সাম্প্রতিক সময়ে পোশাকশিল্পে শ্রমিকের ট্রেড ইউনিয়নের অধিকারের বিষয়টি অনেক বেশি আলোচনায় আসছে। বাংলাদেশের গার্মেন্টস শিল্পের ক্ষেত্রে ট্রেড ইউনিয়নের চেহারা অন্যান্য শিল্পক্ষেত্রের ট্রেড ইউনিয়নের চেয়ে কিছুটা ভিন্ন। কীভাবে এই শিল্প খাতকে অবাধ বাণিজ্য ও মুনাফার জন্য প্রসারিত রাখা যায়, কীভাবে শ্রম আন্দোলনমুক্ত রাখা যায়, কীভাবে ট্রেড ইউনিয়নমুক্ত রাখা যায় এবং কীভাবে দেশীয় ট্রেড ইউনিয়নগুলোকে দুর্বল করে ফেলা যায়, সেই প্রচেষ্টাই দীর্ঘ সময় ধরে সমুন্নত আছে। তাই বলে এই সেক্টরে শ্রমিকের প্রতি চরম অবহেলা, নির্যাতন, নিপীড়ন এবং এর বিরুদ্ধে শ্রমিকের প্রতিরোধ কখনোই থেমে ছিল না।
বাংলাদেশে গার্মেন্টস শিল্প বিকাশের প্রাথমিক পর্যায়ে ট্রেড ইউনিয়নের কাজকে নানাভাবে বাধাগ্রস্ত করা হলেও সাম্প্রতিক সময়ে আমরা দেখতে পাই হঠাৎ করে গার্মেন্টস শিল্পে ট্রেড ইউনিয়নের সংখ্যা দ্রুতগতিতে বাড়ছে। এক হিসাবে ২০১৩-এর জুলাই থেকে ২০১৪ এর ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত মোট ৯৬টি ট্রেড ইউনিয়নের রেজিস্ট্রেশন হয়েছে,। অথচ এর আগের দুই বছরে মাত্র দুটি ট্রেড ইউনিয়নের রেজিস্ট্রেশন হয়েছে। হঠাৎ বেড়ে যাওয়া এই সংখ্যা কি দৈবাৎ কোনো ঘটনা, নাকি এর পেছনে কোনো কারণ রয়েছে? বাংলাদেশে গার্মেন্টস শিল্পে অবহেলাজনিত একের পর এক ‘দুর্ঘটনায়’ ট্রেড ইউনিয়নের অনুপস্থিতিকে একটি বড় কারণ হিসেবে বিশ্লেষকেরা মনে করেন। যেন ট্রেড ইউনিয়ন করতে পারলেই এ ধরনের ঘটনা ঘটত না। তাই এর সমাধানে বিভিন্ন উদ্যোগের পাশাপাশি শ্রমিকের ট্রেড ইউনিয়ন করার অধিকার বাড়ানোর ওপর জোরারোপ করা হয়েছে, যার পেছনে রয়েছে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক শ্রম অধিকার সংস্থাসমূহের চাপ। এই উদ্যোগসমূহ ভালো বা খারাপ, সেটা বিশ্লেষণের সময় এখনো হয়নি। কিন্তু দ্রুত ট্রেড ইউনিয়নের সংখ্যা বাড়িয়ে তোলার যে উদ্যোগ, তা অনেকাংশে এ অঞ্চলের ট্রেড ইউনিয়নের ইতিহাস, বিভিন্ন সময়ের নীতিগত পরিবর্তন এবং বর্তমান পরিপ্রেক্ষিতকে গুরুত্ব না দিয়েই নেওয়া হচ্ছে। গবেষক হিসেবে আমাদের প্রশ্ন, এ ধরনের উদ্যোগ আসলেই কতটুকু শ্রমিকের সঙ্গে জীবনঘনিষ্ঠ, নাকি এসব উদ্যোগ শুধু গার্মেন্টস শিল্পকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা নানা অর্থনৈতিক ও সামাজিক পুঁজির স্বার্থ রক্ষা করবে?
