একটি বৃক্ষশালা উদ্বোধন

মির্জাপুরের কুমুদিনী চত্বরে বিষ্ণুপদ বৃক্ষশালার উদ্বোধন
মির্জাপুরের কুমুদিনী চত্বরে বিষ্ণুপদ বৃক্ষশালার উদ্বোধন

গত ২৪ অক্টোবর মির্জাপুরের কুমুদিনী চত্বরে বিষ্ণুপদ বৃক্ষশালার উদ্বোধন সম্পন্ন হলো। উপস্থিত ছিলেন বৃক্ষশালার রূপকার ডা. বিষ্ণুপদ পতি, কুমুদিনী হাসপাতালের সাবেক পরিচালক, তাঁর স্ত্রী জয়া পতি, কুমুদিনী ট্রাস্টের সাবেক মহাপরিচালক, ট্রাস্টের বর্তমান কর্ণধার রাজীব প্রসাদ সাহা এবং এখানকার বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে কর্মরত কর্মকর্তা, শিক্ষক, দুর্গাপূজা উপলক্ষে আসা অতিথি ও ছাত্রীরা। অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনা করেন ভারতেশ্বরী হোমসের শিক্ষক সুলতানা হেনা। অনেকেই বক্তৃতা করেন এবং বলেন বর্তমান পরিবেশ বিপর্যয় রোধে বৃক্ষরোপণের গুরুত্বের কথা।
ডা. পতি জানান, তিনি চত্বরজুড়ে নানা গাছপালা লাগিয়েছিলেন ফুল ও ফলের, বড় সুন্দর হয়ে উঠেছিল ক্যাম্পাসটি। তখন মাঝে মাঝে এখানে বন্যা হতো। একবার এমন বন্যা হলো যে সবগুলো দালানের একতলা পর্যন্ত পানিতে ডুবে গেল এবং মারা পড়ল এখানকার বেশির ভাগ গাছপালা। অতঃপর তিনি হাসপাতালের দক্ষিণের খালি জায়গায় মাটি ভরাট করে বানালেন বর্তমান বৃক্ষশালার ভিত। ৩২০ ফুট লম্বা, ৬০ ফুট চওড়া ও ৪ ফুট উঁচু এবং লাগালেন মরে যাওয়া গাছপালার প্রতিটির এক বা একাধিক নমুনা। পরে তাতে যোগ করেছেন ব্যতিক্রমী ধরনের আরও কিছু বৃক্ষ-লতা-গুল্ম। ধন্যবাদ জানালেন রণদা প্রসাদ সাহা ও জয়া পতিকে, যাঁদের সাহায্য ব্যতীত এটি নির্মিত হতে পারত না। রাজীব প্রসঙ্গক্রমে তাঁর বক্তৃতায় আমাদের আশ্বস্ত করে বললেন, কুমুদিনী কমপ্লেক্সের বিশাল এলাকাটি তিনি ভরে দেবেন আরও গাছপালা লাগিয়ে।
এই বৃক্ষশালায় আছে পঞ্চাশ কি ততোধিক প্রজাতির বৃক্ষ ও লতাগুল্ম। বৃক্ষের মধ্যে উল্লেখযোগ্য—অ্যাভাকাডো (বড় আমের মতো ফল, পুষ্টিমানে সর্বশ্রেষ্ঠ), দারুচিনি, বোম্বাই বেল, তিন জাতের কাঠগোলাপ, পান্থপাদপ, ধারমার, বেলা বা বনকমল, গর্জন, ভেফল, অরোকেরিয়া, সাইকাস, বহেড়া, কলকে, কুরচি, নাগলিঙ্গম, স্বর্ণচাঁপা ইত্যাদি। বন বিভাগের দেওয়া কিছু বনবৃক্ষ শনাক্ত করা যায়নি। লতার মধ্যে আছে মালতী, মাধবী, জুঁই, কুন্দ, উলটচণ্ডাল, ব্লিডিংহার্ট, কুমারীলতা ও গোল্ডেন শাওয়ার (সোনাঝুরিলতা)। গুল্মের সংখ্যা কম, নানা রঙের রঙ্গন ও মুস্যোদণ্ডাই বেশি। আছে ঝাউ, কেও গাছও বাদ পড়েনি। বাগানের একটি কেয়া বা কেতকী সবার নজর কাড়ে, প্রকাণ্ড ও তাতে অজস্র ঠেকমূলের ঝালর। গোটা এলাকাটা ছায়াঘন, বৃক্ষগুলো ২০-৩০ ফুট পর্যন্ত উঁচু। প্রায় প্রতিটিতেই লাগানো আছে নামলিপি।
এ ধরনের বৃক্ষশালা বা আরবোরিয়াম আমাদের দেশে আরও আছে কি না আমার জানা নেই। কিন্তু আমি নিশ্চিত কুমুদিনী ক্যাম্পাসের স্কুল, কলেজ, নার্সিং কলেজ ও মেডিকেল কলেজের ছাত্রীরা এতে সবিশেষ উপকৃত হবে। এখানে প্রতিদিন নানা কাজে লোকসমাগম ঘটে। আশা করি তাঁরাও নামপত্রশোভিত এই বৃক্ষসংগ্রহটি সাগ্রহে লক্ষ করবেন।
