নদীর দুই তীর মিলছে একই স্বপ্নে!

কর্ণফুলী নদীর তলদেশ দিয়ে এ বছরই টানেল নির্মাণের কাজ শুরু হচ্ছে l ছবি: প্রথম আলো
কর্ণফুলী নদীর তলদেশ দিয়ে এ বছরই টানেল নির্মাণের কাজ শুরু হচ্ছে l ছবি: প্রথম আলো

নতুন বছরের শুরুতেই সুসংবাদ পাওয়া গেল। চট্টগ্রামের (বৃহত্তর অর্থে বাংলাদেশেরও) লাইফলাইন হিসেবে পরিচিত কর্ণফুলী নদীর তলদেশে টানেল নির্মাণের প্রস্তাব একনেক বৈঠকে অনুমোদন পাওয়ার পর সুড়ঙ্গের শেষ প্রান্তে আলোর আভাস দেখা যাচ্ছে। চীন সরকারের ঋণ-সহায়তায় প্রায় সাড়ে আট হাজার কোটি টাকা ব্যয়ের এ প্রকল্পটির কাজ এ বছরের নভেম্বর মাসে শুরু হবে। কর্ণফুলীর পানি প্রবাহের ১৫০ ফুট নিচ দিয়ে ৩ দশমিক ৪ কিলোমিটার এই টানেল যাবে শহরের অপর প্রান্তের আনোয়ারায়।
২০০৮ সালে চট্টগ্রামের লালদীঘির মাঠে নির্বাচনী জনসভায় কর্ণফুলীর তলদেশে টানেল নির্মাণের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। এই প্রতিশ্রুতির কতটা কল্পনাবিলাসী এবং কতটা বাস্তবসম্মত, তা নিয়ে নানা কথা ছিল তখন থেকেই। ২০১২ সালে সম্ভাব্যতা প্রতিবেদন চূড়ান্ত হওয়ার পর স্থান নির্বাচন নিয়ে কালক্ষেপণ হয়। ২০১৪ সালের শেষ দিকে এসে কর্ণফুলীর মোহনায় টানেল নির্মাণে নগর পরিকল্পনাবিদ, চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ, চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ, সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের দুই বিদেশি প্রতিষ্ঠান ও সেতু বিভাগের কর্মকর্তারা একমত হলে স্বপ্ন ও বাস্তবের দূরত্ব কমে আসে। সম্প্রতি একনেক এ বিষয়ে চূড়ান্ত অনুমোদন দেওয়ার পর আমাদের দেশের জন্য নদীর নিচে গাড়ি চলাচলের নতুন ধারণাটি আর অবিশ্বাস্য বলে ভাবছে না সাধারণ মানুষ। বরং সুড়ঙ্গের দুই প্রান্ত কাছাকাছি এলে চীনের সাংহাইয়ের আদলে ‘টু টাউনস—ওয়ান সিটি’ গড়ে ওঠার সম্ভাবনাকেও অলীক বলে মনে হয় না আজ।
নদীর ওপারে আনোয়ারা গ্রামের মানুষের মনে কর্মসংস্থানসহ জীবনমান বৃদ্ধির আশার সঞ্চার হয়েছে। ইতিমধ্যে চীন সেখানে জায়গা বরাদ্দ চেয়েছে। সরকারও ৩৫০ একর জমির ওপর অর্থনৈতিক অঞ্চল গড়ে তোলার ব্যাপারে নীতিগত সিদ্ধান্ত নিয়েছে বলে জানা গেছে।
