ট্রাম্পকে ছাড়িয়ে যাচ্ছেন কিম!

প্রথম আলোকে নির্ভরযোগ্য সূত্র হিসেবে পেতে হলেএখানে ক্লিক করুন
কিম জং উন, ডোনাল্ড ট্রাম্প
কিম জং উন, ডোনাল্ড ট্রাম্প

উত্তর কোরিয়ার নেতা কিম জং–উন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে দ্বিতীয় শীর্ষ বৈঠক করতে আগ্রহী। সিঙ্গাপুরে গত জুন মাসে তাঁদের প্রথম শীর্ষ বৈঠকের পর থেকে কিম প্রায় প্রতিটি ক্ষেত্রে ট্রাম্পকে ছাড়িয়ে যাচ্ছেন। ট্রাম্প হয়তো নিজেকে এখনো বিশ্বমানের ‘চুক্তি সম্পাদনকারী’ বলতে পছন্দ করেন। কিন্তু সত্যি কথা হলো, কিম জং–উন এখন এ ব্যাপারে ট্রাম্পের মতোই যোগ্যতা অর্জন করেছেন।

কিম জং–উনের মধুর আচরণ এবং পরমাণু কর্মসূচি থেকে সরে আসার প্রতিশ্রুতি ট্রাম্পের হুমকির অবসান ঘটিয়েছে। পাশাপাশি দক্ষিণ কোরিয়ার সরকারকে তাঁর পাশে নিয়ে এসেছে। তাঁর দেশের পরমাণু সামর্থ্য না কমিয়েই কিম এ কাজ সাফল্যের সঙ্গে করেছেন। কাজেই এটা খুব একটা বিস্ময়কর
নয় যে কিম তাঁর নতুন আন্তর্জাতিক বৈধতাকে দৃঢ় করতে এবং তাঁর অবস্থান সারা বিশ্বের কাছে তুলে ধরার জন্য ট্রাম্পের সঙ্গে দ্বিতীয়বারের মতো বৈঠক করতে চাইবেন।

কিম ইতিমধ্যে তাঁর পূর্বসূরিদের চেয়ে ভালো করেছেন। তাঁর পিতা ও পিতামহ উভয়ই যুক্তরাষ্ট্রের সরকারে একটি উচ্চপর্যায়ের চ্যানেল তৈরি করার চেষ্টা করে ব্যর্থ হয়েছিলেন। কিম ট্রাম্পের সঙ্গে যে সম্পর্ক গড়ে তুলেছেন, তা রীতিমতো ঐতিহাসিক এবং তাঁর ব্যক্তিগত সাফল্য। ছয় বছর ধরে সারা বিশ্ব থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে ক্ষমতায় থাকার পর ডোনাল্ড ট্রাম্পের মতো স্থূল চরিত্রের ও অহংকারী প্রেসিডেন্টের সঙ্গে আলোচনায় বসে উত্তর কোরীয় রাজবংশের ৩৫ বছর বয়সী বংশধর বিশ্বমঞ্চে একটি উল্লেখযোগ্য বিতর্কের সৃষ্টি করেছেন।

সিঙ্গাপুর বৈঠকের পর থেকেই মার্কিন কর্মকর্তারা পরমাণু নিরস্ত্রীকরণের রূপরেখা তৈরি করার জন্য কিমের প্রশাসনকে চাপ দিয়ে আসছেন। কিন্তু উত্তর কোরীয়রা সে কথায় কোনো কানই দিচ্ছেন না, এমনকি তাঁদের অস্ত্রভান্ডারের কোনো মৌলিক তথ্য দিতেও অস্বীকার করেছেন। এ ধরনের কাজ এ ইঙ্গিত দেয় যে কিম ট্রাম্পকে বেশ ভালোভাবে পড়তে পেরেছেন। ট্রাম্পের আত্ম–অহংকার, মনোযোগের কেন্দ্রবিন্দুতে থাকার তীব্র ক্ষুধা এবং সাবেক প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার মতো শান্তিতে নোবেল পুরস্কার পাওয়ার আকাঙ্ক্ষা—এসব তথ্য কিমের প্রয়োজন ছিল তাঁকে জানার জন্য। আরও একটি বৈঠকের জন্য আগ্রহ প্রকাশ করে কিম আসলে ট্রাম্পের লক্ষ্য সম্পর্কে জানতে চাইছেন বলেই মনে হচ্ছে।

আগের কথাগুলো মনে করে দেখুন, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে পরমাণু নিরস্ত্রীকরণ–সংক্রান্ত আলোচনায় উত্তর কোরিয়া প্রথমে কোরীয় যুদ্ধের অবসানের
জন্য একটি চুক্তি করতে কূটনৈতিক পদক্ষেপ নেওয়ার জন্য যুক্তরাষ্ট্রের ওপর চাপ প্রয়োগ করেছিল। সিঙ্গাপুরে ট্রাম্প ঠিক তা–ই করেছেন, যা কিনা
মার্কিন কর্মকর্তাদের পাশাপাশি মার্কিন মিত্রদেরও বিস্মিত করেছে।

এতে কোনো সন্দেহ নেই যে কিম আশা করছেন, ট্রাম্পের আবেগপ্রবণতা তাঁকে তাঁর লক্ষ্যে পৌঁছাতে সাহায্য করবে। চলতি মাসে কিমের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় প্রকাশ্যে এ হুমকি দিয়েছে যে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের ব্যাপারে যুক্তরাষ্ট্র তার অবস্থান নমনীয় না করলে উত্তর কোরিয়া ফের তার অস্ত্র কর্মসূচি শুরু করবে।

গত জুনে উত্তর কোরিয়া ‘আর পারমাণবিক হুমকি’ নয়, এমন ঘোষণা দেওয়ার পর ট্রাম্প তাঁর সব দাবি থেকে সরে এসেছেন। উত্তর কোরিয়ায় যুক্তরাষ্ট্র ও দক্ষিণ কোরিয়ার মধ্যকার দুটি বড় যৌথ সামরিক মহড়া বাতিল করেছেন। কিন্তু উত্তর কোরিয়ার ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করেননি। উত্তর কোরিয়া বারবারই যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি আহ্বান জানিয়ে আসছে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করে নেওয়ার জন্য। কিন্তু ট্রাম্প প্রশাসন বলছে, পরমাণু অস্ত্র ধ্বংস না করা পর্যন্ত উত্তর কোরিয়ার ওপর তাদের নিষেধাজ্ঞা বহাল থাকবে।

এ সমস্যা সমাধানের জন্য মাইক পম্পেও গত মাসে উত্তর কোরিয়া সফরে গেলে কিম ফের ট্রাম্পের সঙ্গে বৈঠকের আগ্রহ প্রকাশ করেন। তবে এমন হতে পারে, ট্রাম্প হয়তো প্রথমেই এই দ্বিতীয় বৈঠকের ব্যাপারে রাজি হবেন না। অতীতেও তিনি এমনটা করেছেন। উত্তর কোরিয়ার বিবৃতির প্রেক্ষাপটে ট্রাম্প জুন মাসের বৈঠকটি প্রথমে বাতিল করেছিলেন। আগস্ট মাসে কিম আর পম্পেওর মধ্যে বৈঠক অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা ছিল। ট্রাম্প তা–ও বাতিল করেন। পরে তা অক্টোবরে অনুষ্ঠিত হয়। ট্রাম্প যে একই কাজ আবার করবেন না, এর কোনো নিশ্চয়তা নেই।

তবে ট্রাম্প যদি তা করেনও, কিমের নাটক করার যে ঝোঁক (জাপানের ওপর ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করার ভান) এ ইঙ্গিত দেয় যে তিনি খুব ভালো করেইজানেন কীভাবে মঞ্চের নিয়ন্ত্রণ নিতে হবে এবং কীভাবে ট্রাম্পকে আলোচনার টেবিলে আনতে হবে। এ ছাড়া ট্রাম্পের কাছে তাঁর আবেগপূর্ণ চিঠি এটা প্রমাণ করে যে তিনি তাঁর মন বেশ ভালোই বুঝতে পেরেছেন।

স্বত্ব: প্রজেক্ট সিন্ডিকেট।

কেন্ট হ্যারিংটন সিআইএর সাবেক সিনিয়র বিশ্লেষক

জন ওয়ালকট জর্জটাউন ইউনিভার্সিটির স্কুল অব ফরেন সার্ভিসের অধ্যাপক