আজ যদি গোস্বা নিবারণী পার্ক থাকত!

সংবাদ সম্মেলনে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের সাবেক মেয়র মোহাম্মদ সাঈদ খোকন
ছবি: প্রথম আলো

ছেলেবেলাকার কথা। গ্রামের এক ‘ইটালি’ সেলুনে ইটের ওপর বসে চুল ছাঁটাই করছি। ছাঁটাই করছিলেন রতন শীল কাকু। বয়স ৭০ বছরের বেশি। কাঁচি চালাতে চালাতে ‘কাস্টমারের’ সঙ্গে গল্প করা ছিল তাঁর অভ্যাস। রতন কাকু বললেন, ‘বুঝলা কাকু, আমি লেহাপড়া না জানলিও এট্টা ইংরিজি কথা শিখিছি।’ আমি বললাম, ‘কী কথা, কাকু?’ তিনি বললেন, ‘এ মোমেন্টোব আঙ্গার মেলোস ইয়োর লাইফ (আ মোমেন্ট অব অ্যাঙ্গার মে লস ইয়োর লাইফ)। মানে হতিছে, এক মিনিটির রাগ গুস্বা তুমার জান পয়মাল কইরে দিতি পারে।’

২০১৮ সালের ২৭ জানুয়ারি গোস্বা নিবারণী পার্কের নির্মাণকাজের উদ্বোধন করেন ঢাকা দক্ষিণ সিটির তখনকার মেয়র সাঈদ খোকন।
ছবি: বাসসের সৌজন্যে

২০১৮ সালে দেখলাম রতন কাকুর মুখস্থ করা সেই কথাটারই মর্মার্থ সে সময়ের ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) মেয়র সাঈদ খোকন গড়গড় করে বলে যাচ্ছেন। মানুষ গোস্বা হলে মাথা গরম হয়, আর মাথা গরম হলে পুরো সোসাইটিতে মারাত্মক ফ্যাসাদ লেগে যেতে পারে। এই জীবনমুখী চিন্তা মাথায় রেখে ওই বছরের ২৮ জানুয়ারি ওসমানী উদ্যানে মাথা গরম হওয়া লোকজনের মাথা ঠান্ডা করার জন্য একটা পার্কের নির্মাণকাজের উদ্বোধন করেছিলেন তিনি। পার্কটির নামও বেশ গালভরা—‘গোস্বা নিবারণী পার্ক’। পার্কটি উদ্বোধনের সময় সাঈদ খোকন বলেছিলেন, ‘নাগরিকদের মধ্যে অনেক সময় মান-অভিমান, গোস্বা হয়ে থাকে। এই পার্কে যখন মানুষ আসবে, স্বাভাবিকভাবে তাদের ভালো লাগবে, উৎফুল্ল লাগবে। এখানে জলের আধার আছে, চা, কফি, স্যান্ডউইচ খাওয়া ও হারানো দিনের গান শোনার ব্যবস্থা থাকবে। ফলে স্বাভাবিকভাবেই এখানে এলে মানুষের গোস্বা নিবারণ হয়ে যাবে। এই চিন্তা থেকেই এটি গোস্বা নিবারণী পার্ক।’

দয়ালের কী লীলা! মেয়রের পদ হারানোর পর থেকেই সাঈদ খোকন গোস্বা হয়ে আছেন। সর্বশেষ ঘটনায় নিজের ও পরিবারের সদস্যদের আটটি ব্যাংক অ্যাকাউন্ট জব্দ হওয়ার পর তাঁর মাথা সাংঘাতিক গরম হয়েছে। কিন্তু গোস্বা নিবারণী পার্কে ঢুকে যে একটু ‘স্যান্ডউইচ খেয়ে হারানো দিনের গান শুনতে শুনতে’ রাগ কমাবেন, সে উপায় নেই। কারণ, ৫৮ কোটি টাকার সেই গোস্বা নিবারণী পার্কের কাজ ১০ মাসের মধ্যে শেষ হওয়ার কথা থাকলেও সাড়ে চার বছরেও শেষ হয়নি। আধাখেঁচড়া কাজ হয়ে আছে। পুরো উদ্যান এখন খানাখন্দে ভরা।

১০ মাসের মধ্যে গোস্বা নিবারনী পার্কের কাজ শেষ হওয়ার কথা ছিল।সাড়ে তিন বছরেও তা শেষ হয়নি। গত মাসে তোলা।
ছবি: সাইফুল ইসলাম

মেয়রের পদ থেকে চলে যাওয়ার পরপর সাঈদ খোকনের পথও খানাখন্দে ভরে গেছে। তাঁর বিরুদ্ধে ওঠা সুনির্দিষ্ট অভিযোগের তদন্ত হচ্ছে। তদন্তের গতি যত বাড়ছে, তাঁর রাগ-গোস্বা তত বাড়ছে। তাঁর ব্যাংক হিসাব জব্দ করার পর তিনি সংবাদ সম্মেলন ডেকে ‘জাতির বিবেকের কাছে’ প্রশ্ন করেছেন, তাঁর সঙ্গে এই আচরণ করা হচ্ছে কেন? এই জিজ্ঞাসাসূচক অভিব্যক্তির ওপর বাড়তি জোর দিতে তিনি বাংলা চলচ্চিত্রের খলনায়ক মিজু আহমেদের ভঙ্গিমায় ‘কেন?’ শব্দটিকে দু-তিনবার অতি উচ্চ স্বরে প্রতিধ্বনিসহ উচ্চারণ করেছেন। তিনি বলেছেন, ডিএসসিসির বর্তমান মেয়র শেখ ফজলে নূর তাপসের প্ররোচনায় দুদক তাঁর বিরুদ্ধে তদন্তে নেমেছে। আদালতের মাধ্যমে তাঁর ব্যাংক হিসাব জব্দ করা হয়েছে।

