নাপিত, শিল্পী ও সাংসদের মামলা নিয়ে প্রশ্ন
ঢাকার বাইরের জেলা সেশন আদালতে কর্মরত একজন বিচারক সাম্প্রতিক তিনটি মামলার বিষয়ে আমার কাছে কিছু প্রশ্ন করেছেন, যেগুলোর উত্তর আমিও খুঁজছি। মামলাগুলো বহুল আলোচিত না হলেও সংবাদমাধ্যমে কিছুটা হলেও তা জায়গা পেয়েছে। বেশির ভাগ বিতর্ক হয়েছে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে। মামলা তিনটির দুটির ক্ষেত্রে সমালোচনার তির তাক করা হয়েছে পুলিশের দিকে, আর অন্যটির ক্ষেত্রে দুর্নীতি দমন কমিশনের দিকে। সমালোচনার অনেকটাই যৌক্তিক। তবে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা বা ন্যায়বিচার নিশ্চিত করার দায়টা শুধু পুলিশ কিংবা দুর্নীতি দমন কমিশনের নয়, রাষ্ট্রের অন্যান্য প্রতিষ্ঠানেরও রয়েছে। আর সেই সব প্রতিষ্ঠান কতটা কার্যকর ভূমিকা রাখছে, সেই প্রশ্নটি মোটেও উপেক্ষণীয় নয়।
প্রথম ঘটনাটি হচ্ছে একজন নাপিতের বিরুদ্ধে একজন নারী চিকিৎসকের বাবার অপহরণ মামলা। ওই নারী চিকিৎসক তাঁর বাবার পরিচিত নাপিতের প্রেমে পড়েছিলেন এবং বাবার আপত্তির কারণে এলাকা ছেড়ে বিয়ে করে ঢাকায় সংসার করছিলেন। তাঁদের একটি সন্তানও রয়েছে, যার বয়স বছর দেড়েক। অর্থাৎ দুজন প্রাপ্তবয়স্কের দাম্পত্যজীবনের প্রায় আড়াই বছর পর পুলিশ স্বামীটিকে অপহরণের অভিযোগে গ্রেপ্তার করেছে। পুলিশের একজন মাঝারি মাপের কর্মকর্তা, রংপুরের সিআইডির মিলু মিয়া বিশ্বাস এসপি জানিয়েছেন, তিনি মানতেই পারেন না যে একজন নাপিত একজন চিকিৎসককে বিয়ে করবেন। খবরটির প্রতিক্রিয়ায় ফেসবুক জগতের বাসিন্দারা বিস্ময় প্রকাশ করে যথার্থভাবে প্রশ্ন তুলেছেন, প্রাপ্তবয়স্ক নর–নারীর সচেতন সম্পর্কে পুলিশ কোন আইনে হস্তক্ষেপ করে এবং কিসের ভিত্তিতে এসপি এমন মন্তব্য করতে পারেন।
রংপুরের একটি আদালতে ওই দম্পতিকে হাজির করা হলে নারী চিকিৎসক তাঁর জবানবন্দিতে আদালতকে বলেছেন যে তিনি স্বেচ্ছায় সম্পর্ক গড়েছেন এবং সুখেই সংসার করছেন। আদালত অভিযুক্ত ব্যক্তিকে কারাগারে পাঠিয়েছেন। আমার কাছে প্রশ্ন করেছেন যে বিচারক, তিনি জানতে চাইলেন, কথিত ভুক্তভোগী যেখানে আদালতে হাজির হয়ে বললেন কোনো অপরাধ হয়নি, সেখানে অভিযুক্ত ব্যক্তি কেন জেল খাটবেন? মামলাটি তো সঙ্গে সঙ্গে খারিজ হয়ে যাওয়ার কথা। পুলিশের এসপি একজনের নাপিত পরিচয়কে যেমন মেনে নিতে পারেননি, আদালত কি সেই একই কাজ করলেন?
