনের লুটপাট। রাজস্বের এই বৃদ্ধি বাস্তব অর্থনৈতিক উন্নতির প্রতিফলন নয়। বাস্তবে জিডিপির সামগ্রিক সংকোচন আড়াল করে, গলায় চাপা দিয়ে আদায় করা রাজস্বকেই ব্যবহার করা হচ্ছে বাংলাদেশের ‘ট্যাক্স টু জিডিপি’ হারকে কৃত্রিমভাবে ৯ শতাংশ হিসেবে উপস্থাপন করতে।
এই ৯ শতাংশ হারকে তুলনামূলক কম দেখিয়ে বছর বছর ট্যাক্স, ভ্যাট ও শুল্ক বাড়ানো হচ্ছে এবং এটি অর্থনীতি সম্পর্কে ভুল সিগন্যাল দিচ্ছে। কারণ, রাজস্ব বাড়লেই অর্থনীতির প্রবৃদ্ধি হচ্ছে—এই ধারণা ভুল। রেন্ট-সিকিং অর্থনীতিতে সরকার উচ্চ শুল্ক, পরোক্ষ কর, শুল্ক, আমদানি পর্যায় কৃত্রিম ভাবে নির্ধারিত উচ্চ অ্যাসেসমেন্ট রেট এবং নানান অনানুষ্ঠানিক খরচের মাধ্যমে রাজস্ব বাড়াতে পারে; কিন্তু তা অর্থনীতির জীবনীশক্তি কেড়ে নেয়। রেন্ট–সিকিং বলতে এমন একটি অর্থনৈতিক আচরণকে বোঝায়, যেখানে উৎপাদন, উদ্ভাবন বা প্রকৃত মূল্য সৃষ্টির মাধ্যমে আয় বাড়ানোর বদলে রাষ্ট্রের নীতি, আইন, শুল্কব্যবস্থা ও প্রশাসনিক ক্ষমতার সুযোগ কাজে লাগিয়ে বিশেষ গোষ্ঠী নিজেদের জন্য অতিরিক্ত সুবিধা ও আয় নিশ্চিত করে।
এ কারণেই কাগজে-কলমে ট্যাক্স টু জিডিপি অনুপাত কম দেখালেও বাস্তবে বাংলাদেশ একটি উচ্চ ব্যয়ের অর্থনীতিতে পরিণত হয়েছে। সব মিলিয়ে উৎপাদন ও ব্যবসা পরিচালনার খরচ এখন ভারত থেকে অন্তত দুই গুণ এবং চীন থেকে অন্তত তিন গুণ বেশি। ফলে মুনাফার আগেই খরচের চাপ ব্যবসাকে দমিয়ে দিচ্ছে এবং নতুন কর্মসংস্থান তৈরি হচ্ছে না।
এটাই স্ট্যাগফ্লেশনের একটি ক্ল্যাসিক লক্ষণ। স্ট্যাগফ্লেশন বলতে এমন একটি অর্থনৈতিক অবস্থা বোঝায়, যেখানে উৎপাদন ও প্রবৃদ্ধি স্থবির বা মন্থর হয়ে পড়ে, কিন্তু একই সঙ্গে মূল্যস্ফীতি ও জীবনযাত্রার ব্যয় উচ্চ ও স্থায়ী থাকে। এই প্রেক্ষাপটে রাজস্ব–ঘাটতি বাড়িয়ে সরকারি বেতন বড় পরিসরে বাড়ানো অর্থনীতিকে চাঙা করবে—এই ধারণা অর্থনৈতিক বিচারে দুর্বল।
বিষয়টি সরকারি কর্মচারীদের যোগ্যতা বা সম্মানজনক মজুরির প্রশ্ন নয়; বিষয়টি হলো ‘ফিসক্যাল ট্রান্সমিশন’-এর। প্রশ্ন হলো এই অতিরিক্ত এক লাখ কোটি টাকা কোথা থেকে আসবে এবং এই অতিরিক্ত ব্যয়ের বোঝা কার ওপর চাপানো হবে? যেহেতু কর বা শুল্ক না বাড়িয়ে এই অর্থ সংস্থান সম্ভব নয়, তাই প্রতিটি পথই শেষ পর্যন্ত উৎপাদন খরচ ও মূল্যস্তরের ওপর বাড়তি চাপ তৈরি করবে। ফলে এই ভুল খাতে বরাদ্দ বৃদ্ধির মাধ্যমে সম্প্রসারণমূলক রাজস্ব বা মুদ্রানীতি দিয়ে মন্দাক্রান্ত অর্থনীতিকে টেনে তোলা যাবে না।
