কী রকম হতে পারে এবারের বিশ্বমন্দার প্রভাব
বৈশ্বিক মহামারি বা পেন্ডেমিকের কারণে যে মন্দা, মহামন্দা বা রিসেশান হয়েছে, তার মধ্যে ১৮৭০ সালের পর মাথাপিছু উৎপাদনে ধস নামার হিসাবে সবচে ভয়াবহ মন্দা হলো ২০২০-এর মহামন্দা। অন্য সব মন্দা বা মহামন্দার চেয়ে ২০২০-এর মহামন্দার একটি পার্থক্য হলো, এর গতি ও গভীরতা এমন প্রবল হয়েছে যে, বিশ্ব অর্থনীতির পুনরুদ্ধার তথা রিকভারি হবে অনেক ধীরগতিসম্পন্ন। যদিও সাধারণত মন্দার পরপর উৎপাদনে উল্লম্ফন ঘটে। উদীয়মান বাজার এবং উন্নয়নশীল অর্থনীতিতে অন্তত ৬০ বছরের মধ্যে সবচে বড় সংকোচন হচ্ছে (২.৫%) এই ২০২০-এর মহামন্দায়। অন্য সব মন্দার চেয়ে ২০২০-এর মহামন্দা আলাদা আরও এই কারণে যে, কোভিড-১৯-এর প্রকৃতি পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে এবং পেন্ডেমিক বিষয়ে নতুন নতুন তথ্য পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে নিচের দিকে এর গভীরতার মাত্রা দফায় দফায় পরিবর্তন করতে হয়েছে।
হার্ভার্ড ইউনিভার্সিটির অর্থনীতির অধ্যাপক কেনেথ রগোফের এবং ইউএস ফেডারেল রিজার্ভ সিস্টেমের বর্তমান চেয়ার জেরম পাওয়েলের মন্তব্য দুটিতে ২০২০-এর মহামারির মাত্রা ও তীব্রতা প্রকাশ পেয়েছে। অধ্যাপক রগোফ বলেন, বৈশ্বিক উৎপাদনে স্বল্পকালীন ধস এখনই যা দেখা যাচ্ছে, তাতে মনে হচ্ছে গত ১৫০ বছরের যেকোনো রিসেশানকে এটা ছাড়িয়ে যাবে। আর পাওয়েল বলেন, ২০২০-এর ডাউন-টার্নের অর্থাৎ ২০২০ সালের পেন্ডেমিক কালে বৈশ্বিক উৎপাদনের এই যে নিম্নমুখী ভাব এবং এর যে গতি, তা বর্তমান সময়ে বিরল এবং উল্লেখযোগ্যভাবে দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের মন্দা থেকেও খারাপ।
যতই দীর্ঘ হচ্ছে কোভিড-১৯-এর স্থায়িত্বকাল, বিশ্বমন্দার সূচকগুলো ততই খারাপের দিকে যাচ্ছে। যতক্ষণ না কার্যকর ভ্যাকসিন আবিষ্কার হচ্ছে, ততক্ষণ শারীরিক দূরত্ব, মাস্ক ব্যবহারের এবং অন্যান্য সতর্কতামূলক ব্যবস্থা গ্রহণের প্রয়োজনীয়তা দেখা দেবে এবং কলকারখানা বন্ধ থাকবে অর্থাৎ অর্থনৈতিক কার্যক্রম বন্ধ থাকবে। আর অর্থনৈতিক কার্যক্রম বন্ধ থাকা মানেই উৎপাদন বন্ধ থাকা, যাতে মোট উৎপাদন কমে যাবে এবং মানুষ চাকরি হারাবে, বেকারত্ব বাড়বে।
এই নিরিখে, আইএমএফ তার জুন পূর্বাভাস প্রকাশ করেছে। এতে দেখা যাচ্ছে, তার এপ্রিল পূর্বাভাসের চেয়ে বিশ্ব অর্থনীতির সব সূচকই অধিকতর খারাপ। এপ্রিলে প্রকাশিত পূর্বাভাসে বিশ্ব অর্থনীতি বর্তমান বছরে ৩% কমার কথা বলা হয়েছিল। জুন মাসে প্রকাশিত পূর্বাভাসে বিশ্ব অর্থনীতির সংকোচন ৪.৯% হবে বলে জানানো হয়েছে অর্থাৎ সংকোচনের পরিমাণ ১.৯ শতাংশ পয়েন্ট বাড়বে। ২০২০ ও ২০২১ এই দুই বছরে মোট (কিউমুলেটিভ) উৎপাদন (গ্লোবাল জিডিপি) কমে যাবে ১২.৫ ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলার। ‘গ্রেট ডিপ্রেশান’ খ্যাত যে বিশ্বমন্দা ১৯২৯ থেকে ১৯৩৩ সাল পর্যন্ত হয়েছিল, তার পরই সবচেয়ে ভয়াবহ বিশ্বমন্দা হচ্ছে কোভিড-১৯-এর বিশ্বমন্দা, যা আইএমএফের প্রধান অর্থনীতিবিদ গীতা গোপিনাথ স্মরণ করিয়ে দেন।
২০২১-এ বিশ্ব অর্থনীতির ঘুরে দাঁড়াবার যে আভাস আইএমএফ জুন মাসে প্রকাশ করেছে, তাতেও দেখা যাচ্ছে যে, এপ্রিল পূর্বাভাসের চেয়ে ০.৪ শতাংশ পয়েন্ট কম অর্থাৎ বর্তমান হিসাব অনুযায়ী রিকভারি হবে ৫.৪% হারে। এটা স্মরণ রাখা দরকার যে, দীর্ঘস্থায়ী লকডাউন এবং লকডাউন পরবর্তী সময়েও সোশ্যাল বা ফিজিক্যাল ডিসট্যান্সিং আরও বেশ কিছুদিন চলবে, যা সরবরাহ ব্যবস্থায় সাধারণ হিসাবের চেয়েও বেশি মাত্রায় ধস নামাবে এবং এর কুফল অন্তত আগামী বছরের প্রথমার্ধ নাগাদ থাকবে। যেসব ব্যবসা টিকে থাকবে, তাদের কর্মক্ষেত্রে নিরাপত্তা ও জীবাণু নিরোধের জন্য অতিরিক্ত ব্যয় করতে হবে, যাতে উৎপাদনশীলতা ব্যাহত হবে। বলার অপেক্ষা রাখে না যে, অর্থনৈতিক কার্যক্রমে ধস নামলে বিশ্ব শ্রমবাজারেও তার ধাক্কা লাগে। আইএমএফের হিসাব অনুযায়ী, বর্তমান বছরের দ্বিতীয় ৩ মাসে ৩০০ মিলিয়নের বেশি পূর্ণকালীন চাকরি (ফুল-টাইম জব) চলে গেছে। যদিও আইএলওর হিসাবে ২০১৯-এর শেষ ভাগের তুলনায় ২০২০-এর দ্বিতীয় ভাগে পূর্ণকালীন চাকরি চলে যাওয়ার সংখ্যা ৪০০ মিলিয়ন এবং এ হিসাবে বেকারত্বের হার দাঁড়িয়েছে ১৪%। এর মধ্য আবার শুধু মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রেই বেকারত্বের হার ১৮.৩%। উল্লেখ্য, গ্রেট ডিপ্রেশনের সময় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রেই বেকারত্ব ২৩% পর্যন্ত উঠেছিল।
বিশ্বব্যাংকের পূর্বাভাস অনুসারে অবশ্য ২০২০ সালে বিশ্ব অর্থনীতির সংকোচন হবে ৫.২% যা ৮ দশকের মধ্যে বা দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের পর সবচেয়ে ভয়াবহ এবং ২০০৮-২০০৯-এর বৈশ্বিক মন্দার (গ্লোবাল রিসেশানের) তিন গুণ। অবশ্য মহামন্দার সময় বিশ্ব অর্থনীতির সংকোচন হয়েছিল ১৫%। তবে এই সংকোচন আরও গভীর হবে যদি কোভিড-১৯-এর এই মহামারি নিয়ন্ত্রণে আনতে প্রত্যাশিত সময়ের চেয়ে বেশি সময় লাগে। এর মধ্যে ২০২০ সালে উন্নত দেশগুলোর সংকোচন হবে ৭.০, উদীয়মান ও উন্নয়নশীল (ইমার্জিং অ্যান্ড ডেভেলপিং ইকোনমিজ) অর্থনীতির দেশগুলোর সংকোচন হবে ২.৫%, চায়নার প্রবৃদ্ধি হবে ১%, চায়না ছাড়া অন্য সব উদীয়মান ও উন্নয়নশীল অর্থনীতির দেশগুলোর সংকোচন হবে ৩.৬%, দক্ষিণ এশিয়ার সংকোচন হবে ২.৭%, এবং সংকোচনের হার ভারতের ৩.২% আর পাকিস্তানের ২.৬%। বিশ্বব্যাংকের এই পূর্বাভাস অনুসারে বাংলাদেশের সংকোচন নয় বরং প্রবৃদ্ধি হবে ১.৬%।
বিশ্বব্যাংকের হিসাবে ২০২১ সালে বিশ্ব অর্থনীতির ঘুরে দাঁড়ানোর হার হবে মাঝারি ধরনের অর্থাৎ ৪.২%, উন্নত দেশগুলোর ৩.৯%, উদীয়মান ও উন্নয়নশীল দেশগুলোর ৪.৬%, চায়নার ৬.৯%, সাউথ এশিয়ার ২.৮%, ভারতের ৩.১%, পাকিস্তানের ০.২% এবং বাংলাদেশের ১.০%। তবে বৈশ্বিক মহামারির কারণে অর্থনৈতিক ব্যবস্থা অর্থাৎ ফাইন্যান্সিয়াল সিস্টেম যদি অটুট থাকে এবং এই সংকট উত্তরণে যদি রাজস্ব, আর্থিক ও অর্থনৈতিক অন্যান্য ব্যবস্থা চালু থাকে, শুধু তাহলেই বিশ্ব অর্থনীতির এই পুনরুদ্ধার সম্ভব।
