শিরোনাম হিসেবে ব্যবহৃত উদ্ধৃতিটির জন্য প্রধানত ‘দায়ী’ করা হয় মারি আঁত্তিওনেতকে। ১৭৮৯ সালের ফরাসি বিপ্লবের সময় ক্ষমতায় থাকা ফ্রান্সের সম্রাট ষোড়শ লুইয়ের মহাপ্রতাপশালী স্ত্রী-সম্রাজ্ঞী ছিলেন এই মারি আঁত্তিওনেত। ফরাসি বিপ্লবের কিছুকাল আগে থেকেই ফ্রান্সে চলছিল প্রচণ্ড খাদ্যাভাব। ইউরোপের বহু দেশের মতো সাধারণ ফরাসিদেরও প্রধান খাদ্য ছিল আলু। খাদ্যাভাবের দুর্যোগে তাঁরা আলু পাচ্ছিলেন না। সে পরিপ্রেক্ষিতেই মারি আঁত্তিওনেত নাকি বলেছিলেন, ‘আলু পাচ্ছে না তো কী হয়েছে? ওরা তো কেক খেলেই পারে।’
উদ্ধৃতিটি সত্যিই মারি আঁত্তিওনেতের কিনা, তা নিয়ে বিতর্ক আছে। তবে পরবর্তী সময়ে এই উদ্ধৃতির সামাজিক-রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক গুরুত্বটা দাঁড়ায় এরূপ—যাঁদের জনগণের অভাব-অনটন, দুঃখ-কষ্ট, রাগ-ক্রোধ, হিংসা-শত্রুতা ইত্যাদি সম্পর্কে মোটেও ধারণা, সমবেদনা বা সহমর্মিতা নেই; কেবল তাঁরাই বলতে পারেন, ‘ভাত পাচ্ছ না তো কী হয়েছে, পোলাও বা বিরিয়ানি খাও।’
২.
করোনাকালের প্রথম জমানায় তৈরি পোশাক কারখানাগুলো বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল। অল্প কয়েক দিনের মাথায় শ্রমিকদের কাছে খবর পৌঁছানো হয়েছিল যে তাড়াতাড়ি আসো, কেননা কারখানা চালু হতে যাচ্ছে। হুড়মুড় করে হাজার হাজার তো বটেই, লাখ লাখ শ্রমিক হেঁটে, রিকশা-ভ্যানে গাদাগাদি করে, অটোরিকশা নিয়ে ধাক্কাধাক্কি করে বিভিন্ন ফেরিঘাটে জমা হয়েছিলেন। অবর্ণনীয় কষ্টে ফেরি পার হয়ে কীভাবে যে তাঁরা সাভারের আশুলিয়ার কর্মস্থলে ফিরেছিলেন, সেই কষ্টের চিত্র আমরা শুধু টেলিভিশনের পর্দায় দেখেছিলাম।
এ চিত্র এরপরও আমরা অনেকবার দেখেছি। আবার দেখলাম ৩১ জুলাই। গত কয়েক দিনের সরকারি ঘোষণা ছিল একটাই—দোকানপাট বন্ধ, কলকারখানা বন্ধ, বন্ধ অফিস-আদালত। আর বারবার শুনছিলাম কঠোর থেকে কঠোরতম বিধিনিষেধের কথা। তারপর হঠাৎ করে আলীবাবা ও চল্লিশ চোরের গল্পের মতো শুনলাম ‘চিচিং ফাঁক’। ১ আগস্ট থেকে সব তৈরি পোশাক কারখানা খুলে গেল। ভাবছি, মালিকদের কেউ হয়তো বলবেন, ‘ওরা পায়ে হেঁটে, ভ্যানে চড়ে কেন আসে? প্লেনে চড়ে আসলেই তো পারে!’