সরকার পরিবর্তনের পরপরই ব্যবসায়ীরা বিনিয়োগে আগ্রহী না–ও হতে পারেন। কারণ, অধিকাংশ কারখানায় এখন ‘ওভারক্যাপাসিটি’ বা অতিরিক্ত উৎপাদন ক্ষমতা অলস পড়ে আছে। অর্থনীতি যেভাবে প্রক্ষেপণ করা হয়েছিল, সেভাবে বাড়েনি। ব্যবসায়ীরা সরকারের চেয়ে ভালো জানেন যে সংকুচিত অর্থনীতির কারণে মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কমে গেছে। এ ছাড়া দীর্ঘ সময় মূল্যস্ফীতির তুলনায় সুদের হার কম রাখা বড় ব্যবসায়ীদের এমনভাবে অতিবিনিয়োগে প্রলুব্ধ করেছে, যা এখন বৃহৎ প্রকল্পগুলোকে ঋণখেলাপির দিকে ঠেলে দিচ্ছে। ফলে প্রথাগত সম্প্রসারণমূলক রাজস্ব নীতি দিয়ে এই মন্দা থেকে বের হওয়া যাবে না।
এখানে কেবল ‘অস্টেরিটি’ বা কৃচ্ছ্রসাধনের প্রশ্ন নেই। বাংলাদেশের দরকার সঠিকভাবে টার্গেট করা ‘সম্প্রসারণমূলক রাজস্ব নীতি’। বর্তমানে আমাদের প্রয়োজন সাপ্লাই-সাইড সম্প্রসারণমূলক রাজস্ব নীতির মাধ্যমে করভার কমিয়ে মানুষের হাতে টাকা ফিরিয়ে দেওয়া। কারণ, ডিমান্ডসাইড এক্সপানশনের নামে সরকারি কর্মচারীদের বেতন বাড়িয়ে বাজেট বড় করলে সেই টাকা ভুল চ্যানেলে চলে যাবে। এটি সম্পদের একটি ‘মিস অ্যালোকেশন’ তৈরি করবে, যা উৎপাদনশীল খাত ও বিনিয়োগে কোনো ভূমিকা রাখবে না।
সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন আর্থিক সম্পদের নতুন একটি বণ্টনব্যবস্থা। সরকার যদি কৃষক এবং ক্ষুদ্রঋণ গ্রহীতাদের সমপরিমাণ ঋণ মওকুফ করে, তবে সেটি অর্থনীতিতে একটি ‘অটোমেটিক বুস্ট’ দেবে। এটিও একটি ফিসক্যাল এক্সপানশন, তবে এটি ভিন্ন চ্যানেল ব্যবহার করে সরাসরি ‘সাপ্লাই সাইড’-এ ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে।
সাপ্লাই-সাইড অর্থনীতির দৃষ্টিকোণ থেকে করছাড়, শুল্ক হ্রাস ও উৎপাদন খরচ কমানোও একধরনের সম্প্রসারণমূলক রাজস্ব নীতি। কারণ, এতে উৎপাদক ও ভোক্তার হাতে প্রকৃত অর্থ ফেরে এবং অর্থনৈতিক কার্যক্রম গতিশীল হয়। আজকের পরিস্থিতিতে সবচেয়ে কার্যকর কৌশল হবে সেই বাধাগুলো দূর করা, যেখানে অর্থনীতি সবচেয়ে বেশি আটকে আছে। যেমন জ্বালানি খরচ, আমদানি শুল্ক, কমপ্লায়েন্স ব্যয় ও বিভিন্ন ধরনের অনানুষ্ঠানিক আদায়। একই সঙ্গে অদক্ষ ও কম উৎপাদনশীল ক্রমাগত পুনরাবৃত্তি হওয়া ব্যয় নিয়ন্ত্রণে আনতে হবে।
