>ইরাকের পর সিরিয়াতেও ইসলামিক স্টেটের পতন ঘনিয়ে আসছে। কিন্তু আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসবাদের কি অবসান ঘটতে চলেছে? অন্য সন্ত্রাসবাদী সংগঠন আল-কায়েদার অবস্থাই বা কী? ইসলামভিত্তিক আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসবাদের নিকট ইতিহাস, বর্তমান অবস্থা ও ভবিষ্যতের সম্ভাব্য গতি–প্রকৃতি বিশ্লেষণ করেছেন অধ্যাপক আলী রীয়াজ। চার পর্বের ধারাবাহিকের িদ্বতীয় পর্ব আজ ছাপা হলো।
আবু বকর আল বাগদাদির নেতৃত্বে ২০১৪ সালের জুন মাসে ইসলামিক স্টেটের আবির্ভাবের পর আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসবাদের আলোচনায় আইএসের প্রাধান্য থাকলেও আরেক সন্ত্রাসী সংগঠন, ১৯৮৮ সালে প্রতিষ্ঠিত, আল-কায়েদা তখনো সক্রিয় এবং খানিকটা অগোচরেই শক্তি সঞ্চয় করছে। ইতিমধ্যে আল-কায়েদা ২০১০-১১ সালের ‘আরব বসন্ত’-এর ধাক্কা সামলে উঠেছে, পাকিস্তান ও আফ্রিকার বিভিন্ন দেশে তাদের বিরুদ্ধে চালানো অব্যাহত ড্রোন হামলা মোকাবিলা করেছে; শীর্ষস্থানীয় নেতা ওসামা বিন লাদেন, আনোয়ার আল আওলাকিসহ একাধিক নেতার মৃত্যুর ঘটনাও ঘটেছে। আয়মান আল জাওয়াহিরির নেতৃত্বে আল-কায়েদার আঞ্চলিক শাখা আল-কায়েদা ইন মাগরেব (একিউআইএম) এবং আল-কায়েদা ইন আরব পেনিনসুলা (একিউএপি)—প্রতিষ্ঠিত হয়েছে এবং প্রতিষ্ঠিত হতে চলেছে আল-কায়েদা ইন ইন্ডিয়ান সাব-কন্টিনেট (একিউআইএস)। ফলে একদিকে আল-কায়েদার ঘটেছে শক্তিক্ষয়, অন্যদিকে নতুন কাঠামো নিয়ে আল-কায়েদা সংগঠিত হয়েছে।
একিউআইএম প্রতিষ্ঠিত হয় ২০০৭ সালে, আলজেরিয়ার সন্ত্রাসী সংগঠন জিএসপিসি আল-কায়েদার সঙ্গে একীভূত হওয়ার পর। তবে একিউআইএম প্রধানত মালিকে ঘাঁটি হিসেবে ব্যবহার করে থাকে। সোমালিয়া, নাইজেরিয়া, আলজেরিয়া, লিবিয়া, মালি, বুরকিনা ফাসো, মৌরিতানিয়া, মরক্কো ও তিউনিসিয়ায় তাদের সহযোগী ও শাখা সংগঠনগুলোর কাজের সমন্বয় এই আঞ্চলিক কাঠামোর উদ্দেশ্য; যেখানে এ ধরনের সাংগঠনিক উপস্থিতি নেই, সেখানে এ ধরনের সংগঠন তৈরি করাও ছিল তাদের প্রচেষ্টার অন্তর্গত। ২০১১ সালে তিউনিসিয়া ও লিবিয়ায় আনসার আল-শারিয়া, ২০১২ সালে তিউনিসিয়ায় কাতিবাত আকবা ইবনে নাফির প্রতিষ্ঠা থেকেই তা প্রতিভাত হয়। এর বাইরে ওই সব দেশে যেসব জঙ্গি সংগঠন আছে, তাদের সঙ্গে আল-কায়েদা সহযোগিতার সম্পর্ক গড়ে তোলে, যেমন সোমালিয়ায় আল শাবাব, নাইজেরিয়ায় বোকো হারাম। একিউআইএমের বিস্তৃতি, শক্তি সঞ্চয় ও ভয়াবহতা বোঝার জন্য ২০১২-১৩ সালে মালির উত্তরাংশে এক বড় এলাকাজুড়ে তাদের দখল প্রতিষ্ঠার কথা স্মরণই যথেষ্ট। ফ্রান্সের সামরিক অভিযানের মধ্য দিয়েই এই এলাকায় মালি সরকারের কর্তৃত্ব পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হয়; কিন্তু এরপর একিউআইএম ফ্রান্সে তাদের তৎপরতা