শুক্রবার সকালে কথা হয় জনস্বাস্থ্যবিদ আবু জামিল ফয়সালের সঙ্গে। জিজ্ঞেস করলাম, ভারতে যখন করোনার সংক্রমণ ভয়াবহ পর্যায়ে পৌঁছেছে, তখন বাংলাদেশে সংক্রমণ ও মৃত্যুহার দুটোই কমে আসছে। এটি কি আমাদের জন্য স্বস্তিকর বলে মনে করেন। উত্তরে তিনি বললেন, ‘আমি স্বস্তিকর কিছু দেখছি না। পরীক্ষা কম হচ্ছে বলে সংক্রমণের হার কম। যাঁরা পরীক্ষা করছেন, তাঁদের একটা বড় অংশ বিদেশগামী কিংবা চাকরিপ্রার্থী। তাঁরা সুস্থ মানুষ। প্রাতিষ্ঠানিক বাধ্যবাধকতার জন্য পরীক্ষা করছেন। এমন যদি হতো, কোনো এলাকায় করোনায় একজন মানুষ মারা গেছেন, আশপাশের সব মানুষকে পরীক্ষা করা হয়েছে, তখন বোঝা যেত পরিস্থিতি সত্যি সত্যি স্বস্তিদায়ক কি না।’
সেই সঙ্গে এই জনস্বাস্থ্যবিদ আরেকটি শঙ্কার কথা বললেন। আমরা ঈদ সামনে রেখে যেভাবে সবকিছু খুলে দিচ্ছি, তাতে যেকোনো সময় পরিস্থিতি বিপজ্জনক মোড় নিতে পারে। জানতে চাই, সে ক্ষেত্রে করণীয় কী? তিনি বললেন, প্রথমত, কঠোরভাবে স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলা। দ্বিতীয়ত, বেশিসংখ্যক মানুষকে টিকা দেওয়া।
বাংলাদেশ এখন যে তিন উৎস থেকে টিকা আনার জোর চেষ্টা চালাচ্ছে, ভূরাজনীতিতে তাদের অবস্থান পরস্পরবিরোধী। চীন বা রাশিয়ার সঙ্গে চুক্তিকে যুক্তরাষ্ট্র সুনজরে দেখবে না। একইভাবে চীনা উদ্যোগে বাংলাদেশের শামিল হওয়াকেও ভালোভাবে নেবে না ভারত। চীন অনেক আগেই বাংলাদেশে টিকা পরীক্ষা ও সরবরাহের প্রস্তাব দিয়েছিল। কিন্তু ভারত অখুশি হবে, এ বিবেচনায় তখন তা নাকচ করে দেওয়া হয়েছিল। সেরামের সঙ্গে চুক্তি হওয়ার পর আনন্দে ডগমগ সরকার অন্য কোনো উৎস খোঁজার প্রয়োজন বোধ করেনি। সরকারের বোকামির খেসারত দিতে হচ্ছে জনগণকে
স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার ক্ষেত্রে প্রত্যেক নাগরিকের দায়িত্ব আছে। নিজেকে সংক্রমণের হাত থেকে রক্ষা করার পাশাপাশি তাঁর দ্বারা যাতে কেউ সংক্রমিত না হন, সে বিষয়ে সর্বোচ্চ সতর্ক থাকতে হবে।
কিন্তু টিকার ক্ষেত্রে সরকারকেই মূল দায়িত্ব পালন করতে হবে। টিকা সংগ্রহ ও সরবরাহ করার পরই নাগরিকদের বলা যাবে, তোমরা টিকা নাও। নিবন্ধন করো। কিন্তু এখন সেই টিকা পাওয়ার উপায় কী?
