এখন বাংলাদেশে ১ জানুয়ারি জাতীয় পাঠ্যপুস্তক দিবস হিসেবে উদ্যাপিত হচ্ছে। এদিন দেশের শিক্ষার্থীদের হাতে নতুন বই তুলে দেওয়া হয়। বাঙালি শিশুরা তাদের মাতৃভাষার বই হাতে নিয়ে শিক্ষার স্বপ্নে বিভোর হয়ে ওঠে। কিন্তু এ দেশের প্রায় চার লাখ আদিবাসী শিক্ষার্থী সেই অধিকার ও আনন্দ থেকে বঞ্চিত রয়েছে। শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদ আদিবাসী শিক্ষার্থীদের মাতৃভাষায় পাঠের এই অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য উদ্যোগ নিয়েছিলেন। তাই বাংলাদেশের শিক্ষার উন্নয়ন ও নীতিনির্ধারণের ক্ষেত্রে ২০১০ সালের জাতীয় শিক্ষানীতি নিঃসন্দেহে একটি উল্লেখযোগ্য পদক্ষেপ। এই শিক্ষানীতিতেই প্রথম এ দেশের আদিবাসীদের মাতৃভাষায় প্রাথমিক শিক্ষার বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচিত হয়েছে। অবশ্য শিক্ষানীতি ছাড়াও সরকারের বিভিন্ন কৌশল ও পরিকল্পনাপত্রে এ বিষয়টির উল্লেখ এর আগেই লক্ষ করা গেছে।
এ দেশের সংখ্যালঘু আদিবাসীরা জাতীয় শিক্ষানীতি ২০১০-কে স্বাগত জানিয়েছিল তাদের দীর্ঘদিনের একটি স্বপ্নের বাস্তবায়নের প্রতিশ্রুতি দেখে। সে অনুসারে একটি জাতীয় কমিটিও গঠিত হয়েছিল ২০১২ সালে। সে কমিটির প্রধান কাজ ছিল আদিবাসীদের (সরকারের ভাষায় ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী) মাতৃভাষায় প্রাথমিক শিক্ষা প্রদানের জন্য একটি পরিকল্পনা প্রণয়ন এবং বাস্তবায়নের জন্য বিভিন্ন উপকমিটি গঠন। উল্লেখ্য, এই জাতীয় কমিটিতে আদিবাসী নেতারাসহ ভাষাবিশেষজ্ঞ এবং এ কাজে অভিজ্ঞ বিভিন্ন বেসরকারি সংস্থার কয়েকজন প্রতিনিধিও ছিলেন। এ কমিটিরই পরিকল্পনায় প্রাথমিকভাবে ছয়টি আদিবাসী ভাষাকে চিহ্নিত করা হয়, যাদের মাতৃভাষায় পাঠ্যপুস্তক তৈরি করা হবে এবং ভাষাভিত্তিক শিক্ষক প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা নেওয়া হবে। এ ছয়টি ভাষা হচ্ছে চাকমা, মারমা, সাঁওতাল, সাদরি, ত্রিপুরা ও গারো। পরবর্তীকালে লিপিসংক্রান্ত সমস্যার সমাধান না হওয়ায় সাঁওতাল ভাষাকে সাময়িকভাবে বাদ রাখা হয়। এই কমিটির সিদ্ধান্ত মোতাবেক পর্যায়ক্রমে অন্যান্য জনগোষ্ঠীর মাতৃভাষায় প্রাক্-প্রাথমিক থেকে তৃতীয় শ্রেণি পর্যন্ত পাঠ্যপুস্তক তৈরি ও পাঠদানের সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। প্রায় তিন বছর ধরে এই জাতীয় কমিটির বেশ কয়েকটি সভা অনুষ্ঠিত হয়। নেওয়া হয় কর্মপরিকল্পনা এবং গঠিত হয় বিভিন্ন উপকমিটি। এর মধ্যে দুটি উল্লেখযোগ্য কমিটি হচ্ছে আদিবাসী মাতৃভাষায় পাঠ্যপুস্তক প্রণয়ন ও ব্রিজিংয়ের জন্য টেকনিক্যাল কমিটি এবং অন্যটি শিক্ষক প্রশিক্ষণবিষয়ক ব্যবস্থাপনা কমিটি। টেকনিক্যাল কমিটির একাধিক সভা, ব্রিজিং কর্মশালা এবং আদিবাসী ভাষার লেখক নির্বাচন গত ফেব্রুয়ারি মাসে সমাপ্ত