অল্প কিছুদিন আগে ঢাকার দৈনিক পত্রিকাগুলোর কয়েকটিতে একটা অভিনব বিশাল বিজ্ঞাপন ছাপা হয়। সেটি এমনই যে পত্রিকার পাতা উল্টালে চোখে না পড়ার কোনো কারণ নেই। বিজ্ঞাপনটিতে দুবাইয়ের অভিজাত এলাকায় অ্যাপার্টমেন্ট বিক্রির আকর্ষণীয় অফার দেওয়া হয়েছে সেখানকার আবাসন খাতের উৎকর্ষের বর্ণনাসহ। বাংলাদেশের পত্রিকায় বিদেশি হাসপাতালে চিকিৎসার সুযোগের বিজ্ঞাপন তো এখন আর নতুন কোনো বিষয় নয়, সেই সব বিদেশি হাসপাতালের স্থানীয় আবাসিক কার্যালয়ও খোলা হয়েছে ঢাকায়। কোনো কোনো বিদেশি হাসপাতাল বাংলাদেশের সাংবাদিকদের বিনা খরচে নিয়ে গিয়ে দেখিয়েও এনেছে তাদের সেবা ও সুযোগ-সুবিধাগুলো, যাতে ঢাকার কাগজে নিখরচায় তাদের বিজ্ঞাপন হয়ে যায়। চিকিৎসার মতো একটি জীবন রক্ষাকারী বিষয় বলে এবং বাংলাদেশের হাসপাতালগুলোর স্বাস্থ্যসেবা সম্পর্কে আমাদের অনেকেরই ভালো অভিজ্ঞতা নেই বলে বিদেশি হাসপাতালের এসব বিজ্ঞাপন নিয়ে খুব একটা প্রতিক্রিয়া দেখা যায়নি। কিন্তু দুবাইয়ে বিলাসবহুল অ্যাপার্টমেন্ট বিক্রির চোখধাঁধানো এই বিজ্ঞাপন বহু মানুষেরই দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে। কারণ, বাংলাদেশের ধনবান পরিবারগুলো যে দুবাইয়ের মতো ব্যয়বহুল শহরে ততোধিক বিলাসবহুল অ্যাপার্টমেন্ট কিনতে সক্ষম এবং দুবাইয়ের আবাসন খাত বাংলাদেশকে বিজ্ঞাপন দিয়ে প্রচার করার মতো বড় বাজার বলে বিবেচনা করে—সেই সত্য উঠে এসেছে এই বিজ্ঞাপনের মাধ্যমে।আরও একটা বিষয় লক্ষণীয়, দামাক প্রপার্টিজ নামের যে প্রতিষ্ঠান এই বিজ্ঞাপন দিয়ে বাংলাদেশের মানুষকে দুবাইয়ে অ্যাপার্টমেন্ট কিনতে প্রলুব্ধ করছে, তারা বাংলাদেশের বৈদেশিক মুদ্রা নিয়ন্ত্রণ আইন সম্পর্কে খোঁজখবর না নিয়েই এই প্রচারণা চালাচ্ছে না নিশ্চয়ই। বাংলাদেশের বিদ্যমান আইনে বাংলাদেশি নাগরিকদের বিদেশে সম্পত্তি কেনার জন্য অর্থ স্থানান্তরের বিষয়ে নিষেধাজ্ঞা রয়েছে, তবু ঢাকার কাগজে ফলাও করে এই বিজ্ঞাপন প্রকাশ করার অর্থ আমাদের আইনের প্রতি সরাসরি উপেক্ষা। তবে বাংলাদেশই যে একমাত্র টার্গেট, তা নয়। প্রতিষ্ঠানটি তাদের অ্যাপার্টমেন্ট বিক্রির জন্য আরও কয়েকটি দেশে একযোগে প্রচারণা চালাচ্ছে। যেমন দক্ষিণ আফ্রিকার ডারবান ও জোহানেসবার্গ, তানজানিয়ার দারএসসালাম, ঘানার আক্রা এবং পাকিস্তানের লাহোর, করাচি ও ইসলামাবাদ। ঢাকায় প্রকাশিত বিজ্ঞাপনে দেখা যায়, স্থানীয় এক অভিজাত হোটেলের সভাকক্ষ ভাড়া করে দুই দিন অবস্থান করার পরিকল্পনা করেছিলেন দামাকের প্রতিনিধি, যাতে ইচ্ছুক ক্রেতারা তাঁদের সঙ্গে দেখা করে আলোচনা করতে পারেন। বাংলাদেশ ব্যাংকের সতর্কীকরণ বিজ্ঞপ্তি প্রকাশের