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হিসাব অনুযায়ী, করোনার টিকার দ্বিতীয় ডোজ নিয়েছেন ৩৩ লাখ ১৩ হাজার ৪২৪ জন। আর টিকার প্রথম ডোজ নিয়েছেন ৫৮ লাখ ১৯ হাজার ৮৫৪ জন। এ ছাড়া এ পর্যন্ত ৭২ লাখ ৪৮ হাজার ৮২৯ জন টিকা নেওয়ার জন্য নিবন্ধন করেছেন। নতুন করে যাঁরা নিবন্ধন করেছেন, তাঁরা কবে টিকা পাবেন, তার নিশ্চয়তা নেই।
গত ফেব্রুয়ারি মাসে যখন টিকাদান কার্যক্রম শুরু হয়, তখন নীতিনির্ধারকেরা জোর গলায় বলেছিলেন, অনেক উন্নত দেশ টিকা দিতে পারেনি। বাংলাদেশ পেরেছে। এটি সরকারের বিরাট সাফল্য। কিন্তু তিন মাসের মাথায় টিকা কার্যক্রম অনিশ্চিত হয়ে পড়ল। সরকারের লক্ষ্য ছিল দেশের ৮০ শতাংশ মানুষকে টিকার আওতায় আনা। দেশের লোকসংখ্যা ১৭ কোটি হলে ৮০ শতাংশে দাঁড়ায় ১৩ কোটি ৬০ লাখ। প্রত্যেককে দুই ডোজ টিকা দিতে হলে ২৭ কোটি ২০ লাখ ডোজের প্রয়োজন হবে। কেনা ও উপহার মিলিয়ে বাংলাদেশ পেয়েছে মাত্র ১ কোটি ৩ লাখ ডোজ।
বাংলাদেশে টিকা সরবরাহকারী ভারতের সেরাম ইনস্টিটিউট জানিয়ে দিয়েছে, তারা এ মুহূর্তে টিকা দিতে পারছে না ভারত সরকারের নিষেধাজ্ঞার কারণে। দেশটিতে গত এপ্রিলে করোনার সংক্রমণ ভয়াবহ রূপ নিলে সরকার টিকা রপ্তানির ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করে। ফলে সেরাম থেকে দুই দফায় পাওয়া ৭০ লাখ ডোজ এবং উপহার হিসেবে পাওয়া ৩৩ লাখ ডোজই একমাত্র সম্বল।
সরকার ইতিমধ্যে প্রথম ডোজ টিকা দেওয়া বন্ধ করে দিয়েছে। এর আগে যাঁরা প্রথম ডোজ পেয়েছেন, তাঁদের দ্বিতীয় ডোজ দেওয়া হচ্ছে। প্রথম আলোর খবর অনুযায়ী, প্রথম ডোজ পাওয়া ১৩ লাখের বেশি মানুষের দ্বিতীয় ডোজ পাওয়ার নিশ্চয়তা নেই।
ত্রিপক্ষীয় চুক্তির অন্যতম সইকারী বেক্সিমকো ফার্মা প্রথম দিকে সেরামের বিরুদ্ধে হম্বিতম্বি করলেও এখন বলছে, তাদের কিছু করার নেই। সরকারকে চেষ্টা চালাতে হবে। দুই সপ্তাহ আগে থেকে বাংলাদেশ ও ভারত সরকারের মধ্যে কূটনৈতিক পর্যায়ে চিঠি চালাচালি হলেও এখন পর্যন্ত কোনো সুসংবাদ নেই। অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল বলেছেন, সেরাম টিকা না দিলে টাকা ফেরত দিতে বাধ্য। টাকা দিয়ে আমরা কী করব? আমাদের এখন টিকা প্রয়োজন।
