বৈষম্য কমানো, দুর্নীতি দমন ও গণতন্ত্রে ফেরার চ্যালেঞ্জ

আগামী বছর আমরা স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী উদ্‌যাপন করব। প্রায় সব গুরুত্বপূর্ণ সূচক বিশ্বকে জানান দিয়ে চলেছে যে বাংলাদেশ এখন একটি আত্মনির্ভরশীল এবং দ্রুত বর্ধনশীল অর্থনীতিতে পরিণত হয়েছে। এ জন্য ২০২০ সালে জাতির ৪৯তম বিজয়ের মাসে জাতির এই সাফল্যের ধারায় নেতৃত্বদানকারী প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে তাঁর প্রধান তিনটি চ্যালেঞ্জ স্মরণ করিয়ে দেওয়ার জন্যই কলামটি লিখছি; শক্তিশালী পদক্ষেপের মাধ্যমে ক্রমবর্ধমান আয়বৈষম্য হ্রাস, দুর্নীতির প্রতি ঘোষিত ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি সত্যিকারভাবে কার্যকর করা এবং ২০১৮ সালের নির্বাচনে লাইনচ্যুত গণতন্ত্রকে লাইনে পুনঃস্থাপন।

১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর মুক্তিযুদ্ধের বিজয়লগ্নে এই নব্য স্বাধীন দেশটি অর্থনৈতিকভাবে আদৌ টিকবে কি না, তা নিয়ে বিশ্বের উন্নয়ন-অর্থনীতিবিদদের গভীর হতাশা ছিল। ১৯৭১ সালের ডিসেম্বরে জনসন নামের একজন মার্কিন কূটনীতিক যখন বাংলাদেশ ‘ইন্টারন্যাশনাল বাস্কেট কেস’ হবে বলে মন্তব্য করেছিলেন, তখন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট নিক্সনের তদানীন্তন জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা এবং ১৯৭৩ সাল থেকে যুক্তরাষ্ট্রের সেক্রেটারি অব স্টেট হেনরি কিসিঞ্জার তাতে সায় দিয়েছিলেন। বাংলাদেশের ওপর ১৯৭৫ সালে প্রকাশিত ফালান্ড ও পারকিনসনের বিশ্বখ্যাত গবেষণা পুস্তকটির নামই ছিল বাংলাদেশ—আ টেস্ট কেস অব ডেভেলপমেন্ট। ১৯৭৫ সালে বঙ্গবন্ধুর সরকার অনেক সাধ্য-সাধনা করে বাংলাদেশকে জাতিসংঘের ‘স্বল্পোন্নত দেশের’ ক্যাটাগরিতে অন্তর্ভুক্ত করাতে সক্ষম হয়েছিল, যাতে বাংলাদেশ বৈদেশিক অনুদান, খাদ্যসহায়তা ও ‘সফট লোন’ পাওয়ার ব্যাপারে বিশেষ বিবেচনা পায়।

বঙ্গবন্ধু স্বল্পোন্নত দেশের মর্যাদাহীন ইমেজের ব্যাপারে সজাগ ছিলেন বলেই ঘোষণা দিয়েছিলেন, এক দশকের মধ্যেই বাংলাদেশকে ওই অপমানজনক অবস্থান থেকে বের করে আনবেন। কিন্তু বাংলাদেশের সমরপ্রভুদের অবৈধ সরকারগুলো বিভিন্ন দেশ ও আন্তর্জাতিক সংস্থার বর্ধিত বৈদেশিক সহায়তার লোভে স্বল্পোন্নত দেশ থেকে উত্তরণকে সযতনে এড়িয়ে চলেছে। ফলে এক দশকের স্থলে বাংলাদেশের ৪৩ বছর লেগেছে স্বল্পোন্নত দেশ থেকে উন্নয়নশীল দেশে উত্তরণের সোপানে পৌঁছানোর জন্য। ২০১৮ সাল থেকে বাংলাদেশ জাতিসংঘের অর্থনৈতিক ও সামাজিক কাউন্সিল নির্ধারিত ‘উন্নয়নশীল দেশের’ ক্যাটাগরিতে উত্তরণের ছয় বছরের প্রক্রিয়া শুরু করেছে। ওই প্রক্রিয়ার সফল পরিসমাপ্তির পর ২০২৪ সালে বাংলাদেশ উন্নয়নশীল দেশ হিসেবে পরিগণিত হবে। (অবশ্য করোনাভাইরাস মহামারির বিপর্যয়ের কারণে স্বল্পোন্নত দেশের প্রাপ্য সুবিধাগুলো ২০৩৩ সাল পর্যন্ত বহাল রাখার জন্য সম্প্রতি বাংলাদেশ জাতিসংঘের কাছে আবেদন করেছে)।

