বিশ্বজুড়ে জলবায়ুর পরিবর্তন এবং এর প্রভাব নিয়ে আমাদের উদ্বেগের অন্ত নেই। জলবায়ুর এই পরিবর্তন আসলে মানুষেরই কর্মফল। আমাদের কর্মকাণ্ডের ফলে যে সমস্যার উদ্ভব হয়েছে, তা আমাদেরই সমাধান করতে হবে। জলবায়ু পরিবর্তনের ধ্বংসাত্মক প্রভাব এরই মধ্যে আমাদের অবকাঠামো, ব্যবসা-বাণিজ্য, কর্মসংস্থানসহ নানা ক্ষেত্রে পড়ছে। বদলে যাচ্ছে জীবনযাত্রা। প্রতিদিন নানা রকম প্রতিকূলতার মুখোমুখি হতে হচ্ছে।
উদ্যোক্তা থেকে কর্মী—প্রত্যেকেই কমবেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। কর্মজীবী নিম্নবিত্ত, স্বনির্ভর উদ্যোক্তা, মৌসুমি ও প্রান্তিক কর্মজীবী জনগোষ্ঠী—সামাজিক নিরাপত্তাবলয়ের বাইরে যাদের অবস্থান এবং আয়ের সুযোগ বা সম্ভাবনাও সীমিত—তারাই সবচেয়ে বেশি বিপদে। এই মানুষগুলোর সম্পদ, বিশেষ করে খাদ্য ও পানির উৎস পুরোপুরি জলবায়ুনির্ভর।
সমস্যা ও সম্ভাবনা
সত্যি বলতে কি, টেকসই অর্থনৈতিক উন্নয়নের কথা মাথায় রেখে বিশ্বজুড়ে যত শিল্পকারখানা গড়ে উঠেছে, পরিবেশ বা জলবায়ুর কথা ভাবলে সেগুলোর বেশির ভাগই বন্ধ করে দিতে হবে। বিশেষত, যেগুলো অনেক বেশি জ্বালানিনির্ভর এবং দূষণ সৃষ্টিকারী। অন্য শিল্পকারখানাগুলোও অবিলম্বে সংস্কার ও পরিবেশবান্ধব করা দরকার। নতুন কর্মক্ষেত্র সৃষ্টির সময়ও পরিবেশের কথা গুরুত্ব দিয়ে মাথায় রাখা চাই। আসলে কাজের সুযোগ সৃষ্টি এবং পরিবেশ সংরক্ষণ—এর কোনোটিকে আলাদা করে দেখার সুযোগ নেই। দুটোর সমন্বয় করেই সভ্যতাকে এগিয়ে নিতে হবে। শ্রমবাজারের বিষয়টি বিবেচনা করলেও পরিবেশগত সুরক্ষা অতি জরুরি।
উন্নত ও উন্নয়নশীল—দুই ধরনের অর্থনীতিতেই সবুজ অর্থনীতির ধারণাটি অন্তর্ভুক্ত করে নিতে হবে। প্রাকৃতিক ভারসাম্য এবং পরিবেশের ক্ষতিসাধন না করে অর্থনৈতিক উন্নয়নই সবুজ অর্থনীতি। সহজভাবে বলতে গেলে, সবুজ অর্থনীতি হলো সেই অর্থনীতি, যা মানুষের উন্নয়ন নিশ্চিত করবে কিন্তু একই সঙ্গে পরিবেশগত ঝুঁকি কমাবে এবং অভাব দূর করবে। উদ্যোক্তাদেরও ভাবতে হবে সবুজ কর্মক্ষেত্র বা গ্রিন জবস সৃষ্টির বিষয়ে। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলার পাশাপাশি দারিদ্র্য নিরসনের জন্যও বিষয়টি এখন সময়ের দাবি।
নতুন এই ধারণা নিয়ে এরই মধ্যে বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে কাজ শুরু হয়েছে। আন্তর্জাতিক নবায়নযোগ্য জ্বালানি সংস্থা বলছে, ২০১৫ সালে নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতে কর্মসংস্থান ছিল অন্তত ৮০ লাখ। আগের বছরগুলোর তুলনায় তা ৫ শতাংশ বেশি।
খাদ্য ও কৃষি সংস্থার তথ্য বলছে, টেকসই কৃষিব্যবস্থায় বিশ্বজুড়ে কর্মক্ষম জনগোষ্ঠীর শোভন কর্মসংস্থানের বড় রকম ঘাটতি রয়ে গেছে। তবে আশা করা যায়, ২০৫০ সালের মধ্যে অন্তত ২০ কোটি মানুষের পূর্ণাঙ্গ কাজের ক্ষেত্র সৃষ্টি হবে। তবে শুধু কর্মক্ষেত্র সৃষ্টি নয়, কাজের গুণগত মানও এখানে পরিমাপযোগ্য। পরিবেশ তো বটেই, আর্থসামাজিক প্রেক্ষাপট বিবেচনায় নিয়েও টেকসই অর্থনৈতিক উন্নয়ন ত্বরান্বিত করতে হবে। নইলে সবুজ অর্থনীতির ধারণাটি শেষ পর্যন্ত তাত্ত্বিক পর্যায়েই থেকে যাবে, বাস্তবের মুখ দেখবে না।
কীভাবে সম্ভব?