কারণে দ্বিতীয় দিন পাততাড়ি গুটিয়ে ফেলেন আয়োজকেরা। একইভাবে উপরিউক্ত দেশগুলোর উল্লিখিত শহরগুলোতেও একইভাবে তাঁরা দুই দিন করে থাকবেন একই উদ্দেশ্যে। আমরা জানি না, প্রথম দিন দামাকের প্রতিনিধিদের সঙ্গে ঢাকার কারা কারা দেখা করতে গিয়েছিলেন, তার কোনো তালিকা বাংলাদেশ সরকারের কোনো সংস্থা তৈরি করতে পেরেছে কি না, কিংবা তাঁদের গতিবিধি ও অর্থ-সম্পদের ওপর নজর রাখার কথা আদৌ ভেবেছে কি না। তাঁদের পরিচয় ও আর্থিক অবস্থা সম্পর্কে যাবতীয় তথ্য আমাদের জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের জন্য খুব প্রয়োজনীয় ছিল। দুর্ভাগ্যের বিষয়, আমাদের দেশে স্বপ্রণোদিত হয়ে এ-জাতীয় কোনো ব্যবস্থা নেওয়ার খুব বেশি নজির নেই। তা না হলে ‘ডেসটিনি’র কাকরাইলের কার্যালয়ের সামনে দিনের পর দিন ভোর থেকে হাজার হাজার লোক যে লাইনে দাঁড়িয়ে থাকত—যেকোনো সংস্থার উচিত ছিল একটুখানি কৌতূহলী হয়ে বিষয়টি তদন্ত করে দেখা। তাহলে ডেসটিনির গন্তব্য বহু আগেই বন্ধ করে দেওয়া সম্ভব হতো এবং প্রতিষ্ঠানটির উদ্যোক্তারা বিদেশে অর্থ পাচার করতে পারতেন না।তবে এবার দুবাইয়ের বিজ্ঞাপনটি প্রকাশিত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ত্বরিত গতিতে বাংলাদেশ ব্যাংক কর্তৃপক্ষ পাল্টা বিজ্ঞাপন প্রকাশ করে বৈদেশিক মুদ্রা নিয়ন্ত্রণ আইনে নিবাসী বাংলাদেশিদের বিদেশে স্থাবর সম্পত্তি কেনার ওপর বিধিনিষেধ সম্পর্কে স্মরণ করিয়ে দিয়ে দায়িত্বশীলতার পরিচয় দিয়েছে। এমনকি এ-জাতীয় অননুমোদিত কাজে প্রলুব্ধকর বিজ্ঞাপন প্রকাশ না করার ব্যাপারে গণমাধ্যমগুলোও যাতে আরও দায়িত্বশীল হয়, সে পরামর্শও দেওয়া হয়েছে। তবু বাংলাদেশি আবাসিক নাগরিকদের বিদেশে সম্পত্তি কেনা নিয়ে যে অলিখিত তথ্য পাওয়া যায়, তার পেছনের প্রকৃত তথ্য কখনোই উদ্ঘাটন করার চেষ্টা করা হয়নি হয়তো প্যান্ডোরার বাক্স খুলে যাবে বলে। আমরা জানি, দুবাইয়ের আবাসন কোম্পানিটি বাংলাদেশ ব্যাংকের এই সতর্কীকরণ বিজ্ঞাপন দেখে আপাতত রণে ভঙ্গ দিলেও এই বিপণনের প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখবে। কারণ, তারা আমাদের বৈদেশিক মুদ্রা নিয়ন্ত্রণ আইন সম্পর্কে জেনেশুনেই এই প্রচারণা চালাতে এ দেশে এসেছিল। আমাদের দেশের আগ্রহী ক্রেতাদেরও সমাগম ছিল সেখানে। সুতরাং, তারা যে ভুল গন্তব্যে আসেনি, সেটা প্রমাণিত। তবে পত্রিকার খবরে জানা যায়, সম্পত্তি কেনায় অর্থ পরিশোধের পদ্ধতি সম্পর্কে সরাসরি কোনো জবাব দেননি প্রতিষ্ঠানটির প্রতিনিধি। তিনি যে বাংলাদেশি ব্যক্তির সঙ্গে যোগাযোগের পরামর্শ দেন, প্রতিষ্ঠানটির সঙ্গে তাঁর কোনো সম্পর্কের কথা অস্বীকার করেন। এ রকম লুকোচুরি খেলার কারণ সহজেই বোঝা যায়। কারণ তাঁরা জানেন, বৈদেশিক মুদ্রা নিয়ন্ত্রণ আইনে যা-ই থাকুক না কেন, বিদেশে অস্থাবর সম্পত্তি কেনার ব্যাপারে কোনো আইনই আমরা তেমন কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন করতে পারিনি।