তাঁরাই কেন উপাচার্য হন?

গত আট বছর ধরে জাপানের বিশ্ববিদ্যালয়ে আছি। স্নাতকোত্তর, পিএইচডি শেষ করে পোস্টডক করছি, কিন্তু এখন যদি কেউ আমাকে জিজ্ঞাসা করে, আপনার বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য (জাপানে যাকে বলা হয় প্রেসিডেন্ট) কে? কিংবা আপনার অনুষদের ডিনের নাম কী, তাহলে আমার পক্ষে এই উত্তর দেওয়া সম্ভব নয়। শুধু আমি কেন, জাপানের যেকোনো বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীকে যদি আপনি এই প্রশ্নটিই করেন, আমার মনে হয় না, কেউ সঠিক উত্তর দিতে পারবে। বিষয়টি খুবই সোজা, এখানে প্রেসিডেন্ট (উপাচার্য) নাম জানার প্রয়োজন পড়ে না। কিংবা এই দেশের পত্রপত্রিকায় নিত্যদিন তাঁদের নিয়ে খবর প্রকাশ হয় না। শিক্ষার্থীরা কেবল তাঁকে বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাবর্তনেই দেখে। এর বাইরে কখনো প্রেসিডেন্টের প্রয়োজন শিক্ষার্থীদের কাছে নেই। এই প্রেসিডেন্ট হতে তাঁদের রাজনৈতিক পরিচয়ে পরিচিত হতে হয় না, এঁরা সবাই জাঁদরেল একাডেমিশিয়ান।

বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রেসিডেন্ট পদে আসীন থাকলেও এঁরা তাঁদের অফিস যেমন করেন, তার চেয়ে বেশি সময় নিজেদের ল্যাবে দেন। কারণ, বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রেসিডেন্ট মেয়াদ শেষ হওয়ার পর তাঁকে এই ল্যাবেই সময় দিতে হবে, এই ল্যাবই তাঁদের ধ্যান। বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রেসিডেন্ট পদ, তাঁদের কাছে পরম সম্মানের, সেই সম্মান রক্ষায় কেবল বিশ্ববিদ্যালয়ের উন্নয়নে ব্রত থাকেন।

পক্ষান্তরে, আপনি যদি বাংলাদেশের যেকোনো বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যের নাম জানতে চান, তাহলে দেখবেন সিংহভাগ শিক্ষার্থীই তাদের উপাচার্যদের নাম বলতে পারছে। শুধু নিজেদের উপাচার্যই নয়, এই দেশের ডজনখানেক বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যের নাম–পরিচয় জানে তারা। এই জানার বিষয়টি তাদের কাছে খুবই সহজ। প্রতিদিন পত্রপত্রিকা খুললেই আমাদের দেশের মহান উপাচার্যদের শিরোনাম হতে দেখে। টেলিভিশন খুললেই তাঁদের নিয়ে খবর থাকে। কখনো ইতিবাচক (কালেভদ্রে) আবার কখনো উপাচার্যদের অনিয়ম-দুর্নীতির আমলনামা মুখরোচক হয়ে ওঠে।

গত কয়েক দশক ধরে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর দিকে তাকালে আমরা দেখতে পাই ক্ষমতাসীন সরকারের আশীর্বাদপুষ্ট শিক্ষকেরাই বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর উপাচার্য হয়েছেন। অরাজনৈতিক পদটি অনেকটা অঘোষিত রাজনৈতিক পদ হয়ে দাঁড়িয়েছে। তাঁরা শিক্ষকদের সংগঠনগুলোর নেতা হন, রাজনৈতিক দলগুলোর সাদা-নীল-হলুদ দলের নেতা হন, আর সর্বশেষ পুরস্কার হিসেবে সেই নেতারা উপাচার্য হন। উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর উপাচার্য হওয়ার এটাই এখন রূপকল্প। ফলে এই উপাচার্যরা যতটা না একাডেমিশিয়ান, তার চেয়ে বেশি দলীয় রাজনৈতিক চিন্তাধারার লোক। এঁরা যতটা না শিক্ষার্থীবান্ধব, তার চেয়ে বেশি সরকারবান্ধব।

গত কয়েক দশক ধরে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর দিকে তাকালে আমরা দেখতে পাই ক্ষমতাসীন সরকারের আশীর্বাদপুষ্ট শিক্ষকেরাই বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর উপাচার্য হয়েছেন। অরাজনৈতিক পদটি অনেকটা অঘোষিত রাজনৈতিক পদ হয়ে দাঁড়িয়েছে। তাঁরা শিক্ষকদের সংগঠনগুলোর নেতা হন, রাজনৈতিক দলগুলোর সাদা-নীল-হলুদ দলের নেতা হন, আর সর্বশেষ পুরস্কার হিসেবে সেই নেতারা উপাচার্য হন।