এ টানেল তৈরি হলে আউটার রিংরোড হয়ে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের যানবাহন মূল শহর এড়িয়ে কক্সবাজারসহ দক্ষিণ চট্টগ্রামে যাতায়াত করতে পারবে। দূরত্ব কমবে ৩৫ কিলোমিটার। আউটার রিংরোডের কাজ চলছে পুরোদমে। এটি নির্মিত হচ্ছে উপকূলীয় বাঁধের ওপর: এটা হবে একই সঙ্গে ‘এমব্যাংকমেন্ট কাম হাইওয়ে’—বাঁধ ও মহাসড়ক। এর কার্যকারিতা হবে বহুমুখী। প্রাকৃতিকভাবেই দুর্যোগের ঝুঁকিতে রয়েছে চট্টগ্রামের একটি বিরাট অঞ্চল। ১৯৯১ সালের ভয়াবহ ঘূর্ণিঝড় ও সামুদ্রিক জলোচ্ছ্বাসে লক্ষাধিক লোকের প্রাণহানি ঘটেছিল এ অঞ্চলে। কয়েক হাজার কোটি টাকার সম্পদহানি হয়েছিল। এর আগে-পরেও বড়-ছোট বেশ কিছু প্রাকৃতিক বৈরিতা মোকাবিলা করতে হয়েছে চট্টগ্রামবাসীকে। উপকূলীয় বাঁধের ওপর আউটার রিংরোডটি শক্তিশালী প্রতিরোধ হিসেবে গড়ে উঠলে ইপিজেড, কর্ণফুলী ইপিজেড, সমুদ্রবন্দর, নৌবন্দর, চট্টগ্রাম বিমানবন্দরসহ অনেক গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা ও অবকাঠামোর নিরাপত্তা নিশ্চিত হবে। বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, ‘এমব্যাংকমেন্ট কাম হাইওয়ে’ প্রকল্পটি বাস্তবায়নের মাধ্যমে ভারী যানবাহনগুলোর গতি পরিবর্তন করে শহরের যানজট হ্রাস করাও সম্ভব হবে।
চট্টগ্রামের উন্নয়নের সঙ্গে এ দেশের অর্থনীতির ভাগ্য সম্পৃক্ত। ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে চট্টগ্রাম অঞ্চলের অবকাঠামোগত ও যোগাযোগব্যবস্থার উন্নয়নের দিকে তাকিয়ে আছে প্রতিবেশী দেশগুলোও। এসব খাতে নিজেদের স্বার্থেই বিনিয়োগে আগ্রহী তারা। সমুদ্র-বাণিজ্য ও আঞ্চলিক সম্পৃক্ততার কথা জোরেশোরে আলোচনা হচ্ছে এখন। এই আঞ্চলিক সম্পৃক্ততা উদ্যোগের একদিকে রয়েছে বাংলাদেশ-ভারত-ভুটান-নেপাল (সিবিআই)। ভুটান ও নেপাল সমুদ্রে প্রবেশের সুবিধাবঞ্চিত দেশ। অন্যদিকে ‘সেভেন সিস্টারস’ নামে পরিচিত ভারতের সাতটি রাজ্যও স্থলবেষ্টিত। ফলে এই দেশগুলো চট্টগ্রাম সমুদ্রবন্দরকে নিজেদের স্বার্থেই ব্যবহার করতে চায়।
অন্যদিকে রয়েছে বাংলাদেশ-চীন-ভারত-মিয়ানমার (বিসিআইসি)—এই চার দেশের অর্থনৈতিক করিডর স্থাপনের উদ্যোগ। ‘কুনমিং ইনিশিয়েটিভ’ নামে পরিচিত এই উদ্যোগ সম্পর্কে চীন বলছে, ‘ওয়ান বেল্ট, ওয়ান করিডর’। নতুন সিল্ক রোড ও মেরিটাইম সিল্ক রুট পুনর্গঠনের জন্য চীনের প্রায় ৪০ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগের পরিকল্পনা রয়েছে। চীনের ইউনান ও সিচুয়ান প্রদেশ এবং মিয়ানমারের শান ও রাখাইন রাজ্যের