‘জামায়াতে ইসলামী—খরগোশ নয়, কচ্ছপ’

২০০৯ সালের ৭ থেকে ৯ ডিসেম্বর ঢাকায় জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়, যেটিকে দলটি বলে মজলিশে শুরা। মজলিশের আগে জামায়াতের অ্যাসিস্ট্যান্ট সেক্রেটারি জেনারেল ব্যারিস্টার আবদুর রাজ্জাক ও মোহাম্মদ কামারুজ্জামান ঢাকার মার্কিন দূতাবাসের কর্মকর্তাদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। তাঁরা জামায়াতের লক্ষ্য-উদ্দেশ্যের সঙ্গে আওয়ামী লীগ-বিএনপির লক্ষ্য-উদ্দেশ্যের মধ্যকার পার্থক্য তুলে ধরেন। তাঁরা বলেন, আওয়ামী লীগ ও বিএনপি ভোট সংগ্রহের কৌশলের ওপর ভিত্তি করে বিভিন্ন নির্বাচনের সময় বিভিন্ন অবস্থান গ্রহণ করে, কিন্তু জামায়াতের মনোযোগ নিবদ্ধ তার চূড়ান্ত লক্ষ্যের দিকে। চূড়ান্ত লক্ষ্যটি হচ্ছে: বাংলাদেশকে সত্যিকার অর্থে একটি ইসলামি দেশে পরিণত করা। ব্যারিস্টার রাজ্জাক মার্কিন দূতাবাসকে বলেন, জামায়াত পরবর্তী নির্বাচনে জয়ী হওয়া বা জাতীয় সংসদে আসনসংখ্যা বাড়ানোর মতো স্বল্পমেয়াদি অর্জন নিয়ে চিন্তিত নয়, তাদের দৃষ্টি চূড়ান্ত লক্ষ্যের দিকে।মজলিশের পর দূতাবাসের কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠকে জামায়াতের অ্যাসিস্ট্যান্ট সেক্রেটারি জেনারেল আবদুল কাদের মোল্লা বলেন, ‘আওয়ামী লীগ ও বিএনপি থেকে জামায়াতের পার্থক্য হলো, জামায়াতের একটি ভাবাদর্শ আছে, অন্য দুই দলের কোনো ভাবাদর্শ নেই।’ মোল্লা বারবার বলেন, ‘দারিদ্র্য, নৈতিক দেউলিয়াত্বসহ বাংলাদেশের সব সমস্যার সমাধান হতে পারে কেবল একটি ইসলামি রাষ্ট্রের দ্বারা।’এসব কথা লেখা হয়েছে ২০১০ সালের ৩ জানুয়ারি ঢাকার মার্কিন দূতাবাস থেকে ওয়াশিংটন ডিসিতে মার্কিন পররাষ্ট্র বিভাগের সদর দপ্তরে পাঠানো একটি গোপনীয় তারবার্তায়। ‘জামায়াতে ইসলামী—খরগোশ নয়, কচ্ছপ’ শিরোনামের ওই তারবার্তায় মন্তব্য করা হয়েছে: ‘জামায়াতের নেতারা স্পষ্টতই আশা করেন, ধীরে ও নিরন্তর গতিতে চলাই জয়ী হওয়ার উপায় (স্লো অ্যান্ড স্টিডি উইনস দ্য রেইস)।’সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের রায়ে সংবিধানের পঞ্চম সংশোধনী বাতিল হওয়ার পর জামায়াতের অ্যাসিস্ট্যান্ট সেক্রেটারি জেনারেল ব্যারিস্টার রাজ্জাক তৎকালীন মার্কিন রাষ্ট্রদূত জেমস এফ মরিয়ার্টির সাক্ষাৎ প্রার্থনা করেন। ২০১০ সালের ১০ ফেব্রুয়ারি মরিয়ার্টি সাক্ষাৎ দিলে ব্যারিস্টার রাজ্জাক তাঁকে বলেন, ‘পঞ্চম সংশোধনী বাতিলের ফলে জামায়াতে ইসলামীসহ ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক দলগুলোকে সরকার কর্তৃক বেআইনি ঘোষণা করার পথ উন্মুক্ত হবে।’ রাজ্জাকের মত অনুসারে, ‘বাংলাদেশের আদালত অতিরিক্ত এগিয়ে গিয়ে এ বিষয়ে রুল জারি করেছেন, আদালত এ বিষয়ে তদন্ত বা অনুসন্ধানের সময় না দিয়ে অতিরিক্ত দ্রুততার সঙ্গে কাজ করেছেন।’