ভাবছি, আমরা কি মেরি এন্থনোয়ার বর্তমান সংস্করণের যুগে পদার্পণ করেছি! দু-চার-পাঁচ শ বাসের কি ব্যবস্থা করা যেত না ফেরিঘাটগুলো থেকে সাভারের আশুলিয়া পর্যন্ত দুই দিনের জন্য?
মহামারিতে বহু দেশই অল্পবিস্তর সমাধান করেছে অথবা সমাধানের পথে সঠিকভাবে এগোচ্ছে। আমরা লকআপ আর লকডাউন, শাটআপ আর শাটডাউন আর সেই সঙ্গে নতুন শব্দ শিখেছি ‘প্রণোদনা’। প্রণোদনার মাথামুণ্ডু এখনো ঠাওর করে উঠতে পারিনি। তবে এটা সহজেই ঠাওর করা যাচ্ছে যে লাখ লাখ লোক গরিব থেকে অতি গরিব হয়েছে, চারদিকে দুঃখ-কষ্ট বেড়েছে।
৩.
আগেও বলেছি। আবারও বলছি। অধমের ফেসবুক অ্যাকাউন্ট নেই, কারও ফেসবুক অ্যাকাউন্ট দেখি না, দেখতে চাইলেও চোখ বাধা দেয়। তাই যা বলব, তা শোনা কথা। বড় বড় নেতার ফেসবুক অ্যাকাউন্ট আছে। অনেকের অ্যাকাউন্ট নাকি ভীষণ সক্রিয়। অহরহ, ডজন-ডজন ছবি পোস্ট করেন। নিজের ছবি, বিভিন্ন ধরনের ‘পোজ মেরে’। মারি আঁত্তিওনেতও নাকি বহু বহু অর্থ ব্যয় করতেন বিলাসবহুল এবং অতি উচ্চ দামের পোশাক-আশাকের পেছনে। নিন্দুকেরা বলেন, তাঁর পোশাক-আশাকের খরচ মেটাতেই নাকি ফরাসি সাম্রাজ্যের কোষাগারে টান পড়ে। আর আজ শুনছি, ঢাকা শহরে পুরুষদের স্যুট সেলাইয়ে দরজির খরচ এখন নাকি ৫০ হাজার টাকা।
পোশাক কারখানা চলুক, মালিকদের লাভ হোক। ডলার আসবে, আমরা তাতেই খুশি। প্রবাসী শ্রমিকেরা বঙ্গোপসাগরে নৌকা ডুবে মারা যান, মালয়েশিয়া-থাইল্যান্ডের বনে-জঙ্গলে ঘাস-পাতা খেয়ে থাকুন, লিবিয়ার মরুভূমিতে পোশাকশ্রমিকদের থেকেও কষ্টে দিন কাটান। তাতে আমাদের খুব একটা আসে যায় না। ভূমধ্যসাগরে আমাদের দেশ থেকে যাওয়া শ্রমিকদের সলিলসমাধি ঘটে, নারী শ্রমিকেরা নিগৃহীত-নির্যাতিত হন বহু দেশে। তাতে হয়েছেটা কী? রেমিট্যান্স তো আসে! আমরা যাঁরা হিসাবে ব্যস্ত, তাঁদের সুখ ইদানীং আরও বেড়েছে। এখন রেমিট্যান্সের প্রায় সব টাকাই আসে বিকাশ, নগদ ইত্যাদিসহ ব্যাংকিং চ্যানেলে। হুন্ডি প্রায় বন্ধই হয়ে গেছে। হয়তো আর কিছুদিনের মধ্যেই বাংলাদেশ ব্যাংক হাফ সেঞ্চুরি করবে। আমাদের রিজার্ভ হয়ে যাবে ৫০ বিলিয়ন ডলার।
এত ভালো খবরের মধ্যে কিছু দুঃখ-কষ্ট তো থাকবেই। করোনায় চিকিৎসা না পেয়ে মানুষ তো মারা যাবেনই। স্কুল-কলেজ বন্ধের ৫০০ দিন পেরিয়ে গেছে। প্রবাসে গিয়ে গতর খাটা কাজের জন্য আমরা আরও বহু কিশোর-কিশোরী তৈরি করছি। পড়াশোনা যেহেতু শেষ হয়ে গেছে, তাই বিদেশে গিয়ে গতর খাটা ছাড়া অন্য কোনো গত্যন্তর তাদের থাকবে না। আবারও বলছি, তাতে কী? ডলার তো বাড়বে! শত বা হাজার কোটি টাকার প্রকল্প বাস্তবায়নে অর্থের অভাব হবে না। এই করোনার মধ্যেও কোটি টাকার বেশি টাকা জমা আছে, এমন ব্যাংক অ্যাকাউন্টের সংখ্যা বেড়েছে ১১ হাজারের বেশি।
৪.
