
ইংরেজরা বড্ড রসিক জাতি। পাতাবাহার গাছের একটি প্রজাতি আছে, সেটার ফলগুলো একেকটা একেক রঙের এবং পাতাগুলোও ভিন্ন ভিন্ন আকৃতির; তাই তাঁরা ওটার নাম দিয়েছে ‘ম্যাচ মি ইফ ইউ ক্যান’ আর উপমহাদেশে এসে কাঁঠালগাছ ও গাছে লটকানো কাঁঠাল ফলের সঙ্গে তাঁদের সাক্ষাৎ ঘটলে পর তারা ওটার নাম দিয়েছে ‘জ্যাকফ্রুট’। গাছটি প্রায়ই বনবাদাড়ে জন্মায় দেখতে পেয়ে তারা ধরে নিল, ওটার ফলটা খায় শিয়ালে; আর শিয়ালের ইংরেজি প্রতিশব্দ হচ্ছে ‘জ্যাকেল’ তথা ‘জ্যাক’, যা থেকে ‘জ্যাকফ্রুট’ নামের নাকি উৎপত্তি।
সময়টা কাঁঠাল তথা ফলফলাদির সিজন, তাই বাজারে প্রচুর কাঁঠালের সমাগম পরিলক্ষিত হয়। তো সেদিন শুক্রবার বাজারে বিশাল আকারের ও আপাতদৃষ্টিতে উন্নত মানের একটি কাঁঠাল বিক্রির জন্য মজুত দেখে আমার খুব লোভ হচ্ছিল। কিন্তু এত বড় কাঁঠাল একা আমার পক্ষে সামাল দেওয়া সম্ভবপর ছিল না। আশির দশকে সার্ক সম্মেলনে মালদ্বীপ যাওয়ার পথে মাদ্রাজে, যেটার বর্তমান নাম হচ্ছে চেন্নাই, দেখে এসেছিলাম ওখানে ওরা কাঁঠালের কোষ বিভিন্ন সাইজের পলিথিনের ব্যাগে করে রাস্তার পাশে দেদার বিক্রি করছে, কাউকে আস্ত কাঁঠাল কিনতে হয় না। আর সাম্প্রতিক কালে সিঙ্গাপুরে বেড়াতে গিয়ে দেখি, সুপারশপের দুই কর্মচারী হাতে হাতমোজা লাগিয়ে কাঁঠালগুলো ভেঙে চারটি করে কোষ শোলার ছোট্ট ট্রেতে করে পলিথিন দ্বারা মুড়িয়ে বিক্রি করছে। তৎক্ষণাৎ তা কিনে সুপারশপ থেকে বেরিয়ে নিরিবিলি রাস্তার পাশে বেঞ্চিতে বসে আমরা স্বামী-স্ত্রীতে ওগুলো খুব মজা করে খেলাম; অতঃপর উচ্ছিষ্ট পাশেই রাখা ডাস্টবিনে ফেলে দিয়ে এলাম। আমাদের দেশে এমনটি ঘটবে কবে?
সে যাকগে। কাঁঠাল সচরাচর পাহাড়ি অঞ্চলেই অধিক পরিমাণে জন্মায়। আর অনেকটা পাহাড়ি অঞ্চল বলে খ্যাত সীমান্তবর্তী জেলায় জন্মগ্রহণ ও বাল্যকাল অতিবাহিত করার করণেই বোধকরি কাঁঠালের প্রতি আমার প্রচণ্ড আসক্তি। মনে পড়ে, ছোটবেলায় টিলার চূড়ায় নির্মিত পৈতৃক বসতবাড়িতে বেড়ে ওঠার সময় কাঁঠালের সিজনে কোনো কোনো দিন সকাল বেলায় ঘুম থেকে উঠে টিলার পাদদেশে খননকৃত পুকুরে হাত-মুখ ধুতে যাওয়ার পথে টিলার গা ঘেঁষে গজানো কাঁঠালগাছের কোনো কাঁঠালে কাঠবিড়ালিকে মুখ দিতে দেখেই বুঝে ফেলতাম যে ওটা গাছে পেকে গেছে। অতঃপর লাঠি জাতীয় জিনিসের সাহায্যে কাঁঠালটি ধরাশায়ী করে বৃক্ষতলে বসেই পুরো কাঁঠালটি সাবাড় করে বিচি তথা বীজগুলো পুকুরের পানিতে ধুয়ে পরিষ্কার করে বাড়িতে নিয়ে আসতাম। আম্মা তাতেই খুশি। কারণ, তিনি ওগুলো রোদে শুকিয়ে সংরক্ষণ করতেন ও বৃষ্টি-বাদলার দিনে আমরা ওগুলো কড়াইতে ভেজে খেতাম, তা ছাড়া আম্মা ওগুলো কেটে মাঝে মাঝে তরকারিতেও দিতেন। আজকাল বয়স হওয়ার কারণে কাঁঠাল আর তেমন খাওয়া হয় না: ওটা গুরুপাক হওয়ার কারণে পেটের অসুখ তথা হজমের সমস্যা হয়। তবে অনেকগুলো বছর পূর্বে এক হিতৈষী বন্ধু শিখিয়ে দিয়েছিলেন, কাঁঠাল খাওয়ার পর একটা বীজ চিবিয়ে রস খেয়ে ফেললে সেটা হজমের সহায়ক হয়। ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা থেকে জেনেছি, টোটকাটি আসলেই ফলপ্রদ।