সরকার অন্য তিন উৎস—চীন, রাশিয়া ও যুক্তরাষ্ট্র থেকে টিকা সংগ্রহের যে জোর চেষ্টা চালাচ্ছে, এর মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রই অক্সফোর্ড-অ্যাস্ট্রাজেনেকার টিকা দিতে পারবে। চীন সিনোফার্ম, রাশিয়ার স্পুতনিক–ভি যে টিকা দেওয়ার কথা তা ভিন্ন ব্র্যান্ডের। বিশেষজ্ঞদের মতে, যঁারা ইতিমধ্যে অ্যাস্ট্রাজেনেকার টিকার প্রথম ডোজ নিয়েছেন, দ্বিতীয় ডোজ অন্য টিকা নিতে পারবেন না। তাহলে কি তাঁদের নতুন করে দুই ডোজ টিকা নিতে হবে? এ প্রশ্নের জবাবে আবু জামিল ফয়সাল জানান, প্রথম ডোজ টিকার ৮ থেকে ১২ সপ্তাহের মধ্যে দ্বিতীয় ডোজ নিতে হবে। সে ক্ষেত্রে আরও চার সপ্তাহ সময় পাওয়া যাবে। এই সময়ের মধ্যে যদি সেরাম ইনস্টিটিউট টিকা না পাঠায় কিংবা যুক্তরাষ্ট্র থেকে অ্যাস্ট্রাজেনেকার টিকা না আনা যায়, তাহলে প্রথম ডোজ নেওয়া ব্যক্তিরা বিপদে পড়বেন।
প্রথম আলোর প্রতিবেদন থেকে জানা গেল, অক্সেফোর্ড-অ্যাস্ট্রাজেনেকার টিকা আমদানি নিয়ে সেরাম ইনস্টিটিউট, বাংলাদেশ সরকার ও বেক্সিমকো ফার্মার মধ্যে যে চুক্তি হয়েছে, সেই চুক্তিতে দায়মুক্তি আছে। অর্থাৎ কোনো পক্ষ যদি পরোক্ষ বা বিশেষভাবে কিংবা বিশেষ কোনো পরিস্থিতির কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হয়, তাহলে সে ক্ষেত্রে কেউ দায়ী থাকবে না। চুক্তি অনুযায়ী ছয় মাসের মধ্যে তিন কোটি ডোজ টিকা সরবরাহের কথা। দেড় কোটি ডোজের দাম আগাম দেওয়া হয়েছে। কিন্তু গত ফেব্রুয়ারি-মার্চে সেরাম সরবরাহ করা হয়েছে ৭০ লাখ ডোজ। এরপর টিকা আসা বন্ধ।
বাংলাদেশ এখন যে তিন উৎস থেকে টিকা আনার জোর চেষ্টা চালাচ্ছে, ভূরাজনীতিতে তাদের অবস্থান পরস্পরবিরোধী। চীন বা রাশিয়ার সঙ্গে চুক্তিকে যুক্তরাষ্ট্র সুনজরে দেখবে না। একইভাবে চীনা উদ্যোগে বাংলাদেশের শামিল হওয়াকেও ভালোভাবে নেবে না ভারত। চীন অনেক আগেই বাংলাদেশে টিকা পরীক্ষা ও সরবরাহের প্রস্তাব দিয়েছিল। কিন্তু ভারত অখুশি হবে, এ বিবেচনায় তখন তা নাকচ করে দেওয়া হয়েছিল। সেরামের সঙ্গে চুক্তি হওয়ার পর আনন্দে ডগমগ সরকার অন্য কোনো উৎস খোঁজার প্রয়োজন বোধ করেনি। সরকারের বোকামির খেসারত দিতে হচ্ছে জনগণকে।
টিকা পাওয়ার বিষয়টি এখন নিছক ব্যবসা-বাণিজ্যের মধ্যে সীমিত নেই। বাংলাদেশ দ্রুততম সময়ে অন্য তিন উৎস থেকে টিকা পাবে কি না, কিংবা ভারত সরকারকে নিষেধাজ্ঞা তুলে নিতে রাজি করাতে পারবে কি না, তা নির্ভর করছে ভূরাজনৈতিক হিসাব–নিকাশ এবং বিবদমান পক্ষগুলোর সঙ্গে আলোচনায় আমাদের কূটনীতিকদের দক্ষতা ও বিচক্ষণতার ওপর।
সরকারের নীতিনির্ধারকেরা বলেছিলেন, টিকার জন্য টাকার অভাব হবে না। কিন্তু এখন দেখা যাচ্ছে টাকা দিয়েও টিকা পাওয়া যাচ্ছে না। এটাই সরকারের অবিমৃশ্যকারিতার ফল।
● সোহরাব হাসান প্রথম আলোর যুগ্ম সম্পাদক ও কবি