এর আগে ২০১৫ সালে বিশ্বব্যাংকের ‘নিম্ন আয়ের দেশ’ ক্যাটাগরি থেকে বাংলাদেশ ‘নিম্ন–মধ্যম আয়ের দেশ’ ক্যাটাগরিতে উত্তীর্ণ হয়েছে। দুই দশক ধরে বাংলাদেশের জিডিপির প্রবৃদ্ধির হার ৫ দশমিক ৫ শতাংশ থেকে বেড়ে ২০১৮-১৯ অর্থবছরে ৮ দশমিক ২ শতাংশে পৌঁছে গিয়েছিল। করোনাভাইরাস মহামারির আঘাতে ২০১৯-২০ অর্থবছরে প্রবৃদ্ধির হার ৫ দশমিক ২৪ শতাংশে নেমে গেলেও বাংলাদেশের মাথাপিছু জিএনআই ২০১৯ অর্থবছরের ১ হাজার ৯০৯ ডলার থেকে বেড়ে ২০২০ সালের ৩০ জুন ২ হাজার ৬৪ ডলারে পৌঁছেছে।

অবশ্য আইএমএফের প্রাক্কলন বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর চেয়ে কম হলেও তারা বলেছে, এ বছর বাংলাদেশ একটি মাইলফলকে পৌঁছাবে। ২০২০ সালের অক্টোবরে আইএমএফ তাদের ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক আউটলুকে দাবি করছে, করোনাভাইরাস মহামারির আঘাতে ভারতীয় অর্থনীতি ১০ দশমিক ৩ শতাংশ সংকুচিত হয়ে ভারতের মাথাপিছু জিডিপি ২০১৯ সালের ২১০০ ডলার থেকে ২০২০ সালের ডিসেম্বরে ১৮৭৭ ডলারে নেমে যাবে। অন্যদিকে, বাংলাদেশের অর্থনীতি মহামারির ক্ষতি দ্রুত কাটিয়ে উঠে বাংলাদেশ ৩.৮ শতাংশ জিডিপি প্রবৃদ্ধি অর্জন করার ফলে ২০২০ সালের ডিসেম্বরে বাংলাদেশের মাথাপিছু জিডিপি দাঁড়াবে ১৮৮৮ ডলারে। এর মানে, ২০২০ সালে বাংলাদেশের মাথাপিছু নমিনাল জিডিপি ভারতের মাথাপিছু জিডিপিকে ছাড়িয়ে যাবে। এই পূর্বাভাস ভারতীয়দের অহমিকাকে মারাত্মকভাবে আঘাত করেছে। মাথাপিছু জিডিপির বিচারে বাংলাদেশ পাকিস্তানকে বহু আগেই ছাড়িয়ে গেছে, এবার ভারতকে ছাড়িয়ে গেল।

২০১৮ সালের নির্বাচনী ইশতেহারে আওয়ামী লীগ দুর্নীতির ব্যাপারে ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি গ্রহণের অঙ্গীকার করেছিল, কিন্তু গত দুই বছরে সরকার এই অঙ্গীকার পূরণকে সত্যিকার অগ্রাধিকার দিচ্ছে বলে মনে হয়নি। তাই আবারও প্রধানমন্ত্রীকে প্রতিজ্ঞাটি স্মরণ করিয়ে দিলাম।

কিন্তু মাথাপিছু জিডিপি যেহেতু একটি গড় সূচক, তাই মাথাপিছু জিডিপি প্রবৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে যদি দেশে আয়বণ্টনে বৈষম্যও বাড়তে থাকে, তাহলে নিম্নবিত্ত ও নিম্নমধ্যবিত্ত সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ প্রবৃদ্ধির ন্যায্য হিস্যা থেকে বঞ্চিত থেকে যায়। ধনাঢ্য ও উচ্চবিত্ত জনগোষ্ঠীগুলোর দখলে জিডিপির ক্রমবর্ধমান অংশ পুঞ্জীভবনের ফল কী হতে পারে, তা নাটকীয়ভাবে ধরা পড়েছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক গবেষণা সংস্থা ‘ওয়েলথ এক্স’-এর প্রতিবেদনে। ২০১২ থেকে ২০১৭ পর্যন্ত অতিধনীর সংখ্যা বৃদ্ধির বিচারে বাংলাদেশ বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন হয়ে গেছে। ওই পাঁচ বছরে বাংলাদেশে ৩০ মিলিয়ন ডলারের বেশি সম্পদের মালিক অতিধনীর সংখ্যা বেড়েছে বার্ষিক ১৭ দশমিক ৩ শতাংশ হারে। দেশের আয় এবং সম্পদের এহেন পুঞ্জীভবন বাংলাদেশের রাজনীতিকে ‘ক্রোনি ক্যাপিটালিজমের’ নিকৃষ্ট নজির হিসেবে বিশ্বের কাছে তুলে ধরছে।

গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ রাষ্ট্রের চারটি মূলনীতির মধ্যে ২০১০ সালে সুপ্রিম কোর্টের ঐতিহাসিক রায়ের মাধ্যমে সমাজতন্ত্র পুনঃস্থাপিত হয়েছে। ২০১১ সালে সংসদে পাস হওয়া সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে ক্ষমতাসীন মহাজোট সে রায়কে সংবিধানে ফিরিয়ে আনলেও সরকার ‘মুক্তবাজার অর্থনীতির’ পথেই হাটছে। ২০০১ থেকে ২০০৫ পর্যন্ত পাঁচবার বাংলাদেশ দুর্নীতিতে বিশ্ব চ্যাম্পিয়নশিপ অর্জন করেছিল, এখন বিশ্ব চ্যাম্পিয়নশিপ অর্জন করল ধনকুবেরের সংখ্যা বৃদ্ধির দৌড়ে। এসব ‘রবার ব্যারন’ সৃষ্টির জন্য কি বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে স্বাধীনতা ছিনিয়ে এনেছিলাম আমরা?

এসব ধনাঢ্য ব্যক্তির কাছেই দেশের খেলাপি ব্যাংক ঋণের ৮০ শতাংশের বেশি আটকে রয়েছে এবং খেলাপি ঋণের সিংহভাগ বিদেশে পাচার হয়ে যাচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক গবেষণা সংস্থা গ্লোবাল ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেগ্রিটির হিসাব মোতাবেক, এক দশক ধরে প্রতিবছর বাংলাদেশ থেকে বিদেশে পুঁজি পাচার হয়ে চলেছে ৭-৯ বিলিয়ন ডলার। ২০১৮ সালের নির্বাচনী ইশতেহারে আওয়ামী লীগ দুর্নীতির ব্যাপারে ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি গ্রহণের অঙ্গীকার করেছিল, কিন্তু গত দুই বছরে সরকার এই অঙ্গীকার পূরণকে সত্যিকার অগ্রাধিকার দিচ্ছে বলে মনে হয়নি। তাই আবারও প্রধানমন্ত্রীকে প্রতিজ্ঞাটি স্মরণ করিয়ে দিলাম।

সবশেষে ২০১৮ সালের নির্বাচনে লাইনচ্যুত গণতন্ত্রকে আবারও লাইনে পুনঃস্থাপন করার জন্য প্রধানমন্ত্রীর প্রতি অনুরোধ করছি। বলতে চাই, আপনারা জনগণের নাড়িস্পন্দন ধরতে পারেননি, ওই নির্বাচনে ব্যালট জবরদখলের মোটেও প্রয়োজন ছিল না। বিএনপিও বিলেত থেকে নানা চাল চালছে প্রতিটি নির্বাচনকে প্রশ্নবিদ্ধ করার জন্য। এ দেশে অদূর ভবিষ্যতে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ফেরত আসবে না। অতএব, বর্তমান নির্বাচন ব্যবস্থার ত্রুটি সংশোধনে তাদের মনোনিবেশ করতেই হবে। দেশে অদূর ভবিষ্যতে অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনের মাধ্যমে সরকার পরিবর্তন হবে কি না, সে সম্পর্কে জনমনে সর্বনাশা আস্থার সংকট তৈরি হয়েছে। আমার মতে, ভবিষ্যতে অবাধ ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন হলে সরকারি দলের পুনর্নির্বাচিত হওয়ার চাবিকাঠি হচ্ছে দুর্নীতি, পুঁজি লুণ্ঠন ও পুঁজি পাচারের বিরুদ্ধে তাদের অঙ্গীকারকে জনগণের কাছে বিশ্বাসযোগ্য করে তোলা। নির্বাচনে জেতার জন্য তাহলে ব্যালট জবরদখলের প্রয়োজন হবে না।


মইনুল ইসলাম অর্থনীতিবিদ ও চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক