যখন সবকিছু ভেঙে পড়ে

আনাতোলে কালেৎ​স্কি
আনাতোলে কালেৎ​স্কি

আজ সারা বিশ্বে ভাঙনের সুর শোনা যাচ্ছে, মনে হচ্ছে একটি যুগের অবসান ঘটতে চলেছে। অতীতের স্থিতিশীল সমাজগুলো ভেঙে পড়ছে, এমন অশনিসংকেত দেখা যাচ্ছে। প্রখ্যাত কবি ডব্লিউ বি ইয়েটসের মহৎ কবিতা ‘দ্য সেকেন্ড কামিং’-এর কয়েকটি লাইন অমর হয়ে আছে:
‘থিংস ফল অ্যাপার্ট, দ্য সেন্টার ক্যাননট হোল্ড
মিয়ার অ্যানার্কি ইজ লুজড আপন দ্য ওয়ার্ল্ড...
দ্য বেস্ট ল্যাক কনভিকশন, হোয়াইল দ্য ওয়ার্স্ট
আর ফুল অব প্যাশনেট ইনটেনসিটি...
অ্যান্ড হোয়াট রাফ বিস্ট, ইটস আওয়ার কাম রাউন্ড অ্যাট লাস্ট
স্লাউচেস টুওয়ার্ডস বেথেলহেম টু বি বর্ন?’
কবি সুব্রত অগাস্টিন গোমেজের বাংলা তর্জমায় এর অর্থ দাঁড়ায় এমন: ভেঙে পড়ে সবকিছু, কেন্দ্র আর পারে না আগলাতে/ সারা বিশ্ব ভরে যায় হাট-খোলা অরাজকতায়../.নিরতিসংশয় সব শ্রেষ্ঠেরা, প্রত্যুত নিকৃষ্টেরা পাশব প্রাবল্যে সব টৈটম্বুর।/...আর, কী এই কদর্য জন্তু, যার মাহেন্দ্রমুহূর্ত উপস্থিত/ গুড়ি মেরে চলেছে যে বেথলেহেমে জন্ম নিতে তার?
ইয়েটস এই লাইনগুলো লিখেছিলেন ১৯১৯ সালের জানুয়ারি মাসে, প্রথম বিশ্বযুদ্ধ শেষ হওয়ার দুই মাস পর। তিনি তখনই নিজের অন্তর্জ্ঞানে বুঝেছিলেন, শান্তির জায়গায় ক্রমেই বিভীষিকা নেমে আসবে।
১৯৬৭ সালে, অর্থাৎ ইয়েটসের এই কবিতা লেখার প্রায় ৫০ বছর পর মার্কিন প্রাবন্ধিক জোয়ান ডিডিয়ন ১৯৬০-এর দশকের শেষ ভাগে সামাজিক ব্যবস্থা ভেঙে পড়ার ঘটনা নিয়ে লিখিত এক প্রবন্ধ সংকলনের নাম রাখেন স্লাউচিং টুয়ার্ডস বেথেলহেম। দেখা গেল এ বই প্রকাশের এক বছরের মাথায় মার্টিন লুথার কিং জুনিয়র ও রবার্ট কেনেডি আততায়ীর হাতে নির্মমভাবে খুন হন। একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন শহরের রাস্তায় রাস্তায় দাঙ্গা লেগে যায়, আর ফ্রান্সে ছাত্ররা বিদ্রোহ শুরু করে, যার পরিণতিতে এক বছরের মাথায় ফরাসি প্রেসিডেন্ট শার্ল দে গলের পতন হয়।
১৯৭০-এর দশকের মধ্যভাগে যুক্তরাষ্ট্র ভিয়েতনাম যুদ্ধে হেরে যায়। রেড ব্রিগেড, ওয়েদার আন্ডারগ্রাউন্ড, আইরিশ রিপাবলিকান আর্মি ও ইতালীয় নব্য ফ্যাসিস্ট সন্ত্রাসীরা ইউরোপ ও আমেরিকাজুড়ে সন্ত্রাসী হামলা চালাচ্ছিল। আর মার্কিন প্রেসিডেন্ট রিচার্ড নিক্সনের অভিশংসন পশ্চিমা গণতন্ত্রকে হাসির খোরাকে পরিণত করেছিল।
তারপর আরও ৫০ বছর কেটে গেছে। কিন্তু পৃথিবীতে আবারও গণতন্ত্রের ব্যর্থতার ভীতি জেঁকে বসেছে। আমরা কি আগের সেই সময়ের অস্তিত্ববাদী সন্দেহের যুগ থেকে শিক্ষা নিতে পারি না?
১৯২০ ও ৩০-এর দশক এবং ১৯৬০ ও ৭০-এর দশকের মতো আজও মানুষের মধ্যে যে রাজনৈতিক হতাশা বিরাজ করছে, তার সঙ্গে ব্যর্থ অর্থনৈতিক ব্যবস্থার যোগ রয়েছে। দুই যুদ্ধের মধ্যবর্তী সময়ে অসহনীয় অসমতা, মূল্যহ্রাস ও ব্যাপক বেকারত্বের কারণে মনে হচ্ছিল পুঁজিবাদের পতন হলো বলে। আর ১৯৬০ ও ১৯৭০-এর দশকে মনে হচ্ছিল পুঁজিবাদ এর বিপরীত কারণে ডুবতে বসেছে: মূল্যস্ফীতি ও ‘বড় সরকারের’ পুনর্বণ্টনের নীতির বিরুদ্ধে করদাতা ও ব্যসায়ীদের পাল্টা পদক্ষেপ।
সংকটের এই ধাঁচটা বারবার ফিরে এলেও এটা দাবি করা যাবে না যে প্রতি ৫০ বা ৬০ বছর পর পর প্রকৃতির কোনো বিধানের কারণে পুঁজিবাদ এমন পতনের কাছকাছি চলে আসে। কথা হচ্ছে, এ ব্যাপারটা বুঝতে হবে যে গণতান্ত্রিক পুঁজিবাদ একটি বিকাশমান ব্যবস্থা, ফলে সংকট সৃষ্টি হলে সে যেমন অর্থনৈতিক সম্পর্কের পুনর্বিন্যাস করে, তেমনি রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানকে বদলে দেয়।
তাই পুঁজিবাদের আজকের সংকটকে এভাবে দেখতে হবে: এটা আসলে ২০০৮ সালে পুঁজিবাদের একটি ধাঁচের পতনের প্রতিক্রিয়া। অতীত অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে আমাদের এখন এক দশক ধরে আত্ম-অনুসন্ধান করতে হবে, এর মধ্যে অস্থিতিশীলতাও সৃষ্টি হতে পারে। তবে এর ভিত্তিতে রাজনীতি ও অর্থনীতিতে নতুন বিন্যাস আসতে পারে।
১৯৭০-এর দশকের শুরুতে ব্যাপক মূল্যস্ফীতির পর নির্বাচন হলে যুক্তরাষ্ট্রে রোনাল্ড রিগ্যান ও যুক্তরাজ্যে মার্গারেট থ্যাচার নির্বাচিত হন। সংকট-উত্তরকালে যেসব বন্দোবস্ত হয়েছে, তাতে অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক চিন্তার পরিবর্তন ঘটেছে।
মহামন্দার পরিণতি হিসেবে অর্থনীতিতে কেইনসীয় বিপ্লব হয়েছে আর রাজনীতিতে হয়েছে নিউ ডিল। আবার ১৯৬০ ও ৭০-এর দশকে যে মূল্যস্ফীতিজনিত সংকট সৃষ্টি হয়, তার প্রতিক্রিয়া হিসেবে মিল্টন ফ্রায়েডম্যানের মুদ্রানীতিবাদী প্রতিবিপ্লব শুরু হয়, যেটা থ্যাচার ও রিগ্যানকে উৎসাহিত করেছিল।
ফলে এটা আশা করা খুবই যুক্তিসংগত, নিয়ন্ত্রণহীন আর্থিক খাতভিত্তিক পুঁজিবাদের পতন হলে চতুর্থ দফায় বড় ধরনের পরিবর্তন আসবে, সেটা যেমন রাজনৈতিক চিন্তায় তেমনি অর্থনৈতিক চিন্তায়। কিন্তু বৈশ্বিক পুঁজিবাদ যদি নতুন বিপ্লবী পর্যায়ে প্রবেশ করে, তাহলে এর বৈশিষ্ট্য কেমন হবে?
বৈশ্বিক পুঁজিবাদের প্রতিটি স্তরের বৈশিষ্ট্য হচ্ছে, প্রতিটি ক্ষেত্রেই রাজনীতি ও অর্থনীতির সীমানা পুনর্নির্ধারিত হচ্ছে। ১৯ শতকের ধ্রুপদি পুঁজিবাদে অর্থনীতি ও রাজনীতিকে দুটি আলাদা শাস্ত্র হিসেবে বিবেচনা করা হতো, যেখানে সরকার ও ব্যবসার মধ্যকার সম্পর্ক সীমাবদ্ধ ছিল শুধু সামরিক ব্যয়ের জন্য রাজস্ব সংগ্রহ ও শক্তিশালী কায়েমি স্বার্থবাদী গোষ্ঠীকে সুরক্ষার মধ্যে।
দ্বিতীয়ত, পুঁজিবাদের কেইনসীয় ভাষ্যে বাজারকে সন্দেহের চোখে দেখা হয়, যেখানে সরকারের হস্তক্ষেপকে সঠিক বলে

>নিয়ন্ত্রণহীন আর্থিক খাতভিত্তিক পুঁজিবাদের পতন হলে চতুর্থ দফায় বড় ধরনের পরিবর্তন আসবে, সেটা যেমন রাজনৈতিক চিন্তায় তেমনি অর্থনৈতিক চিন্তায়। কিন্তু বৈশ্বিক পুঁজিবাদ যদি নতুন বিপ্লবী পর্যায়ে প্রবেশ করে, তাহলে এর বৈশিষ্ট্য কেমন হবে?

ধরে নেওয়া হয়। তৃতীয় পর্যায়টি ছিল থ্যাচার ও রিগ্যান প্রভাবিত, যেখানে এই ধারণা একদম উল্টে দেওয়া হয়: সরকার ভুল ছিল, আর বাজার সব সময়ই ঠিক। চতুর্থ পর্যায়ের তাৎপর্য হতে পারে এ রকম: সরকার ও বাজার উভয়ই বিপর্যয়করভাবে ভুল হতে পারে।
এ রকম পূর্ণাঙ্গ পতনের প্রবণতা স্বীকার করে নেওয়া হলে মনে হতে পারে যে আমরা পক্ষাঘাতগ্রস্ত। বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতিতেও নিশ্চিতভাবে তার প্রতিফলন ঘটছে। কিন্তু এই ভুল প্রবণতা স্বীকার করে নেওয়া হলে আমরা আরও সমৃদ্ধ হতে পারি। কারণ এর মধ্যে রাজনীতি ও অর্থনীতির উন্নতির সম্ভাবনা থাকতে পারে।
পৃথিবী যদি বাজার ও সরকারের সামাজিক লক্ষ্য অর্জনের জন্য এতটাই জটিল ও অনিশ্চিত হয়, তাহলে ভারসাম্য আনার জন্য নতুন ব্যবস্থা প্রণয়ন করতে হবে, যাতে রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত অর্থনীতিকে ব্যাহত করতে পারে, একই সঙ্গে তার উল্টোটাও ঘটতে পারে। পৃথিবীর বৈশিষ্ট্য যদি হয় অনিশ্চয়তা ও দ্ব্যর্থকতা, তাহলে সংকট-পূর্ব কালের অর্থনৈতিক তত্ত্বের সংশোধন করতে হবে; যুক্তিপূর্ণ আশা, দক্ষ বাজারব্যবস্থা ও অর্থের নিরপেক্ষতার ক্ষেত্রে একই কথা প্রযোজ্য।
তা ছাড়া বাজার মৌলবাদের ভিত্তিতে যে আদর্শিক উপরিকাঠামো রচিত হয়েছে, রাজনীতিবিদদের তা পুনর্বিবেচনা করতে হবে। এর মধ্যে শুধু আর্থিক খাতের নিয়ন্ত্রণহীনতাই নয়, আরও আছে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের স্বাধীনতা, মুদ্রানীতি ও রাজস্বনীতির বিচ্ছিন্নতা। এই উপরিকাঠামোর অংশ হিসেবে লোকে মনে করে, প্রতিযোগিতামূলক বাজারব্যবস্থা আয়ের গ্রহণযোগ্য বণ্টন নিশ্চিত করতে পারে, নবধারা প্রবর্তন করতে পারে, প্রয়োজনীয় অবকাঠামো নির্মাণ করতে পারে এবং জনগণের প্রয়োজনীয় পণ্য সরবরাহ করতে পারে। কথা হচ্ছে, এগুলোও পুনর্বিবেচনা করতে হবে।
এটা ঠিক যে নতুন প্রযুক্তি ও বিলিয়ন বিলিয়ন শ্রমিকের বৈশ্বিক বাজারে প্রবেশের কারণে সংকট-পূর্ব সময়ের চেয়ে অনেক বেশি সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে। এতে সামনের দিনগুলো আরও সমৃদ্ধ হবে। তারপরও ‘দায়িত্বশীল রাজনীতিকেরা’ সব জায়গাতেই নাগরিকদের সতর্ক করে দিচ্ছেন যে প্রবৃদ্ধির স্থবিরতা ‘নতুন স্বাভাবিক’ ব্যাপারে পরিণত হয়েছে। ফলে এতে বিস্মিত হওয়ার কারণ নেই যে নতুন ভোটাররা খুবই ক্ষুব্ধ।
মানুষ বুঝতে পারে নেতাদের হাতে শক্তিশালী অর্থনৈতিক যন্ত্র আছে, যেটা তাঁদের জীবনযাত্রার মান উন্নত করতে পারে। টাকা ছেপে তো সরাসরি জনগণের হাতে দেওয়া যায়। অসমতা কমানোর জন্য ন্যূনতম মজুরি বাড়ানো যায়। সরকার একদম নিখরচায় অবকাঠামো ও নতুন উদ্ভাবনে বিনিয়োগ করতে পারে। ব্যাংকের নিয়মনীতির কারণে ঋণ দেওয়ার প্রবণতা না কমে উল্টো বাড়তে পারে।
কিন্তু এমন বিপ্লবী নীতি বাস্তবায়ন করা হলে ১৯৮০-র দশক থেকে যেসব তত্ত্ব অর্থনীতিকে প্রভাবিত করছে, সেগুলো খারিজ করতে হবে। আর তার ভিত্তিতে যে প্রাতিষ্ঠানিক বন্দোবস্ত করা হয়েছে, সেগুলোও বর্জন করতে হবে, যেমন ইউরোপের মাসট্রিখ্ট চুক্তি। কিছু ‘দায়িত্বশীল’ ব্যক্তি সংকট-পূর্ব অর্থনৈতিক গোঁড়ামিকে চ্যালেঞ্জ জানাতে ইচ্ছুক। আজকের বিপ্লবের জনপ্রিয় স্লোগান হচ্ছে, রাজনীতিকদের সংকট-পূর্ব কালের বিধি-পুস্তক ছিঁড়ে ফেলতে হবে, অর্থনৈতিক চিন্তায় বিপ্লব ঘটাতে হবে। দায়িত্বশীল রাজনৈতিক নেতারা যদি তা করতে অস্বীকৃতি জানান, তাহলে কিছু অভব্য পশুর দাপটে পৃথিবী বিনষ্ট হবে।
স্বত্ব: প্রজেক্ট সিন্ডিকেট, অনুবাদ: প্রতীক বর্ধন
আনাতোলে কালেৎস্কি: গ্র্যাভকেল ড্রাগোনমিক্সের প্রধান অর্থনীতিবিদ।