সবুজ অর্থনীতির সফল বাস্তবায়ন দেখতে চাইলে সবার আগে কার্যকর ও উপযুক্ত আইন প্রণয়ন করা জরুরি। মালিক ও শ্রমিক সংগঠনগুলোর সঙ্গে নিবিড় সমন্বয়ের মাধ্যমে প্রতিটি সরকারকেই এ দায়িত্ব নিতে হবে। ৫ জুন থেকে শুরু হওয়া আন্তর্জাতিক শ্রম সম্মেলনে এটি অন্যতম মুখ্য আলোচ্য বিষয়।
এই পরিবর্তনের পথে যে দুটো উপাদান বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ, তা হলো দক্ষতার উন্নয়ন ও সামাজিক সুরক্ষা। জলবায়ু পরিবর্তনের
বিষয়টি তো আর ভৌগোলিক সীমানা বিবেচনা করে হয় না। এর ভুক্তভোগী কমবেশি প্রত্যেকেই। সে জন্য সরকার এবং সংশ্লিষ্ট
নানা সংস্থা ও সংগঠনের বহুপক্ষীয় এবং সমন্বিত কর্মযোগই পারবে সামগ্রিক লক্ষ্য অর্জন সম্ভব করতে।
জলবায়ু পরিবর্তন উপেক্ষার ফলাফল
জলবায়ু পরিবর্তনকে উপেক্ষা করলে একসময় তা অর্থনীতিকে ক্ষতিগ্রস্ত করবেই। এক দশক আগে যুক্তরাজ্য বিশ্ব অর্থনীতির ওপর বৈশ্বিক উষ্ণতার প্রভাব নিয়ে করা পর্যালোচনায় এ বিষয়ে কঠোর সতর্কতা জারি করেছিল। জলবায়ু পরিবর্তনসংক্রান্ত আন্তসরকার প্যানেল বা আইপিসিসি তাদের এক পর্যালোচনায় দেখিয়েছিল, জলবায়ু পরিবর্তনের বিষয়টি আমলে না নেওয়ায় পৃথিবীর তাপমাত্রা ২ ডিগ্রি বেড়ে গেছে। এ ছাড়া অন্যান্য কয়েকটি গবেষণার ফলাফল এবং বিশ্ব শ্রম সংস্থার বিশ্ব সংযোগ স্থাপন মডেলের আলোকে আশঙ্কা প্রকাশ করা হয়েছে, বিশ্বজুড়ে উৎপাদনক্ষমতা ২০৩০ সাল নাগাদ ২ দশমিক ৪ শতাংশ এবং ২০৫০ সাল নাগাদ ৭ দশমিক ২ শতাংশ কমবে।
তবে আশার কথা হলো, আমরা জানি আমাদের কী করতে হবে এবং কেমন করে করতে হবে। সাম্প্রতিক প্যারিস চুক্তি (বর্তমান শতাব্দীতে বৈশ্বিক তাপমাত্রা বৃদ্ধির হার ২ ডিগ্রির নিচে রাখা) এবং ২০৩০ সালের উন্নয়নসূচি এরই মধ্যে পরিবেশবান্ধব টেকসই অর্থনীতির গন্তব্য স্থির করে দিয়েছে।
অবশ্য গন্তব্য জানা থাকা আর শুধু সেই পথে হেঁটে যাওয়াই সব সময় যথেষ্ট নয়। রাজনৈতিক সদিচ্ছাও থাকা চাই। সবুজ ভবিষ্যৎ এমনি এমনি হয়ে যাবে না। উপযুক্ত পরিকল্পনা করে সেভাবে এগোতে হবে। বিশ্ব পরিবেশ দিবসকে কেবল একটি দিবস হিসেবে না দেখে রাজনৈতিক সদিচ্ছার প্রতিফলন ঘটানো সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
এই পৃথিবীর ভবিষ্যৎ প্রজন্ম আর তাদের কর্মক্ষেত্রের স্বার্থে এই উদ্যোগে আমাদের সফল হতেই হবে।
ইংরেজি থেকে অনূদিত।
গাই রাইডার: মহাপরিচালক, আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা।