চীনের উন্নয়ন মডেল রপ্তানি

>নতুন বছর কেমন কাটবে বিশ্ববাসীর? পৃথিবীর প্রথম সারির নেতা ও ভাবুকেরা তুলে ধরেছেন তার এক আগাম ছবি। বাংলাদেশে শুধু প্রথম আলোকে দেওয়া প্রজেক্ট সিন্ডিকেটের নিবন্ধ নিয়ে চার দিনব্যাপী বিশেষ আয়োজন। আজ প্রকাশ হলো প্রথম দুটি লেখা।
.
.

নতুন বছর ২০১৬ যখন শুরু হচ্ছে, তখন বিভিন্ন ধরনের উন্নয়ন মডেল নিয়ে এক ঐতিহাসিক প্রতিযোগিতা শুরু হয়ে গেছে। অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি উৎসাহিত করার কৌশলগুলো কী হবে, তা নিয়ে প্রতিযোগিতা চলছে একদিকে চীন, অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র ও অন্য পশ্চিমা দেশগুলোর মধ্যে। লড়াইটা চলছে সাধারণ বিশ্ববাসীর দৃষ্টির অন্তরালে। কিন্তু এই নীরব প্রতিযোগিতার ফলই ঠিক করতে যাচ্ছে আগামী কয়েক দশকে ইউরেশিয়ার একটা বিরাট অংশের ভাগ্যে কী জুটবে।
পশ্চিমা বিশ্বের অধিকাংশ মানুষ জানে, চীনের প্রবৃদ্ধি উল্লেখযোগ্য হারে কমে গেছে। সাম্প্রতিক দশকগুলোতে দেশটির বার্ষিক প্রবৃদ্ধি ১০ শতাংশ থেকে কমতে কমতে এখন ৭ শতাংশের নিচে (সম্ভবত আরও নিচে) চলে এসেছে। এই প্রবৃদ্ধি-পতন মোকাবিলায় দেশটির নেতারা এখনো আলোচনায় বসেননি। ভারী শিল্পকারখানার ওপর ভিত্তি করে দাঁড় করানো একটি রপ্তানিমুখী ও প্রতিবেশগত ক্ষয়িষ্ণু প্রবৃদ্ধির রূপরেখা থেকে বেরিয়ে কী করে পণ্যের দেশজ ভোগ ও ব্যবহারভিত্তিক একটি রূপরেখায় চীনকে নিয়ে যাওয়া যায়, তা নিয়ে এখনো তাঁরা এক টেবিলে বসতে পারেননি। তবে এটাও ঠিক, চীনের অর্থনৈতিক পরিকল্পনার একটা বিরাট বাহ্যিক ডাইমেনশন বা মাত্রা রয়েছে। ২০০৩ সালে প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং ‘ওয়ান বেল্ট, ওয়ান রোড’ নামে একটি অর্থনৈতিক মহাপরিকল্পনার ঘোষণা দেন, যা গোটা ইউরেশিয়া অঞ্চলের অর্থনৈতিক প্রাণভোমরা হয়ে উঠবে।
বিস্তীর্ণ এলাকাজুড়ে রেলযোগাযোগ প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে ‘ওয়ান বেল্ট’ অংশ তৈরি হবে। এই অংশে চীনের পশ্চিমাঞ্চল থেকে রেলপথ শুরু হয়ে মধ্য এশিয়া এবং সেখান থেকে ইউরোপ, মধ্যপ্রাচ্য ও দক্ষিণ এশিয়া পর্যন্ত চলে যাবে। আর ‘ওয়ান রোড’ অংশ গঠিত হবে বন্দর ও উৎপাদন স্থাপনাকে কেন্দ্র করে, যা পূর্ব এশিয়ার সমুদ্রভিত্তিক যোগাযোগব্যবস্থাকে আরও শক্তিশালী করবে এবং পূর্ব এশিয়ার দেশগুলো ‘ওয়ান বেল্ট’-এর সঙ্গে সংযুক্ত হবে। বর্তমানে এই অঞ্চলের দেশগুলোকে সাগরপথে পণ্য পরিবহন করতে হয়। এটা করা গেলে এই অঞ্চলের দেশগুলো স্থলপথে কম সময়ের মধ্যে তাদের পণ্য পরিবহন করতে পারবে।
চীনের নেতৃত্বাধীন এশিয়ান ইনফ্রাস্ট্রাকচার ইনভেস্টমেন্ট ব্যাংক (এআইআইবি)—যুক্তরাষ্ট্র যেটিতে চলতি বছরের শুরুর দিকে যোগ দিতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে—তার কার্যক্রম-নকশা করা হয়েছে ‘ওয়ান বেল্ট, ওয়ান রোড’ কর্মসূচিতে অর্থায়ন করার কথা মাথায় রেখে। কিন্তু এই মহাপ্রকল্পের জন্য যে বিনিয়োগ প্রয়োজন, তা জোগান দিতে গেলে প্রস্তাবিত এই নতুন আর্থিক প্রতিষ্ঠানটির সহায়-সম্পদে বড় ধরনের টান পড়বে বলেই আপাতত প্রতীয়মান হচ্ছে।

