
দক্ষিণ এশীয় কৃত্রিম উপগ্রহ (স্যাটেলাইট) উৎক্ষেপণকে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি প্রতিবেশীদের তাঁর দেশের বন্ধুত্বের ‘অমূল্য উপহার’ হিসেবে অভিহিত করেছেন। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, ‘আমি এ বিষয়ে নিশ্চিত যে এই উপগ্রহ উৎক্ষেপণ দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর দৃশ্যপট বদলে দেবে।’ তিনি আরও বলেছেন, দক্ষিণ এশীয় উপগ্রহ উৎক্ষেপণের মাধ্যমে বাংলাদেশ ও ভারত তাদের পারস্পরিক সহযোগিতার ক্ষেত্রে স্থল, জল ও আকাশপথ ছাড়িয়ে মহাশূন্য পর্যন্ত বিস্তৃত করল।
উপগ্রহটি ‘অমূল্য উপহার’ই বটে। দক্ষিণ এশীয় উপগ্রহে ভারতের খরচ হয়েছে সাড়ে চার শ কোটি রুপি, যা ডলারে সাত কোটির মতো। বাংলাদেশ যে বঙ্গবন্ধু উপগ্রহ তৈরি করছে, তার ব্যয় কিন্তু এটির প্রায় পাঁচ গুণের বেশি (তিন হাজার কোটি টাকা বা সাড়ে সাঁইত্রিশ কোটি ডলার)। সুতরাং আর্থিক সামর্থ্যের দিক দিয়ে বাংলাদেশের কাছে এই ভারতীয় উপগ্রহের উপহারের মূল্য বিচারের প্রশ্ন ওঠে না। এই ভারতীয় উপগ্রহের মূল্য বা গুরুত্বটা অন্য জায়গায়। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কথায় যেটি স্পষ্ট। ‘এই উপগ্রহ উৎক্ষেপণ দক্ষিণ এশিয়ার দৃশ্যপট বদলে’ দিল এবং ভারত ও বাংলাদেশের সহযোগিতাকে অন্য মাত্রায় নিয়ে গেল।
কীভাবে এই দৃশ্যপট বদলে গেল? ভারতের এই দক্ষিণ এশীয় উপগ্রহটি আসলে হওয়ার কথা সার্ক উপগ্রহ। এটির সিদ্ধান্ত হয়েছিল ২০১৪ সালে সার্কের কাঠমান্ডু শীর্ষ বৈঠকে। ভারত বলছে যে পাকিস্তান এই উপগ্রহে অংশগ্রহণের প্রস্তাবে রাজি হয়নি। উপগ্রহটি উৎক্ষেপণের পরও ভারতের দ্য ইকোনমিক টাইমস (৫ মে, ২০১৭) জানিয়েছে যে আফগানিস্তানের সঙ্গে একটি সমঝোতায় পৌঁছানোর চেষ্টা চলছে। কিন্তু পাকিস্তানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র নাফিস জাকারিয়াকে উদ্ধৃত করে সিএনএন জানিয়েছে, পাকিস্তান শুরুতে আগ্রহী ছিল। কিন্তু ভারত সহযোগিতার ভিত্তিতে কাজটি করতে রাজি না হওয়ায় সার্কের ছায়ায় তা করা গেল না। ইন্ডিয়া টাইমস ডট কম নাফিস জাকারিয়াকে উদ্ধৃত করে জানিয়েছে যে আন্তর্জাতিক টেলিকমিউনিকেশন ইউনিয়নে (আইটিইউ) এই উপগ্রহ সার্ক স্যাটেলাইট হিসেবে রেজিস্ট্রিকৃত হওয়ার কথা।
সার্কের শীর্ষ বৈঠকে গৃহীত কোনো সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে কোনো একটি সদস্যরাষ্ট্র পিছুটান দিলে বা আপত্তি জানালে সেই সিদ্ধান্ত পরিত্যক্ত হয় বলেই আমরা জানি। যে কারণে একাধিকবার সার্কের শীর্ষ বৈঠক অনুষ্ঠিতই হতে পারেনি। সাবেক পররাষ্ট্রসচিব হেমায়েতউদ্দিনের কাছে বিষয়টি জানতে চাইলে তিনি বলেন, সার্কের সনদ বা চার্টারে যদি পরিবর্তন না হয়ে থাকে, তাহলে সে রকমই হওয়ার কথা। সার্ক সচিবালয়ের ওয়েবসাইটে যে সনদটি আছে, তাতে ১০ নম্বর ধারায় বলা আছে, সর্বপর্যায়ে সিদ্ধান্ত হতে হবে সর্বসম্মতভাবে। (Article X: GENERAL PROVISIONS—Decisions at all levels shall be taken on the basis of unanimity.)
