‘কৃষক লীগের’ বনেদি ক্লাব এবং মেসির শিল্প আন্দোলন

নতুন দরে নতুন জার্সি হাতে ফুটবলার লিওনেল মেসি
এএফপি

মেসি তাঁর ক্যারিয়ারের শেষ অধ্যায়টি উজ্জ্বল করে রাখার জন্য ফ্রেঞ্চ লীগের পিএসজিতে যোগ দিয়েছেন, এটা সবাই কমবেশি জেনে গেছেন। তবে মনস্তাত্ত্বিকভাবে মেসি যে সিদ্ধান্ত নিলেন, তা শিল্পের ইতিহাস বিচারেও যথেষ্ট গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে ফ্রান্সের ফুটবল ও প্যারিসের শিল্পকলার ইতিহাসে কোথায় যেন মিল পাওয়া যায়। টাকার অঙ্কে হিসাবটা ঠিক মেলে না। বিষয়টি খোলাসা করার আগে কিছু তথ্য যোগ করি।

গত দুই দশকে দুইবার বিশ্বকাপ জিতেও ফ্রেঞ্চ লীগ ইউরোপ ক্লাব পর্যায়ে জাতে উঠতে পারেনি, তার পেছনের কারণটা কী? অথচ সেই ষাটের দশকে ইংল্যান্ড মাত্র একবার বিশ্বকাপ জিতল। বাণিজ্যিক কারণ ছাড়া মিডিয়া হাইপ ও বিভিন্ন দেশের কুশলী ফুটবলারদের কল্যাণে ইংলিশ প্রিমিয়ার লীগ অনেক আকর্ষণীয়। সাম্প্রতিক সময়ে যুক্ত হয়েছে বিলিয়নারদের বিনিয়োগের আধিপত্য।

একইভাবে স্পেন মাত্র একবার বিশ্বকাপ জিতলেও মেসি-রোনালদো সূত্রে স্প্যানিশ লীগ ধারাবাহিকভাবে গত দুই দশকে পরাশক্তি হিসেবে ইউরোপে রাজত্ব করে আসছে। রিয়াল মাদ্রিদ ও বার্সেলোনা দ্বৈরথ ছিল মূল আকর্ষণ। একবিংশ শতাব্দীর শুরুতে রিয়াল মাদ্রিদ তারকাখচিত ‘গ্যালাকটিকো’ স্কোয়াড তৈরি করল। বার্সেলোনাও সাফল্য পেতে থাকল তাদের গড়া ‘লা মেসিয়া’ সূত্রে। এই দুই দলের বাইরে আলোচিত হয়েছে ভ্যালেন্সিয়া, সেভিয়া ও অ্যাথলেটিকো মাদ্রিদ।

ইতালি লীগ প্লাতিনি-ম্যারাডোনা-ব্যাজিও-মালদিনি-দেল পিয়ারো যুগের পর ক্রমেই ম্লান হতে থাকে ক্লাব পর্যায়ের দুর্নীতি এবং মাফিয়াদের চক্করে। সিরি-আ এখন আর বিশ বছর আগের মতো আকর্ষণীয় নেই।

জার্মান বুন্দেসলিগা বরাবর কাটখোট্টা ম্যানেজার ও ম্যানেজমেন্টের জন্য পরিচিতি পেলেও সম্প্রতি পেপ গার্দিওলা সূত্রে বায়ার্ন মিউনিখ যান্ত্রিক ফুটবল ছেড়ে কিছুদিন শৈল্পিক ফুটবল খেলছিল। সে তুলনায় ফ্রান্সের জাতীয় দলে গত চার দশকে প্লাতিনি, টিগানা, কনটানা, জিদান, জিওরকফ, অঁরি, আবিদাল, পগবার মতো আন্তর্জাতিক মানের তারকা থাকা সত্ত্বেও ফ্রেঞ্চ লীগ ছিল আকর্ষণহীন।

আশির দশকে মার্শেই এবং লিল ক্লাব পর্যায়ে আধিপত্য দেখালেও পরবর্তীকালে বড় অঙ্কের বিনিয়োগ নিয়ে পিএসজি মাঠে নামে। ইউরোপের অন্যান্য লীগের দলগুলো ইউরোপ সেরা ‘চ্যাম্পিয়নস লীগ’ শিরোপা জিতলেও ফ্রেঞ্চ লিগের কোনো দল সেই স্বাদ পায়নি। অন্যান্য লিগের তুলনায় ফ্রেঞ্চ লিগকে আড়ালে এবং প্রকাশ্যে তাচ্ছিল্য করে বলা হয় ‘ফারমারস লিগ’ মানে কৃষকদের লিগ। এই সাব-অলটার্ন খেদোক্তির মূল কারণ হচ্ছে ক্লাবগুলো ইউরোপের প্রতিযোগিতায় ধারাবাহিকভাবে ভীষণ ব্যর্থ!

কেবল গত বছর পিএসজি প্রথমবার চ্যাম্পিয়নস লিগ ফাইনালে উঠেছিল নেইমার ও এমবাপ্পের কাঁধে ভর করে। তারপরও ফ্রেঞ্চ লিগের কৌলীন্য রক্ষা হচ্ছিল না। অবশেষে এই গ্রহের সেরা ফুটবলার লিওনেল মেসি ফ্রেঞ্চ লিগের ইজ্জত রক্ষায় এগিয়ে এলেন। যেভাবে বার্সেলোনা থেকে অপমানিত হয়ে ম্যারাডোনা ইতালির অখ্যাত নেপোলি ক্লাবকে বিখ্যাত করেছিলেন। মেসির প্রতি এখন প্রত্যাশার পারদে চাপটা একই ধরনের। চ্যাম্পিয়নস লিগ জিতে পিএসজি চায় ইউরোপের বনেদি ক্লাবের সারিতে পৌঁছাতে। তবে একটি ক্ষেত্রে স্পেন বা ইতালি থেকে বড় মাপের পার্থক্য রয়েছে ফ্রান্সের। সেটা হলো নান্দনিক অনুবোধ তথা শৈল্পিক চেতনা। ফ্রেঞ্চ লিগ তেমন একজন যথার্থ শিল্পীর সন্ধানে ছিল বহু বছর। নেইমারের আগে সেস ফ্যাবিগ্রাস কিংবা কাভানি সেই চাহিদাটা পুরোপুরি পূরণ করতে পারছিল না।

কারণ, একক প্রতিভা ও ক্যারিশমায় ফ্রেঞ্চ লিগে মেসির মতো এত বড় মাপের ফুটবলার কখনো এভাবে খেলতে আসেনি। প্লাতিনি কিংবা জিদানও তাদের দেশের লিগকে অবজ্ঞা করেছিলেন। পিএসজির কাছে এখন প্রচুর অর্থ থাকলেও তারকা ফুটবলারদের কেউ তাদের ক্যারিয়ারে রিস্ক নিতে চায়নি। কারণ ইউরোপের শ্রেষ্ঠত্ব লড়াইয়ে ফ্রেঞ্চ লিগ সব সময় পিছিয়ে ছিল। মেসি সূত্রে এখন পরিস্থিতি পাল্টে যাবে। পাল্টে গেছেও ইতিমধ্যে।

বাজার অর্থনীতির সঙ্গে পাল্লা দিয়ে মেসি-নেইমারের ফ্রেঞ্চ লিগ আর কৃষকদের লিগ হয়ে থাকবে না। মাত্র ২০ মিনিটে বিক্রি হয়ে যায় মেসির সদ্য পাওয়া ৩০ নম্বর জার্সির প্রথম এক হাজার চালান। প্রথম দিনেই বিক্রি হয় ৯০ মিলিয়ন ডলার মূল্যে মেসির জার্সি। সেই সঙ্গে টেলিভিশন স্বত্বের মূল্যমান বেড়ে গেছে। রিয়াল মাদ্রিদ থেকে রোনালদোর বিদায়ের পর স্প্যানিশ লিগ টেলিভিশন ছেড়ে ফেসবুকে এসেছিল। এখন মেসির বার্সা ত্যাগে এশিয়া অঞ্চলে দর্শকসংখ্যা যে আরও তলানিতে পৌঁছাবে, তার নমুনা এরই মধ্যে পাওয়া গেছে। ধারণা করা হচ্ছে, ইংলিশ লিগের সঙ্গে জনপ্রিয়তায় পাল্লা দেবে এখন মেসি সূত্রে ফ্রেঞ্চ লিগ। ফ্রান্স তথা প্যারিসের শিল্পের প্রতি কদর করার বিষয়ে ইঙ্গিত করেছিলাম। ফুটবল মাঠে যোগ্য পৃষ্ঠপোষকতার অভাবে তাদের ফুটবল শিল্পে প্রতিভাবান শিল্পীর ঘাটতি ছিল। তা এখন পূরণ হওয়ার পথে!

