
কর্তৃপক্ষের মতে, আমাদের দেশে অনিষ্পন্ন মামলার সংখ্যা প্রায় ৩২ লাখ। আর বিচারকের সংখ্যা ১ হাজার ৭০৪। সংবাদপত্রের মতে, কোনো স্থানে বিচারকের সংখ্যা একজন হলে মামলার সংখ্যা অন্তত ৭৮। দৈনিক মামলার সংখ্যা ১৫ হলে এবং একেকটিতে সময় গড়ে আধা ঘণ্টা লাগলে কেবল শুনানিতে প্রয়োজন সাত ঘণ্টা। রায় দেওয়ার জন্য যদি একটি মামলাও থাকে, তাতে প্রয়োজন কমপক্ষে
দুই ঘণ্টা। কাজেই কর্মঘণ্টা সাড়ে ছয় হলে দৈনিক প্রয়োজন হচ্ছে সাড়ে নয় ঘণ্টা। আবার দৈনিক আরও ১০টি মামলা দায়ের হচ্ছে। তাই প্রতিদিন নিষ্পত্তির চেয়ে অনিষ্পন্ন মামলার সংখ্যা বৃদ্ধি পাচ্ছে।
এই ক্রমবর্ধমান জটে অতিষ্ঠ হয়ে সমাজে প্রতিদিন কতগুলো ধ্বনি শোনা যায়। সেগুলো হচ্ছে ‘সাত দিনের মধ্যে ফাঁসি চাই’, ‘২৪ ঘণ্টায় গ্রেপ্তার চাই’, ‘দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি চাই’ ইত্যাদি। এরপর দেখি দ্রুত বিচার আদালত প্রতিষ্ঠার খবর। কোনো অপরাধের দ্রুত বিচার করা মানেই অন্যান্য অপরাধের বিচারের গতিকে আরও শ্লথ করে দেওয়া। কারণ, সবকিছুর একটি সর্বোচ্চ বহনক্ষমতা আছে। আইনে আছে, প্রত্যেকের কেবল আইনের পথে ন্যায়বিচার পাওয়ার অধিকার রয়েছে। আবার দাবি করা হয়, বিচার সাত দিনের মধ্যে এবং দৃষ্টান্তমূলক শাস্তিসংবলিত হলেই হবে না। তা হতে হবে স্বচ্ছ, নিরপেক্ষ, সুষ্ঠু ও সম্পূর্ণ গ্রহণযোগ্য। অনেক মামলায় আসামির সংখ্যা ২ হাজার ২০০, ১০ হাজার, ১৫ হাজার ইত্যাদিও থাকে। এঁদের অনেকেই অজ্ঞাতনামা, অনেকে পলাতক এবং তাঁরা বিদেশেও থাকতে পারেন। সব আসামি, উকিল, পুলিশ, সাক্ষী, বাদী, বিবাদী, পিপি, জিআরও ও বিচারকদের উপস্থিতি নিশ্চিত করে তদন্ত ও অভিযোগ গঠন শেষে, আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ প্রদান করে মামলাজটের ক্রম ভঙ্গ করে কোনো মামলার বিচার সাত দিনের মধ্যে কী করে করা সম্ভব? যে আসামি বিদেশে পলাতক, তাঁকে ২৪ ঘণ্টার মধ্যে গ্রেপ্তার করা যাবে কী করে? একজন তদন্তকারীর হাতে মামলার সংখ্যা কয়টা? তিনি কোনটিতে কতটুকু সময় দেবেন? ২ হাজার ২০০ আসামিকে গ্রেপ্তার করতে এবং পাঁচ-ছয় হাজার পৃষ্ঠাবিশিষ্ট অভিযোগপত্র দায়ের করতে তাঁর কত সময় লাগবে? ইতিমধ্যে তাঁর হাতে পুরোনো মামলাগুলোর কী হবে? এভাবে নিষ্পত্তি বাস্তবসম্মত নয় বলেই তা হচ্ছে না এবং এই ধ্বনিগুলো ক্রমেই বৃদ্ধি পাচ্ছে। এবার আসা যাক এই মামলাজটের পেছনের সংস্কৃতির বিষয়টিতে। নানা দুর্বিপাকের মধ্যে মরণপণ লড়াই করে বেঁচে থাকার ব্যাপারে আমাদের রয়েছে উচ্চ পর্যায়ের দক্ষতা। তাই ১৯৭০ সালের সাড়ে ৭ কোটি মানুষ আজ ১৬ কোটিতে উন্নীত।
মানসিক দিক থেকেও আমরা আত্মরক্ষায় সক্ষম। দোষত্রুটি করে কীভাবে তা মুছে ফেলা যাবে, গোপন করা যাবে এবং আলামত ও সাক্ষ্য ধ্বংস করা (মামলায় সাক্ষ্য দিয়ে আদালত প্রাঙ্গণে/নিজ বাড়িতে ফিরে/পথিমধ্যে আসামির হাতে নিহত হওয়ার ঘটনাগুলো বিবেচ্য। এ জন্য এখন সাক্ষ্য রক্ষা আইনের কথা শোনা যায়) যাবে, এ গুলো হচ্ছে এ দক্ষতার নানা দিক। অন্যদিকে বিচার করার দক্ষতা হচ্ছে নির্ভুলভাবে তদন্তকাজ সম্পন্ন করা; আসামি, আলামত ও সাক্ষী-সাবুদ সংগ্রহ ও সংরক্ষণ করা; অভিযোগপত্রে নিখুঁতভাবে আইনের প্রযোজ্য ধারা সংযোজিত করে তা আদালতে দাখিল করা। অন্তর্মুখী হয়ে লুকিয়ে থাকা, গোপন করা, বিকৃত করা ইত্যাদির বিপরীতে বহির্মুখী হয়ে উদ্ঘাটন করা এবং অভিযোগ প্রতিষ্ঠা করাই এ ক্ষেত্রে প্রয়োজন। আমরা যে এ ক্ষেত্রে কেমন তার নমুনাও আছে। এক জনপ্রিয় চলচ্চিত্রের বেস্ট ডায়ালগ ছিল, ‘ফিরিয়ে দাও আমার ১২টি বছর’। তার মানে ওই বিচারেও ভুল ছিল। অসংখ্য নারাজি পিটিশন, সরকার বনাম সরকারি কর্মচারী মামলায় ৯৯ শতাংশ ক্ষেত্রে কর্মচারীর জয়লাভ থেকেও বোঝা যায় প্রসিকিউশনে নয়, আত্মরক্ষায় আমরা কত দূর সমর্থ। আবার কথিত অপরাধীকে বিচার থেকে রক্ষা করার প্রচেষ্টার খবর যেমন, ক্যাম্পাসে ইভ টিজারদের রক্ষার জন্য একটি মহল মরিয়া, কিংবা অভিযুক্ত ব্যক্তির স্বামীকে তদন্তকারী হিসেবে নিয়োগ বা মামলার গতি ঘুরিয়ে দেওয়ার জন্য আসামির প্রচেষ্টা আর একটি সমস্যা।
স্মরণাতীত কাল থেকেই আমরা একটি কলহপরায়ণ জাতি। লর্ড মেকোলে ও রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তাঁদের রচনায় এ সম্পর্কে যা লিখে গেছেন, তা দিনে দিনে আরও ভারী হয়েছে। যার কাছে বিচার চাইছি, তিনিও সাংস্কৃতিক কারণে বিচার করার চেয়ে আত্মরক্ষায় সুনিপুণ। তাই তাঁদের অনেকেই বোধ করছেন বিব্রত। কিন্তু বিচারপ্রার্থী হয়ে বলছেন অবিলম্বে বিচার চাই। তার মানে, বিচারক না হয়েও বিচারকের ভূমিকায় নামতে আমাদের বিলম্ব হচ্ছে না। এটি ডাক্তার না হয়েও ভুল চিকিৎসার অভিযোগে চিকিৎসকের ওপর হামলা ও ক্লিনিক ভাঙচুর করার মতো অবস্থা। বিচার না হওয়ার আরেকটি বড় কারণ হচ্ছে প্রখ্যাত সব আইনজীবীর কেউই কোনো কুখ্যাত অপরাধীর শাস্তি বিধানের পক্ষে দাঁড়াননি। বরং দাঁড়িয়েছেন তাকে কীভাবে ছাড়িয়ে আনা যায় তার পক্ষে। অখ্যাত রমজান আলী বা ইংরেজ আলীর মতো অ্যাডভোকেটরাও প্রথমত কিছুদিন ন্যায়বিচারের পক্ষে কাজ করেন। কিন্তু এটি অর্থকরী না হওয়ায় তাঁরাও ক্রমে অভিযুক্ত ব্যক্তির পক্ষে দাঁড়াতে থাকেন।
