টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্য ১৬

টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (এসডিজি) বৈশ্বিক উন্নয়নের একটি নতুন এজেন্ডার প্রতিনিধিত্ব করে, যা ২০৩০ সালের মধ্যে একটি টেকসই বিশ্ব গড়ার জন্য নির্দিষ্ট সময়ে অর্জন করতে হবে, এমন কতগুলো উচ্চাকাঙ্ক্ষী বৈশ্বিক লক্ষ্য তুলে ধরে। আমরা এক গুরুত্বপূর্ণ সময়ে উপনীত হয়েছি। কেননা, আমাদের কেবল একটি অধিকতর টেকসই বিশ্বের নয়, বরং এমন এক বিশ্ব গড়ার বনিয়াদ রচনা করতে
হবে যেখানে বিরাজ করবে অধিকতর সমতা ও সুবিচার। সমৃদ্ধি পৌঁছাবে ক্রমবর্ধমানসংখ্যক লোকের কাছে, যারা আমাদের বসবাসের এই পৃথিবীটাকে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের উপযোগী করে গড়ে তুলতে সক্ষম হবে। আমরা যখন ২০১৫-উত্তর উন্নয়ন এজেন্ডার দিকে অগ্রসর হচ্ছি, তখন দারিদ্র্য বিমোচন এবং সমাজের অসমতাকে টার্গেট করার মাধ্যমে ১৫ বছর ধরে লাখ লাখ মানুষের জীবনযাত্রা উন্নয়নে ভূমিকা রাখা সহস্রাব্দ উন্নয়ন লক্ষ্যসমূহের সাফল্য সংহত করার সুযোগ রয়েছে।
এসডিজির প্রস্তাবিত লক্ষ্যসমূহ আগামী দেড় দশক ধরে টেকসই ও সবাইকে অন্তর্ভুক্ত করে সমাজ গড়ার প্রয়াসকে আরও সহায়তা করার স্তম্ভ নির্মাণ করে। আর এই স্বপ্নের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে এসডিজি ১৬। এসডিজি ১৬-এর অগ্রগতি অপর সব এসডিজি লক্ষ্যকে জবাবদিহিমূলক ও কার্যকর রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান হিসেবে সম্মুখে চালিত করার একটি সুযোগ। আর সবার সুবিচার পাওয়ার অধিকার শান্তিপূর্ণ ও অংশীদারমূলক সমাজের মূল ভিত্তি। যেসব লক্ষ্য গৃহীত হতে যাচ্ছে তার সব কটি বাস্তবায়নে যে প্রচেষ্টা প্রয়োজন, তার চাবিকাঠি হচ্ছে দায়িত্বশীল ও প্রতিনিধিত্বমূলক সিদ্ধান্ত গ্রহণের একটি পরিবেশে উন্মুক্ত ও স্বচ্ছ প্রতিষ্ঠানসমূহকে শক্তিশালী করা।
যেসব প্রতিষ্ঠান দুর্নীতিমুক্ত এবং জনগণের দাবি পূরণে এগিয়ে আসে, সেগুলোতে বিনিয়োগ করা এসব লক্ষ্য অর্জনে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। উন্নয়ন ত্বরান্বিত করতে উন্মুক্ত প্রতিষ্ঠানগুলোর মুখ্য ভূমিকা খাটো করে দেখা যেতে পারে না। এসব প্রতিষ্ঠান পরিবর্তনের সম্ভাবনাময় চালিকাশক্তি এবং সেবা প্রদানের ইঞ্জিন এবং রাষ্ট্র ও নাগরিকের মধ্যবর্তী জনগণের সাধারণ ক্ষেত্র পর্যন্ত বিস্তৃত একটি নেটওয়ার্কের মেরুদণ্ডস্বরূপ। এসডিজি ১৬-এর ওপর সংস্কারে ব্যর্থতা নিঃসন্দেহে এসডিজির পূর্ণ সম্ভাবনা বাস্তবায়নে ব্যর্থতার দিকে চালিত করবে। একটি স্বাধীন বিচারব্যবস্থার পরিবেশের সহায়তায় সরকারি খাত কর্তৃক কার্যকরভাবে আধুনিক জবাবদিহিমূলক সরকারি সেবা প্রদান দক্ষ রাষ্ট্রের নিদর্শন। এবং এদের মধ্যে সবচেয়ে সক্ষম রাষ্ট্রটি সরকারি নীতিকে সরকারি অংশীদারির ক্ষেত্রে সুরক্ষিত করার প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরে, যা এসডিজির সফলতার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হবে।

