ঈষদুষ্ণ রাজনীতি ও বামপন্থীদের করণীয়

.
.

রাজপথের রাজনীতি আবার সরব হতে শুরু করেছে। এই দৃশ্যপটে বামপন্থীদের বিশেষ অবস্থানটি তুলে ধরা এই রচনার উদ্দেশ্য। বাংলাদেশের বামপন্থী শক্তি ষাট-সত্তর-আশির দশকে এ দেশের সব গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক সংগ্রামে একটি উল্লেখযোগ্য প্রভাবকের ভূমিকা পালন করেছে। সম্প্রতি মনে হচ্ছে, তা তারা পারছে না। কেন?
তাদের একটি অংশ ১৪ দলে প্রবেশ করেছে, মন্ত্রীও হয়েছেন। আশা, আওয়ামী লীগ ও হাসিনাকে প্রভাবিত করে গণতন্ত্র ও ধর্মনিরপেক্ষতা রক্ষা করা যাবে। বহুদিন আগে তাঁদের একজনের সঙ্গে আমি সৈয়দপুরে যাচ্ছিলাম। তাঁকে বলেছিলাম, ছাগলের লেজ ছাগলকে নাড়াতে পারে না বরং ছাগলই ইচ্ছেমতো লেজকে নাড়ায়। তিনি এখন মন্ত্রী হয়েছেন। তাঁকে যদি আমি এখন পুনরায় জিজ্ঞেস করি, ঐক্য করে ‘কতটুকু কী পারলেন?’ তিনি হয়তো বলবেন, ‘তবু তো এটাই “মন্দের ভালো নয় কি? না হলে তো দেশটা জামায়াত-বিএনপি জোটের হাতে চলে যেত।”’
তার পরও যদি তাঁকে আমি জিজ্ঞেস করি, ঘোরতর মন্দকে কি মন্দের ভালোকে আশ্রয় করে শেষ পর্যন্ত ঠেকানো যাবে? ব্যর্থ হলে তখন কি ‘উত্তপ্ত কড়াই’ থেকে ‘জ্বলন্ত উনুনে’ গিয়ে পড়ব না? তখন কি আবার ‘উত্তপ্ত কড়াইয়েই’ ফিরে আসার জন্য ফের একসঙ্গে সংগ্রাম করতে হবে? এর সদুত্তর হচ্ছে, হ্যাঁ, ঘুরেফিরে একই চক্করে আমরা থেকে যাচ্ছি। সোভিয়েত ইউনিয়নের ছত্রচ্ছায়ায় অপুঁজিবাদী পথে সমাজতন্ত্র কায়েমের স্বপ্ন আমরা দেখেছিলাম। সেই স্বপ্নের বশবর্তী হয়ে আমরা একসময় বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগকে নিয়ে শত সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও প্রগতির ধারার চর্চা করেছিলাম। কিন্তু শেষ পর্যন্ত আওয়ামী লীগের ভেতর ও বাইরের প্রতিক্রিয়াশীলদের হাতে তাঁর করুণ মর্মান্তিক মৃত্যু হয়েছিল এবং আমাদের আবার ‘পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে হাসিনাপন্থী আওয়ামী লীগকে’ নিয়েই প্রতিক্রিয়াশীলদের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করতে হয়েছিল। বঙ্গবন্ধুকে সেদিন আমরা শত চেষ্টা করেও বোঝাতে পারিনি যে তাজউদ্দীনকে বাদ দিয়ে মোশতাককে প্রশ্রয় দেওয়া ঠিক হবে না। এবারও শেখ হাসিনা যদি মিত্রদের চিনতে ভুল করেন এবং সে জন্য ক্ষমতাচ্যুত হন, তখন ‘ধর্মনিরপেক্ষতা ও গণতন্ত্র’ রক্ষার জন্য হয়তো বিএনপি-জামায়াত গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে আবার বামদের এক ধাপ পিছিয়ে ঐক্যবদ্ধ লড়াই শুরু করতে হবে। সে ক্ষেত্রে আমরা সবাই জানি ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি হবে, কিন্তু প্রথমবার যেটা হয়েছিল ট্র্যাজেডি, এবার সেটা হবে নিতান্তই প্রহসন!
সুতরাং এভাবে মন্দের ভালো ও মন্দের যে দ্বিদলীয় চক্রের মধ্যে আমরা আটকে আছি এবং ট্র্যাজেডি ও ফার্সের মধ্যে ঘুরপাক খাচ্ছি, তা থেকে বেরোনোর কি উপায় আছে? আমার মতে, উত্তর কঠিন ও সময়সাপেক্ষ হলেও আছে। শুধু আরও ‘মন্দের’ উত্থানের বিরুদ্ধে সজাগ থাকা নয়, পাশাপাশি ‘মন্দের ভালোর’ মন্দ দিকগুলোর বিরুদ্ধেও কার্যকর সংগ্রাম অব্যাহত রাখা এবং সে জন্যই দরকার দুইয়ের বাইরে নিজেদের ও অন্যান্য ভালো শক্তির ঐক্যবদ্ধ ক্ষমতা বৃদ্ধি করে ধীরে ধীরে প্রকৃত সৎ বিকল্প রাজনৈতিক শক্তি–সমাবেশ গড়ে তোলা। এটা হতে হবে সাবস্টিটিউট নয়, অল্টারনেটিভ রাজনৈতিক শক্তি। বামদের তাই একটি স্বতন্ত্র অবস্থান ও ভূমিকা খুবই জরুরি। এ ধরনের একটি দীর্ঘমেয়াদি সংশ্লেষিত ভারসাম্যপূর্ণ ও বহুমুখী রাজনৈতিক ভূমিকাই পারে বামের হৃত গৌরবময় ভূমিকা ফিরিয়ে আনতে। কিন্তু এই বহুমুখী সংগ্রামের মধ্যে কখন কোনটি প্রধান হয়ে উঠবে, সেটি সঠিকভাবে নির্ণয়ের বিচক্ষণতা বাম নেতৃত্বের থাকতে হবে।
এবার সাম্প্রতিক প্রসঙ্গ। ৫ জানুয়ারির নির্বাচনে দক্ষিণপন্থী বিএনপি দক্ষিণপন্থী প্রতিক্রিয়াশীল জামায়াতের প্ররোচনায় যোগ দেয়নি। ফলে প্রকারান্তরে আওয়ামী কৌশলের কাছেই তারা হেরে গিয়েছে। কিন্তু এ কথাও সত্য যে আওয়ামী লীগ যেভাবে ৫ জানুয়ারির নির্বাচনে জয়লাভ করেছে, তা নৈতিকভাবে গ্রহণযোগ্য হয়নি। গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার জন্য এখন আবার সবার অংশগ্রহণভিত্তিক একটি সুষ্ঠু নির্বাচন আজ হোক কাল হোক, হতে হবে। রাজনীতির এই কেন্দ্রীয় প্রশ্নটিকে ঘিরে বামপন্থীদের আশু করণীয় কী হবে? আমরা কি এখনই নির্বাচন চাইব? আমার মতে, বিএনপি-জামায়াত জোটকে ক্ষমতায় বসানোর নির্বাচনের জন্য বামপন্থীদের এই মুহূর্তে আকুল হওয়ার প্রয়োজন নেই। এটা আরও সত্য এ জন্য যে বামপন্থীদের জন্য শুধু ‘ভোটের আনুষ্ঠানিক গণতন্ত্র’ই যথেষ্ট নয়। তাদের জন্য দরকার ধর্মের রাজনৈতিক ব্যবহারমুক্ত, অর্থ ও পেশিশক্তির ব্যবহারমুক্ত একটি অবাধ আনুপাতিক ভোটের সিস্টেম। অর্থাৎ গণতন্ত্রকে আরও অন্তর্ভুক্তিমূলক ও অংশগ্রহণমূলক করার জন্য যে সংস্কারগুলো করা প্রয়োজন, তার একটি তালিকা তৈরি করে সেগুলো আগে আদায়ের জন্যই বামপন্থীদের সংগ্রামী মনোনিবেশ করতে হবে। বর্তমানে এসব প্রয়োজনীয় এক বা একাধিক গণতান্ত্রিক সংস্কারের ইস্যুতে প্রকৃত গণতন্ত্রীদের বিকল্প শক্তি–সমাবেশ গড়ে তোলাই আশু কর্তব্য। কিন্তু এ ধরনের ঐক্যবদ্ধ আন্দোলনের রূপটি এমন হওয়া চাই, যাতে তার ভেতরে বামপন্থীরা হারিয়ে না যায় এবং নতুন একটি অকার্যকর জোটের জন্ম হয়।
বামপন্থীরা অতীতের সব গণতান্ত্রিক আন্দোলনে তাদের ছাপ রেখেছে দুভাবে। প্রথমত, সমাজের অপেক্ষাকৃত নিঃস্বার্থ তরুণ ছাত্রসমাজের মধ্যে তাদের দৃঢ় যে সাংগঠনিক ভিত্তি ছিল, তাকে কাজে লাগিয়ে ছাত্রসমাজকে তারা গণতান্ত্রিক আন্দোলনের পুরোভাগে স্থাপন করতে সক্ষম হয়েছিল। দ্বিতীয়ত, সমাজের শোষিত-বঞ্চিত জনগোষ্ঠী শহুরে শ্রমিক ও গ্রামীণ শ্রমজীবী জনগণকে তারা সংগঠিত করে গণতান্ত্রিক আন্দোলনের মিছিলে টেনে আনতে পেরেছিল। এ জন্যই গণতান্ত্রিক আন্দোলন ও কর্মসূচিগুলোয় তাদের নির্দেশিত প্রগতিশীল উপাদানগুলো সংযুক্ত হতে পেরেছিল। সে কারণেই দেশ ধীরে ধীরে প্রগতির পথে যাত্রা শুরু করতে পেরেছিল।
কিন্তু এখন কি এই কাজগুলো বামপন্থীরা করতে পারছে? দাবিগুলো কি ঠিকমতো তোলা যাচ্ছে, তা কি সাধারণ ছাত্র ও শ্রমিকের দেহমনে কোনো আলোড়ন তৈরি করতে পারছে? এসব বিষয়ে বামপন্থীদের আরও গভীরে গিয়ে তৃণমূলের ছাত্র ও শ্রমিকদের সঙ্গে আলাপ করতে হবে। বামপন্থীদের একাংশ আওয়ামী লীগের ভেতরে ঢুকে বসে আছে, অপরাংশ অন্ধ আওয়ামী লীগবিরোধিতা থেকে বিএনপি-জামায়াত জোটের দিকে ঝুঁকে পড়েছে। তাদের বিচারে আওয়ামী লীগ হচ্ছে ‘মন্দ’, অথচ যে বিএনপি জামায়াতের সরাসরি বন্ধু, সে হচ্ছে ‘মন্দের ভালো’! এই দুই ভ্রান্ত প্রবণতার বাইরে যে বামরা, তারা এখন পর্যন্ত তাদের মিত্র শ্রেণি ও পেশাগুলোর মধ্যে তাদের সাংগঠনিক ভিত্তি খুব প্রসারিত করতে পারেনি। এমনকি জামায়াতেরও যতটুকু ঘাঁটি এলাকা রয়েছে, রয়েছে নানা আর্থিক–সামাজিক-প্রাতিষ্ঠানিক শিকড়, রয়েছে সশস্ত্র-নিরস্ত্র উভয় প্রকার শাখা, দেশি-বিদেশি বিস্তৃত নেটওয়ার্ক, বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক পদে ও রাজনৈতিক দলের মধ্যে দালাল, পত্রপত্রিকা-টিভি রয়েছে, সেসব কিছুই তাদের নেই। এই সেদিন গারো পাহাড়ের পাদদেশ থেকে একজন আমাকে ফোন করে জানাল যে সেখানে অন্য কাগজ যায় না, যায় শুধু জামায়াতের সমর্থক পত্রিকা।
তবে সমাজে ভালো ও পরিচ্ছন্ন লোক হিসেবে বামদের একাংশের এখনো কিছুটা উজ্জ্বল ভাবমূর্তি রয়েছে। বিদ্যমান সমাজতন্ত্রের আনুকূল্যে তাদের যে বিশাল শক্তি ষাট-সত্তর-আশির দশকে একসময় তরতর করে গড়ে উঠেছিল। তারা হয়তো সবাই এখন আর বামপন্থী অবস্থানে নেই। কিন্তু তাদের বেশির ভাগ গণতন্ত্র ও ন্যায়বিচারের প্রশ্নে অঙ্গীকারবদ্ধ। অন্যদের পাশাপাশি তাদেরও যদি ভবিষ্যতে প্রকৃত বিকল্প শক্তি সমাবেশে জড়ো করা যায়, তাহলে বামপন্থীকে কেন্দ্র করে আবার বড় একটি বলয় গড়ে তোলা সম্ভব। তখন উদারনৈতিক গণতন্ত্রীরাও তাতে শামিল হবে। এভাবে পুরো প্রক্রিয়াটিকে ধৈর্যের সঙ্গে এগিয়ে নেওয়ার জন্য প্রয়োজন হবে উদার, বিনয়ী ও স্থিতধী বাম নেতৃত্বের। ছোটাছুটি-হুটোপুটি করে রাতারাতি দুই মেরুর বাইরে একটি জোট গঠন করলেই তাতে বিক্ষুব্ধ মানুষের ঢল নামবে এবং বিকল্প দাঁড়িয়ে যাবে, তা মনে হয় না।