২০১০ সালের ১৬ ফেব্রুয়ারি রাষ্ট্রদূত মরিয়ার্টি একটি গোপনীয় তারবার্তায় লেখেন: জামায়াতের নেতা ব্যারিস্টার রাজ্জাক ১০ ফেব্রুয়ারি বৈঠকে তাঁকে বলেন, জামায়াতে ইসলামী ‘সাংবিধানিক পথে’ বিশ্বাস করে, দলটি আদালতের সিদ্ধান্ত মেনে চলবে। বাংলাদেশে যদি ধর্মভিত্তিক দলগুলো নিষিদ্ধ হয়ে যায়, তাহলে জামায়াত তুরস্কের ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক দলগুলোর দৃষ্টান্ত অনুসরণ করবে। জামায়াত দলের নাম পরিবর্তন করবে, দলীয় গঠনতন্ত্র থেকে ধর্মীয় মতবাদগুলো বাদ দেবে; কিন্তু একই সঙ্গে তিনি বলেন যে জামায়াত রুলিংটিকে আদালতে চ্যালেঞ্জ করবে। রাজ্জাকের ভাষ্য অনুসারে, ধর্মভিত্তিক দলগুলোর ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করা হলে জামায়াতে ইসলামী দলের নামে ব্যাংক অ্যাকাউন্টে ও ট্রাস্টে যে অর্থ আছে, দলটি তা হারাবে, কিন্তু দল টিকে থাকবে। রাজ্জাক বলেন, একটি ক্ষত সৃষ্টি হবে, তবে সেই ক্ষত সারানো যাবে।রাজ্জাক আরও বলেন, ‘সরকার যদি এভাবে মধ্যপন্থার কণ্ঠ রোধ করে, তবে তা হবে হতাশাব্যঞ্জক, তাতে বিপদের ঝুঁকি সৃষ্টি হবে।’ তিনি এই মতও প্রকাশ করেন যে ‘বাংলাদেশের বিচারকেরা সাংবিধানিক আইনের ভিত্তিতে সিদ্ধান্তটি নেননি, বরং আওয়ামী লীগের সঙ্গে তাঁদের সংশ্লিষ্টতার কারণে অমন সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।’ রাজ্জাক বলেন, ‘সরকার যদি গণতন্ত্রকে নিয়ন্ত্রণ করার চেষ্টা করে (যদি গণতান্ত্রিক পথগুলো বন্ধ করে দেয়), তাহলে এমন হতাশা ও অসন্তোষ সৃষ্টি হবে, যে ধরনের অসন্তোষ থেকে যুক্তরাষ্ট্রে ১১ সেপ্টেম্বরের সন্ত্রাসবাদী হামলার মতো ঘটনা ঘটেছে। ১১ সেপ্টেম্বরের হামলাকারী সন্ত্রাসবাদীরা গণতান্ত্রিক দেশ থেকে আসেনি, এসেছে স্বৈরতান্ত্রিক কয়েকটি দেশ থেকে। বিশ্বাসে ও কাজে গণতান্ত্রিক দল জামায়াতে ইসলামীর বিরুদ্ধে দমন-পীড়ন চালিয়ে সরকার দেশকে স্বৈরতন্ত্রের দিকে নিয়ে যাবে, যেখানে ভিন্নমত প্রকাশের কোনো গঠনমূলক উপায় থাকবে না।’সেদিনের বৈঠকে রাষ্ট্রদূত মরিয়ার্টি জামায়াতের নেতা ব্যারিস্টার রাজ্জাকের সামনে শিবিরের সহিংসতার বিষয়টি বিশেষভাবে উল্লেখ করার সুযোগ নেন। তিনি এ বিষয়ে বিস্তারিত জানতে চাইলে ব্যারিস্টার রাজ্জাক রাষ্ট্রদূতের কণ্ঠে সুর মিলিয়ে বাংলাদেশজুড়ে সাম্প্রতিক ছাত্র-সহিংসতায় তিন ব্যক্তির মৃত্যু এবং ছাত্র, শিক্ষক, কর্মকর্তাসহ কয়েক কুড়ি ব্যক্তির আহত হওয়ার ঘটনার নিন্দা করেন। রাজ্জাক রাষ্ট্রদূতের কাছে বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলীয় শহর রাজশাহীতে ছাত্রসংগঠনগুলোর মধ্যকার সংঘর্ষের বিবরণ দেন। রাজ্জাকের ভাষ্য অনুযায়ী, ‘সন্ধ্যার দিকে একটি ছাত্রাবাসে আওয়ামী লীগ-সমর্থিত ছাত্রসংগঠন ছাত্রলীগের দুজন ও জামায়াতে ইসলামীর সমর্থনপুষ্ট ছাত্রসংগঠন ইসলামী ছাত্রশিবিরের দুজন কর্মীর মধ্যে সামান্য ঘটনাকে কেন্দ্র করে সংঘর্ষ শুরু হয়।’ রাজ্জাক বলেন, ‘সন্ধ্যার সংঘর্ষের পর রাতের আরও পরের দিকে ছাত্রশিবিরের দেড় হাজারের বেশি কর্মী জড়ো হন।’ তিনি বলেন, ছাত্রশিবিরের কর্মীরা ব্যাপক তাণ্ডব শুরু করেন, ছাত্রলীগের এক সদস্যকে হত্যা করে তাঁর মরদেহ ম্যানহোলের মধ্যে ঢুকিয়ে দেন বলে তিনি শুনেছেন। তিনি আরও শুনেছেন, ছাত্রশিবিরের কর্মীরা ছাত্রলীগের কর্মীদের পায়ের রগ কেটে দিয়েছেন। রাষ্ট্রদূত মরিয়ার্টি লিখেছেন, ব্যারিস্টার রাজ্জাক তাঁর কাছে ‘স্বীকার করেছেন যে ওই সহিংসতা ছিল “অমানবিক, দুঃখজনক, কোনোভাবেই জায়েজ করার মতো নয়”।’