এই বিজ্ঞাপন প্রকাশিত হওয়ার কয়েক দিন পর আরও একটা খবরে ছিল বিস্ফোরণের আভাস। দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) চেয়ারম্যান নির্দ্বিধায় মন্তব্য করেছেন, বাংলাদেশের বড় দুটি দলসহ অন্যান্য দলের লোকেরাও বিদেশে টাকা পাচার করেছেন বলে তাঁদের কাছে তথ্য রয়েছে। স্বয়ং অ্যাটর্নি জেনারেলও বলেছেন, বিদেশের বিভিন্ন বড় নগরে বাংলাদেশি রাজনীতিকদের পাচার করা অর্থ রয়েছে, যদিও তিনি সেই সব রাজনীতিকের পরিচয় প্রকাশ করেননি। সুতরাং, বাংলাদেশের প্রভাবশালী লোকদের দেশের বাইরে অর্থ পাচার কিংবা অস্থাবর সম্পত্তি ক্রয় কোনো বড় বা অস্বাভাবিক ঘটনা নয়। বোঝা যায়, দেশের প্রচলিত আইনের বাইরে বিদেশে অর্থ পাঠিয়ে সম্পত্তি অর্জন আমাদের দেশের পরিপ্রেক্ষিতে আজ ‘ওপেন সিক্রেট’। যে দু-একটি ঘটনা জনসমক্ষে আসে, সেসব হয়তো হিমশৈলের শৃঙ্গমাত্র, প্রকৃত পরিস্থিতি হয়তো আরও নাজুক ও জটিল।এভাবে অর্থ বা সম্পদ পাচার করে বিদেশে সম্পদ আহরণ দেশের প্রচলিত মানি লন্ডারিং আইনে অপরাধ। এই আইনে ব্যাংক অ্যাকাউন্টের মাধ্যমে লেনদেন করে, এমনকি দেশের ভেতরেও মূল্যবান সম্পত্তি আহরণের মতো ঘটনা নিত্যনৈমিত্তিক হলেও অস্বাভাবিক বৃহৎ অঙ্কের অর্থ লেনদেনের হিসাব নিয়ন্ত্রণকারী কর্তৃপক্ষের কাছে রিপোর্ট করার বিধান বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। এমনকি টাকা ধোলাই এখন আর কেবল অপরাধী উৎসের অর্থের বেলায় প্রযোজ্য নয়, এটির পরিধি আরও বিস্তৃত করা হয়েছে। যেমন কর ফাঁকি দেওয়া অপ্রদর্শিত আয়, মূল্য সংবেদনশীল তথ্য ফাঁসের মাধ্যমে শেয়ারবাজারের ফায়দা লাভ করা, এমনকি যৌতুকলব্ধ আয়ও মানি লন্ডারিংয়ের অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। ফলে ব্যাংকগুলোর জন্য এই নতুন দায়িত্ব একটা নতুন চ্যালেঞ্জ হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। কারণ, আজকাল তথ্যপ্রযুক্তির উৎকর্ষের কারণে আর্থিক অপরাধের মাত্রা ও পরিধি আরও জটিল এবং কৌশল উন্নত হয়েছে। ফলে ব্যাংকগুলোর দায়িত্ব ও কর্তব্য এবং দক্ষতার প্রয়োজনীয়তাও অনেক বেড়েছে।