বিখ্যাত ব্যারিস্টাররা প্রায়ই বলেন যে যেকোনো অভিযুক্ত ব্যক্তির জামিন পাওয়ার অধিকার রয়েছে। জামিন মানেই সাক্ষী হত্যার সুযোগ। একদিকে বলছি সাত দিনে ফাঁসি চাই, অন্যদিকে বলছি অপরাধ-নির্বিশেষে জামিন পাওয়ার অধিকার রয়েছে। সেমিনারে প্রায়ই বলছি যে বিচারহীনতার কারণে সমাজে অপরাধ বাড়ছে। শাজনীন হত্যার মতো আলোচিত মামলার বিচার আপিল পর্যায়ে উঠতে সময় লেগেছে ১৮ বছর। শাজনীনের পরিবার আমাদের সমাজের একটি পরিচিত ও প্রভাবশালী পরিবার। এই পরিবারকেই যদি এত বছর অপেক্ষা করতে হয়, তবে আমরা সহজেই অনুমান করতে পারি যে লাখ লাখ সাধারণ বিচারপ্রার্থীর মামলার গতি কী রকম হবে। আবার জনসংখ্যা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে মূলত জমি, অর্থ, কর্মসংস্থান ও বিচার প্রার্থনা নিয়ে মামলার সংখ্যা অবধারিতভাবে বৃদ্ধি পাবে। অথচ প্রয়োজন তা কমানো।
বিচারকে পিছিয়ে দিচ্ছে আরও কয়েকটি বিষয়: ১. অপরাধ হওয়ামাত্রই কর্তৃপক্ষের বলা যে কাউকে কোনো ছাড় দেওয়া হবে না। এই ছাড় শব্দটি থেকেই বিশেষ কোনো কোনো অপরাধী বুঝতে পারে যে আসলে ছাড় পাওয়া যেতে পারে এবং অতীতে তা হয়েছে। ২. এবার অপরাধীদের পাকড়াও করতে চিরুনি অভিযান আরম্ভ করা হবে কিংবা গোয়েন্দারা মাঠে নামবে। এই বিবৃতি অপরাধীদের লুকানো স্থান থেকে অন্যত্র পালিয়ে যেতে উৎসাহিত করা ছাড়া আর কিছুই নয়। এতে সংশ্লিষ্ট মামলাগুলো ঝুলে থাকার আশঙ্কা বাড়ে। এগুলোকে আর ব্যবহার না করার কথা ভাবার সময় কি আসেনি? আমরা বিদেশি সাহায্য ও পরামর্শ কতই তো নিয়েছি। তো বিচারপদ্ধতি তাদের থেকে নিতেই–বা অসুবিধা কোথায়?
এই সেদিন ছয় ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করে চার দিনের মধ্যে বিচার করেছেন সিঙ্গাপুরের একটি আদালত। সেখানে প্রশ্ন দেখা দেয়নি যে এই বিচার অস্বচ্ছ, অবাধ, নিরপেক্ষ, সম্পূর্ণ কিংবা গ্রহণযোগ্য কি না। এই দাবিও ওঠেনি যে এই বেঞ্চের বিচারকদের পরিবর্তন করতে হবে। নিখুঁতভাবে মামলা দায়ের করা, ADR (Alternate Dispute Resolution) জনপ্রিয় করা, জনসংখ্যা বৃদ্ধি হ্রাস করা, সামাজিক নেতৃত্বকে কাজে লাগানো এবং সিঙ্গাপুরের পদ্ধতি নিয়ে চিন্তা করার সময় কি আসেনি? নিজের যোগ্যতা ও অবদানের চেয়ে বেশি সম্পদ ও সুবিধা ভোগ করার মানসিকতা থেকে অধিকাংশ মামলার উৎপত্তি। এর বিচার ও শাস্তির বিধান খুব কম হচ্ছে বলেই বিচারহীনতা সংস্কৃতির কুফলের কথা আমরা বলছি। এমন সময়ের মধ্যে বিচার হওয়া দরকার, যাতে অপরাধের শিকার প্রতিকার এবং অপরাধী শাস্তি পান। বিচার উপলক্ষে কারাগারে ২০-৩০ বছর ধরে আটক লাখ লাখ মানুষের করুণ দশায় বিচলিত হওয়া কি আমাদের দায়িত্ব নয়?
মাসুদ আহমেদ: ঔপন্যাসিক ও বাংলাদেশের কম্পট্রোলার অ্যান্ড অডিটর জেনারেল।