প্রবেশদ্বার হতে পারে চট্টগ্রাম। কেননা, চীনের ইউনান প্রদেশের রাজধানী কুনমিং থেকে নিকটতম সমুদ্রবন্দর গুয়াংজুর দূরত্ব প্রায় ১ হাজার ৭০০ কিলোমিটার। অথচ চট্টগ্রামের সঙ্গে মিয়ানমার হয়ে কুনমিংয়ের দূরত্ব এক হাজার কিলোমিটার। আমাদের অংশে উখিয়ার বালুখালী থেকে ঘুমধুম পর্যন্ত মাত্র দুই কিলোমিটার সড়ক করা গেলে মিয়ানমারের এশিয়ান হাইওয়ের সঙ্গে যুক্ত হবে বাংলাদেশ। সেই সড়ক নির্মাণের কাজও ইতিমধ্যে শুরু হয়েছে। স্বাভাবিকভাবেই চীন তার ইউনান প্রদেশের পণ্য ৭০০ কিলোমিটারের পথ বাঁচিয়ে চট্টগ্রাম সমুদ্রবন্দর দিয়ে রপ্তানির উদ্যোগ নিতে আগ্রহী হবে।
ত্রিপুরার রাজধানী আগরতলা থেকে চট্টগ্রাম বন্দরের দূরত্ব মাত্র ২০০ কিলোমিটার। এ রকম সুযোগ ফেলে ১ হাজার ৬০০ কিলোমিটার দূরের কলকাতা বন্দর ব্যবহার ভারতের এই রাজ্যটির জন্য অর্থনৈতিকভাবে যে যুক্তিযুক্ত নয়, সে কথা তাদের চেয়ে ভালো বুঝবে কে? আবার সড়কপথে চট্টগ্রাম বন্দর থেকে সাব্রুম-রামগড় সীমান্তের দূরত্ব ৭৫ কিলোমিটার, বিলোনিয়া-ফেনীর দূরত্ব ২৫০ কিলোমিটার। সুতরাং এই বন্দর ব্যবহার নিয়ে দর-কষাকষির এক চমৎকার অবস্থানে আছি আমরা।
সম্ভাবনার পাশাপাশি সীমাবদ্ধতার দিকগুলোও শনাক্ত করা দরকার। বন্দরের সক্ষমতা না বাড়ালে এই অবস্থানের শতভাগ সুযোগ আমরা নিতে পারব না। অবকাঠামোগত উন্নয়ন করতে হবে, উন্নত প্রযুক্তির ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে। বর্তমানে নয় মিটারের বেশি ড্রাফটের জাহাজ বন্দরে প্রবেশ করতে পারে না। অথচ নদীর নাব্যতা ও গভীরতা বাড়ানোর জন্য ক্যাপিটাল ড্রেজিংয়ের উদ্যোগটা প্রায় ব্যর্থই হয়েছে বলা যায়।
এদিকে কক্সবাজার জেলার সোনাদিয়া দ্বীপে গভীর সমুদ্রবন্দর নির্মাণের ব্যাপারে সরকার অনেক দূর অগ্রসর হয়েও তা থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে বলে মনে হয়। এ নিয়ে আওয়ামী লীগের চট্টগ্রাম নগর শাখার সভাপতি ও সাবেক মেয়র মহিউদ্দিন চৌধুরী সরাসরি প্রতারণার অভিযোগ তুলেছেন খোদ তাঁর দলের সরকারের বিরুদ্ধেই। সোনাদিয়ায় গভীর সমুদ্রবন্দর নির্মাণের বিষয়ে জাপানের একটি প্রতিষ্ঠানের সম্ভাব্যতা জরিপ সম্পন্ন হয়েছিল এবং চীন এখানে বিনিয়োগের আগ্রহও প্রকাশ করেছিল। কিন্তু শেষ পর্যন্ত এ প্রকল্পটি যে নীতিনির্ধারকদের কাছে গুরুত্ব হারাল, তার কারণ হিসেবে ভারতের অনাগ্রহই দায়ী বলে মনে করেন কোনো কোনো বিশেষজ্ঞ।