মেসির প্যারিস দর্শনের সঙ্গে শিল্প-ইতিহাসের মিল দেখতে পেয়ে লেখাটির অবতারণা করেছিলাম। এখন সামান্য আলোকপাত করছি। পাবলো পিকাসো মাত্র ২৩ বছর বয়সে মেসির মতোই স্পেনের বার্সেলোনা ছেড়ে প্যারিসে থিতু হয়েছিলেন। কিংবদন্তি হয়েছিলেন প্যারিসের মাটিতে। পার্থক্য হচ্ছে, মেসি জীবন্ত কিংবদন্তির তকমা নিয়েই প্যারিসে পা রেখেছেন। কয়েক শ বছর আগে জীবনের শেষ দুই বছর এই প্যারিসে কাটিয়েছিলেন ওল্ড মাস্টার লেওনার্দো দা ভিঞ্চি। সঙ্গে করে নিয়ে এসেছিলেন অর্ধসমাপ্ত ‘মোনালিসা’।

লিওনেল মেসি সঙ্গে করে এনেছেন ছয়টি ব্যালন ডি অর, যা এখন সাজানো হয়েছে আইফেল টাওয়ারের সামনে শৈল্পিকভাবে। মজার বিষয় হচ্ছে, মেসি ৩৪ বছর বয়সে যেভাবে প্যারিসে এলেন, একই বয়সে ডাচ্ মাস্টার ভিনসেন্ট ভ্যান গঘ কপর্দকশূন্য অবস্থায় বেলজিয়াম থেকে প্যারিস এসেছিলেন। ১৮৮৬ সালে তখন তাঁর বয়স ছিল ৩৩ বছর। দুই সময়ের দুই ভিনদেশি শ্রেষ্ঠ শিল্পীকে প্রত্যক্ষ করল প্যারিসবাসী।

আরেক দিকপাল শিল্পী মার্ক শাগাল জীবনের গুরুত্বপূর্ণ সময় কাটিয়েছিলেন প্যারিস শহরে। পিকাসো ও শাগাল একসঙ্গে প্যারিসে সক্রিয় ছিলেন দুই দশক। একে অপরকে শৈল্পিক তাড়নায় ঋদ্ধ করেছিলেন। শিল্প-আন্দোলন নিয়ে নিজেদের মধ্যে প্রতিযোগিতা থাকলেও শ্রদ্ধাবোধ ও বন্ধুত্ব ছিল ভিন্নতর। যদিও এক ডিনার পার্টিতে ভাষাগত ভাব বিনিময়ে ভুল বোঝাবুঝির কারণে পিকাসো ও শাগালের বন্ধুত্বে ছেদ পড়ে।

কিন্তু মেসি ও নেইমারের মধ্যে তেমন কোনো ভুল বোঝাবুঝির অবকাশ নেই। দুজনই মাঠের বাইরে ও ভেতরে একই ভাষায় কথা বলেন। কোনো খাদ নেই তাঁদের বন্ধুত্বে। নেইমার মুক্তকণ্ঠে স্বীকার করে নিয়েছেন মেসির শ্রেষ্ঠত্ব ও শিষ্যত্ব। ফ্রেঞ্চ লিগে শিল্প-আন্দোলনের এই জোয়ার বেগবান হলে আগামী দুই বছরে বদলে যেতে পারে ইউরোপে ক্লাব ইতিহাসের মানচিত্র। প্যারিস সেইন্ট জার্মেইন নামের ক্লাবটি কি মেসির বাঁ পায়ের জাদুতে ফিরিয়ে আনতে পারবে ‘মঁলা রুজের’ মৌতাত!
অপেক্ষায় থাকলাম সবাই।

মিরাজুল ইসলাম চিকিৎসক, লেখক।