সরকারকে খুঁজছি

হজরত আলী তঁার শিশুকন্যাকে নিয়ে চলন্ত ট্রেনের সামনে ঝাঁপিয়ে পড়ে আত্মহত্যা করেছেন। হজরত আলীর শিশুকন্যাটি নির্যাতনের শিকার হয়েছিল। কন্যার নির্যাতনের জন্য দ্বারে দ্বারে ঘুরেছেন। বিচার পাননি। শেষ পর্যন্ত আত্মহত্যা।

ঘটনার আরও বিস্তারিত রিপোর্ট ছিল কিছু কিছু সংবাদমাধ্যমে—প্রিন্ট মিডিয়ায় ও টেলিভিশনের খবরে। বিস্তারিত পড়তে বা শুনতে আর ইচ্ছা করেনি। এত বেদনা আর অসহায়ত্বের কথা বেশি জানা বা শোনা খুবই কষ্টদায়ক। এটা শুধু হতভাগ্য পিতা হজরত আলীর বেদনা আর অসহায়ত্ব নয়; নির্মমতার শিকার নাগরিকের বিচার না পাওয়াটা গোটা দেশ, সমাজ ও জাতির অসহায়ত্বের প্রতিফলন।

দেশটা কত নির্মম, বর্বর আর অসহায় হয়ে পড়ছে, তারই বহিঃপ্রকাশ। বলা বাহুল্য আত্মহত্যার ব্যাপারটা সংবাদমাধ্যমে আসার পর দু-তিন দিন পুলিশের কিছুটা লম্ফঝম্ফ হয়েছে। দু-একজন বোধ হয় গ্রেপ্তারও হয়েছে। এবং ব্যাপারটার ইতি ঘটবে।

মেয়েটির মা আর হজরত আলীর স্ত্রীর কথা আমরা ভুলে যাব। সরকার তো তঁাকে আমলেই নেয়নি। তঁার প্রতি আমাদের কোনো দায়দায়িত্ব নেই—সরকার এটাই ভাবছে আর ভাববে। সরকারের ক্ষমতায় থাকা বা না-থাকার সঙ্গে হজরত আলীর কন্যার নির্যাতন বা হতাশায়-দুঃখে তার আত্মহত্যাটা কোনোক্রমেই জড়িত নয়। তাই সরকারের এ নিয়ে মাথাব্যথা কেন হবে?

অবশ্য ঘটনাটির সঙ্গে কোনোমতে বিএনপি-জামায়াত-জঙ্গিদের জড়ানো গেলে সরকারকে নিশ্চয় খুঁজে পাওয়া যেত।

২.

দিন গড়িয়ে সপ্তাহ। সপ্তাহ গড়িয়ে মাস। এ পর্যায়ে মাস গড়িয়ে বছর এখনো হয়নি। অর্থাৎ, সড়ক দুর্ঘটনায় মৃত্যুর মিছিলের খবর প্রথম আলোতে ধারাবাহিক এবং গুরুত্বের সঙ্গে প্রকাশের সময় এখনো বছরে গড়ায়নি। মৃতের সংখ্যা দুই থেকে দশ, দশ থেকে শতক, শতক থেকে হাজারের পথে। মৃত্যুর মিছিল দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতর হচ্ছে।

বহু বছর আগে দেখেছি তাই স্বাভাবিকভাবেই মনে করতে পারছি না যে নূরলদীনের সারাজীবন নাটকটিতে আসাদুজ্জামান নূর বা আলী যাকেরের দরাজ কণ্ঠে—‘বাহে জাগো! মানুষ মরে’—এমন কোনো সংলাপ ছিল কি না। মানুষ মরছে। দিনের পর দিন, সপ্তাহের পর সপ্তাহ, মাসের পর মাস, বছরের পর বছর। রাস্তায় হাঁটতে গিয়ে, মোটরসাইকেলে চড়তে চলতে, গাড়িতে-বাসে-ট্রাকে-নৌকায়-লঞ্চে-ট্রলারে। বলতে গেলে যাতায়াত মানেই মৃত্যুর ঝুঁকি নেওয়া। অকালমৃত্যু।

বাসের দশজন-বিশজন যাত্রী দুর্ঘটনায় মারা গেলে স্থানীয় ডিসি ঘোষণা দেন—মৃত যাত্রীপ্রতি সৎকারের জন্য দশ হাজার বা বিশ হাজার টাকা দেওয়া হবে। সরকার আছে ওই পর্যন্তই।

নায়ক ইলিয়াস কাঞ্চনের আক্ষেপ শুনলাম রেডিওতে, সম্ভবত ২০ বছর ধরে নিরাপদ সড়কের আন্দোলন করছেন। চেষ্টা করেছেন অনেক। কিন্তু তাঁর কথায়ই—বিশেষ কোনো পরিবর্তন হয়নি।

বাহে! মানুষ মরে সরকার কই?

৩.