এই দেশের বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের বছরের একটি বড় অংশ পড়াশোনার বাইরে দাবিদাওয়া আদায়ের আন্দোলনের জন্য বরাদ্দ রাখতে হয়। যৌক্তিক এসব আন্দোলনে শিক্ষার্থীদের বাইরে কখনো কখনো শিক্ষকেরাও যোগ দেন। উপাচার্যদের সীমাহীন দুর্নীতি ও অনিয়মের প্রতিবাদে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে আন্দোলন-সংগ্রামে যে সময় অপচয় হয়, সেই সময়টুকু তারা যদি ক্লাসে ব্যয় করার সুযোগ পেত, তাহলে সেটি হতে পারত এই দেশের মানসিক উন্নয়নের বড় সোপান।

আমরা দেখি, উপাচার্যের অনিয়ম ঢাকতে একদল শিক্ষক যেমন তাঁর পক্ষে স্লোগান দেয়, তেমনি বিপক্ষেও থাকছেন কেউ কেউ। শিক্ষার্থীদের প্রতিবাদমুখর আন্দোলনকে দমিয়ে রাখতে, বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন সব সময় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে লেলিয়ে দেয়, কখনো কখনো ক্ষমতাসীন দলের ছাত্রসংগঠনকে দিয়ে শিক্ষার্থীদের শায়েস্তা করতেও পিছপা হয় না তারা। আর এসব নিপীড়ন ও অনিয়মে ঘেরা প্রশাসন দেখে, শিক্ষকদের নৈতিকতাবর্জিত আচরণ দেখে, আমাদের ছেলেমেয়েরা শিক্ষকদের প্রতি একধরনের অনাস্থা প্রকাশ করছে।

মূলত ক্ষমতাসীনরা বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে নিজেদের করায়াত্তে রাখার জন্য তাদের মতাদর্শের মানুষদের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর প্রশাসনিক পদে আনছে। ফলে যারা ক্ষমতায় আসছে, তারাই সরকারের আনুগত্য করছে। যে কারণে বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো গুরুত্বপূর্ণ এই পদে নিখাদ একাডেমিশিয়ানরা থাকছে না। কারণ, যাঁরা বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে ভালো গবেষণা করছেন, ক্লাসে ভালো পড়ান, শিক্ষার্থীদের জন্য নিজেকে উৎসর্গ করছেন—এই সব মানুষেরা বিশ্ববিদ্যালয়ের পিচ্ছিল রাজনীতি থেকে নিজেদের বাইরে রাখেন। যে কারণে যোগ্য মানুষ থাকার পরও আমাদের রাষ্ট্র তাঁদের বিশ্ববিদ্যালয়ের নেতৃত্বে আনার সুযোগ পায় না। ফলে ক্লাস ফেলে যাঁরা সারা দিন মিছিল-সমাবেশে ব্যস্ত, পত্রপত্রিকায় বড় বড় আদর্শিক জ্ঞান বিলিয়ে ব্যস্ত, এই শ্রেণির অধ্যাপকেরা যখন বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য পদে আসীন হচ্ছেন, তখন তাঁদের বড় অংশই জড়িয়ে পড়ছে নিয়োগ, অনিয়ম আর দুর্নীতির সঙ্গে। নিজের একক ক্ষমতা প্রতিষ্ঠা করার জন্য, নিজ সমর্থক গোষ্ঠী কিছু শিক্ষককে নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়কে বাণিজ্যশালা বানিয়ে ফেলেন তাঁরা। স্বেচ্ছাচারিতার সব মাত্রা অতিক্রম করে, বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে নিজেদের বাপ-দাদার সম্পত্তি মনে করেন। অবাক করা ব্যাপার হলো, স্নাতকোত্তর পাস করা উপাচার্যের হাতেই প্রকাশ হচ্ছে পিএইচডির ফলাফল। নিজের সেই যোগ্যতা না থাকলেও তিনিই হচ্ছেন পিএইচডির নিরীক্ষক। আর এই অসম্ভবকে সম্ভব করে দিয়েছে আমাদের সরকার।

