নতুন সংবিধান প্রণয়নের জন্য নেপালের রাজনীতিবিদ ও জনগণকে অভিনন্দন জানাই। তারা তাদের এককেন্দ্রিক কাঠামো ভেঙে ফেডারেল ধাঁচের সংসদীয় গণতন্ত্র প্রবর্তন করেছে। বিশ্বের একমাত্র হিন্দু রাষ্ট্রের তথাকথিত গর্বে তারা গর্বিত হতে চায়নি। তারা ধর্মের নামে নয়, মানবতার জয়গানকে সার্থক করেছে। কোনো প্রকার ভান ও ভণিতা ছাড়াই তারা গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার শ্রেষ্ঠতম শর্ত পূরণ করেছে। তারা রাষ্ট্র থেকে ধর্মকে পৃথক করার নীতি গ্রহণ করেছে এবং তা কোনো বুজরুকি দিয়ে ঢেকেঢুকে নয়; সেক্যুলারিজমকে তারা সর্বান্তঃকরণে গ্রহণ করেছে। এর এক নম্বর শর্ত পূরণ করেছে। নেপাল হবে বহু জাতির, বহু বর্ণের ও বহু ভাষাভাষীর রাষ্ট্র। আর তারা সবাই সংখ্যানুপাতে সংসদে নির্বাচিত হবে। নেপাল হবে ‘ইনক্লুসিভ ডেমোক্রেটিক’।
ভাষা প্রশ্নে নেপালি সংবিধানে যে বিধান যুক্ত করা হয়েছে, তাকে শ্রেষ্ঠতম মানতে হচ্ছে। তারাই প্রকৃতপক্ষে সালাম, জব্বার, রফিকের জীবনদানকে সার্থক করেছে। তারাই একুশে ফেব্রুয়ারিকে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস ঘোষণার তাৎপর্যকে সাফল্যমণ্ডিত করেছে। কারণ, তারা সংখ্যাগরিষ্ঠের মাতৃভাষা নেপালিকে রাষ্ট্র বা জাতীয় ভাষা হিসেবে ঘোষণা করেনি। তারা এমন একটি সর্বজনীন বিধান লিখেছে, তা বিশ্বের সব সংবিধান গ্রহণ করলেও কোনো জটিলতা সৃষ্টি হবে না। তারা লিখেছে, অল দ্য মাদার টাংস স্পোকেন ইন নেপাল শ্যাল বি দ্য ন্যাশনাল ল্যাঙ্গুয়েজ। ‘নেপালে উচ্চারিত সকল মাতৃভাষা জাতীয় ভাষা হিসেবে গণ্য হবে।’
এই বহু ভাষাভাষী ও বহু ধর্মের জনগোষ্ঠীকে কী করে রাজনৈতিক প্রক্রিয়ায় যুক্ত করা যায়, তার সযত্ন চেষ্টা সংবিধানে ফুটে উঠেছে। নেপালি রাজনীতিকেরা হয়তো প্রতিবেশীদের দেখে এই শিক্ষা নিয়েছেন যে দলিতদের ওপরে টেনে তুলতে আম্বেদকারীয় কোটা মলমের কাজ করে। ক্ষত বা ক্ষতের দাগ মিলিয়ে যেতে দেয় না। তাই তাঁদের সত্যিকারের ক্ষমতায়নের জন্য চাই রাজনৈতিক ক্ষমতায়ন।
রাজনৈতিক দলগুলো তাঁরা তাই এমনভাবে সংগঠিত ও পরিচালনা করবেন, যাতে অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনের সংজ্ঞা কেবল মানুষ ডেকে শান্তিপূর্ণভাবে ভোটের বাক্স বোঝাই করা না বোঝায়। সমাজের কাঠামোতে যদি সত্যিকারের প্রতিনিধিত্বশীল কমিটি থাকে, তাহলে সেই সমাজে ভোট ডাকাতি অকল্পনীয় হতে বাধ্য। কারণ, জনগণ তার স্বার্থে অনিয়ম রুখে দেবে। এই