গত ১ ফেব্রুয়ারি এক অভ্যুত্থানে অং সান সু চির সরকারকে হটিয়ে মিয়ানমারে রাষ্ট্রক্ষমতা দখল করে সেনাবাহিনী। সেনাপ্রধান সিনিয়র জেনারেল মিন অং হ্লাইং সর্বময় ক্ষমতা গ্রহণ করেন। সেনা অভ্যুত্থানের বিরুদ্ধে বিক্ষোভ শুরু হয় এর পরপরই। আন্দোলনের তীব্রতা যখন বাড়তে থাকে, তখন নির্মম দমনমূলক পদক্ষেপ নেয় সেনারা। গত চার মাসে নারী-শিশুসহ আট শতাধিক মানুষ নিহত হয়েছে সেনাদের হাতে। তবে বিক্ষোভ বা আন্দোলনের গতি তাতে স্তিমিত হয়নি। সেনা অভ্যুত্থানের বিরুদ্ধে এবারের প্রতিক্রিয়া ছিল তাই অনেকটাই অভূতপূর্ব।
সেনাবাহিনী কর্তৃক বাতিল ঘোষিত ২০২১-এর নির্বাচনে বিজয়ী সাংসদদের একাংশ গত ১৬ এপ্রিল বিকল্প সরকার হিসেবে জাতীয় ঐক্যের সরকার গঠন করে। সরকারের মূল অংশীদার সু চির দল ন্যাশনাল লিগ ফর ডেমোক্রেসি (এনএলডি)। তবে এর সঙ্গে যোগ দিয়েছেন বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠীর প্রতিনিধিরা এবং ছোট ছোট আরও কিছু দল। এই সরকারের মন্ত্রিসভার দীর্ঘ তালিকায় এনএলডি ছাড়াও এসব গ্রুপের প্রতিনিধি রয়েছেন। প্রেসিডেন্ট রাখা হয়েছে সেনাদের দ্বারা অপসারিত প্রেসিডেন্ট উইন মিন্টকে, স্টেট কাউন্সিলর পদে আছেন অং সান সু চি। তাঁরা উভয়েই যেহেতু আটক আছেন, তাঁদের অন্তর্ভুক্তি অনেকটাই আনুষ্ঠানিক। ভাইস প্রেসিডেন্ট নিযুক্ত হয়েছেন ‘কাচিন ন্যাশনাল কনসাল্টেটিভ অ্যাসেম্বলি’র দুয়া লাশি লা এবং প্রধানমন্ত্রী এনএলডির মান উইন খাইং থান। এ সরকার তাদের মিয়ানমারের বৈধ সরকার হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়ার জন্য আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে। এখনো অবশ্য তাতে কোনো সাড়া মেলেনি। ‘আসিয়ান পার্লামেন্টারিয়ানস ফর হিউম্যান রাইটস’ গত ২৪ এপ্রিল অনুষ্ঠিত আসিয়ান নেতাদের সভায় সেনাশাসকদের পরিবর্তে এ সরকারকে নিমন্ত্রণের আহ্বান জানিয়েছিল। তবে আসিয়ান তা করেনি।
জাতীয় ঐক্যের এ সরকার কোনো ক্ষমতাসীন সরকার নয়, এর ভবিষ্যৎ কী হবে, তা–ও অনেকটাই অনিশ্চিত। তারপরও মিয়ানমারে চলমান পরিস্থিতির প্রেক্ষাপটে এ সরকারের বক্তব্য এবং অবস্থানের গুরুত্ব আছে। ৩ জুন জাতীয় ঐক্যের সরকার ‘পলিসি পজিশন অন দ্য রোহিঙ্গা ইন রাখাইন স্টেট’ নামে একটি অবস্থানপত্র প্রকাশ করেছে। এ অবস্থানপত্র অনেক দিক দিয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
প্রথমত, এ অবস্থানপত্র সরাসরি রোহিঙ্গা গোষ্ঠীকে উদ্দেশ্য করে প্রণীত হয়েছে, যা এই গোষ্ঠীর গুরুত্বের একধরনের স্বীকৃতি।