বাংলাদেশের অর্থনীতির প্রবৃদ্ধির মূল সমস্যা কম ব্যয় নয়; মূল সমস্যা অতিরিক্ত উৎপাদন খরচ। কোভিড-পরবর্তী আর্থিক সংকোচনে উচ্চ ব্যয়ের দায় মেটাতে গিয়ে পরিবার ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের সঞ্চয় ফুরিয়ে গেছে। উৎপাদন সস্তা না হলে কাঠামোগত শোষণ না কমলে এবং নীতির লক্ষ্য প্রশাসনিক সম্প্রসারণ থেকে সরিয়ে উৎপাদনশীলতার দিকে না ঘোরালে—বাজেট যত বড়ই হোক না কেন, অর্থনীতির পুনরুদ্ধার হবে ভঙ্গুর।
সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন আর্থিক সম্পদের নতুন একটি বণ্টনব্যবস্থা। সরকার যদি কৃষক এবং ক্ষুদ্রঋণ গ্রহীতাদের সমপরিমাণ ঋণ মওকুফ করে, তবে সেটি অর্থনীতিতে একটি ‘অটোমেটিক বুস্ট’ দেবে। এটিও একটি ফিসক্যাল এক্সপানশন, তবে এটি ভিন্ন চ্যানেল ব্যবহার করে সরাসরি ‘সাপ্লাই সাইড’-এ ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে।
আমি যে সমাধানের প্রস্তাব করছি তা হাসিনোমিকস্ বা হাসিনাকোনোমিকসের নয়ছয় সুদের হারের মতো ভ্রান্ত ধারণা নয়; বরং এটি ক্ল্যাসিক সাপ্লাই-সাইড ফিসক্যাল পলিসি। অর্থাৎ বাজেট সম্প্রসারণ নয়; বরং সিভিল সার্ভেন্টদের বেতন ক্যাপ করা, সরকারি অপচয় কমানো এবং করের বোঝা ব্যাপকভাবে হ্রাস করা। বিগত ৩০ বছরে ভারতে দুবার কৃষকদের ঋণ মওকুফ করা হয়েছে; কিন্তু বাংলাদেশের স্বাধীনতার পর একবারও সেই সাহসী নীতি গ্রহণ করেনি। কারণ, এদেশের অলিগার্ক ও আমলারা রাষ্ট্রকে নিজেদের মধ্যে ভাগবাঁটোয়ারা করে নিয়েছে। যাঁদের প্রকৃত প্রয়োজন, তাঁদের জন্য নামমাত্র ‘তবারকি’ সহায়তা ছাড়া মৌলিক কোনো সহায়তা দেওয়া হয়নি।
এখানে মূল বিতর্ক আদর্শগত নয়; এটি সঠিক ‘ডায়াগনসিস’ এবং রাষ্ট্রীয় সম্পদের সঠিক বরাদ্দের প্রশ্ন। যদি অর্থনীতি সত্যিই শুধু আত্মবিশ্বাস ফেরার অপেক্ষায় থাকত, তবে বড় বাজেট ও একই সাথে এক লক্ষ কোটি টাকা বাজেট বৃদ্ধি যৌক্তিক হতে পারত।
ফলে এই বেতন বৃদ্ধি ধাপে ধাপে করতে হবে এবং একই সঙ্গে বাজেটে সঠিক খাতে ব্যয় করে, অপচয় থেকে খরচ হ্রাস করে সেই অতিরিক্ত ব্যয় সংস্থান করতে হবে। বর্তমান কাঠামোগত সংকোচনের মুখে সরকারি ব্যয় বৃদ্ধি ও বাজেটের আকার বৃদ্ধি কোনো সমাধান নয়।
জিয়া হাসান অর্থনীতিবিদ ও প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের পলিসি অ্যাডভাইজার
*মতামত লেখকের নিজস্ব