সামাজিক শক্তির শক্তিশালী উত্থান ছাড়া দলীয় কিংবা নির্দলীয় কোনো ধরনের ব্যবস্থা সুষ্ঠু নির্বাচনের নিশ্চয়তা দিতে পারে না। নেপাল সে কারণে মনে রেখেছে যে দল ও তার বিভিন্ন স্তরের কমিটি গঠনের মধ্যেই বিড়াল মারতে হবে। কারণ, এসব কমিটির একটি নির্বাচনগত মাত্রা আছে। আইনের শাসনের সঙ্গে এর সম্পর্ক নিবিড়। কারণ, এই দলীয় কমিটিই মানবিক ও ন্যায্য সমাজ গড়বে। আর এটা থাকলে সমাজে লজ্জা থাকবে। আর লজ্জা থাকলে ন্যায়বিচার করা যাবে। সুষ্ঠু ও শৃঙ্খলাপূর্ণ কমিটি হলো যোগ্য ব্যক্তির নেতা হওয়ার রক্ষাকবচ। এখানে ঘাটতি থাকলে কোনো নির্বাচন কমিশন বা স্বাধীন আদালত তা পূরণ করতে পারবে না।
>এক দশকের প্রচেষ্টার পরে তারা সম্ভবত এমন আরও কতগুলো বিধান যুক্ত করেছে, যা উপমহাদেশে অনন্য এবং তা ভারতসহ তার প্রতিবেশীদের জন্য অনুকরণীয় বলে গণ্য হতে পারে
নেপালিদের শতকরা ৮০ ভাগের বেশি হিন্দু হলেও জাতপাত ও বর্ণে-গোত্রে তার ভেতরে বৈচিত্র্যের শেষ নেই। ১২৫টি জাতিগত ও সংখ্যালঘু গোষ্ঠীর সবাই যাতে ভাবতে পারে সংসদ আমার, এই রাষ্ট্র আমার, সরকার আমার, এদের সবাই যাতে রাজনৈতিক দলগুলোর দৈনন্দিন কার্যক্রমে অংশ নিতে পারে, সেই রকম করে পুরো রাজনৈতিক দল ও নির্বাচনব্যবস্থা সাজানো হয়েছে। সংবিধানে বলে দেওয়া হয়েছে, অনগ্রসর, জাতিগত সংখ্যালঘু, মুসলিম ও ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করে আইন দ্বারা নির্দিষ্ট শর্তে দল ও সংসদ গঠন করতে হবে। এই লক্ষ্য অর্জনে তারা আমাদের দেশে যেভাবে ভোট হয়, তেমন নিয়ম কিছুটা এবং সংখ্যানুপাতিক পদ্ধতির মিশেলে একটি ভোটব্যবস্থা প্রবর্তন করেছে। এই দুই ব্যবস্থার আওতায় ২৭৫ সদস্যের ফেডারেল সংসদ গঠিত হবে। সংসদের সংখ্যাগরিষ্ঠের নেতা যথারীতি প্রধানমন্ত্রী ও রাষ্ট্রপতি সাংবিধানিক প্রধান হবেন। কিন্তু তারপরও রাষ্ট্রপতির হাতে কিছু ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে। ক্ষমতা বলাটা ঠিক নয়। কারণ, তারা সতর্কতার সঙ্গে রাষ্ট্রপতিকে একেবারে তালিকা করে তাঁকে আলাদাভাবে ‘কর্ম, কর্তব্য ও ক্ষমতা’ দিয়েছে।
