শিশু সাক্ষাৎকার: ফাহিমা নাসরিন, বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী
বাল্যবিয়ে অনিয়মিত বিয়ে হিসেবে স্বীকৃতি পেয়ে যাচ্ছে
বাল্যবিবাহ জাতিসংঘের সহস্রাব্দ উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (এমডিজি) অর্জনের ক্ষেত্রে অন্যতম বাধা। শুধু বিয়ের কারণে কিশোরী বধূর শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্য হুমকির মধ্যে পড়ে। বাল্যবিবাহের কারণে কিশোরী মা মৃত্যুঝুঁকিতে থাকে। সেই অপুষ্ট মা যে শিশুর জন্ম দেয়, সে-ও থাকে মৃত্যুর ঝুঁকিতে। এ কারণে এমডিজির বিভিন্ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে পিছিয়ে পড়তে হয়। একইভাবে বাল্যবিবাহের শিকার মেয়েটির পুরো জীবনই ঝুঁকির মধ্যে চলে যায়।বাংলাদেশ জাতীয় মহিলা আইনজীবী সমিতির নির্বাহী সদস্য ও বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ফাহিমা নাসরিন এ কথা বলেন। তিনি বাল্যবিবাহ প্রতিরোধে আইনের চেয়েও সচেতনতা তৈরির ওপর বেশি গুরুত্ব দেন। ফাহিমা বলেন, দেশে আইনের অভাব নেই। বাল্যবিবাহ প্রতিরোধেও ১৯২৯ সালে তৈরি আইন আছে। পরে এই আইনে সংশোধনীও আনা হয়েছে। কিন্তু লাভ তেমন একটা হয়নি। একদিকে আইনটির প্রয়োগ নেই, অন্যদিকে এতে আছে নানা দুর্বলতা। এতে অভিভাবকসহ বাল্যবিবাহ সম্পন্নকারী বা সহায়তাকারী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে শাস্তির বিধান রাখা আছে। কিন্তু বাল্যবিবাহের ক্ষেত্রে শাস্তির চেয়ে বিয়েটি যাতে না হতে পারে, সেটি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। কেননা, বিয়েটি অনিয়মিত বিয়ে হিসেবে স্বীকৃতি পেয়ে যাচ্ছে। আর জীবনভর এ বিয়ের কুফল পোহাতে হচ্ছে সেই মেয়েকে।বাংলাদেশ জাতীয় মহিলা আইনজীবী সমিতির পক্ষে সমিতির নির্বাহী পরিচালক সালমা আলী বাল্যবিবাহ রোধে হাইকোর্টে একটি রিট মামলা করেছেন। গত ২০ জুন সমিতির করা রিট আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে আদালত সরকারের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের প্রতি বিয়ের সময় জাতীয় পরিচয়পত্রের ভিত্তিতে বিয়ে নিবন্ধন কেন বাধ্যতামূলক করা হবে না—এর কারণ দর্শানোর আদেশ দিয়েছেন। এ প্রসঙ্গে ফাহিমা নাসরিন বলেন, হাইকোর্ট অনেক ভালো রায় দিয়েছেন। কিন্তু এগুলোর বাস্তবায়ন না হলে কোনোই লাভ হবে না। সরকারের মন্ত্রণালয় বা বিভাগ বাল্যবিবাহ প্রতিরোধে কার্যকর কোনো উদ্যোগ নিয়েছে বলে জানা নেই। বাংলাদেশ টেলিভিশন ও বাংলাদেশ বেতারকে সরকার সচেতনতা তৈরির জন্য ব্যবহার করতে পারে। কিন্তু এ ক্ষেত্রেও বলতে গেলে চিত্রটা খুব হতাশাজনক। অভিভাবক বা যারা বাল্যবিবাহের শিকার হতে যাচ্ছে, তারা সচেতন না হলে এ ধরনের ঘটনা ঘটতেই থাকবে।বাংলাদেশ জাতীয় মহিলা আইনজীবী সমিতিসহ বিভিন্ন এনজিও নারী ও শিশুদের নিয়ে কাজ করছে। বেশির ভাগ এনজিওর কাজের তালিকায় বাল্যবিবাহ প্রতিরোধে সচেতনতা তৈরির বিষয়টি প্রাধান্য পায়। তার পরও অভিভাবকেরা এ বিষয়ে সচেতন হচ্ছেন না কেন? এ প্রশ্নের উত্তরে ফাহিমা নাসরিন বলেন, দেশে অনেক এনজিও কাজ করছে। কিন্তু তারা আসলে কী কাজ করছে, তা নিয়ে আত্মসমালোচনা করার সময় এসেছে। কেননা, সরকার ও এনজিও একসঙ্গে কাজ করলে বাল্যবিবাহের মতো সামাজিক সমস্যা এতটা ভয়াবহ আকার ধারণ করত না।ফাহিমা আরও বলেন, শহরের শিক্ষিত পরিবারে বাল্যবিবাহের ঘটনা বেশি একটা ঘটছে না। বেশির ভাগ ঘটনা ঘটছে প্রত্যন্ত গ্রামাঞ্চলে। এ ক্ষেত্রে গ্রাম্য আদালতকে সক্রিয় করা উচিত। এ ছাড়া স্থানীয় সরকার শক্তিশালী না হলে এ সমস্যা সমাধানে তেমন একটা অগ্রসর হওয়া সম্ভব হবে না। বাল্যবিবাহের কুফল বা আইনে যে শাস্তির কথা আছে, ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য বা চেয়ারম্যানকে সে বিষয় সম্পর্কে সচেতন করতে পারলে সুফল পাওয়া সম্ভব।ফাহিমা নাসরিন বলেন, বাল্যবিবাহ প্রতিরোধে কাজি এবং নোটারি পাবলিকের ওপর নজরদারি বাড়ানো প্রয়োজন। তবে এ ক্ষেত্রেও আইন মন্ত্রণালয়ের ভূমিকা নিয়ে অনেক প্রশ্ন আছে। বাল্যবিবাহ প্রতিরোধে সচেতনতা তৈরিসহ বিভিন্ন কাজে মহিলা ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয় কী করছে, তা-ও দৃশ্যমান নয়।মেয়েসন্তানের জন্মকে স্বাগত না জানানোর মন-মানসিকতা খুবই ক্ষতিকর; আর যৌন হয়রানির হাত থেকে রক্ষা করার জন্যও অভিভাবকেরা মেয়ের ১৮ বছর বয়স হওয়ার আগেই বিয়ে দিয়ে দিচ্ছেন উল্লেখ করে ফাহিমা নাসরিন বলেন, মেয়েসন্তান নিয়ে অভিভাবকদের মানসিকতা পাল্টাতেই হবে। অন্যদিকে যুবসমাজ যাতে বখাটে হওয়ার সুযোগ না পায়, তার জন্য সরকারকেই উদ্যোগ নিতে হবে। যুবসমাজের জন্য চিত্তবিনোদন, কর্মসংস্থানসহ বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধা সৃষ্টি করতে হবে। বাল্যবিবাহের পেছনে অনেক কারণ কাজ করে। একক সমস্যা সমাধান করে যেমন এ সমস্যার সমাধান হবে না, তেমনি এককভাবে সরকার ও বেসরকারি সংগঠনও কিছু করতে পারবে না। সমন্বিত উদ্যোগেই এ জটিল সমস্যার সমাধান করতে হবে।সাক্ষাৎকার নিয়েছেন মানসুরা হোসাইন