মেয়র তাপস এটি কেন করতে যাবেন, সাংবাদিকদের এমন প্রশ্নের জবাবে খোকন বলেছেন, তাপস নিজের ব্যর্থতা ঢাকতে তাঁর পেছনে লেগেছেন। তিনি বলেছেন, তাপসের ব্যর্থতা চারদিকে। এখন ঢাকা দক্ষিণে মোড়ে মোড়ে ব্যাগ নিয়ে চাঁদা তোলা হয়। ব্যাপক চাঁদাবাজি হয়। তাঁর বক্তব্যের উচ্চকিত উচ্চারণে অনুমান হয়, তাঁর আমলে এসব কল্পনাও করা যেত না।

তাপসের উদ্দেশে খোকন বলেছেন, ‘কত শতাংশ ভোট পেয়ে নির্বাচিত হয়েছেন, তা এই শহরের মানুষ জানে।...নগর পরিচালনা করতে পারে না। আরও বড় হওয়ার স্বপ্ন দেখো। বড় হওয়ার স্বপ্নে সাঈদ খোকন বাধা নাকি? তুমি বড় হও, আমার কী? আমাকে মেরে বড় হইতে হবে নাকি?’

এর সবই অতি জীবনঘনিষ্ঠ মৌলিক প্রশ্ন। এই প্রশ্ন তিনি ‘জাতির বিবেকের কাছে’ রেখেছেন। সমস্যা হলো, যাত্রাপালার বিবেক সুরে সুরে উচিত কথা বললেও ‘জাতির বিবেক’ নামের বায়বীয় ব্যক্তিটি জন্মগতভাবে বোবা। তাপস কত ভোট পেয়ে মেয়র হয়েছেন এবং এর আগে সাঈদ খোকন কত ভোট পেয়ে মেয়র হয়েছেন, তা এই বিবেক জানে, কিন্তু বোবা বলে বলতে পারছে না।

মশা মারার নকল ওষুধ দিয়ে কোটি কোটি টাকার বিল তুলে রাজধানীবাসীকে ডেঙ্গুর মুখে কে ঠেলে দিয়েছিলেন, গুলিস্তানে ফুলবাড়িয়া মার্কেট-২-এর ৯১১টি অবৈধ দোকান পাবলিকের হাতে দিয়ে তাঁদের কাছ থেকে ‘শাহনেওয়াজ এন্টারপ্রাইজ’ নামের ব্যাংক অ্যাকাউন্টের মাধ্যমে প্রায় অর্ধশত কোটি টাকা কারা নিয়েছেন, চানখাঁরপুল মার্কেটের নির্মাণকাজ চার বছর কারা ফেলে রেখেছে, তা জাতির সেই বোবা বিবেক জানে।
সাঈদ খোকন বলেছেন, তাঁর বিরুদ্ধে যেসব ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে, তা ঢাকাবাসী মেনে নেবে না। তিনি বলেছেন, ‘প্রয়োজন হলে ঢাকাবাসীকে সঙ্গে নিয়ে আরেকবার আন্দোলন করব।’

তাঁর বক্তব্য সঠিক। ‘ঢাকাবাসী’ আপাতত বেকার আছে। কাজকর্ম কমে গেছে। অফিস-আদালত নেই। ব্যবসা-বাণিজ্যও লকডাউনে বন্ধ। শ্রমজীবীরা খেয়ে না খেয়ে আছেন। এই অবস্থায় সাবেক মেয়র সাঈদ খোকনের ব্যাংক থেকে টাকা তোলা যাবে না—এটা তাঁরা মানবেন কেন? তাঁদের যেহেতু কোনো কাজ নেই, সেহেতু তাঁরা সামাজিক দূরত্ব বজায় রেখে আন্দোলনে নামবেন।

সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে সাঈদ খোকন বলেছেন, ‘আমি লাশ দাফন ফ্রি করে দিয়েছিলাম। এখন আজিমপুরে গিয়ে দেখেন একটা লাশ নামানোর আগে টিকিট লাগে।’

আজিমপুর কবরস্থানে গিয়ে আরও একটা জিনিস দেখা যাবে। সেটি হলো সেখানে সৌন্দর্যবর্ধনের জন্য স্বচ্ছ কাচ দিয়ে কবরস্থানের সীমানাপ্রাচীর তৈরি করছিল মেয়র খোকনের ডিএসসিসি। অর্ধশত কোটি টাকার সেই প্রকল্পের কাজ শেষ না হতেই সীমানাপ্রাচীর হিসেবে লাগানো কাচ ভেঙে পড়ছিল। নগর বিশেষজ্ঞরা কবরস্থানে এভাবে কাচের প্রাচীর তৈরির বিষয়কে ‘অন্যায্য অতিরিক্ত খরচ’ বললেও ‘সৌন্দর্যের খাতিরে’ সে সময় মেয়র গা করেননি।

এসব প্রসঙ্গ যদি এখন সামনে আসে, তাতে সাঈদ খোকনের গোস্বা হওয়া স্বাভাবিক। তবে তিনি যদি গোস্বা নিবারণী পার্কটি শেষ করে যেতে পারতেন, তাহলে আজ তাঁকে এত গোস্বা হতে হতো না। সেই পার্কে বসে তিনি ‘হারানো দিনের’ গান শুনতে পারতেন।

সারফুদ্দিন আহমেদ প্রথম আলোর জ্যেষ্ঠ সহসম্পাদক
sarfuddin 2003 @gmail. com