রুয়ান্ডার রাজধানী কিগালিতে ২০১৬ সালের ১৪ অক্টোবর বিশ্বের অন্যতম প্রধান গ্রিনহাউস গ্যাস এইচএফসি (হাইড্রোফ্লুরোকার্বন) নিঃসরণ বন্ধ করার এক যুগান্তকারী সিদ্ধান্তে একমত হয়েছে বিশ্বের প্রায় ২০০ রাষ্ট্র। এইচএফসি গ্যাস প্রধানত এসি-ফ্রিজ চালানোর শীতক হিসেবে ও অ্যারোসলে ব্যবহৃত হয়ে আসছিল। ১৯৮৭ সালে কানাডার মন্ট্রিলে স্বাক্ষরিত চুক্তির পর ফ্রিজ-এসির শীতক গ্যাস হিসেবে সিএফসি গ্যাস ব্যবহার বাতিল এবং এর বদলে এইচএফসি গ্যাস ব্যাপকভাবে ব্যবহার শুরু হয়। কার্যত, কিগালি বৈশ্বিক সম্মেলনে মন্ট্রিল চুক্তির গুরুত্বপূর্ণ সংশোধনী আনা হলো।
পৃথিবীর বায়ুমণ্ডল বেষ্টন করে থাকা প্রয়োজনীয় ওজোন গ্যাসের স্তরে আশঙ্কাজনকভাবে গর্ত তৈরির জন্য সিএফসি গ্যাসের বড় দায় চিহ্নিত হওয়ার পর মন্ট্রিল চুক্তিতে তার ব্যবহার নিষিদ্ধ হয়েছিল। আমাদের পৃথিবীকে মহাজাগতিক ক্ষতিকর অতিবেগুনি রশ্মির প্রভাব থেকে রক্ষা করার জন্য ওজোন স্তরের বেষ্টনী প্রয়োজন। সিএফসি গ্যাসের বিকল্প হিসেবে এইচএফসি গ্যাসের ব্যবহার কার্যকরভাবে এয়ারকন্ডিশনার, রেফ্রিজারেটর, অ্যারোসলের শীর্ষক হিসেবে চিহ্নিত হয়েছিল। কিন্তু দ্রুতই জানা গেল, বৈশ্বিক উষ্ণায়নের কারণ যে গ্রিনহাউস গ্যাসসমূহ, এইচএফসি গ্যাস তার মধ্যে অন্যতম। বায়ুমণ্ডলের উষ্ণতা বৃদ্ধির প্রধান ইন্ধন কার্বন ডাই-অক্সাইড গ্যাস হলেও, এইচএফসি তার তুলনায় প্রায় ১০ হাজার গুণ বেশি ক্ষতিকর গ্রিনহাউস গ্যাস। সে কারণে পরিমাণে অল্প নিঃসরিত হলেও এইচএফসি বায়ুমণ্ডলের উষ্ণতা বৃদ্ধিতে ব্যাপক মাত্রায় নেতিবাচক ইন্ধন জোগাবে।
কিগালি বৈশ্বিক সম্মেলনে বিশ্বনেতারা যে ঐতিহাসিক বাধ্যবাধকতার চুক্তিতে একমত হলেন, তাতে ২১০০ সালের মধ্যে বায়ুমণ্ডলের তাপমাত্রা শূন্য দশমিক ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস হ্রাস করার পথ নির্মিত হলো। যদিও বিশ্বের বিভিন্ন দেশের জন্য এইচএফসি ব্যবহার বন্ধ করার বেঁধে দেওয়া সময়সীমা বিভিন্ন। চুক্তির অধীনে অগ্রসর অর্থনীতির ইউরোপীয় দেশ ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ২০১৯ সাল থেকে ১০ শতাংশ এইচএফসি গ্যাস ব্যবহার কমাবে; ২০৩৬ সালের মধ্যে এই গুচ্ছের দেশগুলো ৮৫ শতাংশ এইচএফসি গ্যাস ব্যবহার কমাবে। চীন ও আফ্রিকার কিছু উন্নয়নগামী দেশ ২০২৪-২০২৯ সালের সময়সীমায় এইচএফসি গ্যাসের ব্যবহার ১০ শতাংশ কমাবে। ২০৪৫ সাল নাগাদ এই গুচ্ছের দেশগুলো এইচএফসি গ্যাসের ব্যবহার ৮০ শতাংশ কমাবে। তৃতীয় গুচ্ছে ভারত, পাকিস্তান, ইরান, ইরাক এবং উপসাগরীয় দেশসহ আরও অনেক উন্নয়নশীল দেশ ২০২৮ থেকে ২০৪৭ সালের মধ্যে ৮৫ শতাংশ এইচএফসি গ্যাসের ব্যবহার কমিয়ে আনবে।