শ্রমিকের ট্রেড ইউনিয়ন করার বাস্তবতা কী? সাধারণ অর্থে আট ঘণ্টা কাজের পর ঘণ্টাপ্রতি বাড়তি মূল্যে যে শ্রম দেওয়া হয়, সেটাই ওভারটাইম। ওভারটাইম বাংলাদেশের গার্মেন্টস শিল্পের শ্রমিকের জন্য নিত্যদিনের বাস্তবতা। এটা শ্রমিকের জন্য বেতনের পর বাড়তি আয়ের সুযোগ তৈরি করে ঠিকই, কিন্তু এই ওভারটাইম করা বা না–করা শ্রমিকের ইচ্ছার ওপর নির্ভর করে না। এটা অনেকটা বাধ্যতামূলক শ্রমের মতো। সেই কারণে গার্মেন্টস শিল্পে শ্রমিকের সুনির্দিষ্ট কর্মঘণ্টা বলে কিছু নেই। ১২-১৬ ঘণ্টা কাজের পর ইউনিয়ন করার মতো সময় বা সুযোগ কতটুকু! উপরন্তু এই শিল্পে ৮০ শতাংশের বেশি নারী শ্রমিক, যাঁরা কাজ থেকে ঘরে ফিরে আরেক দফা কাজের মধ্যে ঢোকেন, ট্রেড ইউনিয়নের কাজে সময় দেওয়ার সুযোগ তাঁদের জন্য আরও কম। নারী শ্রমিকদের সঙ্গে আলাপচারিতায় প্রায়ই শোনা যায়, যাঁরা কিনা একটু প্রতিবাদী, যাঁদের মধ্যে ট্রেড ইউনিয়নিজম বা প্রতিবাদী সত্তা আছে, তাঁদের ম্যানেজমেন্ট ভালো চোখে দেখে না। কাজ পেতেও অসুবিধা হয়। এই বিষয়গুলো বিবেচনা করলে ট্রেড ইউনিয়নের যে আদর্শ মডেল, ফ্যাক্টরিভিত্তিক ইউনিয়ন এবং তার ভিত্তিতে ফেডারেশন গড়ে তোলা—তা আসলে কতটুকু সম্ভব?
গার্মেন্টস শিল্পের ট্রেড ইউনিয়নগুলো নানা বাধাবিপত্তির মধ্যে কাজ করেছে। পাশাপাশি চলছে উন্নয়ন সংস্থাকেন্দ্রিক নানা তৎপরতার বিকাশ। আরেকটি প্রজন্মের এনজিও তৎপরতা আমরা দেখতে পাই, যাদের ভূমিকা একই সঙ্গে এনজিও এবং ট্রেড ইউনিয়নের মতো। এই সংস্থাগুলো বিদেশি দাতাগোষ্ঠীর সহায়তায় পরিচালিত, যারা প্রশ্নহীনভাবে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক শ্রমবিষয়ক নীতির দেশীয় বাস্তবায়কের ভূমিকায় অবতীর্ণ। আপাত দৃষ্টিতে এ ধরনের সংগঠনগুলোকে মনে হয় আন্তর্জাতিক গার্মেন্টস বাণিজ্যের দর-কষাকষিতে দেশীয় ট্রেড ইউনিয়নের চেয়ে দক্ষ। তা ছাড়া, এসব সংগঠনের প্রধানদের শ্রমিক হিসেবে এই সেক্টরে যুক্ত থাকার ইতিহাস তাঁদের বিভিন্ন মহলে আরও বেশি গ্রহণযোগ্য করে তুলেছে।