ছোটবেলায় যখন গ্রামে বাস করতাম তখন আরও দেখতাম, আম-কাঁঠালের সিজনে কারও কারও বাড়িতে ছেলের শ্বশুরবাড়ি থেকে বড় বড় কাঁঠাল ও সঙ্গে খই আসত এবং পাড়া-প্রতিবেশী ও আত্মীয়-স্বজনদের এই উপলক্ষে দাওয়াত করে নিয়ে আসা হতো। অতঃপর সবাই মিলে কাঁঠালগুলোকে ভেঙে খই সহযোগে ফুর্তি করে খাওয়া হতো। গ্রাম-বাংলার রসগল্পেও কাঁঠাল যথারীতি বিদ্যমান। এই যেমন, অনেক দিন আগে এক গ্রামে যদু ও মধু নামে দুই যমজ ভাই ছিল। তাদের দুজনের চেহারায় এতটাই মিল ছিল যে তাদেরকে পার্থক্য করা খুবই কঠিন হতো, এমনকি তাদের মা-বাবাও সহজে বুঝতে পারবেন না কে যদু আর কে মধু। তো একদিন যদু তাদের বাড়িসংলগ্ন হাটে গিয়ে দেখে দূরের একজন বিক্রেতা বেশ বড় এক জোড়া কাঁঠাল নিয়ে বসে আছে। কাঁঠালগুলো তার খুবই পছন্দ হলো, কিন্তু বিক্রেতা অতিরিক্ত দাম হাঁকানোয় যদু বলে উঠল, ‘এই কাডাল আমি একলাই একটা খাইতে পারি। তায় এত দাম হাঁকাচ্ছো ক্যা?’ অতঃপর তাদের দুজনের মধ্যে যে কথোপকথন হলো, তা নিম্নরূপ:
বিক্রেতা: চাপা মারার আর জায়গা পাও না? তুমি যদি একলা এই একটা কাডাল খাইতে পার, তাইলে দুইটাই তোমারে ফ্রি দিমু।
যদু: কথার নড়চড় হইব না তো?
বিক্রেতা: না হইব না। তয় কাডাল তোমারে এইখানে বইসা খাইতে হইব।
যদু তৎক্ষণাৎ কাঁঠাল খেতে বসে গেল। অর্ধেক কাঁঠাল সাবাড় করার পর সে বিক্রেতাকে বলল, একটু পানি খাওয়া দরকার। আমি বাড়ি গিয়ে পানি খাইয়া আসি। যামু আর আমু।
বিক্রেতা তাতে রাজি হয়ে গেল। যদু বাড়িতে এসে মধুকে সবটা বলে বাকি অর্ধেক কাঁঠাল খেতে পাঠাল। গল্পটার উপসংহার সহজেই অনুমেয়। শুধু এটুকুই বলা বোধকরি যথেষ্ট হবে যে বাজিতে যদুরই জয় হয়েছিল এবং দুটো কাঁঠালই সে মাগনা পেয়েছিল।
পরিশেষে প্রাসঙ্গিক মজার গল্পটি পরিবেশন করছি: জনৈক পাঠান আমাদের দেশে এসে কাঁঠাল খেয়ে স্বদেশে প্রত্যাবর্তনের পর বন্ধুর কাছে প্রশ্ন করেছিল, ‘ইয়ার, বাঙাল মুল্লুকমে এক আজীব ফুরুট (আশ্চর্য ফল) খায়া। বাহারমে খাদরা-খাদরা, আন্দরমে লাবড়া-লাবড়া (বাহিরে শক্ত, ভেতরে নরম), আওর অন্দরমে এক ডাণ্ডা ভি হ্যায় (এবং ভেতরে একটি ডান্ডাও আছে)। খোদা কা নূর খারাপ কর দিয়া, অর্থাৎ তাঁর দাড়িতে কাঁঠালের আঠা লেগে বিতিকিচ্ছি ব্যাপার ঘটে গেছে।
সাধে কি আর আফগান লোকটি বলেছিল, বাঙালমে আয়া। কাঁঠাল খায়া, ইয়া গজব খায়া! জয় হোক তাই বাংলাদেশের কাঁঠালের।
আতাউর রহমান: রম্যলেখক৷ ডাক বিভাগের সাবেক মহাপরিচালক৷