বাস্তবতা অবশ্য একেবারেই আলাদা। গত ২০ মার্চ বাংলাদেশ সরকারের মন্ত্রিসভার বৈঠকে প্রথম সিদ্ধান্ত অনুমোদিত হয় যে ভারতের দক্ষিণ এশিয়া উপগ্রহে বাংলাদেশ অংশগ্রহণ করবে। তার তিন দিন পর ২৩ মার্চ ঢাকায় বাংলাদেশ টেলিকমিউনিকেশন রেগুলেটরি কমিশনের (বিটিআরসি) চেয়ারম্যানের সঙ্গে ভারতীয় হাইকমিশনার হর্ষবর্ধন শ্রিংলা এ বিষয়ে একটি চুক্তি সই করলেন। পর্যায়ক্রমে ভারতের উদ্যোগে দ্বিপক্ষীয় আলোচনার ভিত্তিতে অন্য ছয়টি দেশও এই উপগ্রহে অংশগ্রহণের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। যে সাতটি দেশ এতে অংশ নিল, তারা কি কোনো নতুন ফোরাম প্রতিষ্ঠা করল? না, সে রকম কিছুই হয়নি। কিন্তু এই উদ্যোগ যে প্রশ্নের জন্ম দিয়ে গেল তা হচ্ছে, আমরা কি একে এখন সার্কের মৃত্যু ঘোষণার একটি স্মারক হিসেবে দেখব?
ভারতের কূটনৈতিক ও নিরাপত্তা বিশ্লেষকেরা এই উপগ্রহ উৎক্ষেপণকে ভারতের মহাকাশ কূটনীতি বলে অভিহিত করেছেন। সিএনএন জানাচ্ছে যে বিশ্লেষকেরা অনেকেই বলছেন, পাকিস্তানকে পাশে ঠেলে দিয়ে প্রতিবেশীদের সঙ্গে সম্পর্কোন্নয়নে ভারতের বড় ভাইয়ের ভূমিকা এতে জোরদার হবে। ভারতের অবজারভার রিসার্চ ফাউন্ডেশনের পরমাণু ও মহাকাশ নীতি উদ্যোগের প্রধান রাজেশ্বরী পিল্লাই রাজাগোপালন সিএনএনকে বলেছেন, ‘ভারত বাণিজ্যিকভাবে বিভিন্ন দেশের জন্য উপগ্রহ উৎক্ষেপণের কাজ করলেও তাকে পররাষ্ট্রনীতির হাতিয়ার হিসেবে কখনো কাজে লাগায়নি। মহাকাশকে কেবল বিজ্ঞান এবং প্রযুক্তির ক্ষেত্র হিসেবে দেখা যায় না। এখন একে পররাষ্ট্রনীতি ও কৌশলগত দিক থেকেও দেখতে হচ্ছে।’
বিশেষজ্ঞরা বলছেন যে ভারতের এই উপগ্রহটি নিয়ে কাজ করার অন্যতম কারণ হচ্ছে দক্ষিণ এশিয়ায় চীনের প্রভাবকে মোকাবিলা করা। ২০১১ সালে চীন পাকিস্তানের সঙ্গে এবং ২০১২ সালে শ্রীলঙ্কার সঙ্গে আলাদা যোগাযোগপ্রযুক্তির উপগ্রহ উৎক্ষেপণ করেছে। রাজাগোপালন বলছেন, ভারত ও চীনের মধ্যে ক্রমশ বাড়তে থাকা প্রতিদ্বন্দ্বিতার ক্ষেত্র হয়ে উঠছে মহাকাশ।
মহাশূন্যনির্ভর এই সহযোগিতার যে ভূরাজনৈতিক দিক আছে, তার বাইরে বাস্তবে আমরা কি পেলাম, সেই প্রশ্নটিও এখানে গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষজ্ঞ অভিমত হচ্ছে, এই উপগ্রহের কোনো সুফল আমাদের এখনই পাওয়ার সম্ভাবনা নেই। বিবিসির বিজ্ঞান লেখক পল্লব বাগলা লিখেছেন, মহাশূন্য চারণের ক্ষেত্রে ভারতের এই উপহারের মতো আর কোনো দৃষ্টান্ত নেই। কেননা, যে কাজগুলো এই উপগ্রহ করবে বা তা থেকে যেসব তথ্য-উপাত্ত ভারতের প্রতিবেশীরা পেতে পারে, সেগুলো সাধারণত বাণিজ্যিকভাবে পরিচালিত উপগ্রহ প্রতিষ্ঠানগুলোই দিয়ে থাকে। ভারতের নতুন এই উপগ্রহ টেলিযোগাযোগ, সম্প্রচার, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা এবং আবহাওয়ার পূর্বাভাস দেওয়ার কাজে লাগবে। ভারত অংশগ্রহণকারী দেশগুলোর প্রত্যেককেই একটি করে ট্রান্সপন্ডার (উপগ্রহ থেকে বার্তা গ্রহণের সরঞ্জাম বা