সরকারি ভবনবিলাস ও অসুস্থ প্রতিযোগিতা

বাংলাদেশ সচিবালয়ছবি: প্রথম আলো

৭ এপ্রিল প্রথম আলো খুলে একটি প্রতিবেদন চোখে পড়ল। সচিবালয়ে ২১ তলা ভবন নির্মাণ বিষয়ে। এর আগে একটা প্রতিবেদন ছিল যে এই ভবন নির্মাণে প্রতি বর্গমিটারে ব্যয় হচ্ছে ৫৩ হাজার টাকা। গণপূর্ত প্রতিবাদ জানিয়ে বলেছে, এই তথ্য সঠিক নয় ইত্যাদি ইত্যাদি (এ ধরনের প্রতিবাদের ভাষা যেমন হয় আরকি।) তবে ৬ এপ্রিল একনেকের সভায় এই ভবনের বিষয়টি তালিকাভুক্ত ছিল কিন্তু আলোচিত হয়নি। 

গত এক–দেড় দশকে সারা দেশে অনেক সরকারি ভবন হয়েছে। জেলা সদরে অধিকাংশ সার্কিট হাউসে বড় বড় তিন–চারতলা ভবন হয়েছে। বিরাট বিরাট সব কক্ষ। সার্কিট হাউসে কেউ দীর্ঘদিন থাকার জন্য যান না, এত বিশাল সব ঘরের কী প্রয়োজন। দুর্জনেরা বলেন, বড় বড় ঘর বানালে ব্যয় বেশি, আর তাতে ‘লাভ’ও বেশি, এটাই মূল কারণ বড় ঘর তৈরির।

চর কুকরি–মুকরিতে গিয়েছিলাম জানুয়ারি মাসে। বন বিভাগের রেস্টহাউসের ভিআইপি স্যুট দেওয়া হলো আমাকে। স্যুটটার আয়তন প্রায় ১ হাজার ২০০ বর্গফুট। এর অর্ধেক আকারের হলেও কিন্তু প্রয়োজনের তুলনায় ছোট হতো না। ভবনের ডাইনিং রুমের পেছনে সভাকক্ষ (এই সেটআপটাও অদ্ভুত)। সেই সভাকক্ষের দেয়াল, টেবিল, চেয়ার—সবকিছুতে ছাতা পড়ে আছে। ভবন বানাতে আমাদের যত আগ্রহ, রক্ষণাবেক্ষণে অনাগ্রহ আরও কম।

আরও পড়ুন

১৯৮১ সালে যখন চাকরিতে ঢুকলাম পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে, তখন শুধু আইকনিক মূল ভবনটা আছে। আর গেট দিয়ে ঢুকলেই বাঁয়ে এখন যে বড়সড় নতুন ভবনটা, সেখানে ছিল একটা টিনশেড, তাতে কনস্যুলার আর সাধারণ সেবা শাখার অফিস। মন্ত্রণালয় তখন অনেক ছোট। পেছনে পাঁচতলা অ্যানেক্স ভবন তখন নির্মাণাধীন।

এক বছর পর প্রশিক্ষণ শেষে যখন মন্ত্রণালয়ে ফিরলাম, তত দিনে ওটার নির্মাণকাজ সমাপ্ত হয়েছে। মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী, সচিব—সবাই চলে গেছেন পাঁচতলায়। সব কর্মকর্তার বসার জন্য পর্যাপ্ত কক্ষের ব্যবস্থা হয়ে গেছে। এরপর একসময় দ্বিতীয় গেটের পাশে একটা দোতলা ভবন হয়েছে কনস্যুলার সেবার জন্য।

পরবর্তী বড় সংযোজন ছিল ছয়তলা মেরিটাইম ভবন, যেটা চালু হয় ২০০৭-০৮–এর তত্ত্বাবধায়ক আমলে। আমি তখন পররাষ্ট্রসচিব। বড়সড় একটা সভাকক্ষ এবং মেরিটাইম অনুবিভাগের স্থান সংকুলানের পরও সেখানে অনেক কামরা খালি থেকে যায়।

কামরা বড় হলেই কর্মকর্তাদের সেবার মান বেড়ে যায় না। একটি ছোট, শীতাতপনিয়ন্ত্রিত, প্রয়োজনীয় সরঞ্জামসমৃদ্ধ কামরা বরং কর্মদক্ষতা বৃদ্ধির জন্য সহায়ক হতে পারে। সবকিছুর ওপরে অবশ্য সেবা দেওয়ার মানসিকতা।

দেড় বছর আগে যখন আবার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে ঢুকলাম, আমাকে নিয়ে যাওয়া হলো নতুন আটতলা ভবনটিতে, যেখানে ১৯৮১ সালে টিনশেড ঘরটি ছিল। সুন্দর ঝকঝকে ভবনটিতে মন্ত্রীর কামরাটি বিশাল। দক্ষিণ ও উত্তরের দুটি দেয়ালই কাচের, আলোর অভাব নেই, তবু অসংখ্য এলইডি বাতি। কামরাটি কমপক্ষে ৩০ শতাংশ ছোট হতে পারত, আর তাতেই এর সব প্রয়োজন পূরণ হতো। অ্যানেক্স ভবনে মন্ত্রীর কামরা যেমন ছিল, এটা তার অন্তত দেড় গুণ। এমন বিশাল ঘরের দুটি সমস্যা—এক. বানাতে খরচ অনেক বেশি; দুই. ঘর ঠান্ডা রাখতে বিদ্যুৎ ব্যয় অত্যধিক। ভবনের অন্যান্য ঘরও একই ধাঁচের। মন্ত্রীর দপ্তরের পরিচালকের কামরাটির যা আকার, মন্ত্রীর নিজের কামরা ও রকম হলেই চলত।

