২ সেপ্টেম্বর সমকাল পত্রিকায় ‘অত্যাচারে অতিষ্ঠ পঁয়ত্রিশ সংখ্যালঘু পরিবার’ শিরোনামে প্রকাশিত একটি খবরের প্রতি দৃষ্টি আকর্ষণ করেন আমার এক সহকর্মী। শিরোনামটিতে নতুনত্ব কিছু নেই। এ ধরনের ঘটনা দুর্ভাগ্যক্রমে বিরল করে তুলতে পারিনি আমরা স্বাধীনতার ৫০ বছর পূর্ণ করা বঙ্গবন্ধুর বাংলাদেশে।
তারপরও খবরটি যখন পড়ে শেষ করলাম, কিছু সময়ের জন্য মন-মনন যেন নিঃসাড় হয়ে গেল। একই দিনে পরীমনিকে রিমান্ডে নেওয়ার অতি উৎসাহী তৎপরতার পরিপ্রেক্ষিতে উচ্চ আদালতের একটি মন্তব্য পড়ে বুকে কিছুটা হলেও আশার সঞ্চার হয়েছিল। উচ্চ আদালত পরীমনিকে বারবার রিমান্ডে নেওয়ার আবেদন মঞ্জুর করার ঘটনাকে নিন্দা জানিয়ে ‘সভ্য সমাজে এভাবে চলতে পারে না’ বলে মত দেন। এ মন্তব্য শতভাগ সমর্থনযোগ্য। সঙ্গে সঙ্গে মনের ভেতরে অত্যন্ত ক্ষুব্ধ এক প্রশ্ন এসে ধাক্কা দিল। অন্যায্যভাবে ও অবিবেচকের মতো উপাদানহীন আবেদনে রিমান্ড মঞ্জুর করা অবশ্যই চলতে পারে না, কিন্তু ক্ষমতার দাপট দেখিয়ে দীর্ঘদিন ধরে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের নারী-পুরুষের ওপর নির্বিচার অত্যাচার-নির্যাতন চালিয়ে আসাটা সভ্য সমাজে চলতে পারে?
উচ্চ আদালতের উদ্বেগের সঙ্গে কণ্ঠ মিলিয়ে আবারও শক্তভাবে জিজ্ঞাসা করতে চাই, সভ্য সমাজে কি দিনের পর দিন একটি দুর্বল জনগোষ্ঠীর ওপর দুর্বৃত্তের এমন আচরণ চলতেই থাকতে পারে? তারপরও সেই সমাজকে আমরা সভ্য বলতে পারি?
সমকাল–এ খবরটি বিবৃত হয়েছে এভাবে, ঝিনাইদহের কালীগঞ্জ উপজেলার আলাইপুর গ্রামে ৩৫টি সংখ্যালঘু পরিবারে প্রায় দেড় শ মানুষ বাস করে। সুন্দরপুর-দুর্গাপুর ইউনিয়ন আওয়ামী স্বেচ্ছাসেবক লীগের সভাপতি পদের দাবিদার পার্শ্ববর্তী আলুকদিয়া গ্রামের মিজানুর রহমান তাঁর অবস্থানের সুযোগ নিয়ে সংখ্যালঘু পরিবারের মানুষকে অতিষ্ঠ করে তুলেছেন। সমকাল–এ প্রকাশিত এই ব্যক্তি ‘বিভিন্ন সময়ে তাঁদের পাড়ায় প্রবেশ করে নারীদের তাঁর সঙ্গে সময় কাটাতে বাধ্য করেন। অনেক সময় নারীদের ভয় দেখিয়েও ব্যবহার করেন।’ কেউ কোনো প্রতিবাদ করলেই মারধর করেন। ওই সংবাদে ঘটনার যে বিস্তারিত বিবরণ রয়েছে, তা আরও ভয়াবহ। সমকাল পত্রিকার খবর অনুযায়ী গ্রামবাসী অভিযোগ করেছেন, মিজানুরের ভয়ে তাঁরা কোনো কথা বলতে পারেন না। তাঁর ভয়ে কোনো কিছু স্বীকারও করতে পারেন না। মিজানুরের বিরুদ্ধে কিছু বললে পুরুষদের তুলে নিয়ে যাওয়ার, এমনকি মেরে ফেলার হুমকি দেওয়া হয়।