ওই বৈঠকে জামায়াতের নেতা ব্যারিস্টার রাজ্জাক যুদ্ধাপরাধের বিচারের বিষয়ে আওয়ামী লীগ সরকারের উদ্যোগ সম্পর্কে রাষ্ট্রদূত মরিয়ার্টিকে বলেন, ‘যুদ্ধাপরাধের বিচারের বিষয়টি উত্থাপনের ক্ষেত্রে তিনটি সমস্যা আছে: ১. বিষয়টির নিষ্পত্তি আগেই হয়ে গেছে, নতুন করে বিষয়টি উত্থাপনের কোনো প্রয়োজন নেই; ২. বিষয়টি ফিরিয়ে আনা হয়েছে রাজনৈতিক কারণে এবং ৩. বর্তমানে বিদ্যমান আইন আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের অনেক নিচে। তবে যদি আইনটি সংশোধন করা হয়, তাহলে যুদ্ধাপরাধের বিচারের দিকে সরকার এগিয়ে গেলে জামায়াতের আপত্তি থাকবে না।’উইকিলিকসের ফাঁস করা মার্কিন গোপনীয় তারবার্তাগুলোতে দেখা যাচ্ছে, ২০০৮ সালের ২৯ জানুয়ারির নির্বাচনে জয়ী হয়ে সাত বছর পর আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় ফিরে এলে জামায়াতে ইসলামীর উদ্বেগ শুরু হয়। ২০০৯ সালেই দলটির নেতারা মার্কিন দূতাবাসের কর্মকর্তাদের কাছে অভিযোগ করা শুরু করেন যে আওয়ামী লীগ তাঁদের কোণঠাসা করার চেষ্টা করছে। সংবিধানের পঞ্চম সংশোধনী বাতিল হওয়ার পর ধর্মভিত্তিক দল হিসেবে জামায়াতে ইসলামীর নিষিদ্ধ হওয়ার আশঙ্কা প্রকট হয়ে উঠেছিল বটে, কিন্তু বাস্তবে দেখা যাচ্ছে, আওয়ামী লীগ সরকার সেই পথে অগ্রসর হয়নি। কিন্তু সবর্শেষ শাহবাগ আন্দোলনের পরিপ্রেক্ষিতে যুদ্ধাপরাধের বিচার-সংক্রান্ত আইন সংশোধনের ফলে যুদ্ধাপরাধীদের দল হিসেবে জামায়াতের রাজনীতি নিষিদ্ধ হওয়ার আশঙ্কা নতুন করে সৃষ্টি হয়েছে। এটি সত্যিই জামায়াতের জন্য একটি কোণঠাসা অবস্থা। আজ থেকে দুই বছর আগে রাষ্ট্রদূত মরিয়ার্টি তাঁর লেখা ওই তারবার্তায় মন্তব্য করেছিলেন: ‘১৯৭১ সালের পর জামায়াত বর্তমানে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি। এ বিষয়ে সন্দেহের অবকাশ কম যে, ক্ষমতাসীন দলের কট্টরপন্থীরা মনে করছেন, জামায়াত ও অন্যান্য ইসলামি দলকে ধ্বংস করার উপযুক্ত সময় এখনই।’দুই বছর পর আজ যুদ্ধাপরাধের বিচার ও জামায়াত-শিবির নিষিদ্ধ করার পক্ষে প্রবলতম জনমত ও সংশোধিত আইনি হাতিয়ার কাজে লাগিয়ে আওয়ামী লীগ সরকার যদি জামায়াতকে ধ্বংস করতে সত্যিই অগ্রসর হয়, তাহলে দলটির পিঠ দেয়ালে ঠেকে যাবে। এমন দুর্দশায় কী করবে জামায়াত? দলটির নেতা ব্যারিস্টার রাজ্জাক রাষ্ট্রদূত মরিয়ার্টিকে এই বলে আশ্বস্ত করতে চেয়েছিলেন যে, তাঁর দল আইনের শাসন মেনে নেবে; কিন্তু জামায়াতের ওপর বাংলাদেশ সরকারের চাপ বৃদ্ধি পেতে থাকলে দলটির মধ্যকার কট্টর বা উগ্রপন্থীদের আচরণ হয়তো ব্যারিস্টার রাজ্জাকের আশ্বাসের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ থাকবে না।কচ্ছপ দীর্ঘায়ু জীব। জনশ্রুতি আছে, কচ্ছপের কামড় বড়ই নাছোড়।প্রথমা থেকে সদ্য প্রকাশিত বই উইকিলিকসে বাংলাদেশ অবলম্বনেমশিউল আলম: সাংবাদিক।[email protected]