এর মধ্যে জানতে পারলাম, ঐতিহ্যবাহী মূল ভবন এবং পেছনের অ্যানেক্স ভবন—দুটোই ভেঙে ফেলা হবে এবং সেখানে কয়েক শ কোটি টাকা ব্যয়ে একটা ২০ তলা ভবন তৈরি করা হবে। ডিজাইন, পরিকল্পনা সবই হয়ে গেছে, একনেকে যাবে অনুমোদনের জন্য। তারপর অর্থ বরাদ্দ হয়ে গেলেই কর্মযজ্ঞ শুরু হবে প্রথমে ধ্বংসযজ্ঞ দিয়ে।

আরও পড়ুন

প্রথমেই আমি গণপূর্তের প্রধান প্রকৌশলীকে বললাম আমার সঙ্গে চা খেয়ে যেতে। ভদ্রলোক আমার কলেজেরই ছাত্র এবং আমার শিক্ষকের সন্তান। তাঁকে বললাম এ প্রকল্প বন্ধ রাখতে। একদিন সব কটি ভবনে গেলাম সরেজমিন দেখতে। এই নতুন ভবনে আছে দুটো কনফারেন্স রুম এবং একটি অডিটোরিয়াম। মূল ভবনে আছে একটি কনফারেন্স রুম, যাতে পুরোনো ভাঙাচোরা মালামাল বোঝাই। অ্যানেক্স ভবনের পাঁচতলায় আছে আরেকটি কনফারেন্স রুম। সেটিসহ পাঁচতলার পুরোটাই এখন পরিত্যক্ত।

আরেকটা কনফারেন্স রুম আছে মেরিটাইম ভবনে। এর বাইরেও কিছু কিছু কামরায় পুরোনো মালামাল ঠেসে রাখা হয়েছে। বর্তমান কাঠামোর সব কর্মকর্তার প্রয়োজন পূরণ করার পরও কিছু কামরা আছে অব্যবহৃত। আগামী ১০ বছরে মন্ত্রণালয়ের কলেবর যতটা বৃদ্ধির সম্ভাবনা, সেটুকু সুন্দরভাবে এঁটে যাবে বিদ্যমান ভবনগুলোতে, স্থানের ব্যবহারে শুধু খানিকটা যৌক্তিকীকরণ লাগবে। আরেকটি ২০ তলা ভবনের কোনো প্রয়োজন নেই। প্রকল্পটি তাই বাতিলের অনুরোধ করা হয়েছে।

পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ভবনগুলো নিয়ে বিস্তারিত বললাম এ কারণে যে সরকারের প্রতিটি শাখায়ই ভবন বৃদ্ধির এক অসুস্থ প্রতিযোগিতা চলছে।

সম্প্রতি ঝকঝকে একটি বহুতল ভবন নির্মিত হয়েছে সচিবালয়ের দ্বিতীয় গেটের পাশে। মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ ও জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় স্থানান্তরিত হয়েছে এই ভবনে। জানা গেল, এই দুই মন্ত্রণালয়েরই পুরোটা নাকি স্থান সংকুলান হচ্ছে না এই বিশাল ভবনে। হওয়ার কথাও নয়। কামরাগুলো যথারীতি বড় বড় আর করিডর ইত্যাদিতে বিপুল জায়গা অপচয় করা হয়েছে।

কামরা বড় হলেই কর্মকর্তাদের সেবার মান বেড়ে যায় না। একটি ছোট, শীতাতপনিয়ন্ত্রিত, প্রয়োজনীয় সরঞ্জামসমৃদ্ধ কামরা বরং কর্মদক্ষতা বৃদ্ধির জন্য সহায়ক হতে পারে। সবকিছুর ওপরে অবশ্য সেবা দেওয়ার মানসিকতা।

সচিবালয়ে আরেকটি ২১ তলা ভবনের আদৌ প্রয়োজন আছে কি না, তা নৈর্ব্যক্তিক নিরীক্ষার দাবি রাখে। যদি এর প্রয়োজন সত্যিই থাকে, তবে তা যেন একটি স্মার্ট অথচ অনাড়ম্বর ভবন হয়, বিপুল অর্থ অপচয়ের আরেকটি উদাহরণ হয়ে না দাঁড়ায়। প্রতিটি টাকারই বিকল্প ব্যবহার আছে। আর আমাদের দেশে অনেক অতিপ্রয়োজনীয় প্রকল্পই অর্থাভাবে আলোর মুখ দেখে না।

মো. তৌহিদ হোসেন অন্তর্বর্তী সরকারের সাবেক উপদেষ্টা