দ্বিতীয়ত, এই প্রথম মিয়ানমারের একটি সংগঠন রোহিঙ্গাদের ‘রোহিঙ্গা’ নামে সম্বোধন করেছে। মনে রাখতে হবে, এই সরকারের মূল নিয়ন্তা সু চির এনএলডি, সেনাদের মতোই যারা সব সময় রোহিঙ্গাদের রাখাইনে অবস্থানকারী মুসলমান বা বাঙালি বলেই অভিহিত করেছে।
তৃতীয়ত, জাতীয় ঐক্যের সরকার তাদের প্রস্তাবিত ‘ফেডারেল ডেমোক্রেটিক ইউনিয়ন’-এ নৃতাত্ত্বিক পরিচয়নির্বিশেষে সব জাতিগোষ্ঠীর মৌলিক মানবাধিকার ও নাগরিক অধিকার রক্ষার অঙ্গীকার করেছে এবং বলেছে, এসব নীতি রাখাইন রাজ্যের রোহিঙ্গাসংক্রান্ত বিষয়াদি নিষ্পত্তিতে ভিত্তি হিসেবে কাজ করবে। রোহিঙ্গাদেরসহ রাখাইনের সব স্টেকহোল্ডারের সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে তাদের মতামত, ঐতিহাসিক তথ্য এবং জাতীয় ও আন্তর্জাতিক আইনের আলোকে সবার মানবাধিকার রক্ষার ব্যবস্থা করা হবে বলে অঙ্গীকার করা হয়েছে। রোহিঙ্গাদের বিদেশি হিসেবে চিহ্নিতকারী ‘ন্যাশনাল ভেরিফিকেশন কার্ড’ বাতিল এবং ১৯৮২ সালের নাগরিকত্ব আইনে পরিবর্তন আনার কথাও বলা হয়েছে, যে আইনে রোহিঙ্গাদের নাগরিকত্ব বাতিল হয়ে যায়।
চতুর্থত, ‘দুর্বৃত্ত সেনাবাহিনী’ (থাগিশ মিলিটারি) গত ১০ বছরে রোহিঙ্গাদের ওপর যে নির্যাতন চালিয়েছে এবং মানবাধিকার লঙ্ঘন করেছে, এই পত্রে তাতে গভীর দুঃখ প্রকাশ করা হয়। ভবিষ্যতে এরূপ কার্য যাতে না হয়, সে জন্য অপরাধীদের জবাবদিহির আওতায় আনা হবে, ফেডারেল ডেমোক্রেটিক ইউনিয়নের সংবিধানে ন্যায়বিচার এবং ক্ষতিপূরণের ব্যবস্থা রাখা হবে। প্রয়োজনে তাদের দ্বারা সংঘটিত অপরাধের বিচারের জন্য আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের এখতিয়ারের বিষয়টিও বিবেচনা করা যেতে পারে।
পঞ্চমত, কফি আনান কমিশনের ৮৮টি সুপারিশের সূত্র উল্লেখ করে বলা হয় যে রাখাইনে সমস্যা সমাধানের ভিত্তি হতে পারে এই সুপারিশমালা, যাতে একটি গণতান্ত্রিক ও সমৃদ্ধ ভবিষ্যৎ গড়ে তোলা যায়। টাটমাডর (মিয়ানমার সেনাবাহিনী) উৎপীড়নে প্রতিবেশী দেশে আশ্রয়গ্রহণকারী রোহিঙ্গাদের স্বেচ্ছায় এবং নিরাপত্তা ও সম্মানের সঙ্গে প্রত্যাবর্তনের অঙ্গীকারও ব্যক্ত করা হয়।
সবশেষে বলা হয়, জাতীয় ঐক্যের সরকারের প্রথম দায়িত্ব হচ্ছে বেআইনি সামরিক একনায়কত্বের বিরুদ্ধে সংগ্রাম। ভবিষ্যতের ‘ফেডারেল ডেমোক্রেটিক ইউনিয়ন’-এর বিনির্মাণে সহযোগিতার চেতনায় সব স্টেকহোল্ডারের বক্তব্য গ্রহণ করা হবে। এ অবস্থায় ‘বসন্তবিপ্লবে’ এ সরকার এবং অন্য সবার সঙ্গে যোগ দিয়ে সামরিক একনায়কত্বের বিরুদ্ধে অবদান রাখার জন্য রোহিঙ্গাদের প্রতি আহ্বান জানানো হয়।
রোহিঙ্গা প্রশ্নে জাতীয় ঐক্যের সরকারের এ অবস্থানপত্রে বিধৃত প্রতিশ্রুতিগুলোয় রোহিঙ্গাদের প্রায় সব দাবিদাওয়া প্রতিফলিত আছে। তাহলে কি সমস্যা সমাধানের জন্য এখন শুধু এই সরকারের জয়ের প্রতীক্ষা? কিন্তু বাস্তবে বিষয়টা এত সোজাসাপটা নয়।
বামার-অধ্যুষিত ইরাবতী উপত্যকা বাদ দিলে মিয়ানমারের বিভিন্ন প্রান্তে জাতিগত বিদ্রোহীরা সশস্ত্র বিদ্রোহ চালিয়ে আসছে প্রায় দেশটির জন্মলগ্ন থেকেই। এরূপ প্রায় ২০টি গ্রুপ বর্তমানে সক্রিয়। এদের একটা উল্লেখযোগ্য অংশ এখন জাতীয় ঐক্যের সরকারের অধীনে ‘ফেডারেল ইউনিয়ন আর্মি’ নামে সংগঠিত হওয়ার প্রক্রিয়া শুরু করেছে, যাদের লক্ষ্য হবে সশস্ত্র বিদ্রোহের মাধ্যমে সামরিক সরকারের উৎখাত। সশস্ত্র সংগ্রামে আগ্রহী এনএলডিপন্থী বামার তরুণেরাও এ বাহিনীতে যোগ দিচ্ছে এবং বিদ্রোহীরা তাদের প্রশিক্ষণ দিচ্ছে।
এ প্রসঙ্গে প্রথম প্রশ্ন হচ্ছে, এই কথিত ফেডারেল ইউনিয়ন আর্মির পক্ষে কি মিয়ানমার সেনাবাহিনীকে সামরিকভাবে সরাসরি পরাজিত করা সম্ভব? এর সম্ভাব্য উত্তর হচ্ছে, না। ‘দ্য ডিপ্লোম্যাট’ অনলাইন ম্যাগাজিনে ৬ মে সংখ্যায় এক নিবন্ধে সেবাস্টিয়ান স্ট্র্যাঞ্জিও দুই পক্ষের শক্তির তুলনা করে দেখিয়েছেন যে সাড়ে ৩ লাখ প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত নিয়মিত বাহিনীর বিরুদ্ধে বড়জোর ৭৫ হাজার থেকে ৭৮ হাজার বিদ্রোহী যোদ্ধা সামরিক বিজয় আনতে পারবে না। তবে সব কটি বিদ্রোহী গ্রুপ যদি সমন্বিত আক্রমণ শুরু করে, সে ক্ষেত্রে সেনাবাহিনী সব দিকে ছড়িয়ে পড়তে বাধ্য হবে এবং নাগরিক আন্দোলন দমনে তাদের কার্যকারিতা হ্রাস পাবে। জান্তার প্রতি আন্তর্জাতিক সমর্থন লাঘবের রাজনৈতিক প্রয়াস সে ক্ষেত্রে শক্তিশালী হবে। অর্থাৎ চূড়ান্ত বিচারে একটি রাজনৈতিক সমাধানের দিকেই যেতে হবে।
সমস্যার এখানেই শেষ নয়; ফেডারেল ইউনিয়ন আর্মি গঠনের এ প্রয়াসে সব বিদ্রোহী গ্রুপ জড়িত হয়নি। ‘রেস্টোরেশন কাউন্সিল অব শান স্টেটস’ জাতীয় ঐক্যের সরকারকে মৌখিক সমর্থন দিয়েছে, কিন্তু আর কোনো পদক্ষেপ নেয়নি। বিদ্রোহী গ্রুপ আরাকান আর্মি, যাদের বিচরণক্ষেত্র রাখাইন রাজ্য, তারা এনএলডি সরকার এবং জাতীয় ঐক্যের সরকার—কাউকেই বিশ্বাস করে না। আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও সেনাশাসকেরা খুব অসুবিধায় নেই। চীনের পাশাপাশি তাদের সঙ্গে রাশিয়ার অস্ত্র ব্যবসাও বাড়ছে। অভ্যুত্থানের এক সপ্তাহ আগে রাশিয়ার প্রতিরক্ষামন্ত্রী মিয়ানমার সফর করেন, আর ২৭ মার্চ সশস্ত্র বাহিনী দিবসে রাশিয়ার প্রতিনিধি ছিলেন প্রতিরক্ষা উপমন্ত্রী আলেকজান্ডার ফোমিন। মিয়ানমারের বিমানবাহিনীর প্রধানও সম্প্রতি রাশিয়া সফর করেছেন। মিয়ানমারের বিরুদ্ধে অস্ত্রনিষেধাজ্ঞার যে প্রস্তাব উঠছে জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদে, চীনের পাশাপাশি রাশিয়াও যে তার বিরুদ্ধে দাঁড়াবে, তা ধরেই নেওয়া যায়। এ বিষয়ে আসিয়ানের অবস্থানও বেশ কৌতূহলোদ্দীপক। মিয়ানমারের বিরুদ্ধে অস্ত্রনিষেধাজ্ঞার বিরোধিতা করেছে আসিয়ানের সব কটি দেশ।
যদি আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে রাজনৈতিক সমাধানের দিকেই যেতে হয়, তাহলে জাতীয় ঐক্যের সরকারের এই প্রতিশ্রুতিমালার বহুলাংশ অকার্যকর হয়ে যাবে। মনে রাখতে হবে, রোহিঙ্গাদের প্রতি সহানুভূতিশীল শক্তিমান কোনো গোষ্ঠী নেই মিয়ানমারে। বৌদ্ধ পুরোহিত গোষ্ঠী, বামার জনগোষ্ঠী বা সেনাবাহিনী—সবাই তাদের বিরুদ্ধে। স্থানীয় বিদ্রোহী গ্রুপ আরাকান আর্মির মধ্যেও রোহিঙ্গা ও মুসলিমবিদ্বেষ প্রবল। ভবিষ্যতের যেকোনো ব্যাপকভিত্তিক শান্তি সম্মেলনে মিয়ানমার সেনাবাহিনীর দর-কষাকষির ক্ষমতা খুব কম থাকবে না এবং তারা তাদের অবস্থান অনেকটাই হয়তো ধরে রাখতে পারবে। সেখানে রোহিঙ্গাদের অধিকার রক্ষা নিঃসন্দেহে আলোচ্য সূচির প্রাধিকার তালিকার নিচের দিকেই থাকবে।
রোহিঙ্গারা তাহলে কী করতে পারে, বাংলাদেশই-বা কী করবে? মিয়ানমারের জাতীয় ঐক্যের সরকারের ব্যাপারে বাংলাদেশ সরকার এখনো কোনো অবস্থান গ্রহণ করেনি। এটা ঠিকই আছে। কারণ, মিয়ানমারের ক্ষমতাসীন সরকারের সঙ্গে আলোচনার দরজা বন্ধ করা বাংলাদেশের জন্য যথাযথ হবে না। পক্ষান্তরে সবকিছুর পরও রোহিঙ্গাদের উদ্দেশ্যে জাতীয় ঐক্যের সরকারের এই ঘোষণাপত্র তাদের জন্য মিয়ানমারের মূলধারার সঙ্গে সম্পৃক্ত হওয়ার একটা জানালা খুলে দিয়েছে। পূর্বাভিজ্ঞতা অবশ্য খুব ভালো নয়, অং সান সু চির মুক্তি আন্দোলনে রোহিঙ্গারা অংশ নিয়েছিল, কিন্তু মুক্ত সু চির শাসনেই সবচেয়ে বেশি নির্যাতনের শিকার হয়েছে তারা। তবু সামরিক জান্তাবিরোধী এ উদ্যোগে শামিল হওয়া রোহিঙ্গাদের জন্য জরুরি বলে মনে হয়। রোহিঙ্গা ডায়াস্পোরার উচিত আন্তর্জাতিক অঙ্গনে এ উদ্যোগের পক্ষে সোচ্চার হওয়া। আর সেই সঙ্গে একটি উল্লেখযোগ্যসংখ্যক রোহিঙ্গা তরুণ যদি জাতীয় ঐক্যের সরকারের আহ্বানে সাড়া দিয়ে ফেডারেল ইউনিয়ন আর্মিতে নাম লেখায়, তাহলে ভবিষ্যৎ আলোচনার টেবিলে তাদের সম্পূর্ণ উপেক্ষা করা কঠিন হতে পারে।
● মো. তৌহিদ হোসেন সাবেক পররাষ্ট্রসচিব