
তলস্তয়ের ‘তিন প্রশ্ন’ গল্পে এক রাজা তিনটা প্রশ্নের উত্তর খুঁজছিলেন। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সময় কী, সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি কে? সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজ কী?
রাজা ঘোষণা দিলেন, যে তাঁকে এই প্রশ্ন তিনটির উত্তর দিতে পারবে, তাকে তিনি অনেক পুরস্কার দেবেন। কত জ্ঞানী ব্যক্তি এল। তারা কত-কী বলল। কিন্তু একজনের সঙ্গে আরেকজনের উত্তর মেলে না। কেউ বলে, আপনি একটা ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা বানান, দিন-তারিখ-সময় দিয়ে একটা শিডিউল তৈরি করুন, তারপর আপনার কাজগুলোকে সেই ছকে ফেলুন। কখন কী করতে হবে, জানতে পারবেন। কেউ বলল, সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজ হলো সৈন্যদের কাজ। কেউ বলল ধর্মকর্ম, কেউ বলল ডাক্তারি। রাজা কোন উত্তর ছেড়ে কোনটা নেবেন।
শেষে তিনি শুনলেন একজন সাধুর কথা, যিনি বাস করেন বনের ধারে। তিনি সত্যিকারের জ্ঞানী। তাঁর কাছে গেলেই পাওয়া যাবে এই প্রশ্ন তিনটার উত্তর। তিনি ছদ্মবেশে হাজির হলেন সেই সাধুর কাছে, একা, হেঁটে। সাধু তখন কোদাল দিয়ে গর্ত খুঁড়ছিলেন। রাজা তাঁর কাছে প্রশ্ন তিনটা করলেন। সাধু জবাব দিলেন না। রাজা বললেন, আপনার কোদাল দিন। আমি আপনাকে সাহায্য করি। সাধু একটুখানি জিরিয়ে নিলেন। রাজা কোদাল দিয়ে মাটি খুঁড়তে লাগলেন। এই সময় একজন রক্তাক্ত ব্যক্তি এল ঘটনাস্থলে। তার পেটে ছুরিকাঘাত। রাজা আর সাধু মিলে তার শুশ্রূষা করলেন। সে জানাল, রাজার পুরোনো শত্রু সে। এসেছিল রাজাকে হত্যা করতে। রাজা কোদাল খুঁড়ছিলেন। তাই তাঁকে মারতে সে পারেনি। সুযোগের অপেক্ষায় ছিল, তখন রক্ষীরা তাকে চিনে ফেলে ও ছুরিকাঘাত করে।
রাজার সঙ্গে তার সন্ধি হলো।
সাধু বললেন, রাজার তিনটা প্রশ্নের উত্তর দেওয়া হয়ে গেছে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সময় হলো: এখন।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি হলো: এই মুহূর্তে যে তোমার সঙ্গে আছে।
আর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজ হলো, সামনে যে আছে, তার উপকার করা। তুমি যদি আমাকে সাহায্য না করতে, তাহলে মারা যেতে। আর তুমি যদি ওই আহত ব্যক্তির শুশ্রূষা না করতে, তার সঙ্গে সন্ধি হতো না।
হঠাৎ থ্রি কোশ্চেনস বা তিন প্রশ্ন গল্প নিয়ে পড়লাম কেন?
সামনে বইমেলা। উপন্যাস লিখতে হবে। ডিসেম্বর মাসে লিখব ভেবেছিলাম। পারলাম না। জানুয়ারি মাসে অফিস থেকে ছুটি নিলাম। তা–ও পারি না। রোজ কত জরুরি কাজের ডাক এসে যায়।
তখন ঠিক করলাম, একটা কাজ করি। মোবাইল ফোন বন্ধ করে দিই। আর অফলাইন হয়ে যাই। ফেসবুকে ঢুকব না। এরপরে দেখি লেখা শুরু হয়ে গেল।
উপন্যাস সাংঘাতিক ব্যাপার। আপনি একটা কাল্পনিক জগতে ঢুকে যাবেন, কল্পিত চরিত্রের সঙ্গে দিনের পর দিন বসবাস করতে থাকবেন। তাদের ভালোমন্দই আপনার জন্য প্রধান মাথাব্যথা হয়ে উঠবে।
ওই সময় যদি আপনার সামনে বাস্তবের মানুষ এসে পড়ে, তাহলে আপনি নিশ্চয়ই বাস্তবের মানুষটাকেই বেশি গুরুত্ব দেবেন। তাহলে আপনি উপন্যাস লিখবেন কখন? আদৌ লেখার প্রয়োজনীয়তাই অনুভব করবেন না।