পাকিস্তানি আমলে জাতীয়তাবাদী সংগ্রামের যুগে মূল এজেন্ডা ছিল জাতীয় স্বাধীনতা। এখন মূল এজেন্ডা হবে স্বাধীনতার অসমাপ্ত কর্তব্য সম্পন্ন করা, গণতান্ত্রিক উন্নয়নসাধন ও ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা। পাকিস্তান যুগে সংগ্রামের স্তর অনুযায়ী গণসংগ্রামের কেন্দ্রবিন্দু ছিল জাতীয়তাবাদী শক্তি, কিন্তু এখনকার উন্নততর সংগ্রামে কেন্দ্রবিন্দু হতে হবে সৎ ও উজ্জ্বল ভাবমূর্তিসম্পন্ন উদার ও বিচ্যুতিহীন বামপন্থীদের। সে জন্য গড়ে তুলতে হবে ভিত্তি এলাকা, অসংখ্য সামাজিক প্রতিষ্ঠান এবং সাংগঠনিক শক্ত-পোক্ত নেটওয়ার্ক। আদায় করতে হবে গ্রামসীর ভাষায় বামপন্থীদের প্রতি তৃণমূলে সামাজিক সম্মতি বা আধিপত্য৷
বামদের কারও কারও মনে হতে পারে যে এখানে সমাজতন্ত্র কই? উত্তর হচ্ছে, ‘সমাজতন্ত্র’ মার্কসের মতানুযায়ী কোনো পৃথক সমাজব্যবস্থা নয়। এটি একটি উত্তরকালীন পর্যায়, যার গন্তব্য হচ্ছে সাম্যবাদ, যেখানে উৎপাদন সম্পর্ক হচ্ছে শ্রেণিহীন-শোষণহীন, বণ্টনব্যবস্থা হচ্ছে প্রয়োজন অনুযায়ী এবং রাজনৈতিক ব্যবস্থাটি হচ্ছে সচেতন মানুষের স্বশাসিত একটি প্রতিষ্ঠান। এই দিক থেকে একবিংশ শতকের সমাজতন্ত্রের সঙ্গে প্রকৃত গণতন্ত্রের কোনো দ্বন্দ্ব নেই। এই উজ্জ্বল চিরসবুজ স্বপ্ন এখনো আছে এবং সেই লক্ষ্যে অগ্রসর হচ্ছে একেক দেশ একেকভাবে। আধুনিক চীনের স্থপতি দেং দাবি করেছিলেন যে চীনে একদলীয় ব্যবস্থা, ব্যক্তিমালিকানা ও বাজারকে ব্যবহার ও নিয়ন্ত্রণ করেই মূল লক্ষ্যের দিকে এগোতে হবে। তাই ১৯৭৮ সালে তাঁর বিখ্যাত উক্তিটি ছিল: ‘বিড়াল কালোও হতে পারে, সাদাও হতে পারে, লক্ষ রাখতে হবে যে তা ইঁদুর মারতে পারছে কি না।’ আমি শুধু বাংলাদেশের অতীত অভিজ্ঞতার (১৯৭২-৭৫) পরিপ্রেক্ষিতে যোগ করব—হ্যাঁ, বিড়াল কালোও হতে পারে, কিন্তু খেয়াল রাখতে হবে, যেন সেই কালো বিড়ালটি ইঁদুর মারতে গিয়ে সাদা বিড়ালটিকেও মেরে না ফেলে।
ভবিষ্যতে বাংলাদেশে শেখ হাসিনার সরকার যদি কর্তৃত্বপরায়ণতা ব্যবহার করে যথেষ্ট ‘খাদ’সহ ‘উন্নয়ন’ নিশ্চিত করেন, তাহলে কি আমরা খুশি হব? তাহলে স্বল্প মেয়াদে এই সরকার হয়তো টিকে যাবে, কিন্তু দীর্ঘ মেয়াদে তাতে বাংলাদেশের কল্যাণ হবে না। তাই শেষ বিচারে আমরা একবিংশ শতকের বামেরা চাইব, শুধু ‘উন্নয়ন’ নয়, গণতন্ত্রও থাকুক, ন্যায়বিচারও প্রতিষ্ঠিত হোক। এটা একটি অত্যুচ্চ স্বপ্ন হতে পারে, কিন্তু অত্যুচ্চ স্বপ্ন ছাড়া আজ পর্যন্ত কেউ অত্যুচ্চ বাস্তবতা নির্মাণে সক্ষম হয়নি। বাংলাদেশের তরুণ সমাজ (তরুণ শ্রমিক ও তরুণ ছাত্র) কি সেই স্বপ্ন ও সাধনার জন্য প্রস্তুত? বামপন্থী রাজনীতিবিদেরা কি তাঁদের সেই ভরসা দিতে পারবেন?
এম এম আকাশ: অধ্যাপক, অর্থনীতি বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।