ঝিনাইদহ জেলা হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদ সরেজমিন পরিদর্শন করে যে প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে, সে অনুযায়ী মিজানুর রহমান তাঁর দলবল ও একটি চক্র নিয়ে এলাকায় প্রতিনিয়ত মেয়েদের উত্ত্যক্ত করে থাকেন। এ কারণে তাঁরা এলেই গ্রামের নারীরা লুকিয়ে পড়তে বাধ্য হন বা পালিয়ে বেড়ান। এ ছাড়া চক্রটি নানা অজুহাতে ওই গ্রামে ঢুকে তাস খেলা, নেশা করার কারণে এলাকাবাসী প্রচণ্ড ভীত ও সন্ত্রস্ত অবস্থায় থাকে। প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, ওই ব্যক্তি একটি বিশেষ বাড়িতে প্রায় প্রতিদিনই যান এবং অবস্থান করেন। উল্লেখ্য, ওই বাড়ির নারী ও তাঁর স্বামী কোনো অবস্থাতেই মুখ খোলেননি। খবরে আরও প্রকাশ, ওই নেতার কবল থেকে রেহাই পেতে গ্রামবাসী গতকাল মঙ্গলবার ঝিনাইদহ জেলা প্রশাসক ও ইউএনও বরাবর লিখিত অভিযোগ করেছেন।
যেমন ধারণা করা যায়, অভিযুক্ত মিজানুর রহমান দাবি করেছেন, তাঁকে উদ্দেশ্যমূলকভাবে ফাঁসানোর জন্য তাঁর রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ এসব মিথ্যা অভিযোগ এনেছে। অন্যদিকে সংবাদে প্রকাশ, স্থানীয় ইউপি সদস্য মিজানুর রহমানের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে দাসপাড়ায় গিয়ে ঘটনার সত্যতা পাওয়া গেছে। হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদের তদন্তেও একই তথ্য দেওয়া হয়েছে। খবরে এ-ও প্রকাশ, ঝিনাইদহ জেলা স্বেচ্ছাসেবক লীগের নেতারা এলাকা পরিদর্শন করে ঘটনার সত্যতা প্রমাণিত হওয়ায় তাৎক্ষণিকভাবে কালীগঞ্জ উপজেলা স্বেচ্ছাসেবক লীগের কমিটি বাতিল করেন। তাঁরা অভিযুক্ত ব্যক্তিকে ‘স্বঘোষিত’ সভাপতি হিসেবে উল্লেখ করে তাঁর বিচারের দাবি জানান। ২ সেপ্টেম্বর সমকাল পত্রিকা সংবাদটি প্রকাশ করে। তারপর এক সপ্তাহ অতিবাহিত হয়ে গেল। ইতিমধ্যে স্থানীয় কিছু সংগঠন তাদের নিজস্ব তদন্তের ভিত্তিতে অভিযুক্ত ব্যক্তির বিচার ও শাস্তিও দাবি করেছে। কিন্তু এখন পর্যন্ত শুধু স্বেচ্ছাসেবক লীগের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক অস্বীকার করা আর কালীগঞ্জ স্বেচ্ছাসেবক লীগ অবলুপ্ত ঘোষণা করা ব্যতীত আর কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি অভিযুক্ত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে। তাঁকে গ্রেপ্তার করার তৎপরতার কোনো সংবাদ আমাদের গোচরে আসেনি এখন পর্যন্ত।
ভুক্তভোগী সম্প্রদায়ের সঙ্গে সংহতি প্রকাশ করতে এবং বিচারের প্রক্রিয়া যাতে ত্বরান্বিত হয়, সেই দাবি নিয়ে ঢাকা থেকে আমাদের কয়েকজনের সরেজমিন পরিদর্শন করা, ভুক্তভোগীদের কাছ থেকে তথ্য সংগ্রহ করা এবং প্রশাসনের সঙ্গে মতবিনিময়ের পরিকল্পনা ও প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছিল। ব্যক্তিগত কারণে সেটা আমাদের বাতিল করতে হয়েছে। সে জন্য দুঃখ প্রকাশ করছি। তবে আমরা ওই অঞ্চলের প্রশাসন এবং আইনি পদক্ষেপ নেওয়ার দায়িত্বে যাঁরা আছেন, তাঁদের কাছে উচ্চ আদালতের উদ্বেগের সঙ্গে কণ্ঠ মিলিয়ে আবারও শক্তভাবে জিজ্ঞাসা করতে চাই, সভ্য সমাজে কি দিনের পর দিন একটি দুর্বল জনগোষ্ঠীর ওপর দুর্বৃত্তের এমন আচরণ চলতেই থাকতে পারে? তারপরও সেই সমাজকে আমরা সভ্য বলতে পারি?
● সুলতানা কামাল আইনজীবী ও মানবাধিকারকর্মী