ডিভাইস) এবং প্রযুক্তিগত সহায়তা দেবে। কিন্তু এই ট্রান্সপন্ডার বসানোর জন্য ভূকেন্দ্র বা আর্থস্টেশন প্রয়োজন হবে। আমাদের যেসব ভূকেন্দ্র আছে, সেগুলো এর জন্য উপযুক্ত নয়। অতএব নতুন একটি ভূকেন্দ্র প্রয়োজন। বিটিআরসির চেয়ারম্যান শাজাহান মাহমুদের কাছে জানতে চাইলে তিনি বিষয়টি নিশ্চিত করে বলেছেন, ‘আমাদের বঙ্গবন্ধু উপগ্রহের জন্য গাজীপুরে একটি ভূকেন্দ্র নির্মাণের কাজ হচ্ছে, যেটি শেষ হতে এখনো মাস পাঁচেক সময় লাগবে। সুতরাং ভারতের দক্ষিণ এশীয় উপগ্রহ থেকে এখনই স্বাধীনভাবে কোনো তথ্য-উপাত্ত পাওয়ার সুযোগ আমাদের নেই।’
ভূকেন্দ্রটি তৈরি না হওয়া পর্যন্ত, অর্থাৎ অক্টোবর মাস অবধি কোনো তথ্য-উপাত্ত পেতে হলে আমাদের ভারতের ওপরই নির্ভরশীল থাকতে হবে। শাজাহান মাহমুদ প্রথম আলোকে নিশ্চিত করেছেন যে নভেম্বর কিংবা ডিসেম্বরে আমাদের বঙ্গবন্ধু উপগ্রহ উৎক্ষেপণের কাজটি করা হবে। সেদিক থেকে এই উপহার থেকে আমাদের উপকৃত হওয়ার সম্ভাবনা সামান্যই।
বিশেষজ্ঞরা আরও বলছেন, আমাদের প্রাকৃতিক সম্পদের মজুত অনুসন্ধানের তথ্য সংগ্রহ থেকে শুরু করে প্রাকৃতিক দুর্যোগের পূর্বাভাস পর্যন্ত নানা বিষয়ে এই উপগ্রহ তথ্য সংগ্রহ করবে। তাতে করে আমাদের সম্পর্কে অনেক কিছুই আমরা জানার আগে ভারত জানতে পারবে। কৃত্রিম উপগ্রহের পুরো মেয়াদকালেই আমরা যে ধরনের তথ্যই চাই না কেন, তাতে ভারতের কাছে অজানা থাকবে না। অর্থাৎ আমাদের আলাদা ট্রান্সপন্ডার দেওয়া হলেও যেহেতু নিয়ন্ত্রণকেন্দ্রটি হচ্ছে ভারতের শ্রীহরিকোটায়, সেহেতু সব তথ্য-উপাত্তই তাদের নিয়ন্ত্রণকেন্দ্রে পাওয়া যাবে। আমাদের জন্য গোপন বা নিরাপদ কোনো চ্যানেল এতে থাকছে না। বিটিআরসির চেয়ারম্যানের কাছে এ বিষয়টি জানতে চাইলে তিনি তা নিশ্চিত করেছেন।
বলা হয়েছে যে টিভি চ্যানেলগুলো সম্প্রচারকাজে এই উপগ্রহ ব্যবহার করতে পারবে। কিন্তু তা কি বিনা মূল্যে? এই প্রশ্নে শাজাহান মাহমুদ বলেন, বিষয়টি এখনো ঠিক হয়নি। তিনি জানান, বঙ্গবন্ধু উপগ্রহে ট্রান্সপন্ডার থাকবে ১২টি এবং সেটি টিভি চ্যানেলগুলোকে অনেক বেশি সেবা দিতে পারবে। তাহলে এ বছরেই যদি আমাদের নিজস্ব উপগ্রহ মহাকাশের কক্ষপথে স্থাপিত হয়ে যায়, তাহলে ভারতের দক্ষিণ এশীয় উপগ্রহের উপযোগিতা আর কতটুকু থাকে? ভিন্নভাবে বললে ভারতীয় এই উপগ্রহকে যদি আমরা কাজে লাগাই, তাহলে বঙ্গবন্ধু উপগ্রহের উপযোগিতা কি কিছুটা ক্ষুণ্ন হবে বা কমে যাবে? শাজাহান মাহমুদ বলছেন, ‘ভারতীয় উপগ্রহটি তখন আমাদের বঙ্গবন্ধু উপগ্রহের সেবাগুলোর সহায়ক বা অতিরিক্ত হিসেবে (সাপ্লিমেন্ট) কাজে আসতে পারে।’
ভারতের এই উপগ্রহ প্রতিবেশীদের কল্যাণ কতটা করবে, তা নিয়ে প্রশ্ন থাকলেও কূটনীতি ও ভূরাজনীতিতে এর যে দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব পড়বে, তাতে সন্দেহ নেই। ফলে দক্ষিণ এশিয়ার দৃশ্যপট যে সত্যি সত্যিই বদলে গেছে এবং তা ঘটেছে মহাকাশ কূটনীতির কল্যাণে, তাতে সন্দেহ নেই।