দ্বিতীয় মামলাটিও ঢাকার। অনলাইনে সম্প্রচারের জন্য তৈরি চলচ্চিত্র নবাব এলএলবির পরিচালক অনন্য মামুন ও অভিনেতা শাহীন মৃধাকে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি) গ্রেপ্তার করে আদালতে হাজির করলে তাঁদের জামিন না দিয়ে কারাগারে পাঠানো হয়েছে। ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের সংবাদ বিজ্ঞপ্তির ভাষ্য অনুযায়ী, তাঁদের বিরুদ্ধে মূল অভিযোগ চলচ্চিত্রের দৃশ্যে পুলিশকে হেয় করা। তবে মামলা হয়েছে পর্নোগ্রাফি আইনে। পুলিশের বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, যে ভিডিও খণ্ডচিত্র ভাইরাল হয়েছে সেখানে দেখা যায়, ধর্ষণের শিকার একজন নারী থানায় এসে পুলিশের কাছে ধর্ষণের বিষয়ে অভিযোগকালে পুলিশ তাঁকে অত্যন্ত আপত্তিকর ইঙ্গিত ও অশ্লীল ভাষা ব্যবহার করে জিজ্ঞাসাবাদ করছে, যা সুস্থ বিনোদনের পরিপন্থী এবং জনসাধারণের মধ্যে পুলিশ সম্পর্কে নেতিবাচক ধারণা তৈরি করবে। এমন আপত্তিকর ও অশ্লীল সংলাপসংবলিত ভিডিও খণ্ডচিত্র তৈরি ও অভিনয়ের জন্য দুজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
অশ্লীল ভাষা ও আচরণ ব্যবহারের বিষয়ে পর্নোগ্রাফি আইনে স্পষ্ট বিধান আছে ঠিকই। কিন্তু তা থানায় ধর্ষণের অভিযোগ বর্ণনায় শালীন ভাষা ব্যবহারের বাধ্যবাধকতা তৈরি করে না। ধর্ষণের মতো অপরাধের ক্ষেত্রে অপরাধীরা যেসব ভাষা ব্যবহার করে, মামলার অভিযোগে তা উল্লেখ না করে কীভাবে অভিযোগ দায়ের করা সম্ভব? ফেনীর নুসরাত হত্যা মামলায় ধর্ষণের অভিযোগের বিষয়ে পুলিশের জিজ্ঞাসাবাদের যে ভিডিও সেখানকার থানার ওসি ফেসবুকে ছড়িয়ে দিয়েছিলেন, তাতে যে ভাষা ব্যবহার করা হয়েছিল, তা স্মরণ করিয়ে দিতে অনেকেই সেই পুরোনো ভিডিও খুঁজে বের করেছেন। বিজ্ঞপ্তিতে অবশ্য এ কথাও বলা হয়েছে যে পুলিশ বাহিনীর অনুমতি ছাড়া তারা পুলিশের পোশাক পরিধান করে পুলিশের চরিত্রে অশ্লীল সংলাপ ও নেতিবাচক অভিনয়ের কারণে তা বাহিনীর ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করেছে।
পুলিশ সম্পর্কে জনমনে নেতিবাচক ধারণা তৈরির অভিযোগকে পর্নোগ্রাফি আইনের ছাঁচে ফেলার সিদ্ধান্তটি যে পুলিশ বাহিনীর কোনো সদস্যের বিভ্রান্তির ফল, তা নয়। কেননা, পুলিশের প্রাতিষ্ঠানিক বিজ্ঞপ্তিতে অভিযোগের বর্ণনা দিয়ে তা প্রকাশ করা হয়েছে। সৃজনশিল্পী ও সংস্কৃতিকর্মীদের নীরবতা বা প্রতিবাদহীনতার সুযোগে সিনেমা-নাটকে পুলিশের পোশাক ব্যবহারে বাহিনীর অনুমতির নির্দেশনার বিষয়টি যে কোন ভয়াবহ পর্যায়ে নেমে গেছে, এই ঘটনা সম্ভবত তারই একটি জ্বলন্ত দৃষ্টান্ত।
আমার সঙ্গে আলাপচারিতায় থাকা বিচারকের জিজ্ঞাসা: পর্নোগ্রাফি আইনে মামলা হয় কী করে? পর্নোগ্রাফি আইনে মামলা যেহেতু জামিন অযোগ্য, শুধু সে কারণেই কি এই আইনের অপব্যবহার? তাঁর কথায়, এমনিতেও বাংলাদেশে যেহেতু ফৌজদারি মামলায় দণ্ডিত হওয়ার হার মাত্র ১০ শতাংশ, তাই বোঝা যায় যে তদন্ত চলাকালে কয়েকটা দিন জেল খাটানোই হচ্ছে মামলার আসল উদ্দেশ্য। সত্য হোক, মিথ্যা হোক; একটা জামিন অযোগ্য ধারায় মামলা দেওয়াই হলো আসল উদ্দেশ্য।