বিষ্ণুপদ পতির জন্ম ১৩ মে, ১৯২৭ সালে। মেদিনীপুর জেলার তমলুক পরগনায়। ডাক্তারি পাস করেন কলকাতার আর জি কর (রাধাগোবিন্দ কর) মেডিকেল কলেজ থেকে ১৯৫৩ সালে এবং পরের বছর, ১৯৫৪ সালে চিকিৎসক পদে যোগ দেন টাঙ্গাইলের মির্জাপুরের কুমুদিনী হাসপাতালে। ১৯৫৯ সালে তিনি রণদা প্রসাদ সাহার কনিষ্ঠ কন্যা জয়া সাহার সঙ্গে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন। ১৯৬২ সালে উচ্চশিক্ষার্থে ইংল্যান্ড যান এবং পরে চাকরি নিয়ে বার্মিংহাম শহরে বসবাস শুরু করেন। ১৯৭১ সালের গোড়ার দিকে জয়া পতি অসুস্থ বাবাকে দেখতে পুত্র–কন্যাসহ দেশে ফেরেন এবং মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে এখানে আটকা পড়ে যান। বাবা ও একমাত্র ভাইকে পাকিস্তানি সেনারা ধরে নিয়ে গেলে কুমুদিনী সংস্থা রক্ষার দায়িত্ব তাঁর ওপর বর্তায়। ওই নয় মাস তিনি কীভাবে এই পরিস্থিতি মোকাবিলা করেন এবং নিজে বেঁচে থাকেন, সে কাহিনি দীর্ঘ। যুদ্ধ শেষে বিধ্বস্ত কুমুদিনী সংস্থা পুনর্গঠনের গুরুদায়িত্ব তাঁকে পালন করতে হয় এবং তিনি সাফল্যের সঙ্গে কাজটি সম্পন্ন করেন। ইতিমধ্যে ডা. পতি পুনর্গঠন কর্মে স্ত্রীকে সহায়তা দেওয়ার জন্য বিলাতের বাস উঠিয়ে কুমুদিনীতে ফেরেন এবং হাসপাতালের হাল ধরেন। চিকিৎসক হিসেবে তিনি শুধু দক্ষই নন, ছিলেন দরিদ্রদরদি ও জনপ্রিয়। অধিকন্তু তাঁর ছিল কৃষি, মৎস্য চাষ ও উদ্যান নির্মাণের ঝোঁক এবং বলা বাহুল্য নিসর্গ শোভা তাঁরই একক সৃষ্টি। ১৯৯৯ সালে ডা. পতি ও জয়া পতি অবসর গ্রহণ করেন ও ইংল্যান্ড ফিরে যান।
দীর্ঘ ১৬ বছর পর দুর্গাপূজা উপলক্ষে কুমুদিনীতে তাঁদের পুনরাগমন এবং এই সুযোগে বিষ্ণুপদ বৃক্ষশালা উদ্বোধন।
অনুষ্ঠান শেষে ডা. পতি ও মিসেস পতিকে হুইলচেয়ারে বসিয়ে আমরা উদ্যানটি প্রদক্ষিণ করি এবং পূর্বস্থানে ফিরে এলে সুলতানা হেনা বৃক্ষশালার সাইনবোর্ডে উদ্ধৃত রবীন্দ্রনাথের একটি কবিতা আমাদের আবৃত্তি করে শোনান: হে তরু, এ ধরাতলে রহিব না যবে/ তখন বসন্তে নব পল্লবে পল্লবে/ তোমার মর্মরধ্বনি পথিকেরে কবে,/ ‘ভালো বেসেছিল কবি বেঁচে ছিল যবে।’
লেখাটা এখানেই শেষ হতে পারত। কিন্তু আরেকটু না লিখলে বড় কিছু ত্রুটি থেকে যাবে।
বৃক্ষশালার সঙ্গে আমি অনেক দিন জড়িত। ডা. পতির অনুপস্থিতিতে এই গাছগাছালি দেখাশোনা করেছেন হোমসের শিক্ষক আলফাতুন নেছা, নামপত্র লেখায় সহায়তা দিয়েছেন তরুপল্লব সংস্থার সম্পাদক মোকারম হোসেন এবং সব অর্থ জোগান দিয়েছেন রাজীব প্রসাদের মা, কুমুদিনীর আরেক কান্ডারি শ্রীমতী সাহা। নামপত্রগুলো গাছে লাগাতে সাহায্য করেছেন সুলতানা হেনা ও সঞ্চিতা এবং অতিথি হিসেবে আগত স্থপতিদ্বয় তুগলক আজাদ ও সুমন বিশ্বাস। অধিকন্তু ছিল হোমসের সাবেক অধ্যক্ষ প্রতিভা মুৎসুদ্দির সার্বিক সহায়তা।
দ্বিজেন শর্মা: লেখক, প্রকৃতিবিদ।