হাফিজুরের মৃত্যু এবং এলএসডির বাজার

হাফিজুর রহমানের মৃত্যু অভিভাবক মহলে বিশ্ববিদ্যালয়গামী সন্তানদের নিয়ে নতুন দুশ্চিন্তার জন্ম দিয়েছে।

সাইকেডেলিক (মনোরঞ্জক) ড্রাগ নিয়ে হার্ভার্ড মনোবিজ্ঞানী টিমোথি লিয়ারির  গবেষণা ও জানাশোনা প্রবাদসম। তাঁর কাছে এলএসডি মনোচিকিৎসার ওষুধ। এই সাইকেডেলিক ড্রাগই আবার নেশাগ্রস্তের কাছে নেশার দামি উপকরণ। তাই তো তার অন্য নাম ‘এসকেপ ড্রাগ’। ব্যবহারকারীকে এটি অন্য কোনো অপরিচিত জগতে নিয়ে যায়। মস্তিষ্কের স্নায়ুকোষের পরতে পরতে তৈরি করে অনির্বচনীয় সক্রিয়তা।

লিয়ারির দেশে এলএসডি-নির্ভরতা বাড়ার অনেক কারণ। যুদ্ধফেরত সৈনিকদের বড় অংশই ঘরে ফিরে আক্রান্ত হয় ট্রমা বা মানসিক অভিঘাতে। যুদ্ধ, হত্যা, রক্তপাতের বিভীষিকা তাঁদের তাড়িয়ে বেড়ায়। আমেরিকার তখন পোস্ট-ট্রমাটিক স্ট্রেস ডিজঅর্ডার (পিটিএসডি) রোগের সূতিকাগার। এই রোগে মস্তিষ্কের স্নায়ুকোষগুলো মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ফলে বাড়ে আরও অসংখ্য রোগ। যেমন আত্মহত্যাপ্রবণতা, নেশাগ্রস্ততা ও নেশাদ্রব্যের ব্যবহার। বাড়ে স্মৃতি ও মতিভ্রম। স্মরণশক্তি হারানো, ভীতিগ্রস্ততা, সিজোফ্রেনিয়া, বিষণ্নতা, উন্মত্ততা ইত্যাদিও বাড়ে। কমে সামাজিক সংযোগদক্ষতা। এলএসডি ব্যবহার করে স্নায়ুকোষগুলোকে উজ্জীবিত করার চিকিৎসা চলে।

ষাট ও সত্তরের দশক ছিল সাইকেডেলিক ড্রাগ অপব্যবহার ও আসক্তির রমরমা সময়। পুঁজিবাদের লাগামছাড়া বিকাশ, সমাজতন্ত্রী ও পুঁজিবাদী বিশ্বের স্নায়ুযুদ্ধ, ভিয়েতনামে আমেরিকার অন্যায় যুদ্ধ, পরিবারে ভাঙন ইত্যাদি সমস্যা তরুণ-যুবাদের বিক্ষুব্ধ ও অবাধ্য করে তুলেছিল। ধর্মবিশ্বাস, মূল্যবোধ, নিয়ম-নীতি-নৈতিকতা—সবকিছুকেই চ্যালেঞ্জ করছিল ষাট-সত্তরের দশকের যুবসমাজ। রক-পপ-র‍্যাপ-র‍্যাগে সংগীতজগতের অনুষঙ্গ হয়ে পড়েছিল এলএসডি ও মারিজুয়ানা (গাঁজা)। বাদ্যবাজনার গভীরে ঢুকে রঙের ঝলক-ঝিলিক দেখা শ্রোতাদের নেশা। গায়কের নেশা জড়তা ও অন্যমনস্কতা কাটিয়ে উদ্দাম ও সপ্রতিভ হয়ে ওঠার। অধ্যাত্ম-সাধনাবাদী এবং সাধু-সন্তদের নির্বাণ ও অতিপ্রাকৃত শক্তিকে দেখার নেশা। ফলে এলএসডির ব্যবহার শুধুই চিকিৎসাজগতে থাকল না, অপব্যবহার ঘটতে থাকল সংগীত-চলচ্চিত্র-চিত্রকলাসহ সৃষ্টিশীল জগতের মানুষদের মধ্যেও।

আশির দশক থেকে এলএসডির বিকল্প নানা রকম সস্তা নেশাদ্রব্য বাজার দখলে নেয়। ফলে কয়েক দশক এলএসডি বাজারে ছিল না। করোনা বিশ্বজুড়ে নতুন অভিঘাত তৈরি করেছে। পৃথিবীজুড়ে মানসিক স্বাস্থ্য বিপর্যস্ত। এই সময়ে ব্যবসা-বাণিজ্যের পত্রিকা ব্লুমবার্গ, ফোর্বসসহ বেশ কিছু মাধ্যমে একটি কৌতূহলোদ্দীপক সংবাদ ছেপেছে। ওয়াল স্ট্রিটে বিভিন্ন বহুজাতিক ফার্মাসিউটিক্যাল কোম্পানির সাইকেডেলিক ড্রাগ উৎপাদক ইউনিটগুলোর শেয়ারদর আকাশচুম্বী হয়ে চলছে। ফার্মিওয়েব ডটকম ফার্মাসিউটিক্যাল কোম্পানিগুলোর হালনাগাদ তথ্য ছাপে। বুলেটিনটির শিরোনাম ‘২০২১ সালে সাইকেডেলিক ড্রাগ উৎপাদক কোম্পানিগুলোর অভাবিত বাণিজ্যবিস্তার চলছে’। কোম্পানিগুলোর মধ্যে রয়েছে দ্য এম্মে কোম্পানি, ক্লারিসানা, অ্যাস্ট্রাজেনেকা, এফ হফম্যান-লা রোশ লিমিটেড, ড. রেড্ডিজ ল্যাবরেটরিজ।

নব্বইয়ের দশকেই লিয়ারি ভবিষ্যদ্বাণী করেছিলেন যে অচিরেই মার্কিন মুলুকে এলএসডি ব্যবহার ৫০ ভাগ বেড়ে যাবে। এখন বিশ্বায়নের কাল। শ্যাম চাচার দেশে বাড়লে সব চাচার দেশেই বাড়বে। গত বছরের জুলাইতেই আমেরিকান সায়েন্টিফিক নিউজলেটার ইউনিভার্সিটি অব সিনসিনাটির একজন পিএইচডি গবেষকের উপাত্তমূলক বক্তব্য উদ্ধৃত করে জানায়, ২০২০ সাল নাগাদ এলএসডির ব্যবহার অন্য যেকোনো সময়ের তুলনায় অন্তত তিন গুণ বেশি হওয়ার আশঙ্কা। অ্যান্ড্রু ইয়োকি নামের সেই গবেষক ১ লাখ ৬৮ হাজার জনের ‘ড্রাগ ব্যবহার’-এর জরিপ পর্যালোচনা করে জানান যে আগের তিন বছরে এলএসডি ব্যবহার পূর্ববর্তী সময়ের তুলনায় ৫৬ শতাংশ বেড়েছে। ডেভিড নাট লন্ডনের ইম্পিরিয়াল কলেজের স্নায়ু-মনোরোগ চিকিৎসার ওষুধ গবেষক। গত বছরই তাঁর বক্তব্য ছিল, পরীক্ষামূলকভাবে মূল মাত্রার ১০ ভাগের ১ ভাগ এলএসডি গ্রহণ করা নিরাপদ—এমন ভাবনাধারীর সংখ্যা জ্যামিতিক হারে বেড়েছে। এরাই একপর্যায়ে পূর্ণমাত্রা গ্রহণের অনুভূতি পেতে কৌতূহলী হবে। বাড়বে আসক্তের সংখ্যা।


ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র হাফিজুরের লাশ দীর্ঘ সময় ঢাকা মেডিকেল কলেজের মর্গে পড়েছিল। এখন সিসি ক্যামেরার ফুটেজও প্রকাশিত হচ্ছে। লাশ উদ্ধারের পর বন্ধুরা হত্যা ভেবে প্রতিবাদ সভা এবং মানববন্ধনও করেছিলেন। এখন জানা গেল, ডাব বিক্রেতার কাছ থেকে দা নিয়ে হাফিজ নিজেই নিজের গলায় কোপ দিয়েছিলেন। প্রশ্ন হচ্ছে, ডাব বিক্রেতাও কাউকে ঘটনাটি জানালেন না কেন? কোনো অদৃশ্য ভয়ে? জননিস্পৃহতা ও সামাজিক বিচ্ছিন্নতা এতটাই বেড়েছে? করোনাকালে ছাত্রহীন বিশ্ববিদ্যালয়ের সুনসান পরিবেশে আরও অপরাধও ঘটছে না, তারই-বা নিশ্চয়তা কী?

হাফিজুরের মৃত্যুরহস্য উন্মোচিত হয়েছে বা হচ্ছে। ভয়ংকর ড্রাগ সেবনে ও বিক্রিতে জড়িত বন্ধুরা তাঁকে এলএসডি সেবন করিয়েছেন। সেই সূত্রে ডিবি পুলিশ এলএসডি বাণিজ্য চক্রের সন্ধানে নেমেছে। সাফল্যও মিলছে। ধারণাতীত পরিমাণ এলএসডিও উদ্ধার হয়েছে। ধরা পড়েছেন আটজন। তাঁরা বিভিন্ন পাবলিক-প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র। আরও হয়তো ধরা পড়বে। পুলিশের সক্রিয়তা অবশ্যই ধন্যবাদার্হ। বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রদের জড়িত থাকার ধরনধারণে জনপরিসরে আতঙ্ক তৈরি হয়েছে। অভিভাবক মহলেও বিশ্ববিদ্যালয়গামী সন্তানদের বিষয়ে নতুন দুশ্চিন্তা বেড়েছে। কিন্তু বিষয়টিকে দেশীয় সমস্যা ভাবলে ভুল করা হবে।

টেলিভিশন চ্যানেলগুলোতে দেখতে পেলাম সবশেষ ধরা পড়া পাঁচজনকে। তাঁদের মধ্যে ক্যামেরার ফোকাসে থাকা দুজন নির্বিকার। একজন বেশ হাসিখুশি। সেটি নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নানা রকম তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া চলছে। কেউ চাইছে তাদের সমূল উৎপাটন। ক্রসফায়ার, পিতামাতাকে দোষারোপ। কোনো কিছুরই কমতি নেই। একদল মনে করছে তাঁদের কিছুই হবে না। ঘটনা অচিরেই চাপা পড়ে যাবে। তাদের সন্দেহ, পেছনে ক্ষমতাবানরা রয়েছেন। একদল বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রদের নির্বিশেষে সন্দেহ করে চলেছে। অন্য দল বখে যাওয়া ধনীর দুলালদের পিণ্ডি চটকাচ্ছে। গডফাদার রাজনীতিকদের সন্দেহ করছে কেউ কেউ। অবিশ্বাস চরমে।

বলতেই হয়, একটি বিশ্বাসহীনতার কালে বাস করছি আমরা। টেলিভিশন ও পত্রপত্রিকায় এলএসডি নামক ড্রাগটি নিয়ে বেশ কথাবার্তা হচ্ছে। বাংলাদেশের আমজনতার বড় অংশই সম্ভবত ড্রাগটি সম্পর্কে তেমন কিছু জানত না। এখন জানছে।