হলেও বাজেট বরাদ্দসংক্রান্ত জটিলতার কারণে এখন পর্যন্ত পাঠ্যপুস্তক প্রণয়নের কাজ শুরু করা হয়নি। অন্যদিকে আদিবাসীদের মাতৃভাষায় প্রাথমিক শিক্ষা প্রদানের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হচ্ছে বিভিন্ন ভাষাভাষী শিক্ষক তৈরি এবং তাঁদের প্রশিক্ষণ। অথচ অত্যন্ত দুঃখজনক হচ্ছে, প্রায় দুই বছর অতিক্রান্ত হলেও অদ্যাবধি শিক্ষক প্রশিক্ষণবিষয়ক ব্যবস্থাপনা কমিটির কোনো সভা অনুষ্ঠিত হয়নি। এমনকি এ বিষয়ে কোনো কার্যক্রমও হাতে নেওয়া হয়নি।
আমরা লক্ষ করেছি, রাষ্ট্রের নেওয়া আদিবাসীদের বিভিন্ন কার্যক্রম বাস্তবায়নে কোনো না কোনোভাবে জটিলতা সৃষ্টি হয়, বিশেষ করে আমলাতান্ত্রিক জটিলতা। ফলে সরকারের প্রতিশ্রুতি ও রাজনৈতিক অঙ্গীকার বাস্তবায়ন ঝুলে পড়ে। সরকার, মন্ত্রী, আদিবাসী নেতা, সুশীল সমাজ, ভাষাগবেষক প্রমুখের অপরিসীম আগ্রহ ও সহযোগিতা সত্ত্বেও কোনো এক অদৃশ্য কারণে লাল ফিতার বাঁধন থেকে মুক্ত হয়ে আদিবাসীদের মাতৃভাষায় প্রাথমিক শিক্ষার স্বপ্ন কিছুতেই যেন বাস্তবায়নের আলো দেখতে পাচ্ছে না।
প্রথম দিকে এটি বাস্তবায়নের জাতীয় কমিটির আহ্বায়ক ছিলেন প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের তৎকালীন অতিরিক্ত সচিব এস এম আশরাফুল ইসলাম। তাঁর আগ্রহ ও প্রচেষ্টায় এটি অনেক দূর অগ্রসর হলেও পরবর্তীকালে ওই পদে নতুন অতিরিক্ত সচিব রূপণ কান্তি শীল যোগদান করার পর এ বিষয়ে কোনো অগ্রগতি হয়নি। এমনকি সরকারের এই পরিকল্পনা বাস্তবায়নের জন্য সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দেওয়া মাল্টিলিঙ্গুয়াল এডুকেশন ফোরামের সভায় ওই অতিরিক্ত সচিবকে আমন্ত্রণ জানিয়ে বিষয়টি বাস্তবায়নের অনুরোধ জানানোর পরেও তেমন একটা অগ্রসর হয়েছে বলে আমাদের জানা নেই। অতিসম্প্রতি তিনি বদলি হলে পুরো বিষয়টি অনিশ্চিত হয়ে পড়ে।
২০১৩ সালে কার্যক্রমের অগ্রগতি দেখে মনে হচ্ছিল, ২০১৪ সালের জানুয়ারি মাসে শিক্ষামন্ত্রীর হাত থেকে আদিবাসী শিক্ষার্থীরা তাদের মাতৃভাষার পাঠ্যপুস্তক গ্রহণ করবে। কিন্তু তা সম্ভব হয়নি। এমনকি ২০১৪ সালে পাঠ্যপুস্তক প্রণয়নের প্রাক্-প্রস্তুতি সম্পন্ন হওয়ার পরেও বিষয়টি দীর্ঘদিন ধরে পরবর্তী কার্যক্রমে সক্রিয় না হওয়ায় এবং সময় দ্রুত ফুরিয়ে যাওয়ায় ২০১৫ সালেও আদিবাসী শিক্ষার্থীরা তাদের বিদ্যালয়ে মাতৃভাষায় পাঠ করার সুযোগ থেকে বঞ্চিত হবে বলে মনে হচ্ছে। সরকারের রাজনৈতিক সদিচ্ছা, শিক্ষামন্ত্রীর আন্তরিকতা এবং অন্যদের সহযোগিতা সত্ত্বেও আমলাতান্ত্রিক জটিলতা ও প্রতিবন্ধকতার কারণে শেষ পর্যন্ত দীর্ঘসূত্রতার জালে আবদ্ধ হয়ে ঝুলে গেল একটি মহৎ উদ্যোগ। এ বিষয়ে মন্ত্রী কি আবারও উদ্যোগী হবেন?
সৌরভ সিকদার: অধ্যাপক, ভাষাবিজ্ঞান বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।
[email protected]