বিশ্বাসের ঋণে অবিশ্বাস

বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোতে বহু ধরনের ঋণসুবিধা থাকে, যা তাদের ব্যাংকিং ব্যবসার মূল সেবাপণ্য। সেসব ঋণ সম্পর্কে অল্পবিস্তর ধারণা গড়পড়তা শিক্ষিত মানুষের আছে। এসবের মধ্যে আমদানি রপ্তানি ব্যবসায় চলতি মূলধনের প্রয়োজনেও একাধিক ঋণসুবিধা থাকে। যেমন রপ্তানির জন্য থাকে প্যাকিং ক্রেডিট বা রপ্তানি–পূর্ব ঋণ, কিংবা রপ্তানি–উত্তর স্বল্পমেয়াদি ঋণ। আমদানির জন্যও রয়েছে এলসি (লেটার অব ক্রেডিট) নামের অনগদ (নন-ফান্ডেড) ঋণ এবং লিম (লোন অ্যাগেইনস্ট ইমপোর্টেড মার্চেন্ডাইজ) ও এলটিআর (লেটার অব ট্রাস্ট রিসিপ্ট) নামের আমদানি–পরবর্তী ঋণ।

লিম পদ্ধতিটি আজকাল প্রায় বিলুপ্ত। আমদানিকারকের পক্ষে সব সময় নগদ দায় পরিশোধ করে আমদানি দলিল ব্যাংক থেকে ছাড় করানো সম্ভব হয় না বলে আমদানি–পরবর্তী ঋণের প্রয়োজন হয়। লিম ব্যবস্থায় আমদানি করা পণ্য ব্যাংকের তত্ত্বাবধানে খালাস করে গুদামে রাখা হয়।

ঠিক এ রকম আরেকটি ঋণ আছে, যা সাধারণত সিসি প্লেজ নামে পরিচিত। পার্থক্য হলো, এটিতে আমদানি করা পণ্যের পরিবর্তে অভ্যন্তরীণভাবে সংগৃহীত পণ্য ব্যাংক-নিয়ন্ত্রিত গুদামে রেখে ঋণ দেওয়া হয়। কোনো কোনো ব্যাংকে এখনো লিম কিংবা প্লেজ ঋণ চালু আছে। কিন্তু অতীতে ঋণ পরিশোধ ছাড়াই গুদামের মাল বের হয়ে যাওয়ার মতো বহু দুষ্কর্ম ঘটার পর অনেকের বোধোদয় ঘটে যে কোটি টাকা সম্পদের মালিক আমদানিকারক-গ্রাহকের ওপর বিশ্বাস না রেখে ব্যাংক নিয়োজিত সামান্য বেতনের পাহারাদার কিংবা গোডাউনকিপারের ওপর লক্ষ কোটি টাকার পণ্যের সুরক্ষার দায়িত্ব দেওয়াটা ঝুঁকিপূর্ণ।

আমদানি–পরবর্তী ঋণের আরও একটি ধরন রয়েছে। এলসির বিপরীতে নির্দিষ্ট পণ্য জাহাজীকরণের পর বিদেশি সরবরাহকারী মূল বিল অব লেডিংসহ এলসির শর্ত মোতাবেক সব কাগজপত্র নিখুঁতভাবে নিজস্ব ব্যাংকে জমা দিলে এলসি ইস্যুকারী ব্যাংকের বিদেশে রক্ষিত হিসাব থেকে রপ্তানিকারকের পাওনা পরিশোধ করে দেওয়া হয়।

আমদানি–পরবর্তী ঋণের বহুল ব্যবহৃত মাধ্যমটি হচ্ছে এলটিআর। এই ঋণের আইনগত বিষয়টি ব্যাখ্যা করা উচিত। ট্রাস্ট রিসিপ্ট ঋণ হচ্ছে টাকা পরিশোধের আগেই বিশ্বাসের ভিত্তিতে আমদানিকারক-গ্রাহকের কাছে আমদানি দলিল ন্যস্ত করা, যাতে পণ্য ছাড় করিয়ে বিক্রিলব্ধ টাকা দিয়ে এলটিআর পরিশোধ করা যায়। ব্যাংকের কাছে এই পদ্ধতির মূল শক্তি তার আইনগত অবস্থান। আমদানিকারক যদি এই পদ্ধতিতে ছাড় করা আমদানি করা পণ্য বিক্রি করার পরও এলটিআর পরিশোধ না করেন, কিংবা অবিক্রীত পণ্য ব্যাংকের জিম্মায় ফিরিয়ে না দেন, সেটিকে বিশ্বাসভঙ্গ হিসেবে গণ্য করা যায়। ব্যাংক যেহেতু কেবল বিশ্বাসের ভিত্তিতে আমদানিকারক-গ্রাহকের কাছে আমদানি দলিল ছেড়ে দেয় এবং যেহেতু পণ্য বিক্রিলব্ধ অর্থের ওপর ঋণের সমপরিমাণ অধিকার ব্যাংক সংরক্ষণ করে, সেহেতু এই ঋণ পরিশোধ না হলে ব্যাংক আমদানিকারকের বিরুদ্ধে বিশ্বাসভঙ্গের অভিযোগে ফৌজদারি মামলা দায়ের করতে পারে। গ্রাহক যেহেতু এই পণ্যের ট্রাস্টি ছিলেন, আইনের ভাষায় এ ক্ষেত্রে ক্রিমিনাল ব্রিচ অব ট্রাস্ট সংঘটিত হয়েছে। দেশের বিদ্যমান আইনে এটির বিরুদ্ধে ফৌজদারি মামলার মাধ্যমে প্রতিকার চাওয়া যায়।

নতুন নামে অভিহিত হলেও এই ঋণের বিপরীতে ট্রাস্ট রিসিপ্ট সম্পাদন বাধ্যতামূলক করে এবং ঋণটি খেলাপি হলে বিশ্বাসভঙ্গের দায়ে ফৌজদারি মামলার বিষয়টির ওপর গুরুত্ব আরোপ করা হলে সার্কুলারটির অপব্যাখ্যা করার সুযোগ থাকে না এবং ইচ্ছাকৃত ঋণ খেলাপের প্রবণতাও রোধ করা সম্ভব হয়

ব্যাংকিং শাস্ত্রে ট্রাস্ট রিসিপ্টের সংজ্ঞা অনুযায়ী এটি ব্যাংক ও গ্রাহক তথা আমদানিকারক—দুই পক্ষের মধ্যে লিখিত একটা আইনি দলিল। এটির মাধ্যমে গ্রাহক ব্যাংকের কাছ থেকে কোনো পণ্য বা সম্পদের বিপরীতে নির্দিষ্ট পরিমাণ ঋণ গ্রহণ করেন এবং ঋণ পরিশোধ না হওয়া পর্যন্ত সেই পণ্য বা সম্পদের ওপর ব্যাংকের আইনগত মালিকানা বহাল থাকে। ঋণগ্রহীতা ‘ট্রাস্ট রিসিপ্ট’ নামে অভিহিত দলিল যথাযথভাবে সম্পাদন করে দিলে ব্যাংক নির্ধারিত পণ্যের ওপর মালিকানাসংক্রান্ত দলিল (এলটিআরের ক্ষেত্রে শিপিং ডকুমেন্ট) গ্রহীতার অনুকূলে ছাড় করে দেয়। ব্যাংক যেহেতু বিশ্বাসের ওপর ভিত্তি করে তার মালিকানাধীন সম্পদ বা পণ্য গ্রাহকের জিম্মায় অর্পণ করে, গ্রাহকের দায়িত্ব থাকে সেই পণ্য বা সম্পদের বিক্রিলব্ধ অর্থ ব্যাংকের কাছে সমর্পণ করা, যা দিয়ে তার এলটিআর দায় পরিশোধিত হবে। এমনকি গ্রাহকের সদিচ্ছা থাকা সত্ত্বেও সেই পণ্য যদি অবিক্রীত থেকে যায়, তাহলে পণ্যের দখল অবিকৃত অবস্থায় ব্যাংকের কাছে ফিরিয়ে দিলেও গ্রহীতা বিশ্বাসভঙ্গের দায় থেকে মুক্তি পাবেন। তবে ব্যাংকের নিজস্ব ব্যবস্থায় সেই পণ্য বিক্রি করে প্রাপ্ত অর্থ দিয়ে যদি গ্রাহকের দায় সম্পূর্ণ পরিশোধিত না হয়, তাহলে গ্রাহকের বিরুদ্ধে সাধারণ অর্থঋণ মামলা দায়ের করার সুযোগ থাকে, ফৌজদারি মামলা নয়।

বাংলাদেশ ব্যাংকের সাম্প্রতিক এক সার্কুলারে আমদানি–পরবর্তী ঋণের সংজ্ঞায় বলা হয়েছে, এ ধরনের ঋণ এলটিআর/এলএটিআর/এমটিআর/এমপিআই ইত্যাদি যে নামেই পরিচিত হোক না কেন, এগুলোকে ‘আমদানি পরবর্তী অর্থায়ন’ কিংবা ‘পোস্ট ইমপোর্ট ফাইন্যান্সিং’ (পিআইএফ) বলে অভিহিত করতে হবে। অথচ ব্যাংকিং শাস্ত্রে এই ধরনের ঋণ সব সময়ই আমদানি–পরবর্তী ঋণ নামেই সংজ্ঞায়িত।

এই সার্কুলারের ফলে একটা বিভ্রান্তি দেখা দিতে পারে। আমদানি–পরবর্তী এই ঋণকে যদি এলটিআর হিসেবে অভিহিত করা না হয়, তাহলে লেটার অব ট্রাস্ট রিসিপ্ট সম্পাদনের বাধ্যবাধকতা থাকবে না। কারণ, ঋণটির সংজ্ঞা পরিবর্তনের মাধ্যমে বিশ্বাসের ভিত্তিতে দেওয়া ঋণের মূল চেতনাটা বিস্মৃত হয়ে পড়বে। এ রকম ক্ষেত্রে ব্যাংকের হাতে ফৌজদারি মামলা করার অস্ত্রটা থাকবে বলে প্রতীয়মান হয় না। সংজ্ঞা পরিবর্তনের এই বিষয়টির আইনি তাৎপর্য বিবেচনা করা হয়ে থাকলেও সার্কুলারে তার কোনো প্রতিফলন পাওয়া যায় না। ফলে সার্কুলারটির অপব্যাখ্যা করে ট্রাস্ট রিসিপ্ট দলিল সম্পাদন না করার একটি ঝুঁকি থেকে যায়। আমরা প্রথমেই দেখেছি, আমদানি–পরবর্তী ঋণের মধ্যে এলটিআর ছাড়াও রয়েছে লিম এবং পিএডি, কিন্তু নাম পরিবর্তন করা হয়েছে কেবল প্রথমটির। অপব্যাখ্যাকারীরা এই যুক্তিতেই ট্রাস্ট রিসিপ্ট দলিল সম্পাদন থেকে বিরত থাকতে পারে। সে ক্ষেত্রে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এই দলিল ছাড়া ব্যাংকের পক্ষে ফৌজদারি মামলা খাড়া করা সম্ভব হবে কি না, সে প্রশ্ন সৃষ্টি হতে যাচ্ছে। অতীতে ট্রাস্ট রিসিপ্টের বিপরীতে নেওয়া বিপুল অঙ্কের ঋণ যথাসময়ে পরিশোধিত হয়নি, এ কথা ঠিক, কিন্তু ঋণটির নাম পরিবর্তন করে নতুনভাবে ঢেলে সাজানোর ফলে খেলাপের সম্ভাবনার বিরুদ্ধে কার্যকর প্রতিষেধক তৈরি হলো কি না, হলে কীভাবে, সেটিও পরিষ্কার নয়।

সার্কুলারের সব জায়গায় এলটিআরের জায়গায় সর্বত্র ‘পিআইএফ’ নামটি প্রতিস্থাপন করে এই ঋণের বিষয়ে বিদ্যমান অন্যান্য সাধারণ নীতিমালার আলোকে নতুন নির্দেশনাও দেওয়া হয়েছে। কিন্তু সর্বশেষ প্যারাতে একবার মাত্র ‘এলটিআর’ শব্দটি ব্যবহার করায় নতুন নামকরণ ও সংজ্ঞা সম্পর্কে আবার অস্পষ্টতা তৈরি হয়। কারণ, এখানে এসে মনে হচ্ছে, এলটিআর নামের পদ্ধতিটি বাতিল করা হয়নি। সুতরাং নতুন নামে অভিহিত হলেও এই ঋণের বিপরীতে ট্রাস্ট রিসিপ্ট সম্পাদন বাধ্যতামূলক করে এবং ঋণটি খেলাপি হলে বিশ্বাসভঙ্গের দায়ে ফৌজদারি মামলার বিষয়টির ওপর গুরুত্ব আরোপ করা হলে সার্কুলারটির অপব্যাখ্যা করার সুযোগ থাকে না এবং ইচ্ছাকৃত ঋণ খেলাপের প্রবণতাও রোধ করা সম্ভব হয়।

ফারুক মঈনউদ্দীন লেখক ও ব্যাংকার

[email protected]