ডিবি পুলিশ, সংবাদমাধ্যম ও ইউটিউবভিত্তিক নাগরিক সংবাদমাধ্যমগুলো বিষয়টি নিয়ে বেশ তৎপর। তবে চলতি হাওয়ায় ঘটনাটির উপস্থাপনার ধরনধারণে উল্লসিত হওয়ার কিছু নেই। বরং শঙ্কিতই হতে হয়। কারণ, অতি তৎপরতা ও অতি উৎসাহ সব সময় উপকারী হয় না। জনমনে ‘স্টিগমা’ বা ঘৃণা-বিদ্বেষজনিত ভীতিবোধ তৈরি হলে সমস্যা বাড়ে, কমে না। ভুল জানাজানি আরও বেশি ক্ষতিকর। ক্যামেরার ফোকাসে থাকা একজন ইংরেজিতে কিছু বলছিলেন। সব টিভি সংবাদই তরুণটির পুরো বাক্যটি না শুনিয়ে শুধু প্রথম দিককার কয়েকটি শব্দ শুনিয়েছে। সম্পাদনার কারণে ছেলেটির বক্তব্য আমাদের শোনা হলো না। কিন্তু তাঁর কথায় ‘মিসকনসেপশন’ বা ‘ভুল ধারণা’ শব্দটি স্পষ্ট শোনা গেল।

সম্ভবত ছেলেটি জানাচ্ছিলেন যে এলএসডি বিষয়ে জনমনে ‘ভুল ধারণা’ রয়েছে। কী ভুল ধারণা, আর কোন জানাটিকে তিনি সঠিক জানা মনে করেন—বিষয়টি অবগত হওয়া গেলে আমাদের উপকারই হতো, ক্ষতি হতো না। কারণ, বিভিন্ন তথ্যমাধ্যম উপস্থাপনার চমৎকারিত্ব দিয়ে হয় স্টিগমা তৈরি করছে, নয় অযাচিত ভুল ধারণা তৈরি করছে। ছেলেটি কি এলএসডি সম্পর্কে প্রশংসামূলক কিছু বলতে চেয়েছিলেন? পুলিশ বা সংবাদমাধ্যম কি ভেবেছিল পুরো বাক্য প্রকাশ পেলে অনেকেই এলএসডি সেবনে উৎসাহী বা কৌতূহলী হয়ে পড়বে? নইলে সম্পাদনাটি কেন? অনলাইনে অসংখ্য সাইট আছে, যেগুলোতে এলএসডির অশেষ গুণাগুণ বর্ণনা করা আছে। ছেলেটি কি সেই সব সাইটের তথ্য দ্বারা প্রভাবিত? তিনি কি সেই সব তথ্যে বিশ্বাস করেন? বাংলাদেশের যুবসমাজের হাতে হাতে ইন্টারনেট। সাইটগুলো তাদের কাছেও উন্মুক্ত। তারাও কি এই সব অনির্ভরযোগ্য তথ্যে বিশ্বাসী হয়ে উঠবে না? তারা ব্যবসাও চালাচ্ছিল অনলাইনে।

বিশ্বময় মানসিক স্বাস্থ্য বিপর্যস্ত ভোক্তাদের একাংশ নেশার খরচ জোগাতে গিয়ে নিজেরাই ব্যবসায় জড়াবে। এটিই নেশাজগতের চিরাচরিত রীতি। বাংলাদেশ এই কালোবাজারের অন্যতম সংযোগকেন্দ্র হয়ে ওঠার ঝুঁকিতে রয়েছে। চীন কাঁচামালের অন্যতম বড় সরবরাহকারী। মিয়ানমারে বিদ্রোহী ও জাতিভিত্তিক স্বাধীনতাকামী গেরিলা গোষ্ঠীগুলো অস্ত্র কেনার অর্থের প্রয়োজনে এলএসডি কালোবাজারিতে জড়িত হতে পারে। আছে রোহিঙ্গাদের অংশগ্রহণের ঝুঁকি। এলএসডি নির্মূলে এ মুহূর্তে বাংলাদেশের উচিত আন্তর্জাতিক ও আন্তদেশীয় সমন্বিত কর্মসূচি নেওয়া। ধরা পড়া তরুণদের বিষয়ে ঘৃণা ও আতঙ্কের ডামাডোল বরং আড়ালে থাকা বড় ও ভয়ংকর বাণিজ্য চক্রকেই সুসংহত করে তুলতে পারে।

হেলাল মহিউদ্দীন অধ্যাপক, রাজনীতিবিজ্ঞান ও সমাজবিজ্ঞান, নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়