হজরত আলীর ঘটনার অন্য পিঠ। যেখানে স্বার্থ, সেখানে সরকার আছে। ন্যায়-অন্যায়, আইনকানুন, অপরাধ-বিচার—কোনো কিছুরই তোয়াক্কা না করার জন্য সরকার আছে। আছে, কারণ সরকারের স্বার্থটাই মুখ্য। ন্যায়-অন্যায় তুচ্ছ।

হেফাজতের ৬৮ মামলার তদন্ত চার বছর ধরে থেমে আছে। একটা খবরের এই শিরোনাম প্রথম আলোর ৪ মের প্রথম পাতায়। ঢাকায় শাপলা চত্বর ঘিরে ২০১৩ সালের ৫ মে হেফাজতের তাণ্ডব-সমাবেশের পর, প্রথম আলো বলছে মোট ৮৩টি মামলা হয়। এককথায় ফলাফল এখন পর্যন্ত শূন্য। ৫ মের সমাবেশ থেকে চালানো হেফাজতি তাণ্ডবলীলায় ভীষণভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল গোটা মতিঝিল এলাকা। বায়তুল মোকাররমের আশপাশের বইয়ের দোকানে আগুন দেওয়ার ফলে পবিত্র কোরআনও পুড়ে গিয়েছিল—এই অভিযোগ ছিল সরকারি নেতাদের। মানুষ মারা গিয়েছিল।

বিচার হয়ে কারও শাস্তি হয়নি, হবেও না। হেফাজত এখন সরকারের বন্ধু। যাতে বিচার না হয়, বন্ধুদের শাস্তি না হয়, সে ব্যাপারে সরকার ভীষণ সক্রিয়। অবশ্য হেফাজত বেশ চালাক। ৫ মের সমাবেশের সময় তার বন্ধু ছিল বিএনপি। আর এখন হেফাজত বন্ধুত্ব করেছে আওয়ামী লীগের সঙ্গে। মসনদের স্বপ্নে উভয়ই মশগুল।

৪.

অবশ্য সরকার আছে। যেখানে আছে, সূচক সেখানেই নিম্নগামী। আন্তর্জাতিক কোনো সংস্থাই আজকাল আমাদের ভালো না। ভাবছি এটা আন্তর্জাতিকঅলাদের সঙ্গে বিএনপি-জামায়াতের সখ্য ও ষড়যন্ত্রের ফল কি না।

লেটেস্ট হলো প্রেস ফ্রিডমের সূচকে আমাদের ১৪৬তম অবস্থান, ১৮০টি দেশের মধ্যে। অর্থাৎ পৃথিবীর কুল্লে ৩৩টা দেশের অবস্থান আমাদের চেয়ে খারাপ। ১৪৫টা দেশ শ্রেয়তর। সরকার বলে ৩০টির বেশি টিভি চ্যানেল, শত শত হাজার হাজার পত্রিকা, ম্যাগাজিন, ইত্যাদি ইত্যাদি।

অল্প কয়েক দিন আগে প্রধান বিচারপতি যথার্থই বলেছিলেন যে দেশে আইনের শাসন থাকলে প্রধান বিচারপতিকে এত কথা বলতে হতো না। আদালত থাকলেই বিচারব্যবস্থা স্বাধীন হয় না। আইন থাকলেই আইনের শাসন হয় না। সংবাদপত্র আর টিভি চ্যানেল থাকলেই তা সংখ্যায় যত বেশি হোক না কেন, সংবাদমাধ্যম স্বাধীন হয় না। সরকার থাকলেই মানুষের ভালো হয় না। প্রতি সপ্তাহে শত শত কোটি টাকার পরিকল্পনা পাস করলেই দেশ উন্নত হবে না।

ব্যক্তিগত একটি ঘটনা দিয়ে শেষ করি। চুল কাটতে আমরা সবাই সম্ভবত একই সেলুনে যাই বছরের পর বছর। আমারও পাড়ার একই সেলুন, প্রায় দেড় যুগ ধরে। চুল কাটার সেলুন, সবাই জানে রাজনীতির আসল চর্চাকেন্দ্র। এত বছরে ওখানকার কর্মীদের সঙ্গে দহরম-মহরম।

দুই-তিন মাস আগের ঘটনা। সময়টা তারও কিছু আগে হতে পারে। দিনকাল সঠিক মনে নেই। ওই দিনের দুই-তিন দিন আগে যুক্তরাষ্ট্রের এক সহকারী পররাষ্ট্রমন্ত্রী বাংলাদেশ সফরে এসেছিলেন। বেগম খালেদা জিয়ার সঙ্গে তাঁর মিটিং হয়েছিল মার্কিন দূতাবাসে। সে খবর ছিল সংবাদমাধ্যমে।

চুল কাটতে কাটতে আমাকে কর্মীর প্রশ্ন—স্যার, বুঝছেন তো দূতাবাসে কেন মিটিং? ব্যাপারটা নিয়ে ভাবিনি। কী উত্তর দেব ভাবছিলাম। আমার উত্তরের অপেক্ষা না করেই সে জানাল, ‘বুঝছেন না স্যার, দূতাবাসের ভিতরে মিটিং করলে সরকার কিছু শুনতে পারবে না!’

নাগরিকেরা এখন সব দেখে, সব বোঝে। না জানলেও আন্দাজ করতে পারে। বোঝে, সরকার কোথায় নেই আর কেন নেই। জানে, যেখানে মধু, সরকার শুধু সেখানেই।

. শাহদীন মালিক: অ্যাডভোকেট, সুপ্রিম কোর্ট, আইনের শিক্ষক, ইউনিভার্সিটি অব এশিয়া প্যাসিফিক