ফ্রান্সিস ফুকুইয়ামা
ফ্রান্সিস ফুকুইয়ামা

প্রকৃতপক্ষে, ‘ওয়ান বেল্ট, ওয়ান রোড’ প্রকল্প চীনা নীতির ব্যতিক্রমী বহির্গমন নীতির প্রতিনিধিত্ব করছে। এই প্রথমবারের মতো চীন তার উন্নয়ন রূপরেখা অন্য দেশে ‘রপ্তানি’ করতে চাইছে। চীনা কোম্পানিগুলো অবশ্যই গত দশকে লাতিন আমেরিকা ও সাব-সাহারান আফ্রিকার দেশগুলোয় নিত্যব্যবহার্য পণ্যসামগ্রী ও খনিশিল্প খাতে বিনিয়োগের মাধ্যমে প্রচণ্ড সক্রিয় হয়েছে। এর জন্য প্রয়োজনীয় অবকাঠামোর অনিবার্য প্রয়োজনীয়তায় দেশগুলোকে চীনের দ্বারস্থ হতেই হচ্ছে। কিন্তু ‘ওয়ান বেল্ট, ওয়ান রোড’ সম্পূর্ণ আলাদা একটা ব্যাপার। এই মহা রূপরেখার মূল লক্ষ্যই হচ্ছে চীনের বাইরের দেশগুলোর শিল্পকারখানার উৎপাদন-সক্ষমতা বাড়ানো এবং সেখানকার ভোক্তাদের মধ্যে চীনের পণ্যের চাহিদা বাড়ানো। বাইরের দেশের কাঁচামাল আহরণের বদলে চীন এখন স্বল্পোন্নত দেশগুলোয় তার ভারী শিল্প সরিয়ে নিতে চাইছে। দেশটি মনে করছে, এতে স্বল্পোন্নত দেশগুলো আরও সচ্ছল হবে এবং তাদের ক্রয়ক্ষমতা বাড়লে চীনের পণ্যের বাজার বাড়বে।
চীনের এই উন্নয়ন মডেল নিঃসন্দেহে পশ্চিমাদের বর্তমান জনপ্রিয় উন্নয়ন মডেল থেকে একেবারে আলাদা। মহাসড়ক, বন্দর, বিদ্যুৎ, রেল ও বিমানবন্দর—শিল্পোন্নয়নের এই মূল খাতগুলোয় ব্যাপকভাবে রাষ্ট্রীয় বিনিয়োগই চীনের এই উন্নয়ন মডেলের ভিত্তি। মার্কিন অর্থনীতিবিদেরা অবশ্য চীনের এই ‘পথ বানাও, পথিক আসবে’ নীতির বিরোধিতা করে আসছেন। তাঁদের আশঙ্কা, উন্নয়নশীল দেশে এসব বিরাট বিরাট প্রকল্পে সরকার ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত থাকে; এতে দুর্নীতি ও সরকারের খেয়াল-খুশিমতো কাজ করার আশঙ্কা থাকে। মার্কিন ও ইউরোপীয় উন্নয়ন নীতি সাম্প্রতিক বছরগুলোতে রেওয়াজ ভেঙে জনস্বাস্থ্য, নারীর ক্ষমতায়ন, বৈশ্বিক সুশীল সমাজ এবং দুর্নীতিবিরোধী পদক্ষেপে সহযোগিতা দেওয়ার ব্যাপারে জোর দিয়েছে।
এই পশ্চিমা লক্ষ্যগুলো নিঃসন্দেহে প্রশংসার যোগ্য; তবে এসব খাতে একক বিনিয়োগ করে আজ পর্যন্ত কোনো দেশই ধনী হতে পারেনি। জনস্বাস্থ্য অবশ্যই টেকসই প্রবৃদ্ধির একটি গুরুত্বপূর্ণ পূর্বশর্ত; কিন্তু একটি স্বাস্থ্যকেন্দ্রে যদি নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ ও নিরাপদ পানি সরবরাহ না থাকে অথবা স্বাস্থ্যকেন্দ্রটিতে যাওয়ার মতো ভালো রাস্তাঘাট না থাকে, তাহলে সেটা খুব একটা কাজে আসবে না।