অর্থনীতিবিদ মইনুল ইসলাম প্রশ্ন তুলেছেন, ‘সোনাদিয়া বন্দর কি ভূ–রাজনীতির শিকার?’ তিনি বলেছেন, ‘ভারত যদি চীনকে সোনাদিয়ার গভীর সমুদ্রবন্দর নির্মাণ থেকে বিরত রাখার জন্য বাংলাদেশ সরকারকে চাপ দেয়, তাহলে বাংলাদেশ সরকারের উচিত ওই বন্দর নির্মাণের বিকল্প অর্থায়নের জন্য ভারতকে চাপ দেওয়া।’ (প্রথম আলো, ৯ অক্টোবর)। আসলে দেনদরবারের সামর্থ্য ও যোগ্যতার ওপর নির্ভর করছে নিজেদের লাভালাভের অনেক কিছুই।
বাংলাদেশের দক্ষিণাঞ্চলের পায়রা নদীর মোহনায় একটি বন্দর গড়ে তোলার ব্যাপারে এখন সরকারকে অধিক আগ্রহী বলে মনে হচ্ছে। প্রস্তাবিত এই বন্দরের সম্ভাব্যতা যাচাই-সংক্রান্ত কোনো সমীক্ষা হয়েছে বলে আমাদের জানা নেই। চট্টগ্রাম বন্দরেরই অর্থায়নে চলছে এ বন্দর নির্মাণের কাজ। এখানেই সম্ভবত মহিউদ্দিন চৌধুরীর ক্ষোভ। কিন্তু এই ক্ষোভকে শুধু ‘আঞ্চলিকতা’র দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলে হবে না। বিষয়টি অগ্রাধিকার নির্ণয় করার। প্রস্তাবিত পায়রা বন্দরের জন্য অবকাঠামো, পশ্চাৎ সুযোগ-সুবিধা এবং যে স্টেকহোল্ডার দরকার, তা আছে কি না, যাচাই করতে হবে। তার আগে ফিজিবিলিটি রিপোর্টে উল্লিখিত সম্ভাবনাময় সোনাদিয়াকে গুরুত্ব দেওয়া দরকার কি না, সেটাই ভাবতে হবে সরকারকে। আমাদের ধারণা, সোনাদিয়া গভীর সমুদ্রবন্দরকে ঘিরে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার ‘কমার্শিয়াল হাব’ বা বাণিজ্যিক কেন্দ্রস্থল হয়ে ওঠার যে সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে, তা অগ্রাহ্য করা ঠিক হবে না।
যা-ই হোক, শুরু করেছিলাম কর্ণফুলীর তলদেশে টানেল নির্মাণ প্রসঙ্গে। এই টানেল নদীর দুই প্রান্তকে কাছাকাছি এনে বিরাট অর্থনৈতিক-সামাজিক পরিবর্তন ঘটাতে পারে। শহররক্ষা বাঁধের ওপর নির্মিত আউটার রিংরোড সেই সম্ভাবনাকে বহুমাত্রিক করে তুলবে। ৩০ জানুয়ারি চট্টগ্রামে আসছেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি প্রায় পাঁচ হাজার কোটি টাকার একগুচ্ছ প্রকল্পের উদ্বোধন করবেন। বদলে যাচ্ছে চট্টগ্রাম। সব মিলিয়ে আশা-আকাঙ্ক্ষা ও প্রবল উদ্দীপনার সঞ্চার হয়েছে এ অঞ্চলের মানুষের মনে। এখন শুধু কর্ণফুলীর দুই তীরের মতো স্বপ্ন ও বাস্তবতাকে মেলানোর জন্য অপেক্ষা।
বিশ্বজিৎ চৌধুরী: কবি, লেখক ও সাংবাদিক।
[email protected]