বিচারকাজে ন্যায়বিচার আর অবিচারের মধ্যে পার্থক্য গড়ার প্রক্রিয়া নিয়ে এই বিচারকের যে জিজ্ঞাসা, তা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এতে অন্তত এটুকু বোঝা যায় যে আইনের ভেতরে অপপ্রয়োগের যেসব সম্ভাব্য সুযোগ থেকে যাচ্ছে, তা নিয়ে তাঁদের অনেকেই চিন্তিত। আইনের অপব্যবহার বন্ধ বা প্রতিকারে বিচারপ্রার্থীর শেষ ভরসা তো আদালত। সেই আদালত এসব আত্মজিজ্ঞাসার মাধ্যমে স্বাধীনভাবে বিচারিক বিবেচনা প্রয়োগে সচেষ্ট হবেন, সেটাই প্রত্যাশা
তাহলে আদালত রয়েছে কেন? এই প্রশ্ন করে তিনি বললেন, কী ভয়ানক একটা নজির স্থাপন হলো। কবিতার লাইন কী হবে, সিনেমার সংলাপ কী হবে, পেইন্টিংয়ের বিষয়বস্তু কী হবে, আমাদের ভাবনার বিষয়বস্তু কী হবে, বইমেলাতে কী ধরনের বই প্রকাশ হবে—এই সব ব্যাপারেই আমাদের রাষ্ট্রের কাছ থেকে পূর্বানুমতি নিতে হবে? পর্নোগ্রাফি নিয়ন্ত্রণ আইন ২০১২–এর ৯ নম্বর ধারায় অবশ্য স্পষ্ট বলা আছে ধর্মীয় উদ্দেশ্যে সংরক্ষিত কল্পমূর্তি বা স্বাভাবিক শিল্পকর্মের ক্ষেত্রে এই আইনের বিধানাবলি প্রযোজ্য হবে না। অনলাইন সিনেমাকে কি তাহলে আদালত স্বাভাবিক শিল্পকর্ম হিসেবে বিবেচনা করছেন না? এতটা গুরুতর একটি নির্বতনমূলক ব্যবস্থার পর সরকারদলীয় রাজনীতির প্রভাবাধীন চলচ্চিত্র পরিবার কিংবা বাংলাদেশের সংস্কৃতি অঙ্গনের যে ভাবলেশহীন প্রতিক্রিয়া, তাতে ধারণা করা যায়, আটক শিল্পীরা তাঁদের কাছে অচ্ছুত। তবে আদালত যে শিল্পীর স্বাধীনতার পক্ষে একটা নজির তৈরি করতে পারতেন, আমি আমার ওই বিচারক বন্ধুর সেই উপলব্ধির সঙ্গে সম্পূর্ণ একমত।
তিনি তৃতীয় যে মামলার প্রসঙ্গ টেনেছিলেন, সেটি হলো মানব পাচারের মাধ্যমে অবৈধ সম্পদের অধিকারী হওয়া সাংসদ দম্পতি শহিদ-সেলিনার বিরুদ্ধে দুর্নীতি দমন কমিশনের মামলা। কুয়েতে বিচারাধীন সাংসদ কাজী শহিদ ইসলামের স্ত্রী সাংসদ সেলিনা ইসলাম ও মেয়ে ওয়াফা ইসলামকে অবৈধ সম্পদ এবং অর্থ পাচারের মামলায় আদালত জামিন দিয়েছেন। জামিনে থাকলে যাঁদের পক্ষে সত্যিই তদন্তকাজ প্রভাবিত করা সম্ভব, তাঁদের ক্ষেত্রে দুর্নীতি দমন কমিশন কি আদালতে যথাযথ ভূমিকা রাখতে পেরেছে? এই প্রশ্ন ঝট করে নাকচ করে দেওয়া সহজ নয়। এই কমিশনই গত ২৮ ডিসেম্বর তদন্তে ত্রাণ আত্মসাতের প্রমাণ পেয়েও সামাজিক মর্যাদার বিবেচনায় একটি মামলায় পাঁচজন সরকারি কর্মকর্তা ও একজন ইউপি চেয়ারম্যানকে অভিযোগ থেকে অব্যাহতি দিতে ঠাকুরগাঁওয়ের এক আদালতে চূড়ান্ত প্রতিবেদন দিয়েছে।
বিচারকাজে ন্যায়বিচার আর অবিচারের মধ্যে পার্থক্য গড়ার প্রক্রিয়া নিয়ে এই বিচারকের যে জিজ্ঞাসা, তা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এতে অন্তত এটুকু বোঝা যায় যে আইনের ভেতরে অপপ্রয়োগের যেসব সম্ভাব্য সুযোগ থেকে যাচ্ছে, তা নিয়ে তাঁদের অনেকেই চিন্তিত। আইনের অপব্যবহার বন্ধ বা প্রতিকারে বিচারপ্রার্থীর শেষ ভরসা তো আদালত। সেই আদালত এসব আত্মজিজ্ঞাসার মাধ্যমে স্বাধীনভাবে বিচারিক বিবেচনা প্রয়োগে সচেষ্ট হবেন, সেটাই প্রত্যাশা।
● কামাল আহমেদ সাংবাদিক