বৃদ্ধি করেছে এবং কয়েকটি হামলা চালানোর চেষ্টা করেছে। এই গোষ্ঠীর আক্রমণের আরও উদাহরণ রয়েছে আলজেরিয়া থেকে বুরকিনা ফাসো পর্যন্ত। লিবিয়ায় গাদ্দাফি সরকারের পতনের পর সৃষ্ট পরিস্থিতির সুযোগে লিবিয়ার কালোবাজার থেকে একিউআইএমের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট জঙ্গিরা অস্ত্র সংগ্রহ করেছে বলেই জানা যায়। তাদের অর্থের এক প্রধান উৎস হচ্ছে পশ্চিমাদের পণবন্দী হিসেবে নেওয়া। এ বছরের জুন মাসের শেষ দিকে এ রকম একজন পণবন্দী সুইডেনের নাগরিক ছয় বছর আটক থাকার পর মুক্তি লাভ করেছেন।
২০০৯ সালে এসে উদ্ভব ঘটে আল-কায়েদা ইন আরব পেনিনসুলার (একিউএপি); এই আঞ্চলিক কাঠামোর প্রধান এলাকা হচ্ছে ইয়েমেন ও সৌদি আরব। ইয়েমেনে ১৯৯০-এর দশক থেকেই আফগান যুদ্ধফেরত যোদ্ধারা সংগঠিত ছিল বিভিন্ন নামে, যেমন ইসলামিক জেহাদ ইন ইয়েমেন (১৯৯০-৯৪), আর্মি অব এডেন আবয়িয়ান (১৯৯৪-৯৮) এবং আল-কায়েদা ইন ইয়েমেন (১৯৯৮-২০০৩)। এরাই ২০০০ সালের অক্টোবরে এডেন বন্দরে মার্কিন যুদ্ধজাহাজ ইউএসএস কোলে বোমা হামলা চালিয়েছিল। ইয়েমেনে জঙ্গিদের বিকাশের পথ উন্মুক্ত হয়েছিল আলী আবদুল্লাহ সালেহ সরকারের প্রত্যক্ষ মদদেই, দক্ষিণের বিচ্ছিন্নতাবাদীদের মোকাবিলা করার কৌশল হিসেবে সালেহ আশির দশকে আফগানিস্তানে ইয়েমেনিদের পাঠিয়েছিলেন এবং তাদের পরে দক্ষিণে বিচ্ছিন্নতাবাদীদের বিরুদ্ধে ব্যবহার করা হয়। সেই জঙ্গিরাই পরে আল-কায়েদার সঙ্গে যুক্ত হয়; ২০১১ সালে প্রতিষ্ঠা হয় আনসার আল শারিয়া। এরাই ২০১১ সালে আবয়ান প্রদেশের একটি এলাকা দখল করে নিয়ে সেখানে তাদের শাসনব্যবস্থা চালু রাখে প্রায় এক বছর। সালেহ সরকারের পতনের পর (২০১২) তার উত্তরসূরির বিরুদ্ধে শিয়া মতানুসারী হুতি জনগোষ্ঠী যে বিদ্রোহ চালাচ্ছে, তার বিপরীতে আল-কায়েদা সুন্নি মতাবলম্বীদের প্রতিনিধিত্বের দাবিদার হয়ে গৃহযুদ্ধে শরিক হয়েছে এবং ক্রমাগতভাবে শক্তি সঞ্চয় করে চলেছে। নতুন সরকারের প্রতি সমর্থনের নামে এই সংকটে সৌদি আরবের সংযুক্তি এবং রাজনৈতিক সমাধানের বদলে নির্বিচার হামলা ও যুদ্ধ এই পরিস্থিতির আরও অবনতিই ঘটিয়েছে। আমেরিকান এন্টারপ্রাইজ ইনস্টিটিউটের ফেলো ক্যাথরিন জিমারম্যান গত ১৩ জুলাই যুক্তরাষ্ট্রের কংগ্রেসের একটি সাব-কমিটির শুনানিতে ‘আল-কায়েদা ইজ স্ট্রেংদেনিং ইন দ্য শ্যাডোজ’ শিরোনামে দেওয়া বক্তব্যে বলেন যে ইয়েমেন আল-কায়েদার বৈশ্বিক অপারেশন এবং জ্যেষ্ঠ নেতাদের একটি ‘নিরাপদ স্বর্গে’ পরিণত হয়েছে।