আশুলিয়ার নিশ্চিন্তপুরে মাঠকর্মের ক্ষেত্রে আমরা দেখেছি এ ধরনের একাধিক সংগঠন সেখানে সক্রিয়। তারা নিশ্চিন্তপুরে শ্রমিকদের সংগঠিত করে শ্রমিকদের মধ্য থেকে তাঁদের নিজেদের পক্ষের লোক তৈরি করে, বিভিন্ন কর্মসূচিতে আসার জন্য টাকা দেয়। বিশেষ করে তাজরীন অগ্নিকাণ্ডের পরবর্তী সময়ে বায়ারদের কাছ থেকে বিরাট অঙ্কের ক্ষতিপূরণ পাইয়ে দেওয়ার কথা বলেও শ্রমিকদের সংগঠিত করে চলেছে। এ রকম একটি সংগঠন শতাধিক শ্রমিককে পুড়িয়ে মারার প্রতিবাদে শ্রমিককে সংগঠিত না করে নিশ্চিন্তপুরে শ্রমিকদের মাঝে টয়লেট, কম্বল, গুঁড়ো দুধের মতো ত্রাণসামগ্রী বিতরণ করে। শ্রমিকদের তাঁদের অধিকারের লক্ষ্যে সংগঠিত না করে এভাবে সংগঠিত করার ক্ষেত্রে যে এসব শ্রমিক সংগঠনগুলোর সরাসরি স্বার্থ যুক্ত রয়েছে, তা স্পষ্ট। এসব সংগঠনের বৈদেশিক আর্থিক অনুদান পাওয়ার ক্ষেত্রে অন্যতম যোগ্যতা হলো বিভিন্ন দিবসে মানববন্ধন বা সমাবেশে শ্রমিকদের একত্র করা এবং দাবিদাওয়া পেশ করা। এ ধরনের প্রক্রিয়ার কারণে এই সংগঠনগুলোর পক্ষে ÿঅনেক লোক জড়ো করে ফেলা সম্ভব এবং যেকোনো দর-কষাকষিতে তাদের এই বিরাটসংখ্যক শ্রমিককে ব্যবহার করাও সম্ভব। এ ধরনের কর্মসূচিতে আসা শ্রমিকদের অনেকেই জানেন না, তাঁরা সেখানে কেন এসেছেন, শুধু বাসভর্তি করে তাঁদের নিয়ে আসা হয়েছে—এ পর্যন্তই তাঁরা জানেন।
এসব কারণেই স্থানীয় ট্রেড ইউনিয়ন বা শ্রমিক সংগঠনের জন্য ক্রমেই কঠিন হয়ে পড়ছে শ্রমিকদের সংগঠিত করার কাজ। শ্রমিকেরা দেখে যে এ ধরনের সংগঠনের ডাকে গেলে টাকাপয়সা কিছু পাওয়া যায় আর স্থানীয় শ্রমিক সংগঠনের কর্মসূচিতে খালি হাতে ফিরে আসতে হয়। এই নব্য ধারার এনজিও/ডোনার/ বায়ারের দেওয়া শ্রম আন্দোলনের মডেল এতই শক্তিশালী যে খুব সম্প্রতি স্থানীয় একটি ট্রেড ইউনিয়নকে দেখেছি ঈদের সময় চাঁদা তুলে শ্রমিকদের মাঝে সেমাই কেনার জন্য টাকা বিতরণ করতে। আমরা এখানে স্পষ্ট দেখতে পাই কীভাবে শ্রমিক ও রাজনৈতিক সংগঠনের মধ্যকার সম্পর্ক দ্রুতই সংহতি ও সহযোদ্ধার পরিবর্তে পেট্রন-ক্লায়েন্ট সম্পর্কে পরিণত হচ্ছে। এই নতুন ধারার ট্রেড ইউনিয়ন শ্রম সম্পর্কে বা গার্মেন্টস শিল্পের চলমান অবস্থায় কী পরিবর্তন আনতে পারবে, সে সম্পর্কে আমরা সন্দিহান।
লেখকেরা অ্যাকটিভিস্ট নৃবিজ্ঞানের সদস্য।