আমাদের বিবেচনা করতে হবে, অবৈধ আর্থিক লেনদেনের বিষয়ে বাংলাদেশের অবস্থান বেশ নাজুক। কারণ, প্রথমত, আমাদের দেশের মানুষের মধ্যে ব্যাংক-বহির্ভূত নগদ লেনদেনের প্রবণতাই বেশি। সাধারণ মানুষ নগদ অর্থে লেনদেন করতে বেশি স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করে। দ্বিতীয়ত, আমাদের দেশে আসা বিশাল অঙ্কের বিদেশি রেমিট্যান্স আন্তর্জাতিক অর্থ পাচারের জন্য একটা বড় অভয়ারণ্য হতে পারে, যদি আমরা সেসব অন্তর্মুখী প্রবাহের উৎস সম্পর্কে সতর্ক না থাকি। এ ছাড়া বাংলাদেশ তার ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে মাদক, সোনা ও অবৈধ অস্ত্র চোরাচালানের যে একটা নিরাপদ সংযোগস্থলে পরিণত হয়েছে, সেটা বিভিন্নভাবে বহু ঘটনার মাধ্যমে প্রমাণিত। আচমকা ১০ ট্রাক অস্ত্র ধরা পড়া কিংবা বিমানের খোলে করে বিশাল পরিমাণ সোনা পরিবহনের ঘটনাকেও হিমশৈলের শৃঙ্গের সঙ্গে তুলনা করা যায়। কারণ, এসব ঘটনার আড়ালে ঘটে যায় আরও বহু বড় কোনো ঘটনা। আরও উদ্বেগের বিষয় এই যে, আন্তর্জাতিক অস্ত্র চোরাচালানের ট্রানজিটে পরিণত হওয়ার পেছনে ক্ষেত্রবিশেষে রাজনৈতিক মদদের প্রমাণও উঠে এসেছে। পত্রিকার খবরে জানা যায়, গত কয়েক বছর দেশে কোনো সোনা আমদানি হয়নি, তাহলে দেশব্যাপী হাজার হাজার সোনার দোকানের এত মজুদের উৎস কী, তা সহজেই ধারণা করা যায়।এ রকম নাজুক পরিস্থিতি সত্ত্বেও অতি সম্প্রতি বাংলাদেশ মর্যাদাপূর্ণ এগমন্ট গ্রুপের সদস্যপদ লাভ করেছে। উল্লেখ্য, এগমন্ট গ্রুপ আন্তর্জাতিক ফিন্যানশিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিটগুলোর সম্মিলিত একটি ফোরাম। এই ফোরাম মানি লন্ডারিং ও সন্ত্রাসী অর্থায়নবিষয়ক তথ্য নিয়ে গবেষণা এবং তা সদস্যদের মধ্যে বিনিময় করে। এই সদস্যপদ অ্যান্টি মানি লন্ডারিং প্রয়াসে বাংলাদেশের জন্য একটা বড় অর্জন। কারণ, গত বছরগুলোতে দেশের ভেতরে সন্ত্রাসী কার্যক্রম, অস্ত্র চোরাচালানের ট্রানজিট রুট হিসেবে বাংলাদেশকে ব্যবহার এবং কালোটাকা নিয়ে বাংলাদেশের যে ভাবমূর্তি, তাতে এগমন্ট গ্রুপের মতো ফোরামের সদস্যপদ লাভ এই ভাবমূর্তি পুনরুদ্ধারের পথে এক ধাপ অগ্রগতি। কারণ, বাংলাদেশ এখন আন্তর্জাতিক অর্থ পাচার এবং সন্ত্রাসী অর্থায়নের বিষয়ে আরও ১৩১ দেশের সঙ্গে এক কাতারে দাঁড়াতে পারবে, বিনিময় করতে পারবে এ-বিষয়ক তথ্য। এই মর্যাদা অক্ষুণ্ন রাখার জন্য ৩৬টি দেশের সমন্বয়ে গঠিত ফিন্যানশিয়াল অ্যাকশন টাস্কফোর্সের (এফএটিএফ) সুপারিশগুলো আমাদের বাস্তবায়িত করতে হবে। কারণ, মানি লন্ডারিং-বিষয়ক এশিয়া প্যাসিফিক গ্রুপের সদস্য হিসেবে বাংলাদেশও এফএটিএফের সহযোগী সদস্য। তবে এই সবকিছুর সাফল্য ও কার্যকারিতা নির্ভর করবে বাংলাদেশের ব্যক্তিতথ্য প্রবাহের অবাধ সুযোগ ও স্বচ্ছতার এবং অন্যান্য প্রাসঙ্গিক অবকাঠামোগত সুযোগ-সুবিধার ওপর।ফারুক মঈনউদ্দীন: লেখক ও ব্যাংকার।[email protected]