সাম্প্রতিক সময়ে আমরা দেখছি, রংপুরের বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়, গোপালগঞ্জের বঙ্গবন্ধু বিশ্ববিদ্যালয়, খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়সহ বেশ কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয়ে উপাচার্যরা যে অনিয়ম ও স্বেচ্ছাচারিতায় বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে ডুবিয়ে ফেলছিলেন, সেই সব উপাচার্যদের বিরুদ্ধে হওয়া আন্দোলন–সংগ্রামে মাসের পর মাস কেটে গিয়েছিল। আর সেখানে যোগ হয়েছে শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়। দুর্নীতির অভিযোগের মুখে থাকা উপাচার্যদের নিয়ে সরকার ব্যবস্থা গ্রহণ না করে বরং তাদের পুনর্নিয়োগ দিয়ে তাদের স্বেচ্ছাচারিতাকে উসকে দিয়েছিল। ছাত্র-শিক্ষকদের বাধার মুখেও এদের বিশ্ববিদ্যালয় বহাল রাখা হয়েছে দিনের পর দিন। অথচ এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের কোনো সহজ সমাধানের নজর দেয়নি সরকার। সরকার এসব দেখেও না দেখার ভান করেছে। দুর্নীতিবাজদের পুরস্কৃত করে তাদের আরও বেশি ক্ষমতাধর বানিয়ে ফেলছে।

বারবার বিতর্কিত মানুষদের উচ্চশিক্ষালয়ে এনে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর সুনাম ম্রিয়মাণ হয়ে যাচ্ছে। উপাচার্যদের পদত্যাগ দাবিতে শিক্ষার্থীদের শিক্ষাজীবনের একটি অংশই যদি চলে যায়, তাহলে পড়াশোনা করবে কীভাবে? দাবিদাওয়ার আন্দোলনে যদি মাসের পর মাস চলে যায়, তাহলে তারা ক্লাস করবে কখন? মহামারির দেড় বছর পর ক্লাস শুরু করার পর যদি এমন ‘গুণধর’ উপাচার্য পদত্যাগের দাবি নিয়ে শীতের রাতে অনশন করতে হয়, তাহলে তারা স্বাভাবিক শিক্ষাজীবনে ফিরবে কবে?

রাজনৈতিক পদ-পদবি হিসেবে উপাচার্য নিয়োগ নয়, এটি একটি জাতি বিনির্মাণের সংকল্পকদের পদ। এটি শিক্ষার্থী-শিক্ষকদের সম্মানের পদ। প্রভাষক, সহকারী ও সহযোগী অধ্যাপক ও অধ্যাপকদের পদোন্নতি পেতে যেমন যোগ্যতা ও গবেষণাপত্রের প্রয়োজন, উপাচার্য হতে গেলে তেমন বিধান করা যায় কী না সিদ্ধান্ত নিন। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপকেরা সরাসরি ভোটের মাধ্যমে প্রেসিডেন্ট ক্যান্ডিডেটকে (উপাচার্য) বেছে নেন। ফ্যাকাল্টির সদস্যদের পূর্ণ ক্ষমতা তাঁকে, তাঁরা কাকে এই বিশ্ববিদ্যালয় পরিচালনার জন্য যোগ্য মনে করেন। ফলে এই প্রেসিডেন্ট নিজের কাজের জবাবদিহি কেবল বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের জন্য জমা রাখেন। তিনি আমলাতন্ত্রের জাঁতাকলে পিষ্ট হন না, কোনো রাজনৈতিক নেতা-কর্মীদের চোখ রাঙানি সহ্য করেন না। আমরা এমনই স্বায়ত্তশাসিত বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বপ্ন দেখি।

বহিরাগত উপাচার্যদের না এনে স্বীয় বিশ্ববিদ্যালয়গুলো থেকে উপাচার্য তৈরি করার বিধান থাকুক। ঢাকা টু রংপুর, ঢাকা টু সিলেট, ঢাকা টু গোপালগঞ্জ যাত্রা করতে যাঁদের সময় চলে যায়, এমন উপাচার্যদের দিয়ে বিশ্ববিদ্যালয় পরিচালনা কখনোই স্বয়ংসম্পূর্ণ হয় না। এই নীতি থেকে আমাদের বেরিয়ে আসতে হবে। স্বীয় বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে বেড়ে ওঠার শক্তি ও সাহস দিতে হবে। সেটি করতে না পারলে এই সব ‘বহিরাগত’ উপাচার্যদের বিরুদ্ধে অসন্তোষ ও বিক্ষোভ উচ্চশিক্ষালয়গুলো মুখ থুবড়ে পড়বে। আমার বিশ্বাস সরকার ভবিষ্যতে এই বিষয়ে নজর রাখবে।

  • ড. নাদিম মাহমুদ জাপানের ওসাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক। [email protected]