লেখালেখি দিয়ে কী হয় আসলে? গল্প-কবিতা কিংবা চিত্রকলা দিয়েই-বা কী হয়? শিল্প তো স্টেডিয়ামে উইকেটের পতন, শেয়ার মার্কেটের দরপতন, কিংবা সিরিয়ার শিশুদের ওপরে বোমার পতন রোধ করতে পারে না। শিল্প আপনাকে টাকা দেবে না। নামের চেয়ে বদনাম দেবে বেশি। রবীন্দ্রনাথ নোবেল পুরস্কার পান ১৯১৩ সালে, ১৯১৪ সালে কলকাতার ম্যাট্রিক মানের পরীক্ষায় রবীন্দ্রনাথের প্রকাশিত লেখা থেকে একটা অনুচ্ছেদ হুবহু তুলে দিয়ে বলা হয়েছিল, এই অনুচ্ছেদটিকে অভিজাত ও সঠিক বাংলায় পুনর্লিখন করো। জীবনানন্দ দাশ মারা গেলে তাঁর ওপরে সুধীন্দ্রনাথের কাছে লেখা চেয়েছিলেন বুদ্ধদেব বসু; সুধীন্দ্রনাথ দত্ত বলেছিলেন, যে কবি নয়, তার ওপরে স্মরণসংখ্যা বের করবার দরকার কী। রবীন্দ্রনাথ কিংবা জীবনানন্দ দাশ যদি এত অবহেলা ও আঘাত পেয়ে থাকেন, অন্যদের বেলায় কী হবে, তা সহজবোধ্য।
তাহলে আপনি কেন লিখবেন। অন্য যেকোনো কাজই তো লেখার চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ। ধরুন, আপনি টাক নিয়ে একটা ছড়া লিখছেন। এই
সময় একজন আপনাকে ফোন করলেন। খুবই গুরুত্বপূর্ণ একটা বিষয় নিয়ে আলোচনা করব। সড়ক দুর্ঘটনা রোধ করা। আপনি বললেন, আমি একটা ছড়া লিখছি।
তিনি বলতেই পারেন, রোজ বাংলাদেশে ৬০ জন মানুষ মারা যায় সড়ক দুর্ঘটনায়। আমরা যদি একটা দুর্ঘটনা রোধ করতে পারি, পাঁচটা লোকের জীবন বাঁচবে। আপনি ঠিক করুন এখন, আপনি টাক নিয়ে কবিতা লিখবেন, নাকি ওই ভদ্রলোকের সঙ্গে সড়ক দুর্ঘটনা রোধের আলোচনা করবেন।
পৃথিবীর অন্য যেকোনো কাজ লেখালেখির চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ। এটা যদি আপনি জেনে যান, তাহলে আপনি আর লেখক হতে পারবেন না। আপনাকে এই রকমের একটা বিশ্বাস ধারণ করতে হবে যে আপনি এই কবিতাটা, এই ছড়াটা না লিখলে বা আপনি এই ছবিটা না আঁকলে পৃথিবী ধ্বংস হয়ে যাবে। আপনার লেখাটা এমনই গুরুত্বপূর্ণ।
কে বলেছে কবিতা কোনো কিছু করতে পারে না? শিল্পী কোনো কিছু করতে পারে না? শিল্প-সুর, শব্দ, রং, সংগীত, চলচ্চিত্র একটা আশ্চর্য কাজ করতে পারে, আর তা সে করে গোপনে, নিভৃতে; তা হলো, মানুষের হৃদয়টাকে শুশ্রূষা করা। ঘাতকের হাত থেকে ছুরি পড়ে যায়, অ্যাটম বোমার সুইচ থেকে আঙুল সরিয়ে ফেলেন রাষ্ট্রপ্রধান, ঘাতক ড্রাইভার মানুষের জীবনের মূল্য বুঝতে পারে, সে যদি শিল্প-সাহিত্য সম্ভোগ করতে শেখে। লেখকেরা-শিল্পীরা এভাবে তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ রোধ করেন।
এভাবে যদি ভাবতে পারি, তাহলে আমি লিখতে পারব। শচীন টেন্ডুলকার যদি জেনে যান, খেলে কিছু হয় না, এর কোনো মানে নেই, তাহলে তিনি কেন রোদের মধ্যে সারা দিন ধরে একটা কাঠের খণ্ড ধরে দৌড়াবেন। তিনি যখন জানেন, ওই কাজটাই তাঁর জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজ, এতই গুরুত্বপূর্ণ যে এমনকি পিতার মৃত্যুর পরে আবার ফিরে যেতে হয় ইংল্যান্ডে, ব্যাট তুলে নিতে হয় বিশ্বকাপে, তখনই কেবল তাঁর পক্ষে উৎকর্ষ ছোঁয়া সম্ভব।
কাজেই আমরা যে যা করছি, তা যদি মানুষের ক্ষতি না করে, তাহলে সেই কাজটাই খুব মন দিয়ে যেন করতে পারি। আমার সামনে যিনি আছেন, আমি যেন তাঁকে গুরুত্ব দিই এবং এখন আমি যেন মানুষের উপকার করতে পারি। আর যেন মনে রাখি, এই মুহূর্তটাই সবচেয়ে মূল্যবান। কিছু করবার জন্য এখনই শ্রেষ্ঠ সময়।
আনিসুল হক: সাহিত্যিক ও সাংবাদিক।