কেক না কাটার আশা করেছিলেন যাঁরা

এবারও ঘটা করেই কেক কাটেন খালেদা জিয়া
এবারও ঘটা করেই কেক কাটেন খালেদা জিয়া

পঁচাত্তরের ১৫ আগস্টের ঘটনাটি কতটা শোকাবহ, সেটা এখন আর তর্ক-বিতর্কের বিষয় নয়। মাস হিসেবেই আগস্ট এখন বাংলাদেশে শোকের মাস হিসেবে বিবেচিত। ১৫ আগস্ট দিনটি এখন রাষ্ট্রীয়ভাবে জাতীয় শোক দিবস হিসেবে পালিত হয়। শোকের এই দিনটি নিয়ে এখন আর দৃশ্যমান ও সরাসরি কোনো রাজনৈতিক বিরোধিতা নেই। কিন্তু কী এক কঠিন সময় পার করতে হয়েছে আজকের এই জায়গায় আসার আগে!
বিষয়গুলো আমাদের সবারই জানা। বঙ্গবন্ধুকে পুরো পরিবারসহ মেরে ফেলার পর এই বর্বরতম ঘটনাটি যাঁরা ঘটিয়েছেন, কোনো লুকোছাপায় না গিয়ে তঁারা এর দায়িত্ব স্বীকার করেছেন। তাঁরা নিরাপদে দেশ থেকে বের হয়ে গেছেন বা সে সুযোগ করে দেওয়া হয়েছে। এই হত্যাকাণ্ডের যেন বিচার না হয় সে জন্য পরের মাসেই, অর্থাৎ পঁচাত্তরের সেপ্টেম্বরে ইনডেমনিটি অধ্যাদেশ হয়েছে। পরে ’৭৯ সালে জিয়াউর রহমানের সময় সংসদে পাস হয়ে তা আইনে পরিণত হয়েছে। এ ধরনের একটি কালো বিধানকে পঞ্চম সংশোধনীর মাধ্যমে সংবিধানের অংশে পরিণত করা হয়েছিল। এই খুনিদের অনেকে বিদেশে বাংলাদেশের দূতাবাসে কাজ করেছেন। এরশাদের সময় সেই খুনিদের কেউ কেউ দেশে ফিরে এসে রাজনৈতিক দল করেছেন—ফ্রিডম পার্টি। প্রকাশ্যে জনসভা করেছেন। কুড়াল প্রতীক নিয়ে ফ্রিডম পার্টি থেকে নির্বাচন করে দুই খুনি জাতীয় সংসদেও বসেছেন। মিল্লাত নামে একটি দৈনিক পত্রিকা বের হতো ফ্রিডম পার্টির মুখপত্র হিসেবে, খুনি চক্রের সমর্থনে।
আমাদের মনে থাকার কথা যে আওয়ামী লীগ যখন সেই পঁচাত্তর-পরবর্তী কঠিন সময়ে ১৫ আগস্ট শোক দিবস পালন করত, তখন কেউ কেউ দিনটি পালন করত ‘নাজাত দিবস’ হিসেবে। তখনকার অনেক পত্রপত্রিকায় এসব কর্মসূচি পালনের খবর ছাপা হতো। আমাদের মনে আছে, ১৯৮৭ সালের আগস্ট মাসে ফ্রিডম পার্টি গঠিত হওয়ার পর নানা সময়ে ও নানা জায়গায় আওয়ামী লীগ ও এর অঙ্গসংগঠনগুলোর শোক দিবসের অনুষ্ঠান বা কাঙালিভোজে দলটির লোকজন হামলা চালিয়েছে। ১৯৯৬ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগ বিজয়ী হয়ে সরকার গঠন করার পর পরিস্থিতি পাল্টাতে থাকে। এখন ফিরে তাকালে অবাক হতে হয় যে এরপরও ২০০১ ও ২০০৮ সালের নির্বাচনে ফ্রিডম পার্টির অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা ও মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত পলাতক খুনি কর্নেল আবদুর রশীদের মেয়ে মেহনাজ রশীদ দলটির সমর্থন নিয়েই নির্বাচন করেছেন।