চীনের অবকাঠামোভিত্তিক উন্নয়ন নীতি চীনের নিজ ভূখণ্ডে উল্লেখযোগ্য ভালো ফল দেখিয়েছে। জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া বা সিঙ্গাপুরের মতো পূর্ব এশিয়ার দেশগুলো তাদের উন্নয়ন নীতির বাস্তবায়নে চীনের এই নীতিকে গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হিসেবে অনুসরণ করেছে। এখন বৈশ্বিক রাজনীতির ভবিষ্যতের সামনে একটি বিরাট প্রশ্ন এসে দাঁড়িয়েছে: সবাইকে ছাপিয়ে কার উন্নয়ন মডেল শেষ পর্যন্ত জয়লাভ করবে? যদি ‘ওয়ান বেল্ট, ওয়ান রোড’ চীনা পরিকল্পকদের প্রত্যাশা পূরণ করতে সক্ষম হয়, তাহলে ইন্দোনেশিয়া থেকে পোল্যান্ড, অর্থাৎ গোটা ইউরেশিয়া আসন্ন উন্নয়ন প্রজন্মের আওতায় চলে আসবে।
চীনের এই মডেল চীনের বাইরে বিকশিত হবে। চীনের বাইরের রূপরেখাভুক্ত দেশগুলোর আয়, উপার্জন ও ক্রয়ক্ষমতা বাড়বে। এর ফলে চীনা পণ্য দুনিয়ার বাকি অংশের স্থবির বাজার দখল করে নেবে। দূষণকারী শিল্পকারখানাগুলোও শুধু চীনের মধ্যে কেন্দ্রীভূত না থেকে পৃথিবীর বিভিন্ন অংশে ছড়িয়ে পড়বে। বৈশ্বিক অর্থনীতির প্রান্তবর্তী অবস্থানে না থেকে মধ্য এশিয়া হয়ে উঠবে বিশ্ব অর্থনীতির কেন্দ্রবিন্দু। এতে বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে থাকা গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার ওপর বড় ধরনের নেতিবাচক প্রভাব খাটানোর সুযোগ পাবে চীন এবং এর মাধ্যমে দেশটির কর্তৃত্ববাদী সরকারব্যবস্থা ব্যাপক বিশ্ব সম্মান হাতিয়ে নিতে সক্ষম হবে।
তবে এই ‘ওয়ান বেল্ট, ওয়ান রোড’ সফল হবে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন তোলার অনেক যৌক্তিক কারণ আছে। এখন পর্যন্ত চীনের অবকাঠামোভুক্ত প্রবৃদ্ধি ভালোভাবে কাজ করছে, কারণ চীন সরকার তার রাজনৈতিক পরিস্থিতি সফলভাবে নিয়ন্ত্রণ করতে পেরেছে। বাইরের দেশগুলোয় পরিস্থিতি এমন হবে না। সেখানকার রাজনৈতিক অস্থিরতা, সংঘাত ও দুর্নীতি চীনের পরিকল্পনার সামনে বাধা হয়ে দাঁড়াবে। ইকুয়েডর ও ভেনেজুয়েলার মতো অংশীদার দেশগুলোয় চীন ইতিমধ্যে বিশাল অঙ্কের অর্থ বিনিয়োগ করেছে। এসব দেশে এখনই চীনকে ক্ষুব্ধ অংশীদার, জাতীয়তাবাদী আইনপ্রণেতা এবং নিয়ত সিদ্ধান্ত পাল্টানো বন্ধুদের সামাল দিতে হচ্ছে। নিজ ভূখণ্ডের জিনজিয়াং প্রদেশের ক্ষুব্ধ মুসলমানদের এখন পর্যন্ত দমন ও নিষ্পেষণের মাধ্যমে চীন বাগে রাখতে পেরেছে। কিন্তু এই কৌশল তো পাকিস্তান বা কাজাখস্তানে কাজ করবে না।