এক দশকের প্রচেষ্টার পরে তারা সম্ভবত এমন আরও কতগুলো বিধান যুক্ত করেছে, যা উপমহাদেশে অনন্য এবং তা ভারতসহ তার প্রতিবেশীদের জন্য অনুকরণীয় বলে গণ্য হতে পারে। এই ‘সম্ভবত’ শব্দটি রেখেছি এ কারণে যে ২০ সেপ্টেম্বরে নেপালি গণপরিষদ যে সংবিধানটি চূড়ান্ত করেছে, তার ইংরেজি অনুবাদ এখনো প্রকাশ করা হয়নি। ২২ সেপ্টেম্বর বাংলাদেশে নিযুক্ত নেপালি রাষ্ট্রদূত হরি কুমার শ্রেষ্ঠা বলেছেন, তিনি আগামী কয়েক দিনের মধ্যে আমাকে একটি অনূদিত কপি দেবেন। তখন এ নিয়ে বিস্তারিত লেখা যাবে। তবে কাঠমান্ডুতে টেলিফোনে যোগাযোগ করলে একটি ওয়াকিবহাল সূত্র বলেছে, আমি নেপালি অফিশিয়াল সাইট থেকে খসড়া বিলের যে কপি সংগ্রহ করে এই নিবন্ধ লিখেছি, তার সঙ্গে পাস হওয়া বিষয়বস্তুর বেশি ফারাক নেই। শেষ মুহূর্তে কেবল প্রদেশগুলোর সীমানা-সংক্রান্ত কতিপয় বিষেয় নাকি সামান্য সংশোধনী এসেছে।
তবে নেপালি সংবিধান প্রণয়ন-প্রক্রিয়ার দিকে নজর রাখার পেছনে কয়েকটি বিশেষ কারণ রয়েছে। কারণ, এক দশকের বেশি সময় ধরে লিখে আসছি, ব্যক্তির হাতে নির্বাহী ক্ষমতানির্ভর যে ব্যবস্থা ব্রিটিশ মডেল থেকে বাংলাদেশ, ভারত, পাকিস্তান, শ্রীলঙ্কা, এমনকি নেপাল অনুসরণ করে চলেছে, তা রাজনীতিতে ব্যক্তিবাদের জন্ম দেয়। কিন্তু সময়টা ব্যক্তিতন্ত্রের নয়। আমার বিশ্বাস, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ব্যক্তিরাষ্ট্রপতি-নির্ভর যে ব্যবস্থায় গণতন্ত্র অনুশীলন করে আসছে, তারও একদিন অবসান ঘটবে।
এটা খুবই মুগ্ধ হওয়ার বিষয যে ব্যক্তির বন্দনানির্ভর রাজতন্ত্রের ছায়া মুছে ফেলতে নেপালি রাজনীতিকেরা খুব সচেতনতার পরিচয় দিয়েছেন। এর একটি কাছাকাছি প্রচেষ্টা ১৯৭২ সালে আমাদের সংবিধানপ্রণেতারা ভেবেছিলেন, কিন্তু তাঁরা তাতে সফল হননি। যেমন তাঁরা প্রজাতন্ত্রের নির্বাহী ক্ষমতা ‘সরকারের’ কিংবা ‘প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বাধীন মন্ত্রিসভাকে’ দিতে চেয়েছিলেন। কিন্তু পরে কেবল প্রধানমন্ত্রীর হাতে ন্যস্ত করা হয়। এবারে নেপাল যা করেছে, তার কোনো তুলনা নেই। বহুবার লিখেছি, বাংলাদেশ রাষ্ট্রপতির হাতে নির্বাহী ক্ষমতা নেই; অথচ সংবিধানে লেখা আছে, ‘সরকারের সব নির্বাহী কার্যক্রম রাষ্ট্রপতির নামে গৃহীত হয়েছে বলে গণ্য হবে।’ নেপাল খুব সতর্কতার সঙ্গে লিখেছে, যাবতীয় ফেডারেল নির্বাহী কার্যক্রম ‘সরকারের’ নামে সম্পন্ন বলে গণ্য হবে। আর নির্বাহী ক্ষমতা তারা ‘মন্ত্রিপরিষদের’ হাতে ন্যস্ত করেছে। সেটা করতে গিয়ে তারা প্রধানমন্ত্রী শব্দটি পর্যন্ত উল্লেখ করেনি।
তবে উত্তম সংবিধান তৈরি ও রাজনৈতিক সংস্কৃতির উন্নয়ন এক কথা নয়। সংবিধানের ওপর নয়, সহনশীল ও উদার সংস্কৃতিই কেবল নেপালকে বাঁচাতে পারে।
মিজানুর রহমান খান: সাংবাদিক৷
[email protected]