পঁচাত্তর-পরবর্তী সময়টিতে বাংলাদেশ এই খুনি চক্রের বিকাশ ও বিচরণের উর্বরভূমি হয়ে উঠতে পেরেছিল প্রথমে জিয়াউর রহমান ও পরে এরশাদের পরিচর্যার কারণে। নিয়মিত সার ও পানি দিয়েই এই বিষবৃক্ষের ডালপালা গজাতে ও শিকড় গাড়তে সহায়তা করেছেন তাঁরা। এই পরিস্থিতি পাল্টানো সহজ ছিল না, কিন্তু পাল্টেছে। ইনডেমনিটি আইন বাতিল হয়েছে, বাংলাদেশের সর্বোচ্চ আদালত পঞ্চম সংশোধনীকে অবৈধ ঘোষণা করেছেন। দীর্ঘ সময় নিয়ে হলেও বঙ্গবন্ধু ও পঁচাত্তরের ১৫ আগস্ট হত্যাকাণ্ডের বিচার হয়েছে। দণ্ডপ্রাপ্তদের মধ্যে যাঁরা আটক ছিলেন এমন পাঁচজনের মৃত্যুদণ্ডও কার্যকর হয়েছে। বাকি ছয়জন পালিয়ে আছেন দেশের বাইরে। ফ্রিডম পার্টি দলটি এখন শুধু একটি ওয়েবসাইটে এসে ঠেকেছে। ইন্টারনেটে সার্চ দিলে এখন দলটির যে ওয়েব পেজ পাওয়া যায়, সেখানকার তথ্য অনুযায়ী ফাঁসি কার্যকর হওয়া সৈয়দ ফারুক রহমানের ছেলে সৈয়দ তারিক রহমান এখন দলটির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান। তারিক অস্ট্রেলিয়ায় থাকেন বলে দলের ওয়েবসাইটে প্রকাশিত তাঁর এক সাক্ষাৎকার থেকে জানা যায়। সেটাও বছর চারেক আগের তথ্য।
পঁচাত্তরের হত্যাযজ্ঞ ও সেই রাজনীতির প্রকাশ্য সমর্থক কোনো গোষ্ঠী এখন দেশে আর সক্রিয় নেই। কিন্তু যারা এই খুনি চক্র ও তাদের রাজনীতিকে লালন-পালন করতে সহায়তা করেছে, সেই দুই রাজনৈতিক দল বিএনপি ও জাতীয় পার্টির অবস্থানটি এখন কী? জাতীয় পার্টির অবস্থা এখন অনেকটাই বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের সহযোগী বা অঙ্গসংগঠনের মতো। আওয়ামী লীগের ইচ্ছাই যেন এখন দলটির ইচ্ছা। আর বিএনপি? ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর যখন পরিস্থিতি পাল্টাতে থাকে তখন বিএনপির পক্ষে প্রকাশ্যে এই খুনি চক্রের পক্ষে অবস্থান নেওয়া কঠিন হয়ে দাঁড়ায়। প্রথম মেয়াদে আওয়ামী লীগ বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের বিচার শুরু করলেও তা শেষ করতে পারেনি। ২০০১ সালে বিএনপি সরকার গঠন করার পর বঙ্গবন্ধু হত্যা মামলার কার্যক্রম স্থবির হয়ে ছিল ঠিকই কিন্তু তাকে ভিন্নপথে চালাতে বা খুনিদের মুক্তি-জামিন—এ ধরনের কিছু করার সাহস দেখায়নি। আমাদের মনে আছে, ২০১০ সালের জানুয়ারি মাসে যখন বঙ্গবন্ধুর পাঁচ খুনির ফাঁসি কার্যকর হয়, তখন বিএনপির নেতাদের দলীয় বা ব্যক্তিগতভাবে প্রতিক্রিয়া জানানো নিষেধ ছিল।
আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর যখন ১৫ আগস্টের হত্যাকাণ্ড ও সেই ধারার রাজনীতির পরিস্থিতি পাল্টাতে থাকে, রাষ্ট্রীয়ভাবে যখন দিনটি শোক দিবস হিসেবে পালনের উদ্যোগ নেওয়া হয়, ঠিক সেই সময়েই ’৯৬ সালের ১৫ আগস্ট থেকে বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার আনুষ্ঠানিক জন্মদিন পালন ও কেক কাটার রেওয়াজ শুরু হয়। পত্রপত্রিকার খবর অনুযায়ী এক যুবদল নেতা ও কয়েকজন বুদ্ধিজীবীর