চীনের মহাপরিকল্পনা: ‘ওয়ান রোড, ​ওয়ান বেল্ট’
চীনের মহাপরিকল্পনা: ‘ওয়ান রোড, ​ওয়ান বেল্ট’

তবে এর মানে এই নয় যে যুক্তরাষ্ট্র ও অন্য পশ্চিমা দেশগুলোর সরকার হাত-পা ছেড়ে বসে থেকে চীনের এই প্রকল্পের ব্যর্থতা দেখার জন্য অপেক্ষা করবে। বিশাল পরিসরের অবকাঠামো উন্নয়নভিত্তিক কৌশল অনুসরণ করে চীন হয়তো তার অভ্যন্তরে সীমিত সাফল্য অর্জন করতে পেরেছে; হয়তো এই কৌশল বিদেশে কাজ করবে না; কিন্তু চীনের এই উন্নয়ন কৌশল এখনই বৈশ্বিক প্রবৃদ্ধির সামনে একটা সংকট হিসেবে দেখা দিয়েছে।
১৯৫০ ও ১৯৬০-এর দশকে যুক্তরাষ্ট্র বিশাল বিশাল বাঁধ ও মহাসড়ক নির্মাণ করেছে। এসব প্রকল্পের জনপ্রিয়তা না হারানো পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্র প্রকল্পগুলো চালিয়ে গেছে। সেই যুক্তরাষ্ট্র আজ উন্নয়নশীল দেশে এ ধরনের কাজে তুলনামূলকভাবে খুব কম সাহায্য–সহযোগিতা দিয়ে থাকে। প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার ‘পাওয়ার আফ্রিকা’ একটি ভালো পদক্ষেপ; কিন্তু মাঠপর্যায়ে এর তৎপরতা খুবই ধীরগতির। এই প্রকল্পের আওতায় হাইতিতে ফোর্ট লিবার্টি নামের একটি বন্দর করার কথা ছিল, এখন সে উদ্যোগ ব্যর্থতায় পর্যবসিত হয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের উচিত ছিল এআইআইবির প্রতিষ্ঠাতা সদস্য হওয়া; চাইলে এখনো সে এতে যুক্ত হতে পারে এবং চীনকে আরও বেশি আন্তর্জাতিক পরিবেশ, নিরাপত্তা ও শ্রমমানবান্ধব হওয়ার পথে এগিয়ে নিতে পারে। একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র ও অন্য পশ্চিমা দেশগুলোর নিজেদেরই প্রশ্ন করা উচিত, অবকাঠামো নির্মাণের বিষয়টি কেন আজ শুধু উন্নয়নশীল দেশেই নয়, তাদের নিজেদের ভূখণ্ডেও কঠিন বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। আমরা যদি এটা নিয়ে না ভাবি, কিছু না করি, তাহলে ইউরেশিয়া ও বিশ্বের অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ অঞ্চলের ভবিষ্যৎকে চীন ও চীনের উন্নয়ন মডেলের হাতে ছেড়ে দেওয়ার ঝুঁকি আমরাই তৈরি করব।
স্বত্ব: প্রজেক্ট সিন্ডিকেট; অনুবাদ: সারফুদ্দিন আহমেদ
ফ্রান্সিস ফুকুইয়ামা: স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন জ্যেষ্ঠ ফেলো। দ্য এন্ড অব হিস্টোরি অ্যান্ড দ্য লাস্ট ম্যান গ্রন্থের লেখক।

আগামীকাল পড়ুন: কৌশিক বসুর লেখা