গত বছরের ডিসেম্বর মাসে সম্মত হওয়া প্যারিস জলবায়ু সম্মেলনের সিদ্ধান্ত ৪ অক্টোবর ইউরো পার্লামেন্টে অনুসমর্থিত হওয়ায়, জাতিসংঘের সদস্যদেশগুলোর জন্য তা আগামী ৪ নভেম্বর থেকে আইনি বাধ্যবাধকতায় পরিণত হবে। তার আগে এ মাসেই বিশ্বের আবহাওয়ামণ্ডলের উষ্ণতা বৃদ্ধি সীমিত করার কিগালি সম্মেলনের প্রায়োগিক সিদ্ধান্ত সবার জন্যই নতুন প্রেরণার বিষয় হবে। ক্ষতিকর গ্রিনহাউস গ্যাস নিঃসরণ এবং তার উৎস সংকুচিত না হলে ধ্বংসের দিকে ছুটে চলা পৃথিবীর পরিবেশের ব্যাপক বিপর্যয় রোধ করা সম্ভব হবে না। কিগালি সম্মেলনে গৃহীত এইচএফসি গ্যাসের ব্যবহার বন্ধের সিদ্ধান্ত একক কোনো চুক্তির মাধ্যমে আবহাওয়ামণ্ডলীর তাপমাত্রা হ্রাসে এযাবৎ অর্জিত সবচেয়ে বড় সাফল্য।
সমগ্র পৃথিবীতে দুই বছর ধরে জীবাশ্ম জ্বালানি পুড়িয়ে যত কার্বন ডাই-অক্সাইড নিঃসরণ ও গ্রিনহাউস গ্যাস প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করতে পারে, কিগালি সম্মেলনের সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন এককভাবে কেবল এইচএফসি গ্যাস ব্যবহার রোধ করার মাধ্যমে সমপরিমাণ ক্ষতি রোধ করতে সক্ষম। বিশ্বজুড়ে রেফ্রিজারেটর, এয়ারকন্ডিশনার, অ্যারোসল স্প্রের ব্যবহার বছরে ১০ থেকে ১৫ শতাংশ হারে বাড়ছে, ফলে এইচএফসি গ্যাসের উৎপাদন, ব্যবহার এবং বায়ুমণ্ডলে তার নিঃসরণ ক্রমাগত বেড়ে চলেছে।
নগরায়ণ ও মাথাপ্রতি আয় বাড়ার ফলে ফ্রিজ-এসির চাহিদা ও ব্যবহার দ্রুত বাড়ছে। ফলে ফ্রিজ-এসি-অ্যারোসল ব্যবহারের বাজারও বিশাল রূপ নিয়েছে। প্রকাশিত হিসাব অনুযায়ী ২০৩০ সাল নাগাদ পৃথিবীতে আরও ৭০ কোটি নতুন এয়ারকন্ডিশনার যুক্ত হবে। বছরে প্রায় ১০ কোটি বাসাবাড়িতে ব্যবহার-উপযোগী রেফ্রিজারেটর উৎপাদিত হয়। বর্তমানে ব্যবহৃত প্রযুক্তি বহাল থাকলে দ্রুত বেড়ে চলা বাড়ি, অফিসের এয়ারকন্ডিশনার, গাড়িতে স্থাপিত এসি, ফ্রিজ প্রচুর এইচএফসি গ্যাস উৎপাদন ও ব্যবহার দাবি করে। আইনি বাধ্যবাধকতা আরোপ করায় এখন নতুন শীতক উপাদান অনুসন্ধান ও তার বাণিজ্যিক ব্যবহার নিশিত করবে।
বাজারের চাহিদা যেমন নতুন শীতক উপাদান আবিষ্কার ত্বরান্বিত করবে, তেমনি ইতিমধ্যে আবিষ্কৃত দক্ষ শীতক অ্যামোনিয়া গ্যাস ও কার্বন ডাই-অক্সাইডের ভিন্ন প্রকৃতির ব্যবহার উৎসাহিত করবে। বিশেষজ্ঞদের অনেকে অ্যামোনিয়া ও কার্বন ডাই-অক্সাইডকে প্রাকৃতিক শীতক হিসেবে চিহ্নিত করেছেন এবং এইচএফসি গ্যাসের বিকল্প হিসেবে ব্যবহারের ব্যাপারে আশাবাদ জানাচ্ছেন।
ড. মুশফিকুর রহমান: খনি প্রকৌশলী, জ্বালানি ও পরিবেশবিষয়ক লেখক।