পরামর্শে নাকি এই উদ্যোগ নেওয়া হয়। যারাই এই পরামর্শ দিয়ে থাক, ঘটা করে ১৫ আগস্ট দিনটিতে খালেদা জিয়ার এই আনুষ্ঠানিক জন্মদিন পালনের উদ্দেশ্যটি পরিষ্কার। ১৫ আগস্টের খুনি চক্রের যে রাজনীতি দেশে দীর্ঘদিন সক্রিয় ছিল ও শাসকগোষ্ঠীর সমর্থন পেয়েছে, তা কোণঠাসা হয়ে যাওয়ায় ‘নাজাত দিবস’ ধরনের কর্মসূচির একটি বিকল্প দাঁড় করানো তখন বিএনপির জন্য জরুরি হয়ে পড়েছিল। সেই বিকল্প হচ্ছে খালেদা জিয়ার ‘জন্মদিন’ ও ‘কেক কাটার’ সংস্কৃতি।
দল হিসেবে আওয়ামী লীগ ও তার প্রধান শেখ হাসিনার জন্য ১৫ আগস্ট খুবই সংবেদনশীল একটি দিন। আমরা অনুমান করতে পারি সেই দিনটিতেই হঠাৎ করে খালেদা জিয়ার জন্মদিন পালন শুরু করা ও কেক কাটা শেখ হাসিনার পক্ষে মেনে নেওয়া কতটা কঠিন। এটা তাঁর জন্য একটি চরম মনঃকষ্টের ব্যাপার না হলে সংসদ নির্বাচন নিয়ে আলোচনার জন্য ২০১৩ সালে খালেদা জিয়াকে ফোন করে শেখ হাসিনা এই প্রসঙ্গ তুলতেন বলে মনে হয় না। আর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ আশরাফ তো খালেদা জিয়ার প্রতি অনেকটা অনুরোধ করেই বলেছেন, ১৫ আগস্ট যদি সত্যিকারের জন্মদিন হয়েও থাকে তাহলেও যেন খালেদা জিয়া ১৬ বা ১৭ আগস্ট তা পালন করেন।
আগেই বলেছি যে ১৫ আগস্ট জাতীয় শোক দিবস নিয়ে এখন আর কোনো সরাসরি রাজনৈতিক বিরোধিতা নেই। জন্মদিন পালনের নামে খালেদা জিয়ার কেক কাটাই হচ্ছে এখন এই শোক দিবসের একমাত্র রাজনৈতিক বিরোধিতা। ’৯৬ সাল থেকে খালেদা জিয়া যা পালন করে আসছেন এবার তার ব্যতিক্রম হতে পারে—এমন আশা হঠাৎ অনেকের মনে জেগেছিল। ১৪ আগস্ট খালেদা জিয়ার দেশের বাইরে যাওয়ার কথা ছিল, অনেকে কল্পনা করেছিলেন জন্মদিন পালন না করার জন্য তো খালেদা জিয়ার একটি যৌক্তিক অছিলা লাগবে, দেশের বাইরে বা বিমানে বসে তিনি কেক কাটা এড়াবেন। তা হয়নি, তিনি বেশ ঘটা করেই কেক কেটেছেন।
যাঁরা অনেক বেশি আশা করেন বা বাংলাদেশের রাজনীতিতে শুভ কিছু দেখতে চান, খালেদা জিয়ার এবারের জন্মদিন পালনে তাঁদের আশা ভঙ্গ হয়েছে সন্দেহ নেই। প্রশ্ন হচ্ছে, এ ধরনের আশার পেছনে আদৌ কোনো যুক্তি আছে কী? বিএনপির নেতৃত্ব, তাদের বুদ্ধিদাতা বা তাত্ত্বিকেরা জানেন ১৫ আগস্ট দিনটিকে কোনো না কোনোভাবে উৎসবের একটি উপলক্ষ বানানো তাঁদের জন্য কতটা জরুরি। যাঁরা এবারের ১৫ আগস্ট খালেদা জিয়া কেক কাটবেন না বলে আশা করেছিলেন, তাঁদের উদ্দেশে বলি, এটা শুধু নিছক খালেদা জিয়ার জন্মদিন পালনের বিষয় নয়। ১৫ আগস্টের ঘটনা বিএনপির জন্মের পথ তৈরি করে দিয়েছে। সেই দিনকে শোক দিবস হিসেবে দলটি মেনে নেয় কীভাবে! এই শোক দিবসের রাজনৈতিক বিরোধিতা না থাকলে বিএনপির রাজনীতি টিকবে কী করে!
এ কে এম জাকারিয়া: সাংবাদিক।
[email protected]