করোনা ও আনুষঙ্গিক সমস্যাগুলো নতুন, ব্যাপক ও ভয়াবহ। তবে বহু দেশই অল্পবিস্তর সমাধান করেছে অথবা সমাধানের পথে সঠিকভাবে এগোচ্ছে। আমরা লকআপ আর লকডাউন, শাটআপ আর শাটডাউন আর সেই সঙ্গে নতুন শব্দ শিখেছি ‘প্রণোদনা’। প্রণোদনার মাথামুণ্ডু এখনো ঠাওর করে উঠতে পারিনি। তবে এটা সহজেই ঠাওর করা যাচ্ছে যে লাখ লাখ লোক গরিব থেকে অতি গরিব হয়েছে, চারদিকে দুঃখ-কষ্ট বেড়েছে। দরকার ছিল সবাইকে নিয়ে মিলেমিশে আলাপ-আলোচনা করে সমাধানের পথ খোঁজা। সমস্যাটা যেহেতু নতুন, অত্যন্ত জটিল এবং তদুপরি সারা বিশ্ব এই সমস্যায় জর্জরিত; তাই এক মাথা বা পাঁচ মাথা থেকে এই সমস্যার সমাধান বেরোবে না। অনেক মাথা, অর্থাৎ অনেকের চিন্তাভাবনা, যুক্তি-সমাধান এককাট্টা করে যৌথ পথে এগোতে হবে। রাতে ডাউন, সকালে আপ করলে হবে না।
অবশ্য সবই দুরাশা। প্রধানমন্ত্রীর আশ্রয়ণ প্রকল্পের অনেক বাড়িঘরের দেয়ালে ফাটল ধরছে, আঁকাবাঁকা হয়ে যাচ্ছে, আরও কত-কী! এসব নিয়ে সংবাদমাধ্যমে প্রতিবেদন আসছে প্রতিনিয়ত। তদন্ত হচ্ছে বা হবে ছাড়া আর কোনো জবাবদিহির বয়ান শুনিনি। শত শত কোটি টাকার চিকিৎসা সরঞ্জাম ভেস্তে গেছে। একমাত্র পরিণতি যেটা সংবাদমাধ্যমের নজরে পড়েছে, সেটাও একই ধরনের। অর্থাৎ তদন্ত হচ্ছে।
শুরুর কথায় ফিরে আসি। অবস্থার পরিবর্তন হয়। কিন্তু তত দিনে মুষ্টিমেয় লোক কেক খেতে প্রচণ্ড অভ্যস্ত হয়ে যায়, তবে আলু বা ভাত না পাওয়া লোকদেরও ধৈর্যের বাঁধ একদিন ভেঙে যায়। তাই কায়মনোবাক্যে প্রার্থনা করছি, এ দেশে জবাবদিহির একটা ব্যবস্থা যেন অচিরেই চালু হয়। দুঃখী মানুষকে যারা আরও দুঃখী করছে, তাদের বিহিত করার ব্যবস্থা যেন নেওয়া হয়।
ড. শাহদীন মালিক বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ও গণবিশ্ববিদ্যালয়ের আইনের শিক্ষক