>আগামী কার্যকালজুড়ে অগ্রগতির সঠিক প্রতিফলন ও পিছিয়ে থাকা ক্ষেত্রসমূহ চিহ্নিত করার জন্য পরিমাণগত ও গুণগত উভয় ধরনের হাতিয়ার তৈরি করারও প্রয়োজন হবে

নাগরিক অংশগ্রহণ এবং দারিদ্র্য বা অসমতাসংক্রান্ত নীতিমালা প্রণয়নে প্রভাব রাখতে সক্ষম একটি সক্রিয় নাগরিক সমাজ একটি অনন্য সম্পদ, যার ওপর আমরা আগামী সময়ে যেসব লক্ষ্য স্থির করতে যাচ্ছি, সেগুলো অর্জনে আমাদের নির্ভর করার প্রয়োজন হবে। ২০১৫-উত্তর উন্নয়ন এজেন্ডা সফল হবে যদি এটি প্রণয়নে সহায়তাকারী সারা বিশ্বের লাখ লাখ মানুষের প্রয়োজন মেটাতে এগিয়ে আসে। মানুষ এই নতুন এজেন্ডা বাস্তবায়নের অংশীদার হতে চায়। সামনে অগ্রসর হওয়ার জন্য দুর্নীতি, রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা, অবকাঠামোগত উন্নয়নসহ নাগরিক অধিকার ও উদ্বেগসমূহ চিহ্নিত করে নাগরিকের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে এসডিজি কেন্দ্রীয় ভূমিকা পালন করতে পারে।
সহস্রাব্দ উন্নয়ন লক্ষ্যসমূহের অনেকগুলো টার্গেট অর্জনে বাংলাদেশের সাফল্য অনেক দিক থেকে উল্লেখযোগ্য। নতুন এজেন্ডা ও এসডিজি টার্গেটের কারণে বিশ্বের জন্য নতুন কিছু উন্নয়ন চ্যালেঞ্জ উপস্থিত হয়েছে। মধ্য আয়ের মর্যাদা সংহত করে এবং একটি সমতাপূর্ণ ও সমৃদ্ধ সমাজ গড়ার অভিন্ন স্বপ্ন বাস্তবায়নের মাধ্যমে এ পর্যন্ত অর্জিত অগ্রগতি ছাড়িয়ে এসডিজি টার্গেট অর্জনে কাজ করা হবে খুবই গুরুত্বপূর্ণ। ইউএনডিপি এসডিজি ১৬-এর সুফল প্রদানে যা করা প্রয়োজন তা করবে, তাতে সরকার ও নাগরিক সমাজে আমাদের সহযোগীদের আগামী দিনের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় সম্পৃক্ত করার প্রত্যাশা রয়েছে। এ ক্ষেত্রে অগ্রাধিকার চিহ্নিতকরণ এবং এসডিজি ১৬-কে স্থানীয় পরিপ্রেক্ষিত ও পরিবেশের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেওয়া হবে একটি সূচনাবিন্দু। এই লক্ষ্যকে ঘিরে অগ্রগতি নিরূপণ ও তদারকি নিশ্চিত করতে পারে এমন একটি কাঠামো দাঁড় করানোও হতে পারে একটি গুরুত্বপূর্ণ পরবর্তী ধাপ।
আগামী কার্যকালজুড়ে অগ্রগতির সঠিক প্রতিফলন ও পিছিয়ে থাকা ক্ষেত্রসমূহ চিহ্নিত করার জন্য পরিমাণগত ও গুণগত উভয় ধরনের হাতিয়ার তৈরি করারও প্রয়োজন হবে। নতুন এজেন্ডার প্রতি একটি অঙ্গীকারে বিশ্ব যেসব মৌলিক সমস্যার সম্মুখীন, তা নিরসনের নির্দেশনা প্রয়োজন। এসডিজিতে যেসব লক্ষ্য স্থির করা হয়েছে, তাতে আমরা কীভাবে পরিবেশ সংরক্ষণ করে সবার জন্য মর্যাদা, সমতা ও সুবিচার, অংশীদারিমূলক সমৃদ্ধি এবং কল্যাণ বাড়াতে একসঙ্গে কাজ করব, তার রূপরেখা তুলে ধরা হয়েছে। এসডিজি ১৬ উন্নত সর্বজনীন সেবা প্রদানের সামর্থ্য এবং বিভিন্ন বৈচিত্র্যপূর্ণ দৃষ্টিভঙ্গি ও জন-অগ্রাধিকার আত্মভূত করার ক্ষমতাসম্পন্ন একটি আধুনিক ও স্বচ্ছ রাষ্ট্র গড়ার জোরালো প্রত্যয় নিয়ে অন্য ১৬টি লক্ষ্যেরও অনুঘটক ও চালক হতে পারে।
পলিন ট্যামেসিস: আবাসিক পরিচালক, ইউএনডিপি।