একিউএপির দ্বিতীয় প্রধান ক্ষেত্র হচ্ছে সৌদি আরব। আল-কায়েদার সঙ্গে সৌদি যোগাযোগের একটি দিক হচ্ছে আদর্শিক, অন্যটি ঐতিহাসিক। ওসামা বিন লাদেন সৌদি নাগরিক ছিলেন এবং ১৯৯১ সাল পর্যন্ত সৌদি ক্ষমতাসীনদের সঙ্গে তাঁর কোনো বিরোধই ছিল না। তদুপরি ৯/১১-এর ১৯ জন হামলাকারীর ১৫ জন ছিল সৌদি নাগরিক এবং এই হামলার পরিকল্পনাকারীদের বড় অংশই এসেছিল সৌদি আরব থেকে। এই অভিযোগও আছে যে সৌদি আরবের ক্ষমতাসীন ও প্রভাবশালীরা জ্ঞাতসারেই আল-কায়েদার এই অভিযানে অর্থের সংস্থান করেছিল। এসব তথ্যের পাশাপাশি এটাও আমরা জানি যে ২০০৩ সাল থেকে সৌদি আরবের ভেতরেই আল-কায়েদার সাংগঠনিক শক্তি বৃদ্ধি পেয়েছে এবং আল-কায়েদার জঙ্গিরা বেশ কিছু হামলা চালাতে সক্ষম হয়েছে।
ক্যাথরিন জিমারম্যানের মতে, সাম্প্রতিক কালে আল-কায়েদার শক্তি সঞ্চয়ে সবচেয়ে বেশি ভূমিকা রেখেছে এবং এখনো রেখে চলেছে সিরিয়ার গৃহযুদ্ধ। জাওয়াহিরি যে ইরাক, সিরিয়া ও লেবাননকে গুরুত্বপূর্ণ মনে করেন, সেটা তাঁর একাধিক বক্তব্যেই স্পষ্ট।
এসব সুনির্দিষ্ট আঞ্চলিক শাখার বাইরেও আল-কায়েদার সঙ্গে যুক্ত সন্ত্রাসী সংগঠন আছে এবং তার অনেকগুলো যথেষ্ট শক্তিশালী বলেই বিবেচিত। আল-কায়েদার একটা বড় উপস্থিতি আমরা দেখতে পাই দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায়, যেখানে আঞ্চলিক শাখা না থাকলেও সাংগঠনিকভাবে যুক্ত সংগঠন ছিল বা রয়েছে; যেমন ইন্দোনেশিয়ার লস্কর-এ-জুনাদুল্লাহা, জামিয়া ইসলামিয়া, মালয়েশিয়ায় কুম্পুলান মুজাহিদিন, থাইল্যান্ডের জামিয়া সালাফিয়া। আবু সায়েফ এবং মরো ইসলামিক ফ্রন্ট ইসলামিক স্টেটের প্রতি আনুগত্য প্রকাশের আগ পর্যন্ত আল-কায়েদার সঙ্গেই যুক্ত ছিল। এ ধরনের যোগাযোগ ১৯৯০-এর গোড়া থেকেই উপস্থিত। যে কারণে ১৯৯৪ সালে রামজি ইউসুফ এবং ৯/১১-এর অন্যতম পরিকল্পনাকারী খালিদ শেখ মুহাম্মদ দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় বসেই ১২টি মার্কিন বিমান ছিনতাই করার পরিকল্পনা করেছিলেন; কুয়েতি জঙ্গি ওমর আল ফারুক দক্ষিণ এশীয় গোষ্ঠীর সদস্যদের প্রশিক্ষণের জন্য ক্যাম্প তৈরি করেছিলেন। এসব জঙ্গিই এই অঞ্চলের বিভিন্ন দেশে সন্ত্রাসী হামলা চালায়, যার মধ্যে আছে ২০০২ সালে বালিতে, ২০০৩ সালে জাকার্তায় হোটেলে এবং ২০০৪ সালে অস্ট্রেলিয়ার দূতাবাসে বোমা হামলা। তাদের এসব কার্যক্রমের প্রভাব কেবল দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় নয়, বরং দক্ষিণ এশিয়াতেও আছে।
বাংলাদেশের পাঠক, নিরাপত্তা বিশ্লেষক এবং সন্ত্রাসবাদ–বিরোধী কর্মকাণ্ডের সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিদের জন্য আল-কায়েদার যে আঞ্চলিক শাখার কার্যক্রম বিশেষ মনোযোগ দাবি করে, তা হচ্ছে আল-কায়েদা ইন ইন্ডিয়ান সাব-কন্টিনেন্ট (একিউআইএস)। আর এই শাখার পক্ষ থকেই জুন মাসে প্রকাশিত হয়েছে নতুন দলিল ‘কোড অব কনডাক্ট ফর মুজাহিদিন ইন দ্য সাব-কন্টিনেন্ট’ বা ‘উপমহাদেশের মুজাহিদদের আচরণবিধি’।
আগামীকাল: উপমহাদেশে আল-কায়েদার নজর
আলী রীয়াজ: যুক্তরাষ্ট্রের ইলিনয় স্টেট ইউনিভার্সিটির রাজনীতি ও সরকার বিভাগের অধ্যাপক।