রিসার্চ ফাইন্ডিং অনুযায়ী, প্রোডাকশন তথা আউটপুটের চেয়ে ট্রেড বেশি অস্থিতিশীল এবং বিশেষ করে সংকটের সময় আউটপুটের চেয়ে ট্রেডের পতনের হারও বেশি হয়। সেই নিরিখে, ২০২০ সালে, বিশ্বব্যাংকের পূর্বাভাস অনুযায়ী, বিশ্ব বাণিজ্যের সংকোচন হবে ১৩.৪%। ২০২১ সালে বিশ্ব বাণিজ্যের পুনরুদ্ধার কী হারে হবে, সে বিষয়ে কোনো পূর্বধারণা করা যাচ্ছে না, কারণ এটা নির্ভর করে অনেক কিছুর ওপর। যেমন আর কত দিন লকডাউন থাকবে, কত দিন যাতায়াত ও মালামাল চলাচলের ওপর কড়াকড়ি আরোপ থাকবে, কত তাড়াতাড়ি মানুষের আস্থা পুনঃস্থাপন করা যায়, দেউলিয়া হয়ে যাওয়া ফার্মগুলো কত তাড়াতাড়ি প্রতিস্থাপন করা সম্ভব প্রভৃতি। তবে, মন্দার পর সাধারণত যে হারে রিকভারি হয়, এবারের পেন্ডেমিক পরবর্তী বছরে অর্থাৎ ২০২১ সালের রিকভারি, ব্যতিক্রমধর্মী চারিত্র্যের কারণে, সেই হারে হবে না; বরং এবারের রিকভারি হবে ইতিহাসের সবচে দুর্বল রিকভারি।
আগেই উল্লেখ করা হয়েছে, দক্ষিণ এশীয় অর্থনীতির সংকোচন হবে ২.৮% আর ভারতের ৩.১%। এখানে স্মর্তব্য, বিশ্বব্যাংকের এক হিসাব অনুযায়ী, ভারতের মাথাপিছু জিডিপি ১ শতাংশ পয়েন্ট বাড়লে, তা দক্ষিণ এশিয়ার অন্য দেশগুলোর মাথাপিছু জিডিপি ০.৪৯ শতাংশ পয়েন্ট বাড়ে। বিশেষ করে বাংলাদেশ-ভারত আমদানি-রপ্তানি দুই দেশেরই প্রবৃদ্ধির নিয়ামক। দক্ষিণ এশীয় অর্থনীতির আর একটা গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, এখান থেকে প্রচুর শ্রমিক মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে কাজ করেন, যাঁদের পাঠানো রেমিট্যান্স প্রবাহও সাউথ এশিয়ান অর্থনীতির একটা বড় নিয়ামক। তেলের দাম, তেলের বাজারে কোনো ধরনের ধস মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে বিভিন্ন খাতে শ্রমিক নিয়োগের সক্ষমতার সঙ্গে যুক্ত। দক্ষিণ এশিয়ান অর্থনীতির জন্য একটা গুরুত্বপূর্ণ তথ্য হলো, তেলের দাম ১ ইউএস ডলার হ্রাস পেলে দক্ষিণ এশিয়ায় রেমিট্যান্স প্রবাহ ০.২৮ শতাংশ পয়েন্ট কমে যায়। বিশ্বব্যাংকের বিগত ১০ বছরের হিসাব অন্তত তা-ই বলে।
২০২০-এর বৈশ্বিক মহামারির মন্দার তীব্রতা ও গভীরতা অনেক বেশি হলেও এর প্রকৃতিগত সব খবরই কিন্তু খারাপ নয়। অধিকাংশ রিসেশানেরই একটা বড় কারণ ব্যাংকিং খাত তথা আর্থিক বাজারের ধস এবং এর ফলে যে ফাইন্যান্সিয়াল শক তৈরি হয়, তা একসময় আবাসন খাতের বাজারে বাবল সৃষ্টি করে এবং তা বিস্ফোরিত হয়। এবারের মন্দায় তা হয়নি। সুনিয়ন্ত্রিত আর্থিক ব্যবস্থা সমস্যার অংশ না হয়ে বরং এখন সমাধান করতে সাহায্য করবে।
ড. এম এন তরুণ: ভিজিটং ফ্যাকাল্টি, সাইবেরিয়ান ফেডারেল বিশ্ববিদ্যালয়, রাশিয়া।